বিশ্লেষণ | পারস্য উপসাগর থেকে সামরিকভাবে সরে যাওয়ার কথা ভাবছে ওয়াশিংটন
পার্সটুডে—ওয়াশিংটন পোস্ট-এর প্রতিবেদনে মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর পারস্য উপসাগরে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর বিষয়টি পর্যালোচনা করছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর (পেন্টাগন)।
পার্সটুডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পেন্টাগনের নীতি পরিকল্পনা দপ্তর, জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ এবং মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) উপসাগরে যুদ্ধ-পরবর্তী মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ব্যাপকভাবে কমানোর সম্ভাবনা পর্যালোচনা করছে। এটি পশ্চিম এশিয়ায় ওয়াশিংটনের সামরিক কৌশলে একটি মৌলিক পরিবর্তনের প্রাথমিক ইঙ্গিত হতে পারে। সেন্টকমের কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারও উপসাগর থেকে আরও পশ্চিমে মার্কিন সেনা সরিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা পর্যালোচনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে:
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে মার্কিন ঘাঁটির দুর্বলতা: এই পুনর্মূল্যায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো উপসাগরে মার্কিন বড় ঘাঁটিগুলো ইরানের মিসাইল ও ড্রোন হামলার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। যুদ্ধের সময় ইরানের হামলায় বেশ কয়েকটি ঘাঁটি মাসের পর মাস লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল এবং কমপক্ষে ১৬ মার্কিন সেনা নিহত ও শতাধিক আহত হয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেন্টাগন স্পষ্ট জানিয়েছে যে তারা আগের মতো করে ঘাঁটিগুলো পুনর্নির্মাণ নাও করতে পারে।
হুমকি সম্পর্কিত হিসাব-নিকাশে পরিবর্তন: ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ মার্কিন সামরিক বাহিনীকে বাস্তবতা উপলব্ধি করিয়েছে যে ইরানের প্রতিবেশী অঞ্চলে বড় ও কেন্দ্রীভূত ঘাঁটিতে বাহিনী মোতায়েন রাখা তাদের সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। এক সূত্রের মতে, কমান্ডাররা মনে করেন 'ইরান জানে আমরা ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোতে আছি' এবং এই সচেতনতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সুবিধা কেড়ে নিয়েছে। তাই বাহিনীকে ছড়িয়ে দেওয়া এবং উপসাগর থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়া ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন হুমকির বিরুদ্ধে একটি সামরিক প্রতিক্রিয়া।
বৈশ্বিক অগ্রাধিকার পুনর্মূল্যায়ন: যদিও এই পর্যালোচনা এখনো যুদ্ধমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক নির্দেশে রূপান্তরিত হয়নি এবং এটিকে 'সতর্ক পরিকল্পনা' হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে, তবে এটি পশ্চিম এশিয়ায় ব্যাপক উপস্থিতি বজায় রাখার খরচ বনাম তার সুবিধা সম্পর্কে পেন্টাগনের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন নির্দেশ করে।
উপসাগরে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি সম্ভাব্য হ্রাসের বিভিন্ন মাত্রা ও পরিণতি রয়েছে:
আঞ্চলিক মিত্রদের প্রতিক্রিয়া: মার্কিন সামরিক উপস্থিতি স্থায়ীভাবে হ্রাস পেলে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের ওয়াশিংটনের মিত্ররা গভীর উদ্বিগ্ন হবে। বাহরাইন (পঞ্চম নৌবহরের সদরদপ্তর), কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলি যারা কয়েক দশক ধরে মার্কিন নিরাপত্তা ছাতার অধীনে ছিল, তারা এখন নিজেদের আঞ্চলিক হুমকি ও নিরাপত্তা শূন্যতার মুখোমুখি দেখতে পাবে।
বিকল্প স্থান: প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাহিনীকে পশ্চিমে সরানোর মধ্যে জর্ডান, অধিকৃত ফিলিস্তিন বা লোহিত সাগর উপকূলে সৌদি আরবের মতো স্থান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পেন্টাগন মনে করছে, এই স্থানান্তর সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা বজায় রেখে বাহিনীকে ইরানের কিছু অস্ত্রের সরাসরি পাল্লার বাইরে নিয়ে যেতে পারে।
ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ বিভেদ: আশা করা যায় যে এই বিষয়টি মার্কিন সরকারের মধ্যে আরও হস্তক্ষেপ চাওয়া উগ্রপন্থী গোষ্ঠী এবং অ-হস্তক্ষেপবাদী গোষ্ঠীর মধ্যে বিভেদ তৈরি করবে।
মনে হচ্ছে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ, তার মাঠপর্যায়ের ফলাফল নির্বিশেষে, মার্কিন নিরাপত্তা সমীকরণকে কৌশলগত পর্যায়ে বদলে দিয়েছে। সামরিক ঘাঁটির দুর্বলতা, উপসাগরে উপস্থিতি বজায় রাখার বিপুল ব্যয় ও হুমকির প্রকৃতির পরিবর্তন পেন্টাগনকে তার বাহিনী মোতায়েনের ধরণ পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য করছে।
যদিও এই পর্যালোচনা প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং এর চূড়ান্ত পরিণতি অনিশ্চিত, তবুও এই বিষয়টি উত্থাপনই পশ্চিম এশিয়ার সামরিক-নিরাপত্তা সমীকরণে একটি যুগের সমাপ্তি ও নতুন যুগের সূচনার ইঙ্গিত দেয়। ওয়াশিংটনের সমর্থনের ওপর যারা বছর বছর নির্ভর করে এসেছে, সেই আঞ্চলিক মিত্ররা এখন তাদের নিরাপত্তা নীতি পরিবর্তন করতে এবং আঞ্চলিক জোট গঠন বা অন্যান্য শক্তিধর দেশগুলির সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর মতো নতুন নিরাপত্তা কাঠামো তৈরিতে বাধ্য হবে।#
পার্সটুডে/এমবিএ/১৯
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।