তদন্তে ছাত্রদলের কমিটি
রাবিতে সাংবাদিকদের ওপর হামলা: এনসিপি, ছাত্রশিবির ও টিআইবির নিন্দা
বাংলাদেশের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) সাংবাদিক ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। হামলার নিন্দা জানিয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তুলেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
অন্যদিকে ঘটনা তদন্তে দুই সদস্যের কমিটি গঠন করেছে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মামলা করার ঘোষণা দিয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, গতকাল (রোববার) রাত সাড়ে ৮টার দিকে রাবির শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা রামদা, চাপাতি, হকিস্টিক, পাইপ ও বেসবল ব্যাটসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালান। একটি ফেসবুক পোস্টের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধের জেরে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হলের সামনে অবস্থান নেন। সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে তাঁরা সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হন।
গুরুতর আহত সাংবাদিকেরা হলেন দৈনিক সমকালের মাঈনুল ইসলাম রাজু, দ্য ডেইলি স্টারের নূর আহসান মৃদুল, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের আরিফ উজ্জামান কোরবান এবং আগামীর সময়ের জাহিদুল ইসলাম। এনসিপির বিবৃতি অনুযায়ী, এঁদের মধ্যে জাহিদুল ইসলাম মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়েছেন। আহতদের প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁদের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
এনসিপির বিবৃতিতে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়, হামলাকারীরা সাংবাদিকদের 'পুঁতে ফেলার' হুমকি দেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে অভিযুক্ত হিসেবে উঠে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি আহসান হাবীব, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল ইসলাম, সহ-সভাপতি শরিফুল ইসলাম ও সহ-দপ্তর সম্পাদক শাহরিয়ার আলমের নাম। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, অন্তত ১০ জন নেতাকর্মী সরাসরি হামলায় অংশ নেন।
রোববার রাতে দেওয়া বিবৃতিতে এনসিপি ঘটনার তীব্র নিন্দা জানায়। দলটি বলেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো মুক্তবুদ্ধি ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের এ ধরনের সশস্ত্র কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ প্রশাসনও দায় এড়াতে পারে না বলে মন্তব্য করেছে তারা। জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে কঠোর শাস্তি এবং ক্যাম্পাসে নির্বিঘ্নে মতপ্রকাশের পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছে দলটি। এনসিপি আরও জানায়, ছাত্র-জনতাকে সঙ্গে নিয়ে তারা ক্যাম্পাসে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির রাজনীতি প্রতিহত করবে।
ছাত্রশিবিরের প্রতিক্রিয়া
রোববার দিবাগত রাতে যৌথ বিবৃতিতে হামলার নিন্দা জানান ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম ও সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ। বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, শিক্ষার্থীদের ওপর সশস্ত্র হামলার ভিডিও ধারণ ও সংবাদ সংগ্রহের সময় ছয় থেকে সাতটি গণমাধ্যমের সাংবাদিককে মারধর করে রক্তাক্ত করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উপস্থিতিতে এ ঘটনা ঘটায় তাঁরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তাঁদের অভিযোগ, এ হামলা ক্যাম্পাসে সন্ত্রাস ও দখলদারিত্বের রাজনীতির পুনরাবৃত্তির ইঙ্গিত দেয়। এর আগেও বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে বলে দাবি করেন তাঁরা। হামলাকারীদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পাশাপাশি আহতদের যথাযথ চিকিৎসা, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
টিআইবির বক্তব্য
সোমবার (৫ অক্টোবর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে টিআইবি ঘটনাকে গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর 'সশস্ত্র হামলা ও হত্যাচেষ্টা' আখ্যা দিয়ে তীব্র নিন্দা জানায়। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, হামলার শিকার গণমাধ্যমকর্মী ও শিক্ষার্থীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে হামলাকারী, তাঁদের সহযোগী ও পৃষ্ঠপোষকদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করে পুলিশের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলা জনগণের তথ্য জানার অধিকার খর্ব করে এবং ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির সুযোগ সংকুচিত করে। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অসহায়ত্ব ও পুলিশের ব্যর্থতা দেখিয়ে দিয়েছে, সমস্যার সমাধান শুধু হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে ক্ষমতাবান দলগুলোর আমূল সংস্কার ও আত্মশুদ্ধি জরুরি।
তিনি আরও বলেন, কর্তৃত্বের সহিংস লড়াই বন্ধ এবং নিজ নিজ দল ও অঙ্গসংগঠন নিয়ন্ত্রণের মূল রাজনৈতিক দায় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী এড়িয়ে যেতে পারে না। শুধু তদন্ত কমিটি গঠন বা সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়ে দায় শেষ না করে সহিংসতার প্রশ্রয় ও পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ করতে হবে।
ছাত্রদলের তদন্ত কমিটি
ঘটনার পর রোববারই তদন্তের জন্য দুই সদস্যের কমিটি গঠন করে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ। কমিটির নেতৃত্বে আছেন কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি এ. বি. এম. ইজাজুল কবির রুয়েল ও মনজুরুল আলম রিয়াদ। কমিটিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত করে কেন্দ্রীয় সংসদের কাছে লিখিত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক (সহ-সভাপতি পদমর্যাদা) মো. জাহাঙ্গীর আলমের স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির এ নির্দেশনা দেন। বিজ্ঞপ্তিতে ঘটনাকে 'অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার অভিযোগ' বলে উল্লেখ করা হয়। সভাপতি রাকিব বিজ্ঞপ্তিটি নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেন।
প্রকাশের আগে লক্ষ রাখার বিষয়
আহতের সংখ্যায় উৎসভেদে পার্থক্য আছে। এনসিপি, টিআইবি ও ছাত্রদলের বিজ্ঞপ্তিতে চার সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জনের কথা আছে, আর ছাত্রশিবির ছয় থেকে সাতটি গণমাধ্যমের সাংবাদিকের কথা বলেছে। হামলার কারণ ও অভিযুক্তদের নাম এসেছে সংবাদমাধ্যম ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে, অভিযুক্তদের নিজস্ব বক্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রক্টরের ব্যর্থতা স্বীকার ও পুলিশের সরে যাওয়ার তথ্য টিআইবির বিজ্ঞপ্তি থেকে নেওয়া, প্রক্টরের সরাসরি বক্তব্য নেই। প্রশাসন মামলার ঘোষণা দিলেও মামলা দায়েরের তথ্য এই খবরগুলোতে নেই। ছাপার আগে প্রক্টর, পুলিশ ও অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতাদের বক্তব্য নিতে পারলে প্রতিবেদন আরও সুসংহত হবে। শেষ অংশটি সম্পাদকীয় টীকা হিসেবে আছে, ছাপার সময় বাদ দিতে পারেন।#
পার্সটুডে/এমএআর/৫