ইরান ইস্যুতে কৌশলগত সংকটে ট্রাম্প, বলছে সিএনএন
পার্সটুডে: মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে,ইরানের পারমাণবিক ইস্যু মোকাবিলায় মার্কিন প্রশাসন বিভ্রান্তি ও নীতিগত অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে।
গত কয়েক সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে একাধিকবার ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। কখনও তিনি এসব মজুদকে “তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়” বলে উল্লেখ করে বলেছেন যে স্যাটেলাইট নজরদারিই যথেষ্ট। আবার কখনও তিনি এসব ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তরের কথা বলেছেন। পরে সেগুলো মাটির নিচে পুঁতে সিলগালা করার ধারণা তুলে ধরেন এবং শেষ পর্যন্ত আবারও সেগুলো ধ্বংস বা দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়ার পক্ষে জোর দেন।
প্রতিবেদনটি বলছে,এই পরস্পরবিরোধী অবস্থানকে কেবল ট্রাম্পের ব্যক্তিগত অপ্রত্যাশিত আচরণের ফল হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের গভীর কৌশলগত সংকটের প্রতিফলন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত ৪০ দিনের যুদ্ধের পর ওয়াশিংটন এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে, যা তাদের প্রাথমিক হিসাব-নিকাশের সঙ্গে মেলে না। হোয়াইট হাউস ও তেল আবিবের প্রত্যাশার বিপরীতে,এই সংঘাত ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতা ভাঙতে পারেনি, দেশটির কৌশলগত কাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারেনি এবং তেহরানকে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দাবিগুলো মেনে নিতেও বাধ্য করতে পারেনি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প ও তার ঘনিষ্ঠ মহল ধারণা করেছিল যে সামরিক, অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপের সমন্বিত প্রয়োগের মাধ্যমে তারা ইরানকে এমন অবস্থায় নিয়ে যেতে পারবে, যেখানে সংকট নিরসনের জন্য তেহরানকে বড় ধরনের ছাড় দিতে হবে। এর মধ্যে ছিল আরও কঠোর পারমাণবিক সীমাবদ্ধতা, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির নিয়ন্ত্রণ এবং আঞ্চলিক ভূমিকায় পরিবর্তন আনার মতো বিষয়।
কিন্তু বাস্তবে যা ঘটেছে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে। ইরান শুধু তার সামরিক সক্ষমতা ও অবকাঠামো ধরে রাখতেই সক্ষম হয়নি, বরং আঞ্চলিক মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে এবং অভ্যন্তরীণ সংহতি বজায় রেখে এই বার্তা দিয়েছে যে সম্ভাব্য যেকোনো যুদ্ধের খরচ ওয়াশিংটনের প্রাথমিক ধারণার চেয়ে অনেক বেশি হবে।
প্রতিবেদনটি বলছে, বর্তমানে ট্রাম্প রাজনৈতিকভাবে এমন একটি অবস্থায় রয়েছেন যেখানে তার একটি দৃশ্যমান সাফল্যের প্রয়োজন। যে প্রেসিডেন্ট দ্রুত ইরানকে নিয়ন্ত্রণে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সংঘাত শুরু করেছিলেন তাকে এখন মার্কিন জনগণ ও আঞ্চলিক মিত্রদের সামনে কোনো না কোনো অর্জন দেখাতে হবে।
এই প্রেক্ষাপটে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিষয়টি একটি প্রতীকী ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। হোয়াইট হাউস এটিকে এমন একটি বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়, যেখান থেকে তারা ইরানের কাছ থেকে ছাড় আদায় করেছে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি এবং প্রযুক্তিগত বাস্তবতা ট্রাম্প প্রশাসনের সেই প্রচেষ্টাকে সীমিত করে দিয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বছরের পর বছর নিষেধাজ্ঞা, পারমাণবিক বিজ্ঞানীদের হত্যা, নাশকতা এবং রাজনৈতিক চাপ সত্ত্বেও ইরান শুধু তার পারমাণবিক জ্ঞানই সংরক্ষণ করেনি, বরং নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও সুসংহত করেছে। ফলে ইউরেনিয়ামের কিছু অংশ সরিয়ে নেওয়া বা সীমিত করা হলেও প্রযুক্তিগত জ্ঞান, মানবসম্পদ এবং কর্মসূচি পুনর্গঠনের সক্ষমতা বহাল থাকবে।
এ কারণেই মার্কিন নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের একটি অংশ প্রতীকী ও প্রচারমূলক পদক্ষেপের কার্যকারিতা নিয়ে সন্দিহান।
প্রতিবেদন অনুসারে, ট্রাম্পের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এই রাজনৈতিক অচলাবস্থারই বহিঃপ্রকাশ। যখন তিনি বলেন ইউরেনিয়াম মজুদ তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়, তখন তিনি প্রযুক্তিগত বাস্তবতার কথা উল্লেখ করেন। কিন্তু যখন তিনি সেগুলো ধ্বংস বা সরিয়ে নেওয়ার দাবি করেন, তখন তিনি মূলত একটি রাজনৈতিক বিজয়ের চিত্র তুলে ধরতে চান।
বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্বৈত অবস্থান ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যেরও ইঙ্গিত দেয়। প্রশাসনের একটি অংশ এখনো সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতিতে বিশ্বাসী, অন্য অংশ মনে করে যুদ্ধ-পরবর্তী ইরান আগের অবস্থানে নেই এবং তাকে চাপ দিয়ে শর্ত মানতে বাধ্য করা সহজ হবে না।
প্রতিবেদনটি আরও উল্লেখ করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সীমাবদ্ধতারও মুখোমুখি। একদিকে তাকে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতা সামাল দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে পশ্চিম এশিয়ায় নতুন করে দীর্ঘস্থায়ী সংকটে জড়ানোর সক্ষমতা ও আগ্রহ সীমিত।
এছাড়া ইরাক ও আফগানিস্তানের অতীতের অভিজ্ঞতাও এখনো মার্কিন কৌশলগত চিন্তায় প্রভাব ফেলছে। ফলে ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে তার অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত খরচ অনিশ্চিত ও ব্যাপক হতে পারে।
প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন এখনো এমন একটি সমঝোতা খুঁজছে যাকে রাজনৈতিক বিজয় হিসেবে উপস্থাপন করা যায়। কিন্তু যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতায় ইরান বারবার দেখিয়েছে যে, অস্থায়ী বা অনিশ্চিত কোনো চুক্তির বিনিময়ে সে তার নিরাপত্তা ও কৌশলগত সক্ষমতা বিসর্জন দিতে প্রস্তুত নয়।#
পার্সটুডে/এমবিএ/৩০
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।