শত বাধা সত্ত্বেও ইরানের পারমাণবিক অগ্রগতিতে পশ্চিমা শক্তিগুলোর ক্রুদ্ধ ও ক্ষুব্ধ
আইএইএ'র অসহযোগিতার জবাবে ইরানের পাল্টা যৌক্তিক ব্যবস্থা
ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রধান মুহাম্মাদ ইসলামী বলেছেন, পরমাণু তৎপরতা ও পরমাণু চুক্তির বিষয়ে তেহরানের মানদণ্ড হল দেশটির জাতীয় সংসদ বা মজলিসে শুরায়ে ইসলামী।
তিনি এ প্রসঙ্গে আরও বলেছেন, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বা আইএইএ ইরানের ব্যাপারে নানা বাধা ও অসহযোগিতা সৃষ্টি করায় তেহরানও পরমাণু সমঝোতার ধারা অনুযায়ী তার অঙ্গীকার বাস্তবায়ন কার্যক্রম কমিয়ে আনার পদক্ষেপ নিচ্ছে। জনাব ইসলামী গতকাল ভিয়েনায় আইএইএ'র নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে ইরানের পরমাণু তৎপরতা সম্পর্কে এই সংস্থার তুলে ধরা প্রতিবেদনের বিষয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, ইরানের সঙ্গে যেসব দেশের সরকার পরমাণু বিষয়ে চুক্তি বা সমঝোতা করেছিল তারা চুক্তির শর্তগুলো পালন করেনি বা চুক্তির আলোকে দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করেনি এবং মার্কিন সরকার তো প্রকাশ্যেই ওই চুক্তি বা সমঝোতা থেকে বেরিয়ে গেছে ও এমনকি চুক্তির শরিক কয়েকটি সরকারকেও ইরানের সঙ্গে সহযোগিতা করতে দেয়নি।
ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রধান আরও বলেছেন, পরমাণু সমঝোতার ২৬ নম্বর ও ৩৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে যদি চুক্তির এক পক্ষ তার অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়ন না করে তাহলে অন্য পক্ষও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের মাত্রা কমিয়ে আনার অধিকার রাখে এবং ইরানের সংসদের আইনেও একই ধরনের কর্মপন্থা বা পদক্ষেপ নেয়ার বিধান রয়েছে।
আইএইএ'র মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি গতকাল ভিয়েনায় এ সংস্থার নির্বাহি বৈঠকে দ্বিমুখী নীতি ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য-প্রণোদিত অবস্থান নিয়ে ইরানের পরমাণু তৎপরতা সম্পর্কে রিপোর্ট দিয়েছেন। তিনি ইরানের পরমাণু তৎপরতা পর্যবেক্ষণের বিষয়ে এমনসব দাবি দাওয়া পেশ করেছেন যা এ সংক্রান্ত চুক্তি বা আইনের আওতায় পড়ে না। তাই ইরান এসব দাবির ব্যাপারে প্রতিবাদ জানিয়েছে। অন্যদিকে ফ্রান্স, ব্রিটেন ও জার্মানি এইসব দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। আসলে আইএইএ'র মহাপরিচালক এ ধরনের দাবি জানিয়ে নির্বাহি পরিষদের সভায় ইরানের বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের প্রস্তাব উত্থাপনের পথ সুগম করেছেন। গ্রোসি কারিগরি সহযোগিতার বিষয়ে নজর না দিয়ে নোংরা রাজনৈতিক খেলায় মেতে উঠেছেন। ফলে পরমাণু বিষয়ক এই আন্তর্জাতিক নজরদারি সংস্থার নিরপেক্ষতা আবারও ক্ষুণ্ণ হচ্ছে এবং ইরানের সঙ্গে এই সংস্থার সম্পর্কগুলো অচলাবস্থার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ইরানের পাল্টা কঠোর প্রতিক্রিয়ার সুবাদে।
আসলে ইরান শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচিকে সাফল্যের সঙ্গে নানা ক্ষেত্রে এগিয়ে নিতে সক্ষম হচ্ছে দেখে পশ্চিমা শক্তিগুলোর ঘুম হারাম হয়ে গেছে। শত বাধার সত্ত্বেও ইরানের এই অগ্রগতিতে পশ্চিমা শক্তিগুলোর ক্রুদ্ধ ও ক্ষুব্ধ। অথচ পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির সদস্য হিসেবে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার নানা সহায়তা পাওয়াটা ছিল ইরানের প্রাপ্য বা ন্যায্য অধিকার।
ইরান ২০১৫ সালে পরমাণু বিষয়ক একটি সমঝোতা স্বাক্ষর করে ছয় বৃহৎ শক্তির সঙ্গে যা জাতিসংঘেও অনুমোদিত হয়। কিন্তু ওই চুক্তি অনুযায়ী ইরানের ওপর যেসব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার কথা ছিল সেসব অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তবায়ন করা হয়নি। বরং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ২০১৮ সালের মে মাসে একতরফা এক সিদ্ধান্ত নিয়ে ওই চুক্তি থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বিচ্ছিন্ন বলে ঘোষণা করেন। এ অবস্থায় চুক্তির অন্যান্য সদস্য দেশগুলো এ চুক্তি থেকে মার্কিন সরকারের বেরিয়ে যাওয়ার ক্ষতি পূরণের জন্য ১১টি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু এইসব প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়নের মুখ দেখতে পায়নি সদিচ্ছার অভাবে ও মার্কিন চাপের কারণে।
এ অবস্থায় ২০১৯ সালের মে মাসে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ ইউরোপীয় পক্ষগুলোকে তাদের প্রতিশ্রুতি পালনের জন্য আরও ৬০ দিনের সময় দেয়। মার্কিন সরকার এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরও এক বছর পর্যন্ত ইরান চুক্তির সব শর্ত অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করে এসেছে। অবশেষে মার্কিন সরকারের মিত্র ইউরোপীয় পক্ষগুলোও তাদের প্রতিশ্রুতি পালন না করায় এবং ২০২১ সালে ক্ষমতায় আসা বাইডেন সরকারও ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগের নীতি অব্যাহত রাখায় এটা স্পষ্ট হয়েছে যে মার্কিন সরকার ও ইউরোপীয় পক্ষগুলো এই চুক্তি বাস্তবায়নে মোটেই আগ্রহী নয়। তাই ইসলামী ইরানও প্রতিপক্ষগুলোর এমন অসহযোগিতার জবাব হিসেবে ওই চুক্তির অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়ন স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়েছে।#
পার্সটুডে/এমএএইচ/০৫
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।