'নতুন ইরান আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সমীকরণ পরিবর্তন করছে'
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি ধ্বংসের মিশনে ব্যর্থ হয়ে বিস্মিত ও হতভম্ব পাশ্চাত্য
-
ইরানের বিশেষ শ্রেণীর অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র-'খাইবার-শেকান'
পার্সটুডে: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার দাবি করলেও যে ইরানের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে, পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো স্বীকার করেছে যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি বিলুপ্ত হয়নি; বরং এর বড় অংশ পুনর্গঠিত হয়েছে এবং যুদ্ধ শুরু হলে ইরান এখনও শক্ত জবাব দিতে সক্ষম।
ইসলামী ইরানের প্রতিরক্ষা কাঠামো কোনো একক ঘাঁটি বা নির্দিষ্ট স্থানের ওপর নির্ভরশীল নয়। দেশটির রয়েছে গোপন ও ব্যাপক বিস্তৃত প্রতিরক্ষা অবকাঠামোর একটি নেটওয়ার্ক। ফলে এই সক্ষমতাকে পুরোপুরি ধ্বংস করার চিন্তা বাস্তবসম্মত নয়।
পশ্চিমা গণমাধ্যমও এই বাস্তবতা মেনে নিয়েছে এবং ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি নির্মূল করার মিশনের ব্যর্থতায় বিস্ময় প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র বহুবার দাবি করেছে যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস হয়ে গেছে, কিন্তু পশ্চিমা বিশ্লেষক মহল বলছে, এই সক্ষমতার অধিকাংশই অক্ষত রয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলোরও পুনর্গঠন করা হয়েছে।
মার্কিন সাময়িকী ব্লুমবার্গ-এর (Bloomberg) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান তার ক্ষেপণাস্ত্র সম্ভারের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ পুনর্গঠন করেছে এবং নতুন কোনো যুদ্ধ শুরু হলে প্রায় পূর্ণমাত্রার হামলা চালানোর সক্ষমতা রাখে।
এমন পরিস্থিতিতেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার দাবি করছেন যে তিনি ইরানের সব সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করে দিয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রায়ই এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে গণমাধ্যম ও তার সমর্থকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চান। তবে বাস্তবভিত্তিক প্রতিবেদনগুলো তার দাবির বিপরীত চিত্র তুলে ধরছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রচারযুদ্ধও এই ঘটনার একটি অংশ। যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে চায় যে ইরানের আর পাল্টা জবাব দেওয়ার ক্ষমতা নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইরান ক্ষেপণাস্ত্রশক্তিধর অত্যন্ত শক্তিশালী একটি রাষ্ট্র। এর সক্ষমতার কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দেশটি তা পুনর্নির্মাণ করতে পারে।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তিকে প্রতিবেদনে একটি দীর্ঘস্থায়ী সক্ষমতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা শত্রুর হামলায় সহজে ধ্বংস হয় না। প্রতিরোধ ও প্রতিরোধমূলক কৌশলের (deterrence) জন্য এ ধরনের সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এর আগে CNN জানিয়েছিল যে, যুক্তরাষ্ট্রের ৪০ দিনের বোমাবর্ষণ সত্ত্বেও ইরান স্বল্প সময়ের মধ্যে বোমাবিদ্ধ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোর প্রায় ৭০ শতাংশ পুনর্গঠন করেছে।
নতুন স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সিএনএন স্বীকার করে যে, ইরান আবারও তার ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোতে সংরক্ষিত বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্রের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হচ্ছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমটি আরও জানায়, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কৌশল ছিল ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির সুড়ঙ্গপথের প্রবেশমুখে বোমাবর্ষণ করা। তবে এটিকে তারা একটি সাময়িক সমাধান বলে উল্লেখ করেছে, কারণ ইরান ধীরে ধীরে এই কৌশলকে অকার্যকর করে তুলছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রও আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছে। সিএনএনের ভাষ্য অনুসারে, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হ্যাগসেথ (Pete Hegseth) এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন যে ইরান ক্ষয়ক্ষতি পুনরুদ্ধার করছে এবং তার সামরিক সক্ষমতার ব্যাপক উন্নয়ন ঘটাচ্ছে।
অন্যদিকে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব উন্নত অস্ত্রব্যবস্থা পুনর্গঠন বা প্রতিস্থাপন করা সহজ নয় এবং এতে দীর্ঘ সময় লাগবে। পশ্চিমা বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যবহৃত মার্কিন উন্নত অস্ত্রব্যবস্থাগুলোর ঘাটতি পূরণ করতে ৩ থেকে ৬ বছর সময় লাগতে পারে।
এদিকে পশ্চিমা বিশ্বে ইরানকে ঘিরে আলোচনায় এখন আর একক বর্ণনা বা দৃষ্টিভঙ্গি নেই। আগে যে অধিকার এক পক্ষের জন্য স্বীকৃত ছিল, তা অন্য পক্ষের ক্ষেত্রে অস্বীকার করা হতো।
বিবিসি'র ফার্সি সার্ভিসের সাংবাদিক সিয়াভাশ আর্দালান লিখেছেন:
“আমি কখনো ভাবিনি যে একজন রিপাবলিকান সিনেটর ফিরে এসে বলবেন, ইরানের আত্মরক্ষার অধিকার থাকা উচিত। তাকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র থাকা নিয়ে তার কোনো সমস্যা আছে কি না, তখন তিনি এ কথা বলেন। আমেরিকানরা, বিশেষ করে রিপাবলিকানরা, আত্মরক্ষার অধিকার সবসময় ইসরায়েলের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছে, ইরানের ক্ষেত্রে নয়। অবশ্য ওই ব্যক্তি বদলে যাননি; তিনি শুধু সেই কথাই বলছেন যা ট্রাম্প শুনতে পছন্দ করেন। ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, আজ আমরা এক ভিন্ন পৃথিবীতে বাস করছি।”
প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হয়েছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা পশ্চিমা শক্তিগুলোর সামর্থ্যের বাইরে। ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত সামরিক উপকরণগুলো বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা ও অকার্যকারিতার মুখোমুখি হয়েছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা একটি অস্বীকার করা যায় না এমন বাস্তবতা, যা সহজে বিলীন হবে না।
প্রতিবেদনটি দাবি করে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি যত বেশি সংরক্ষিত ও শক্তিশালী হবে, তার বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার খরচ ততই বেড়ে যাবে। ক্রমবর্ধমান শক্তির অধিকারী নতুন ইরান আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সমীকরণ পরিবর্তন করছে এবং বিশ্বব্যবস্থার নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণে ভূমিকা রাখছে। #
পার্স টুডে/এমএএইচ/২১
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।