রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের ২৫,০০০ শ্রমিককে স্বেচ্ছা অবসরে পাঠানোর প্রক্রিয়ায় উদ্বেগ
বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের ক্রমবর্ধমান লোকসানের বোঝা কমাতে প্রায় ২৫ হাজার স্থায়ী শ্রমিককে স্বেচ্ছা অবসরে (গোল্ডেন হ্যান্ডশেক) পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন (বিজেএমসি)।
গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের অংশ হিসেবে শ্রমিকেরা কী কী সুযোগ-সুবিধা পাবেন, তা শিগগিরই চূড়ান্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়।
এ প্রসঙ্গে গতকাল অনুষ্ঠিত এক বৈঠক শেষে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গাজী গোলাম দস্তগীর বলেছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল থাকবে। তবে ব্যবস্থাপনা বেসরকারীকরণ করা হবে, যাতে লোকসান না হয়। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি)-এর ভিত্তিতে মিলগুলো চালানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। তিনি জানান, অবসরে পাঠানো শ্রমিকেরা সেপ্টেম্বরে তাদের পাওনা টাকা পাবেন।
তবে, শ্রমিক নেতারা বলেছেন, ‘আমরা শ্রমিকেরা গোল্ডেন হ্যান্ডশেক চাই না। আমরা কাজ করে খেতে চাই।’ শ্রমিক নেতাদের অভিমত, প্রায় এক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে পাটকলগুলোর যন্ত্রপাতি আধুনিকায়ন করলেই উৎপাদন তিন গুণ বৃদ্ধি পাবে।
এ প্রসঙ্গে খুলনা অঞ্চলের প্রবীণ শ্রমিক নেতা আবদুর রশিদ রেডিও তেহরানকে বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত পাট কলের শ্রমিকদের অবসরে পাঠাবার খবরে তাদের মাঝে তীব্র হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল তারা বিভিন্ন মিল গেটে সমাবেশ করেছে এবং আজ বিকেলে খুলনা-যশোর অঞ্চলের শ্রমিক নেতারা বসে তাদের কর্মসূচি নিয়ে কথা বলবেন।

ওদিকে, বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারন সম্পাদক এ এ এম ফয়েজ বলেছেন, এ বিষয়ে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন পেশাজীবী সংগঠন ও রাজনৈতিক দলের সাথে তারা আলোচনা শুরু করেছেন। সকলে মিলে একটা বৃহত্তর কর্মসূচি নেবার পরিকলন্পনা করা হচ্ছে। তিনি দৃঢ়তার মাথে জানান, শ্রমিকদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেলে তাদের তীব্র অন্দোলন সরকারের জন্যও বিপজ্জনক হয়ে পড়তে পারে।
উল্লেখ্য, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিজেএমসির আওতায় ২৬টি পাটকলের মধ্যে বর্তমানে চালু আছে ২৫টি। এর মধ্যে ২২টি পাটকল ও ৩টি নন–জুট কারখানা। পাটকলগুলোতে বর্তমানে স্থায়ী শ্রমিক আছেন ২৪ হাজার ৮৫৫ জন। এ ছাড়া তালিকাভুক্ত বদলি ও দৈনিকভিত্তিক শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ২৬ হাজার।
দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো লোকসানের বৃত্ত থেকে বের হতে পারছিল না। গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে পাটকলগুলো ৪৯৭ কোটি টাকার লোকসান গুনেছে। পরের বছর সেই লোকসান বেড়ে ৫৭৩ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। লোকসানের চক্কর থেকে বের হতে না পারায় পাটকলের শ্রমিকদের মজুরি বকেয়া পড়ে। আন্দোলনে নামেন শ্রমিকেরা। তাঁদের অর্থ পরিশোধে অর্থ মন্ত্রণালয়ে হাত পাতে বিজেএমসি। কয়েক বছর ধরে এমন ঘটনা ধারাবাহিকভাবে ঘটে আসছে।
অন্যদিকে বিজেএমসির আয়ও বছর বছর কমছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে করপোরেশনটির আয় ছিল ১ হাজার ১৭৯ কোটি টাকা। গত অর্থবছর সেটি কমে ৭০৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

পাটকলগুলোর আয় কমে যাওয়া এবং বছরের পর বছর লোকসানের কারণ হিসেবে বিজেএমসির শীর্ষ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে শ্রমিকনেতারা বলছেন, লোকসানের বড় কারণ কাঁচা পাট কেনায় অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি। তারা পাট কেনে দেরিতে ও বেশি দামে। এছাড়া সরকারি পাটকলের উৎপাদনশীলতা কম, উৎপাদন খরচ বেশি, যন্ত্রপাতি পুরোনো এবং বেসরকারি খাতের তুলনায় শ্রমিকের মজুরি বেশি।
২০১৫ সালের ১ জুলাই থেকে নতুন মজুরি স্কেল কার্যকর হলেও সে অনুযায়ী মজুরি দেওয়া হয়নি। তাতে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বকেয়া মজুরি রয়েছে। তা ছাড়া অবসরে যাওয়া প্রায় ৯ হাজার শ্রমিকের গ্র্যাচুইটি বাবদ ১ হাজার কোটি টাকা বকেয়া আছে।
এ প্রসঙ্গে বিজেএমসির চেয়ারম্যান মো. আবদুর রউফ গণমাধ্যমকে বলেছেন, স্থায়ী শ্রমিকদের অবসরে পাঠানোর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। তবে এখনো সবকিছু চূড়ান্ত হয়নি। শ্রমিকদের বিষয়টি সুরাহা হওয়ার পরে পাটকলগুলো কীভাবে চলবে, তা ঠিক করা হবে। তিনি বলেন, গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের জন্য যে অর্থ প্রয়োজন, তা আগামী অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
বিজেএমসির চেয়ারম্যান বলেন, গোল্ডেন হ্যান্ডশেক হলেও বর্তমানের শ্রমিকেরা পরে পাটকলগুলোতে কাজ করবেন। কারণ, তাঁদের মতো দক্ষ শ্রমিক আর পাওয়া যাবে না।
সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, পাটকলগুলোকে আধুনিকায়ন করে লাভজনক করা সম্ভব। পাটকলগুলো পিপিপি মডেলে চালানোর যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যক্তি খাতে ছেড়ে দেওয়ার মতোই।
এদিকে বাম গণতান্ত্রিক জোট কেন্দ্রীয় পরিচালনা পরিষদের সমন্বয়ক বজলুর রশীদ ফিরোজ, সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, বাসদের সাধারণ সম্পাদক কমরেড খালেকুজ্জামান, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকিসহ কয়েকটি বাম রাজনৈতিক দলের নেতা এক বিবৃতিতে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্তে উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়েছেন।#
পার্সটুডে/আবদুর রহমান খান/আশরাফুর রহমান/২৬
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন