কাজভিনের ভূগর্ভস্থ জলাধার: প্রাচীন ইরানি প্রকৌশলের বিস্ময়কর নিদর্শন
পার্সটুডে: ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কাজভিন প্রদেশ রাজধানী তেহরান থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত। একসময় এই প্রদেশে শতাধিক জলাধারের একটি ঘন নেটওয়ার্ক ছিল। বর্তমানে এর অল্প কয়েকটি টিকে আছে। এগুলোর মধ্যে সর্দার-এ বোজর্গ সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। এটিকে ইরানে সংরক্ষিত সবচেয়ে বড় এক-গম্বুজবিশিষ্ট জলাধার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
প্রেসটিভির বরাতে পার্সটুডে জানিয়েছে, এসব স্থাপনার দীর্ঘস্থায়িত্বের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ‘সারুজ’ নামের বিশেষ জলরোধী মসলার। বালি, মাটি, চুন, ছাই, ছাগলের লোম ও ডিমের সাদা অংশসহ বিভিন্ন উপাদান দিয়ে এই মসলা তৈরি করা হতো।
কাজভিনের চারটি জলাধার নিয়ে করা একটি কম্পিউটারভিত্তিক গবেষণায় দেখা গেছে, অপেক্ষাকৃত নিচু গম্বুজ উঁচু গম্বুজের তুলনায় সূর্যের তাপ অনেক বেশি শোষণ করত। তুলনামূলকভাবে ঠান্ডা জলবায়ুর জন্য এই বৈশিষ্ট্য বেশি উপযোগী ছিল। অর্থাৎ গম্বুজের আকৃতি শুধু সৌন্দর্যের জন্য নির্ধারণ করা হয়নি, জলাধারের পরিবেশগত কার্যকারিতার সঙ্গেও এর গভীর সম্পর্ক ছিল।
কাজভিনের ব্যস্ত রাস্তা ও ঐতিহাসিক বাজারগুলোর নিচে লুকিয়ে আছে ইরানের প্রাচীন প্রকৌশল দক্ষতার এক বিস্ময়কর নিদর্শন। এগুলো হলো বিস্তৃত ভূগর্ভস্থ পানির সংরক্ষণ ব্যবস্থা, যা 'আব-আনবার' নামে পরিচিত।
ইরানি প্রকৌশলের বিস্ময়কর নিদর্শন
একসময় এসব জলাধারের বিশাল গম্বুজ শহরের আকাশরেখায় স্পষ্টভাবে দেখা যেত। অথচ এগুলো নির্মাণের জটিল প্রযুক্তি শত শত বছর পরও স্থপতি ও প্রকৌশলীদের বিস্মিত করে।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কাজভিনের মানুষ এসব বুদ্ধিদীপ্ত জলাধারের ওপর নির্ভর করতেন। মাটির নিচে তৈরি ছাদযুক্ত এসব জলাধারে শুষ্ক মৌসুমের জন্য পানি সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও সুরক্ষিত রাখা হতো।
এটি ছিল এমন এক সময়, যখন আধুনিক পাইপলাইনভিত্তিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ইরানের শহরগুলোকে বদলে দেয়নি। সেই সময়ের জলাধারগুলোতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সঞ্চিত জল প্রকৌশল, স্থাপত্য কাঠামো, নির্মাণসামগ্রী এবং পরিবেশভিত্তিক নকশার জ্ঞান কাজে লাগানো হয়েছিল।
শতাধিক জলাধারের শহর
জলাধার নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে কাজভিনের গুরুত্ব বিশেষ। কারণ একসময় শহরটিতে এসব জলাধারের একটি অত্যন্ত ঘন নেটওয়ার্ক ছিল।
ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, এখানে একসময় জলাধারের সংখ্যা প্রায় ১০০ বা তারও বেশি ছিল। বর্তমানে অবশ্য অল্প কয়েকটি টিকে আছে।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সর্দার-এ বোজর্গ, সর্দার-এ কুচাক, হাজ্জ-কাজেম, হাকিম, জামেয় মসজিদ এবং বাজার জবানেহর জলাধার।
ঐতিহাসিক শহরজুড়ে এসব জলাধারের অবস্থান ছিল মূলত একটি বিকেন্দ্রীভূত পানি সরবরাহ ব্যবস্থার অংশ। পানি সংরক্ষণের জন্য একটি বিশাল কেন্দ্রীয় জলাধারের ওপর নির্ভর না করে পুরো ব্যবস্থাটিকে শহরের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল।
শহরের বিভিন্ন মহল্লা, বাজার, ধর্মীয় স্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ জনসমাগমস্থল এসব জলাধার থেকে সুবিধা পেত।
কিছু জলাধার মসজিদের পাশে তৈরি করা হয়েছিল। কিছু ছিল বড় স্থাপত্য কমপ্লেক্সের অংশ। আবার অনেকগুলো ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক মহল্লার মানুষের পানির চাহিদা মেটাত।
মাটির নিচে পানি সংরক্ষণের স্থাপত্য
একটি আব-আনবারের মূল অংশ ছিল তার পানির সংরক্ষণাগার। সাধারণত এটি মাটির নিচে তৈরি করা হতো এবং ওপর থেকে বিশাল ইটের খিলান বা গম্বুজ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হতো।
ভূগর্ভস্থ অবস্থানের একসঙ্গে কয়েকটি সুবিধা ছিল। সরাসরি সূর্যের আলো থেকে পানি সুরক্ষিত থাকত, বাইরের তাপমাত্রার তীব্র ওঠানামার প্রভাব কমে যেত এবং চারপাশের মাটি তাপমাত্রা স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করত।
জলাধারগুলো আলাদা কোনো স্থাপনা ছিল না। অনেক জলাধারই বৃহত্তর পানি সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিল। এর মধ্যে ছিল 'কানাত' ও বিভিন্ন পানির নালা, যেগুলোর মাধ্যমে পানি ভূগর্ভস্থ জলাধারে পৌঁছে দেওয়া হতো।
স্থানীয় পরিবেশ ও স্থাপত্যের প্রয়োজন অনুযায়ী জলাধারের আকারও পরিবর্তিত হতো। কাজভিনের জলাধারগুলোর মধ্যে গোলাকার ও বর্গাকার উভয় ধরনের নকশা দেখা যায়। অর্থাৎ সব জায়গায় একই ধরনের নকশা ব্যবহার করা হয়নি।
পরিমাপ করা কয়েকটি জলাধারের গম্বুজের উচ্চতা ছিল প্রায় ৭ দশমিক ৫ থেকে ৯ মিটার এবং প্রস্থ ৯ থেকে ১৪ মিটার। বিভিন্ন ধরনের গম্বুজের তাপীয় আচরণ তুলনা করতে আধুনিক কম্পিউটার মডেলেও এসব মাপ ব্যবহার করা হয়েছে।
সর্দার-এ বোজর্গ: বিশাল এক-গম্বুজের জলাধার
কাজভিনের সবচেয়ে চমকপ্রদ উদাহরণগুলোর একটি হলো 'সর্দার-এ বোজর্গ'। এর বিশাল বর্গাকার পানির সংরক্ষণাগার একটি বড় একক গম্বুজ দিয়ে ঢাকা। সাধারণভাবে এটিকে ইরানের সবচেয়ে বড় এক-গম্বুজবিশিষ্ট জলাধার বলা হয়। তবে আরও নির্ভুলভাবে বললে, এটি বর্তমানে টিকে থাকা সবচেয়ে বড় এক-গম্বুজবিশিষ্ট জলাধার।
এর বিপরীতে 'সর্দার-এ কুচাক' ভিন্ন ধরনের কাঠামোগত সমাধান ব্যবহার করেছে। এখানে একটি বিশাল কেন্দ্রীয় স্তম্ভ জলাধারের ভেতরের অংশকে চারটি ভাগে বিভক্ত করেছে। প্রতিটি অংশ আলাদাভাবে ঢেকে দেওয়া সম্ভব ছিল।
এই নির্মাণপদ্ধতি প্রাচীন স্থপতিদের সামনে থাকা একটি বড় চ্যালেঞ্জকে স্পষ্ট করে। আধুনিক ইস্পাত বা রিইনফোর্সড কংক্রিট ছাড়া এত বড় বর্গাকার বা আয়তাকার পানির ট্যাংককে পাথর বা ইটের কাঠামো দিয়ে ঢেকে রাখা সহজ কাজ ছিল না। এর জন্য ভার, চাপ এবং গম্বুজের জ্যামিতি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হতো।
গম্বুজ ছাদের ওজনকে মূলত চাপের শক্তিতে রূপান্তর করত। সেই চাপ ইটের কাঠামোর মাধ্যমে ধীরে ধীরে নিচের দেয়ালে পৌঁছাত।
এই ব্যবস্থার জন্য ইট ছিল অত্যন্ত উপযোগী। ছোট ছোট ইট ব্যবহার করে বড় পাথরের ব্লক ছাড়াই বাঁকানো ও গম্বুজাকৃতির কাঠামো তৈরি করা সম্ভব ছিল। ফলে প্রাচীন ইরানি নির্মাতারা সীমিত উপকরণ ও ঐতিহ্যবাহী নির্মাণ প্রযুক্তি ব্যবহার করেই বিশাল পরিমাণ পানি সংরক্ষণের সক্ষমতা এবং বড় পরিসরের ছাদ তৈরি করতে পেরেছিলেন।
সারুজ, ইট এবং জলরোধী প্রযুক্তি
কাজভিনের জলাধারগুলো শত শত বছর ধরে টিকে থাকার পেছনে ভূগর্ভস্থ নির্মাণ, শক্তিশালী ইটের কাঠামো এবং জলরোধী প্রযুক্তির সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বিশেষ করে খিলান ও গম্বুজ তৈরিতে ইট ছিল প্রধান নির্মাণসামগ্রী। আর জলাধারকে পানি থেকে সুরক্ষিত রাখতে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হতো 'সারুজ' নামের ঐতিহ্যবাহী জলরোধী মসলা।
সারুজ তৈরিতে বালি, মাটি, চুন, ছাই, ছাগলের লোম এবং ডিমের সাদা অংশের মতো উপাদান ব্যবহার করা হতো। স্থানীয় পরিবেশ ও জলবায়ুর ওপর নির্ভর করে উপাদানগুলোর অনুপাত পরিবর্তন করা হতো।
এই মসলার গুরুত্ব বোঝা যায় জলাধারের পরিবেশ বিবেচনা করলে। জলাধারের দেয়াল শুধু আর্দ্রতার সংস্পর্শে থাকত না, সংরক্ষিত পানির বিপুল চাপ এবং চারপাশের মাটির পার্শ্বচাপও সহ্য করতে হতো। তার ওপর কাঠামোটিকে কয়েক দশক বা কয়েক শতাব্দী ধরে টিকে থাকতে হতো এবং নিয়মিত পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণও করতে হতো।
গম্বুজ ছিল একটি পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থা
কাজভিনের জলাধারগুলোর সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো গম্বুজ। বাইরে থেকে সাধারণ মনে হলেও গম্বুজ আসলে একটি প্রাকৃতিক পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে কাজ করত। কাজভিনের চারটি জলাধার নিয়ে করা একটি গবেষণায় এই বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে।
গবেষকরা শুধু ধরে নেননি যে, ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য পরিবেশবান্ধব বরং তাঁরা কাজভিনের ১০ বছরের আবহাওয়ার তথ্য ব্যবহার করে চার ধরনের জলাধারের গম্বুজ কম্পিউটারে মডেল করেন। এরপর বছরের উষ্ণতম দিনের বিভিন্ন সময়ে গম্বুজের পৃষ্ঠে কতটা সৌর বিকিরণ পড়ছে, তা হিসাব করেন। এরপর কম্পিউটারভিত্তিক তরলগতিবিদ্যার বিশ্লেষণ ব্যবহার করে বিভিন্ন উচ্চতার গম্বুজের ভেতরে বাতাসের প্রবাহ ও তাপমাত্রার বণ্টন পরীক্ষা করা হয়। ফলাফল কিছুটা অপ্রত্যাশিত ছিল।
নিচু গম্বুজগুলো তাদের বেশি পৃষ্ঠতলের কারণে উঁচু গম্বুজের তুলনায় বেশি সৌর বিকিরণ গ্রহণ করত।
গবেষণায় দেখা যায়, দুপুর ২টার দিকে সর্দার-এ কুচাকের নিচু গম্বুজের প্রায় '৮৪ দশমিক ৩ শতাংশ' অংশ সূর্যের তাপের সংস্পর্শে ছিল। অন্যদিকে জামেয় মসজিদের পাশে থাকা উঁচু গম্বুজের ক্ষেত্রে এই হার ছিল '৫২ দশমিক ৫ শতাংশ'। বিকেল ৪টায় এই হার ছিল যথাক্রমে '৭৪ দশমিক ৭ শতাংশ ও ৫৩ দশমিক ৫ শতাংশ'। সন্ধ্যা ৬টায় তা দাঁড়ায় যথাক্রমে '৬২ দশমিক ৪ শতাংশ ও ৪৩ দশমিক ২ শতাংশে'।
প্রথম দেখায় একটি পানির জলাধারের ক্ষেত্রে বেশি সূর্যের তাপ পাওয়া ভালো মনে নাও হতে পারে। কিন্তু কাজভিনের জলবায়ু অনেক উষ্ণ ও শুষ্ক অঞ্চলের তুলনায় তুলনামূলকভাবে ঠান্ডা। এই জলবায়ুতে গবেষকরা দেখতে পান, নিচু গম্বুজ বেশি তাপ ধরে রাখতে সক্ষম। অন্যদিকে উঁচু গম্বুজের ওপরের অংশে তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী উষ্ণ বায়ুর ঘূর্ণি তৈরি হয়। কম্পিউটার সিমুলেশনের ফলাফল তাই ইঙ্গিত করে যে কাজভিনের তুলনামূলক ঠান্ডা মহাদেশীয় জলবায়ুর জন্য নিচু গম্বুজ জলাধারের ক্ষেত্রে বেশি উপযোগী ছিল।
এই গবেষণার গুরুত্ব এখানেই যে, কোনো ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যকে অন্য অঞ্চলের জলবায়ুর যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়। কাজভিনের প্রাচীন নির্মাতাদের শীতের ঠান্ডা, গ্রীষ্মের তাপ, সূর্যের আলো এবং ভূগর্ভস্থ মাটির তাপ ধরে রাখার ক্ষমতা, সবকিছু বিবেচনায় নিতে হয়েছিল। অর্থাৎ গম্বুজ শুধু একটি ছাদ ছিল না। এর আকৃতি ভূগর্ভস্থ জলাধারের তাপমাত্রা ও পরিবেশের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলত।
পানি, বাতাস ও প্রাকৃতিক শীতলীকরণ
জলাধারের সঙ্গে বাইরের পরিবেশের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ইরানের কিছু জলাধারে 'বাদগির' বা বায়ু ধরার টাওয়ার ব্যবহার করা হতো। এগুলো বাইরের চলমান বাতাসকে স্থাপনার ভেতরে প্রবেশ করিয়ে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করত। কিছু অঞ্চলে গ্রীষ্মের সময় জলাধারের পানি ঠান্ডা রাখার জন্য বাদগির যুক্ত করা হতো। তবে কোথায় কতটি বাদগির থাকবে বা কীভাবে সেগুলো তৈরি হবে, তা স্থানভেদে ভিন্ন ছিল। কাজভিনের টিকে থাকা জলাধারগুলোতেও এই বৈচিত্র্য দেখা যায়।
সর্দার-এ কুচাকে চারটি গম্বুজের পাশাপাশি চারটি অর্ধ-বায়ু-ধরনী টাওয়ার ছিল বলে বর্ণনা করা হয়। হাজ্জ-কাজেমের জলাধারে ছিল দুটি উঁচু বাদগির। আবার বাজার জবানেহর জলাধারে ছিল ভিন্ন ধরনের ছাদ কাঠামো এবং পাঁচটি বাদগির। মূল ধারণাটি ছিল সহজ। পানির গুণমান অনেকটাই তার চারপাশের পরিবেশের ওপর নির্ভর করে।
স্থির, গরম ও আর্দ্র বাতাস পানির মান খারাপ করতে পারে। বিপরীতে নিয়ন্ত্রিত বাতাস চলাচল জলাধারের ভেতরে বায়ু চলাচল এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে। ফলে ভূগর্ভস্থ জলাধার, মোটা দেয়াল, ভারী নির্মাণসামগ্রী, গম্বুজ এবং প্রয়োজনে বাদগির, সবকিছুকে একত্র করে একটি প্রাকৃতিক শীতলীকরণ ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল।
এর জন্য আধুনিক রেফ্রিজারেশন বা শক্তিশালী যান্ত্রিক ভেন্টিলেশনের প্রয়োজন হতো না।
বাদগির দিয়ে প্রবেশ করা বাতাস ভেতরের বায়ু চলাচল বাড়াত এবং জলাধারের পরিবেশ তুলনামূলক ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করত। অন্যদিকে মাটির নিচে অবস্থান এবং মোটা দেয়াল বাইরের তাপমাত্রার পরিবর্তন থেকে পানিকে সুরক্ষা দিত।
প্রাচীন নির্মাতারা অবশ্য আধুনিক ‘এনার্জি এফিশিয়েন্সি’ বা শক্তি সাশ্রয়ের মানদণ্ড ধরে ভবন তৈরি করেননি। তাঁরা স্থানীয় উপকরণ, অভিজ্ঞতা এবং জলবায়ু সম্পর্কে নিজেদের জ্ঞান ব্যবহার করে বাস্তব সমস্যার সমাধান করেছিলেন।
আধুনিক কম্পিউটার সিমুলেশন এখন আমাদের দেখাচ্ছে, এসব ঐতিহ্যবাহী সমাধানের কিছু ক্ষেত্রে পরিবেশগত সুবিধা পরিমাপ করাও সম্ভব।
পানি সংরক্ষণের অবকাঠামো থেকে নগর স্থাপত্য
কাজভিনের জলাধারগুলোর বিশেষত্ব হলো, এগুলোর প্রকৌশলগত ব্যবহারিক ভূমিকা এগুলোকে শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য ও নাগরিক পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠতে বাধা দেয়নি। পানি সংগ্রহ ও সংরক্ষণের এই অবকাঠামোকে ইরানি স্থাপত্যের উন্নত নান্দনিকতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল।
একটি জলাধারের মূল অংশ মাটির নিচে লুকিয়ে থাকতে পারত। কিন্তু এর প্রবেশপথ হতে পারত দৃষ্টিনন্দন ও স্মারকধর্মী। দীর্ঘ সিঁড়ি দিয়ে মানুষ নিচে পানির স্তরের কাছে নেমে যেত। অন্যদিকে বিশাল গম্বুজ ভূগর্ভস্থ একটি কার্যকর স্থাপনাকে শহরের আকাশরেখায় দৃশ্যমান স্থাপত্যে পরিণত করেছিল।
কাজভিনের সর্দার-এ বোজর্গ ও সর্দার-এ কুচাক এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ। কাজার শাসক ফতেহ আলী শাহের সময় সর্দার ভ্রাতৃদ্বয় এগুলো নির্মাণ করেন।
সর্দার-এ বোজর্গ ১৮১২ সালে এবং সর্দার-এ কুচাক ১৮১৪ সালে সম্পন্ন হয়। দুটি জলাধারই তাদের পৃষ্ঠপোষকদের সঙ্গে সম্পর্কিত বৃহত্তর ধর্মীয় ও নাগরিক নির্মাণ প্রকল্পের অংশ ছিল।
কাজভিনের অন্যান্য জলাধারেও ছিল অলংকৃত প্রবেশপথ, টাইলসের কাজ, শিলালিপি এবং নিখুঁত ইটের স্থাপত্য। বাজার, মহল্লা ও ধর্মীয় স্থাপনার কাছে এসব জলাধারের অবস্থান ছিল বলেই এগুলো শুধু প্রকৌশল স্থাপনা ছিল না। এগুলো শহরের সামাজিক জীবনেরও অংশ ছিল।
সর্দার-এ বোজর্গের বিশাল জলাধার
কাজভিনে এর সবচেয়ে নাটকীয় উদাহরণ হলো সর্দার-এ বোজর্গ। এর ভূগর্ভস্থ জলাধারের ধারণক্ষমতা প্রায় '৪,৯০০ ঘনমিটার'। বিশাল এই জলাধারের ওপর নির্মিত স্মারকধর্মী গম্বুজ দেখায়, কীভাবে প্রাচীন স্থপতিরা মূলত মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা একটি পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে দৃশ্যমান নগর স্থাপত্যে রূপ দিয়েছিলেন।
জলবায়ুর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া প্রাচীন প্রকৌশল
কাজভিনে টিকে থাকা জলাধারগুলো আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের একটি স্থাপনাতেই কীভাবে জল প্রকৌশল, কাঠামোগত প্রকৌশল, নির্মাণসামগ্রীর জ্ঞান এবং পরিবেশবান্ধব নকশাকে একত্র করা যায়, এসব জলাধার তার অসাধারণ উদাহরণ। ভূগর্ভস্থ জলাধারগুলো মাটির স্থিতিশীল তাপমাত্রার সুবিধা নিত। বিশাল ইটের কাঠামো একদিকে শক্তি দিত, অন্যদিকে তাপমাত্রা স্থিতিশীল রাখত। সারুজ তৈরি করত জলরোধী স্তর। ইটের খিলান ও গম্বুজ আধুনিক ইস্পাত বা কংক্রিট ছাড়াই বড় পরিসরের স্থান ঢেকে রাখার সুযোগ দিত। আর যেখানে বাদগির ব্যবহার করা হয়েছে, সেখানে প্রাকৃতিক বায়ু চলাচলের ব্যবস্থাও যুক্ত হয়েছিল। সব মিলিয়ে এটি ছিল স্থানীয় পরিবেশ ও সহজলভ্য উপকরণের ওপর নির্ভর করে তৈরি একটি অত্যন্ত কার্যকর পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা।
ইরানের বিশাল জলাধার: কাজভিনের বাইরেও
সর্দার-এ বোজর্গকে প্রায়ই ইরানের সবচেয়ে বড় জলাধার হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে দক্ষিণ ইরানে আরও দুটি জলাধার রয়েছে, যেগুলোর ধারণক্ষমতা সর্দার-এ বোজর্গের চেয়ে বেশি।
কাজভিনের সর্দার-এ বোজর্গের বর্গাকার জলাধারের ধারণক্ষমতা প্রায় '৪,৯০০ ঘনমিটার'। এরপর রয়েছে জামেয় মসজিদের জলাধার, যার ধারণক্ষমতা প্রায় '৩,৭৫০ ঘনমিটার'; মসজিদে নবীর জলাধার '৩,৬০০ ঘনমিটার'; সর্দার-এ কুচাক '২,০৯০ ঘনমিটার'; হাজ্জ-কাজেম '১,৯৫০ ঘনমিটার' এবং হাকিমের জলাধার '১,৯৪৪ ঘনমিটার'। তবে ফার্স প্রদেশের গারাশ শহরের 'কাল জলাধার', যা ‘গানজ-আল-বাহর’ নামেও পরিচিত, এসবের তুলনায় অনেক বড়।
এর নলাকার জলাধারের ব্যাস প্রায় '২৯ মিটার' এবং গভীরতা '২১ মিটার'। এতে প্রায় '১৩,৮৭২ ঘনমিটার পানি' সংরক্ষণ করা যায়। অর্থাৎ ধারণক্ষমতার দিক থেকে এটি সর্দার-এ বোজর্গের প্রায় তিনগুণ।
হরমুজগান প্রদেশের বন্দর কংয়ের 'দরিয়া দৌলত জলাধার'ও অসাধারণ। এর নলাকার জলাধারের ব্যাস প্রায় '২৮ মিটার' এবং গভীরতা '১৪ মিটার'। এর ধারণক্ষমতা প্রায় '৮,৬২০ ঘনমিটার'। এই তিনটি জলাধারই কাজার যুগে নির্মিত হয়েছিল। এতে বোঝা যায়, ইরান আধুনিক যুগে প্রবেশ করার সময়ও ঐতিহ্যবাহী পানি সংরক্ষণ অবকাঠামোর গুরুত্ব অনেকটাই বজায় ছিল।
গম্বুজের আকারেও বিস্ময়
সর্দার-এ বোজর্গের গম্বুজের ব্যাস প্রায় '১৭ মিটার'। আকারের দিক থেকে এটি ইরানের বড় বড় ঐতিহাসিক মসজিদের গম্বুজের সঙ্গে তুলনীয়, যেমন কাজভিন ও ইয়াজদের জামে মসজিদের গম্বুজ। তবে গারাশের কাল জলাধারের আগের গম্বুজ ছিল এর চেয়েও অনেক বড়। কাল জলাধারের গম্বুজের বাইরের ব্যাস ছিল বিস্ময়কর '৩১ দশমিক ৫ মিটার' এবং ভেতরের ব্যাস '২৯ মিটার'। এটি এমনকি বিখ্যাত 'সোলতানিয়েহ গম্বুজের' চেয়েও বড় ছিল। সোলতানিয়েহ গম্বুজের অভ্যন্তরীণ ব্যাস প্রায় ২৫ দশমিক ৫ মিটার এবং এটিকে প্রায়ই ইরানের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক গম্বুজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
নির্মাণের সময় কাল জলাধারের গম্বুজ ছিল বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ইটের গম্বুজগুলোর একটি। আকারের দিক থেকে এর চেয়ে বড় ছিল মূলত ইস্তাম্বুলের 'হায়া সোফিয়া' এবং ফ্লোরেন্সের 'ক্যাথেড্রাল'-এর গম্বুজ। এই অর্জন আরও বিস্ময়কর হয়ে ওঠে যখন নির্মাণের পেছনের পরিস্থিতি বিবেচনা করা হয়।
সোলতানিয়েহ ও ফ্লোরেন্সের ক্যাথেড্রালের মতো স্থাপনা নির্মাণ করেছিলেন সে সময়ের সেরা প্রকৌশলীরা এবং এগুলোর পেছনে ছিল সম্রাট ও অত্যন্ত ধনী মেডিচি পরিবারের মতো শক্তিশালী পৃষ্ঠপোষক। অন্যদিকে গারাশের কাল জলাধার নির্মাণ করেছিল আশপাশের একটি শহরের সাধারণ মানুষ। সেই সময় শহরটির জনসংখ্যা ছিল মাত্র কয়েক হাজার।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ফার্স প্রদেশে আঘাত হানা এক বিধ্বংসী ভূমিকম্পে কাল জলাধারের বিশাল ইটের গম্বুজটি টিকে থাকেনি।
তবে এর নলাকার মূল কাঠামো এখনো সংরক্ষিত রয়েছে। আধুনিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থা চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত কয়েক দশক ধরে এই জলাধার ব্যবহার করা হয়েছে।
প্রাচীন ইরানি প্রকৌশলের অসাধারণ স্মারক
দক্ষিণ ইরানের এসব জলাধার কাজভিনের জলাধারের তুলনায় তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত। কিন্তু এগুলো ইরানের ঐতিহ্যবাহী প্রকৌশল দক্ষতার অসাধারণ উদাহরণ। কাজভিনের জলাধারগুলো আমাদের দেখায়, আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়াই প্রাচীন ইরানি নির্মাতারা কীভাবে পানি সংরক্ষণ, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, বায়ু চলাচল, কাঠামোগত স্থায়িত্ব এবং জলরোধী ব্যবস্থা একসঙ্গে কাজে লাগিয়েছিলেন।
এসব স্থাপনা শুধু পুরোনো পানির ট্যাংক নয়। এগুলো এমন এক সময়ের সাক্ষ্য, যখন মানুষের জীবনযাত্রা, জলবায়ু এবং স্থানীয় উপকরণ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান স্থাপত্য ও প্রকৌশলের সঙ্গে মিলেমিশে ছিল।
কাজভিনের ভূগর্ভস্থ জলাধারগুলো তাই আজও প্রাচীন ইরানি প্রকৌশল, স্থাপত্যবোধ এবং পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার অসাধারণ দক্ষতার জীবন্ত স্মারক হয়ে আছে।#
পার্সটুডে/এমএএআর/৯