ইরানের কায়েনাত: বিশ্বের সেরা জাফরানের ঠিকানা
https://parstoday.ir/bn/news/iran-i163328-ইরানের_কায়েনাত_বিশ্বের_সেরা_জাফরানের_ঠিকানা
পার্সটুডে: ইরানের দক্ষিণ খোরাসান প্রদেশের একটি অঞ্চলের নাম কায়েনাত। শত শত বছর ধরে এখানকার জাফরান পরিচিত বিশ্বের সবচেয়ে ভালো ও সুগন্ধি জাফরান হিসেবে।
(last modified 2026-09-23T12:48:06+00:00 )
সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬ ১৮:৩৪ Asia/Dhaka
  • ইরানের কায়েনাত: বিশ্বের সেরা জাফরানের ঠিকানা

পার্সটুডে: ইরানের দক্ষিণ খোরাসান প্রদেশের একটি অঞ্চলের নাম কায়েনাত। শত শত বছর ধরে এখানকার জাফরান পরিচিত বিশ্বের সবচেয়ে ভালো ও সুগন্ধি জাফরান হিসেবে।

নিশাপুরের দক্ষিণের বিশাল মরুভূমি থেকে শুরু করে পাকিস্তান সীমান্তের কাছের সিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত এই কায়েনাত। যুগ যুগ ধরে এখানেই ফলে খাঁটি ইরানি জাফরান। প্রেস টিভি-কে উদ্ধৃত করে পার্সটুডে জানিয়েছে, বিশেষজ্ঞদের মতে জাফরান গাছ সবচেয়ে ভালো ফলন দেয় ঠান্ডা ও কিছুটা শুষ্ক আবহাওয়ায়, যেখানে বৃষ্টিও হয় পরিমিত। কায়েনাতের আবহাওয়া ঠিক এমনই—আর এ কারণেই এখানকার জাফরান এত খাঁটি ও শক্তিশালী।

ঠান্ডা শীতকাল, কম বৃষ্টি, আর উর্বর মাটি—সব মিলিয়ে জাফরান চাষের জন্য এখানকার পরিবেশ একদম উপযুক্ত।

কায়েনাতের জাফরান এত বিখ্যাত কেন? কারণ এতে থাকে তিনটি বিশেষ উপাদান—রং দেওয়ার জন্য "ক্রোসিন", গন্ধের জন্য "সাফরানাল" আর স্বাদের জন্য "পিক্রোক্রোসিন"। এই তিনটি উপাদান পৃথিবীর আর কোথাও এত বেশি পরিমাণে পাওয়া যায় না। তাই কায়েনাতের জাফরানকে ধরা হয় বিশ্বের সবচেয়ে দামি মসলার সেরা মান হিসেবে।

২০১৮ সালে কায়েনাত জাফরান আনুষ্ঠানিকভাবে একটি ব্র্যান্ড হিসেবে স্বীকৃতি পায় এবং জাতীয় মানের সনদও পায়। এতে বিশ্ব মঞ্চে ইরানি জাফরানের সুনাম আরও বেড়ে যায়।

দক্ষিণ খোরাসানের কায়েনাতের একটি মাঠে জাফরান তুলছেন এক মহিলা

দক্ষিণ খোরাসান কৃষি বিভাগের প্রধান মোহসেন এসফান্দিয়ারি জানিয়েছেন, এই প্রদেশে এখন জাফরান চাষ হচ্ছে ১৬ হাজার ১২১ হেক্টর জমিতে।

সবচেয়ে বেশি জাফরান উৎপাদন হয় তিনটি শহরে—কায়েনাত (৫,০০০ হেক্টর), সারায়ান (৩,৪৫৭ হেক্টর) এবং ফেরদৌস (৩,১৭৭ হেক্টর)।

ভালোভাবে পরিচর্যা করা জমিতে প্রতি হেক্টরে গড়ে পাওয়া যায় প্রায় ২.৪ কেজি শুকনো জাফরান। এই প্রদেশের ২৩ হাজার ৫০০-রও বেশি কৃষক পরিবার জাফরান চাষ করেই সংসার চালায়।

মান বিচারে এই প্রদেশ সারা দেশে এক নম্বরে। আর উৎপাদনের পরিমাণে পাশের খোরাসান রাজভি প্রদেশের পরই এর স্থান।

জাফরান তোলার কাজ শুরু হয় ইরানি মাস মেহরের শেষ দিকে, চলে আজার মাসের শুরু পর্যন্ত। এই সময় হাজার হাজার শ্রমিক ভোরের ঠান্ডায়, রোদ ওঠার আগেই হাত দিয়ে তুলে নেন বেগুনি রঙের জাফরান ফুল।

বিশ্ববাজারে ইরানের জাফরান

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) বলছে, বিশ্বের মোট জাফরানের ৯০ শতাংশেরও বেশি উৎপাদন করে ইরান একাই। শুধু সরবরাহকারী দেশ হিসেবেই নয়, তেল ছাড়া রপ্তানি পণ্য হিসেবেও জাফরান ইরানের জন্য এখন খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটা ইরানের সংস্কৃতিরও একটা বড় অংশ।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে দক্ষিণ খোরাসানের কায়েনাতের একটি মাঠে কৃষকরা সূর্যোদয়ের আগে জাফরান সংগ্রহ করছেন।

চলতি ইরানি বছরের প্রথম ছয় মাসে (মার্চের শেষ থেকে) ইরান রপ্তানি করেছে ৯৯.৫ টনেরও বেশি জাফরান, যার দাম ৯৪ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এটা পরিমাণে ৭৩ শতাংশ বেশি, আর দামে ৪৫ মিলিয়ন ডলার বেশি।

এই জাফরানের বড় অংশই বিক্রি হয়েছে ছোট ছোট প্যাকেটে—১০ থেকে ৩০ গ্রামের। এভাবে খুচরা বিক্রি করায় ইরানি জাফরানের নামডাক বেড়েছে, আর কম দামে পাইকারি বিক্রির চেয়ে লাভও হয়েছে বেশি।

কাস্টমস তথ্য বলছে, ইরানের জাফরানের সবচেয়ে বড় ক্রেতা সংযুক্ত আরব আমিরাত—২৯.৬ টন, দাম ২৯.১ মিলিয়ন ডলার। এরপর আছে স্পেন (১৯.৬ টন), চীন (১২.৬ টন), আফগানিস্তান (১০.৫ টন) আর জার্মানি (৩ টন)।

এ ছাড়া জাফরান কিনেছে যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড, ইরাক, তুরস্ক, ওমান, ফিলিপাইন, হংকং আর অস্ট্রেলিয়াও।

গত বছর একই সময়ে ইরান রপ্তানি করেছিল ৫৭ টন জাফরান, দাম ছিল ৪৯.৪ মিলিয়ন ডলার। তুলনা করলেই বোঝা যায়, এবার রপ্তানি অনেকটাই বেড়েছে।

জাফরান মানেই ইরানের গর্ব

ইরানিদের কাছে জাফরান শুধু একটা মসলা নয়। এটা তাদের কাছে অধ্যবসায়, শিল্প আর জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে দক্ষিণ খোরাসানের কায়েনাতের একটি মাঠে একজন মহিলা সদ্য তোলা জাফরান ফুল স্তূপ করছেন।

শীতের ভোরে কায়েনাতের কৃষকের হাত থেকে শুরু হয়ে মাদ্রিদ, দুবাই বা সাংহাইয়ের দোকানের তাক পর্যন্ত পৌঁছানো—প্রতিটি জাফরানের সুতোই যেন বহন করে ইরানের ইতিহাস আর শিল্পের গল্প।

শুধু টাকা-পয়সার হিসাব নয়, জাফরান চাষ হাজার হাজার গ্রামীণ পরিবারের রুটি-রুজির সংস্থান করে। এতে মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে যাওয়া কমায়। আর টিকিয়ে রাখে শত শত বছরের পুরনো এক ঐতিহ্য, যেটা ইরানের নামের সাথেই জড়িয়ে আছে।

আজ কায়েনাতের জাফরান একদিকে যেমন গর্বের বিষয়, তেমনি অর্থনীতির চাকা ঘোরানোরও একটা বড় মাধ্যম।

লাল রঙের সুগন্ধি এই সুতোগুলো আজও ইরানের মরুভূমিকে যুক্ত করে রেখেছে বিশ্বের রান্নাঘর আর গবেষণাগারের সাথে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, কায়েনাতই এখনো বিশ্বের জাফরান শিল্পের প্রাণকেন্দ্র—যেখানে সূর্যের আলো, উর্বর মাটি আর মানুষের পরিশ্রম মিলে তৈরি করে খাঁটি সোনা।#

পার্সটুডে/এমএআর/২৩

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।