বিপর্যস্ত ইসরায়েল গণহত্যা চালাল লেবাননে; ইরান-মার্কিন আলোচনা বাতিল করল ক্ষুব্ধ তেহরান
https://parstoday.ir/bn/news/event-i160490-বিপর্যস্ত_ইসরায়েল_গণহত্যা_চালাল_লেবাননে_ইরান_মার্কিন_আলোচনা_বাতিল_করল_ক্ষুব্ধ_তেহরান
পার্সটুডে:হিজবুল্লাহর হামলায় পাঁচজন সৈন্য নিহত এবং তিনটি ট্যাংক ধ্বংসসহ উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ার পর ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে বেসামরিক ঘুমন্ত নাগরিকদের ওপর হামলা চালায়। এর জেরে সুইজারল্যান্ডে নির্ধারিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা বাতিল করেছে ইরান।
(last modified 2026-06-19T11:19:06+00:00 )
জুন ১৯, ২০২৬ ১৬:৩৭ Asia/Dhaka
  • স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, হিজবুল্লাহর সঙ্গে তীব্র সংঘর্ষের পর দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হতাহতদের সরিয়ে নিতে অন্তত চারটি হেলিকপ্টার অবতরণ করতে দেখা গেছে
    স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, হিজবুল্লাহর সঙ্গে তীব্র সংঘর্ষের পর দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হতাহতদের সরিয়ে নিতে অন্তত চারটি হেলিকপ্টার অবতরণ করতে দেখা গেছে

পার্সটুডে:হিজবুল্লাহর হামলায় পাঁচজন সৈন্য নিহত এবং তিনটি ট্যাংক ধ্বংসসহ উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ার পর ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে বেসামরিক ঘুমন্ত নাগরিকদের ওপর হামলা চালায়। এর জেরে সুইজারল্যান্ডে নির্ধারিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা বাতিল করেছে ইরান।

লেবাননের আল-মায়াদিন টেলিভিশনের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার শুরু হওয়ার কথা থাকা ওই আলোচনায় অংশ নিতে ইরানি প্রতিনিধিদল সুইজারল্যান্ডে যাচ্ছে না।

সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে বুর্গেনস্টক রিসোর্টে অনুষ্ঠেয় আলোচনা বাতিল হয়েছে। অন্যদিকে হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা থাকা ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স তার সফর স্থগিত করেছেন।

এই বাতিলের ঘটনা ঘটে এমন সময়ে, যখন শুক্রবার ভোরের আগে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান দক্ষিণ লেবাননের আবাসিক এলাকাগুলোতে বোমাবর্ষণ করে। এতে অন্তত ২০ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং আরও ৩০ জন আহত হন। লেবাননের কর্মকর্তারা এ ঘটনাকে একটি “গণহত্যা” হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

লেবাননের জাতীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, নাবাতিয়েহ জেলার আল-শারকিয়াহ, হারুফ এবং কাফর সির শহরের বসতবাড়িগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইসরায়েলি হানাদাররা।

আল-আশামিয়া এলাকায় পৃথক আরেকটি হামলায় একটি বাড়ি ধ্বংস হয়ে চারজন নিহত হন। এছাড়া দুয়েইর পৌর ভবনের কাছে একটি মোটরসাইকেলকে লক্ষ্য করে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় একজন নিহত এবং আরেকজন আহত হন।

এর আগে বৃহস্পতিবারের হামলায়ও অন্তত তিনজন নিহত হয়েছিলেন, যাদের দুই জন ও কাফর তিবনিতে দুইজন এবং জেবদিনে একজন ছিলেন।

স্থানীয় সময় রাত ২টা ১০ মিনিটের দিকে শুরু হওয়া এই হামলাগুলো ঘুমন্ত পরিবারগুলোর ওপর পরিচালিত হয় এবং ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরুর পর এটিকে সবচেয়ে প্রাণঘাতী রাতগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, লেবাননের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অভিযানে এখন পর্যন্ত মোট ৩,৯১২ জন নিহত এবং ১১,৮৭৩ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া ১০ লক্ষাধিক লেবাননি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

স্থলযুদ্ধে হিজবুল্লাহর ভয়াবহ আঘাত

হিজবুল্লাহ যোদ্ধারা ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে তীব্র স্থলযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে এবং কাফর তিবনিত ও আলি আল-তাহের পাহাড়ি এলাকায় গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে অন্তত তিনটি মেরকাভা ট্যাংক ধ্বংস করেছে বলে জানিয়েছে।

প্রতিরোধ সংগঠনটি জানায়, নাবাতিয়েহ শহরকে পর্যবেক্ষণকারী কৌশলগত উচ্চভূমির দিকে চার দিনব্যাপী ইসরায়েলি অগ্রযাত্রা তারা প্রতিহত করেছে।

এক বিবৃতিতে হিজবুল্লাহ বলেছে:

“কাফর তিবনিত-আলি আল-তাহের অঞ্চল শত্রুর অগ্রযাত্রার জন্য দুর্ভেদ্যই থাকবে।”

তারা আরও ঘোষণা করে যে, লেবানন রক্ষায় তাদের যোদ্ধারা “কারবালার মহাকাব্য” রচনা করবে—যা শিয়া মুসলমানদের কাছে অত্যাচারের বিরুদ্ধে আত্মত্যাগী প্রতিরোধের প্রতীক।

হিজবুল্লাহর মাঠ পর্যায়ের সূত্রগুলো জানায়, শুক্রবার ভোরে ব্যাপক গোলাগুলি, কামান হামলা ও রকেট নিক্ষেপের মধ্য দিয়ে তীব্র সংঘর্ষ সংঘটিত হয়েছে।

যোদ্ধারা আলি আল-তাহের পাহাড়ের আশপাশে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয় এবং একই সঙ্গে একাধিক ইসরায়েলি অবস্থান ও সেনাসমাবেশকে রকেট ও ভারী ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে লক্ষ্যবস্তু করে।

সংগঠনটি আরও দাবি করে যে, কাফর তিবনিতের কাছে একটি ইসরায়েলি সামরিক যান আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে আগুনে পুড়ে যায়।

হতাহতদের সরিয়ে নিতে ধোঁয়া ও আলোক সংকেতের আড়ালে অগ্রসর হওয়া ইসরায়েলি বাহিনীও রকেট ও মর্টার হামলার মুখে পড়ে। ইসরায়েলি সূত্রগুলো জানিয়েছে, সংঘর্ষে অন্তত পাঁচজন সৈন্য নিহত এবং ১৭ জন আহত হয়েছেন।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে চারজন সৈন্য নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করেছে, যাদের মধ্যে একজন ব্যাটালিয়ন কমান্ডার ছিলেন। ইসরায়েলি গণমাধ্যম জানায়, ৪০১তম সাঁজোয়া ব্রিগেডের ৫২তম ব্যাটালিয়ন রাতে গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়।

ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট ইসহাক হারজগ (Isaac Herzog) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন:

“গভীর শোকের সঙ্গে আমরা লেবাননে যুদ্ধে আমাদের চার পুত্রের মৃত্যুর তিক্ত সংবাদে জেগে উঠেছি; তাদের মধ্যে ৪০১তম ব্রিগেডের ৫২তম ব্যাটালিয়নের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল ডর বেন সিমহোনও রয়েছেন।”

স্থানীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, আহত সৈন্যদের সরিয়ে নিতে অন্তত চারটি দখলদার ইসরায়েলি হেলিকপ্টার অবতরণ করতে দেখা গেছে। ইসরায়েলি গণমাধ্যম দক্ষিণ লেবাননের এই ঘটনাকে “অত্যন্ত কঠিন” বলে বর্ণনা করেছে। একই সময়ে ইসরায়েলি কামান হামলা কাফর জৌজ ও জাবাল আল-রাফি এলাকাকেও লক্ষ্যবস্তু করে।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার পরও উত্তেজনা

ইসরায়েলি হামলাগুলো এমন সময়ে ঘটেছে, যখন ১৭ জুন ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করে। ওই সমঝোতায় “লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করার” এবং “লেবাননের আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার” কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি (Esmaeil Baghaei) সতর্ক করে বলেছেন, লেবাননের ওপর ইসরায়েলের অব্যাহত হামলা চুক্তিতে উল্লেখিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকার লঙ্ঘনের শামিল।

আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কূটনীতিক, যাকে তাসনিম সংবাদ সংস্থা উদ্ধৃত করেছে, জানান যে সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ফিরে যাওয়ার আগে লেবাননে শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ হওয়ার নিশ্চয়তা চেয়েছে তেহরান।

সূত্রটির মতে, স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতেই হবে। তিনি আরও বলেন, মধ্যস্থতাকারীরা বর্তমানে বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো সমাধান ও মতপার্থক্য দূর করার চেষ্টা করছেন।

একই কূটনীতিক জানান, লেবাননে সাম্প্রতিক ইসরায়েলি হামলার পর ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের নির্ধারিত আলোচনা “সাময়িকভাবে স্থগিত” করা হয়েছে, পুনরায় আলোচনা শুরু হওয়ার তারিখও নির্ধারণ করা হয়নি।

চুক্তি থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ঘোষণা করেছে যে তারা অনির্দিষ্টকালের জন্য দক্ষিণ লেবাননে অবস্থান বজায় রাখবে। তারা তথাকথিত “ফরওয়ার্ড ডিফেন্স লাইন”-এর একটি মানচিত্রও প্রকাশ করেছে, যাকে লেবাননের ভূখণ্ডের প্রায় ১০ কিলোমিটার ভেতর পর্যন্ত বিস্তৃত একটি নিরাপত্তা অঞ্চল হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বা এআই (Amnesty International) ইসরায়েলের অব্যাহত হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি “এমন একটি ঢাল হয়ে উঠতে পারে, যার আড়ালে দায়মুক্তি, দখলদারিত্ব এবং দমন-পীড়ন অনির্দিষ্টকাল ধরে চলতে থাকবে।”

লেবাননের কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন যে ইসরায়েলি বাহিনী পরিকল্পিতভাবে অ্যাম্বুলেন্স, চিকিৎসাকর্মী এবং বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করছে, যা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য।

জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীরা জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার পর্যবেক্ষণ করা ১৪৩টি গোলাবর্ষণের গতিপথের মধ্যে ১১৯টির জন্য ইসরায়েলি বাহিনী দায়ী ছিল।

বৈরুতের রাজনৈতিক সূত্রগুলো হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে, যাতে ইসরায়েলি হামলা বন্ধ হয় এবং যুদ্ধবিরতি চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা যায়। #
 

পার্স টুডে/এমএএইচ/১৯

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।