জুলফিকার-১ ট্যাংক: ইরানে সাঁজোয়া যান তৈরির ক্ষেত্রে একটি মৌলিক পদক্ষেপ
-
জুলফিকার-১ ট্যাঙ্ক
পার্সটুডে: ট্যাংক হলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সাঁজোয়া সামরিক যান, যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষভাগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত বিভিন্ন যুদ্ধে এবং বিশেষ করে প্রথাগত স্থলযুদ্ধে অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে আসছে।
পার্সটুডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান আট বছরব্যাপী সংঘাতমূলক যুদ্ধের (ইরান–ইরাক যুদ্ধ) পর নিষেধাজ্ঞার মুখে এবং সামরিক আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে সামরিক শিল্পের দেশীয়করণের দিকে মনোযোগ দেয়। এই পথে প্রথম পদক্ষেপগুলোর মধ্যে ছিল সেনাবাহিনীর তিন বাহিনী, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিপ্লবী গার্ড বাহিনীতে (আইআরজিসি) গবেষণা কেন্দ্র এবং জিহাদ কেন্দ্র গড়ে তোলা।
ইরানের সেনাবাহিনীর স্থলবাহিনীর ‘গবেষণা ও স্বনির্ভরতা জিহাদ সংস্থা’ মূলত স্থলবাহিনীতে ব্যবহৃত সামরিক সরঞ্জামগুলোর মানোন্নয়ন ও আধুনিকায়নের দায়িত্বে নিয়োজিত। এই সংস্থার সাঁজোয়া যান সংক্রান্ত পরিকল্পনাগুলো প্রথমে নিজস্ব গবেষণা কেন্দ্রে অনুমোদিত হয়; এরপর তা বাস্তবায়নের জন্য ‘শহীদ জেরেহরান মডার্নাইজেশন সেন্টারে’ পাঠানো হয়। ইরানের সাঁজোয়া যানের চাহিদা মেটাতে এই সংস্থার নেওয়া সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ ছিল ‘জুলফিকার’ নামের নিজস্ব ট্যাঙ্কের নকশা ও তা তৈরি করা।
সার্বিক পর্যালোচনা
সশস্ত্র বাহিনীতে ট্যাঙ্ক তৈরির প্রথম প্রকল্প হিসেবে ‘জুলফিকার’ ট্যাঙ্ক পরিবারটি দেশীয় প্রতিরক্ষা পণ্য তৈরির ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি অর্জন। সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি এই প্রকল্পটির কাজ শুরু হয় ১৯৯০ সালের শুরুতে।
সেনাবাহিনীর স্থলবাহিনীর গবেষণা সংস্থা তিনটি মডেলের জুলফিকার ট্যাঙ্কের নকশা ও প্রোটোটাইপ তৈরি করেছে, যার মধ্যে জুলফিকার-১ এবং জুলফিকার-৩ জনসমক্ষে প্রদর্শন করা হয়েছে। এই ট্যাঙ্কের নকশায় শুরু থেকেই রুশ ট্যাঙ্কে ব্যবহৃত গম্বুজ আকৃতির বুরুজ বা টার্রেট এড়ানো হয়েছে এবং নকশাকাররা ভিন্ন কোনো মডেলকে অনুসরণের চেষ্টা করেছেন। জুলফিকার-১ থেকে জুলফিকার-৩ পর্যন্ত এর আকার ও ওজন ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। ধারণা করা হয়, এই তিন মডেলের ট্যাঙ্কের ওজন ৪০ থেকে ৫০ টনের মধ্যে।
টার্রেট এবং বডির সামগ্রিক নকশার ক্ষেত্রে প্রদর্শিত দুটি মডেলের (জুলফিকার-১ এবং ৩) মধ্যে খুব একটা দৃশ্যমান পার্থক্য নেই; তবে ধারণা করা হয় জুলফিকার-৩ এর বডিতে এমন কিছু উন্নত সিস্টেম যুক্ত করা হয়েছে যা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। ১৯৯৭ সালে ‘শহীদ কোলাহদুজ ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স’-এ এর উৎপাদন লাইনের উদ্বোধন করা হলেও, এটি খুব বড় সংখ্যায় বা গণহারে উৎপাদন করা হয়নি।
জুলফিকার-১ ট্যাংক
জুলফিকার-১ হলো এই সিরিজের প্রথম প্রজন্মের ট্যাংক, যা ১৯৯৩ সালে উন্মোচন করা হয়। ট্যাঙ্ক নকশা ও তৈরির ক্ষেত্রে এটি ছিল ইরানের বিজ্ঞানীদের একটি প্রাথমিক বা পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ, যা তাদের একটি সহজ নকশা ব্যবহারের মাধ্যমে ট্যাঙ্ক তৈরির মূল ও মৌলিক জ্ঞান অর্জনে সহায়তা করেছিল।
জুলফিকার-১ ট্যাঙ্কে আমেরিকার ‘এম-৬০’ (M60) ট্যাংকের চ্যাসিস ব্যবহার করা হয়েছে। এটি মূলত গবেষণামূলক উদ্দেশ্যে মাত্র ২টি তৈরি করা হয়েছিল এবং বড় আকারে উৎপাদনে যাওয়া হয়নি। এই ট্যাঙ্কের একটি আকর্ষণীয় দিক ছিল এর নতুন পাঁচকোণাবিশিষ্ট টার্রেট, যা সেনাবাহিনীর স্বনির্ভরতা শাখা তৈরি করেছিল।
বাহ্যিক দিক থেকে এই ট্যাঙ্কটির সাথে আমেরিকার এম-৬০ ট্যাংকের মিল রয়েছে। জুলফিকার-১ ট্যাঙ্কের দৈর্ঘ্য ৭ মিটার, প্রস্থ ৩.৬ মিটার এবং উচ্চতা ২.৫ মিটার। প্রায় ৪১ টন ওজনের এই ট্যাঙ্কে একটি ৭৮০ হর্সপাওয়ারের ডিজেল ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে, যার ফলে এটি পাকা রাস্তায় ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার গতিতে চলতে পারে। তবে আঁকাবাঁকা ও অসমতল রাস্তায় এর গতি ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৪৫ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
বৈশিষ্ট্যসমূহ:
জুলফিকার-১ ট্যাংকের নকশার অন্যতম ইতিবাচক দিক হলো যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর চোখ ফাঁকি দেওয়ার বা লুকিয়ে থাকার (Stealth) ক্ষমতা। আমেরিকার ‘আব্রামস’ ট্যাঙ্কের মতো এর উচ্চতাও বেশ কম, যার ফলে সঠিক ছদ্মবেশ (Camouflage) ব্যবহারের মাধ্যমে এটি যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর নজর থেকে লুকিয়ে থাকতে পারে। এর পাঁচকোণা টার্রেটটিও মার্কিন ট্যাঙ্কের মতো নকশা করা হয়েছে, যা ট্যাঙ্কের বডি ঘোরার সময়ও নির্দিষ্ট লক্ষ্যের ওপর শক্তভাবে লক বা নিশানা স্থির রাখতে পারে।
জুলফিকার-১ ট্যাংকের মূল অস্ত্র হলো একটি ১২৫ মিলিমিটারের স্মুথবোর গান, যা রাশিয়ার ‘2A46’ মডেলের কামানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এই কামানটি ইরানের ব্যবহৃত ‘টি-৭২’ (T-72) ট্যাঙ্কেও বসানো আছে। এটি বিশ্বের প্রথম সারির এমন একটি কামান যাতে স্বয়ংক্রিয় গোলা লোড করার ব্যবস্থা (Autoloader) রয়েছে, যার ফলে ট্যাঙ্কের ভেতরে ক্রু বা কর্মীর সংখ্যা মাত্র ৩ জনে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
এই ধরনের কামানের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি দিয়ে দূরনিয়ন্ত্রিত এবং সাধারণ—উভয় ধরনের প্রচুর গোলাবারুদ নিক্ষেপ করা যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক হাই-এক্সপ্লোসিভ গোলা, ফিন-স্ট্যাবিলাইজড আর্মার-পিয়ার্সিং গোলা এবং ‘AT-11’ সিরিজের লেজার-গাইডেড মিসাইল। এই লেজার-গাইডেড মিসাইল ব্যবহার করে ৪ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানা সম্ভব।
এই কামানটি প্রতি মিনিটে ৪ থেকে ৬টি গোলা ছুড়তে পারে। এছাড়া জুলফিকার-১ এর সেকেন্ডারি বা সহযোগী অস্ত্র হিসেবে একটি ৭.৬২ মিলিমিটার ক্যালিবারের ‘MG3’ হালকা মেশিনগান এবং একটি ১২.৭ মিলিমিটারের ‘দুশকা’ ভারী মেশিনগান রয়েছে।
ট্যাংকটির সুরক্ষার জন্য ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্প সংস্থার তৈরি সম্পূর্ণ দেশীয় ‘লেজার ওয়ার্নিং অ্যান্ড ডিফেন্স সিস্টেম’ ব্যবহার করা হয়েছে। বিভিন্ন সেন্সরের সাহায্যে এই সিস্টেমটি ট্যাঙ্কের ক্রুদের সতর্ক করে দেয় যদি কোনো শত্রু ট্যাংক-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের লেজার রশ্মি বা লেজার রেঞ্জফাইন্ডার এর ওপর তাক করে।
এই সিস্টেমটি ট্যাঙ্কের ক্রুদের শত্রুর হুমকির বিরুদ্ধে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখানোর সুযোগ করে দেয় এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে সঠিক কোণে ডিফেন্স ইউনিটকে সক্রিয় করে তোলে। এই ডিফেন্স ব্যবস্থার অংশ হিসেবে স্মোক গ্রেনেড লাঞ্চার ব্যবহার করা যায়, যা ধোঁয়ার স্ক্রিন তৈরি করে শত্রুর লেজার লক ভেঙে দেয়। এই ওয়ার্নিং সিস্টেমটি দিগন্তে ৩৬০ ডিগ্রি এবং উচ্চতায় ৬০ ডিগ্রি পর্যন্ত সুরক্ষা দিতে সক্ষম।#
পার্সটুডে/এমএআর/২৮