ইরানের সঙ্গে সমঝোতার পথ খুঁজছে যুক্তরাষ্ট্রের আরব মিত্ররা
https://parstoday.ir/bn/news/event-i160724-ইরানের_সঙ্গে_সমঝোতার_পথ_খুঁজছে_যুক্তরাষ্ট্রের_আরব_মিত্ররা
পার্সটুডে: মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন (CNN )এক বিশদ প্রতিবেদনে ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি “ক্রমবর্ধমান অনাস্থা”-র কথা উল্লেখ করেছে।
(last modified 2026-06-25T13:58:17+00:00 )
জুন ২৫, ২০২৬ ১৯:৩২ Asia/Dhaka
  • ইরানের সঙ্গে সমঝোতার পথ খুঁজছে যুক্তরাষ্ট্রের আরব মিত্ররা
    ইরানের সঙ্গে সমঝোতার পথ খুঁজছে যুক্তরাষ্ট্রের আরব মিত্ররা

পার্সটুডে: মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন (CNN )এক বিশদ প্রতিবেদনে ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি “ক্রমবর্ধমান অনাস্থা”-র কথা উল্লেখ করেছে।

সিএনএন-এর ভাষ্য অনুযায়ী, “এই যুদ্ধ উপসাগরীয় নেতাদের ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতার বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে বাধ্য করেছে।”

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “ট্রাম্পের উপসাগরীয় মিত্ররা উদ্বিগ্ন যে ইরানের সঙ্গে তাঁর চুক্তি একটি ‘বিপর্যয়কর মোড়’ হতে পারে। কয়েক দশক ধরে উপসাগরীয় আরব নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে একটি কৌশলগত অংশীদারত্ব হিসেবে দেখেছেন। কিন্তু ট্রাম্প প্রায়ই এ সম্পর্ককে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখেছেন।”

সিএনএন স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি আরবের বাদশাহকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন: “বাদশাহ! আমরা আপনাদের রক্ষা করি। আমাদের ছাড়া হয়তো আপনারা দুই সপ্তাহও টিকতে পারবেন না। এই সেনাবাহিনীর খরচ আপনাদেরই বহন করতে হবে।”

প্রতিবেদনে ২০১৯ সালে সৌদি আরবের তেল স্থাপনাগুলোর ওপর হামলার প্রসঙ্গও তুলে ধরা হয়েছে। CNN দাবি করেছে, ওই হামলার জন্য ওয়াশিংটন ইরানকে দায়ী করেছিল, যদিও ইয়েমেন ও ইরানের কর্মকর্তারা বহুবার এ অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন।

সিএনএন-এর মতে, সেই হামলায় সৌদি আরবের তেল উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায় এবং বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যায়। এর ফলে উপসাগরীয় দেশগুলো প্রশ্ন তুলতে শুরু করে—তেহরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র কতটা আগ্রহী।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে উপসাগরীয় নেতারা এই বাস্তবতা উপলব্ধি করেছিলেন। তারা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর ট্রাম্প তাঁর প্রথম সরকারি বিদেশ সফরের জন্য উপসাগরীয় অঞ্চলকে বেছে নেন। কাতারের রাজধানী দোহায় তিনি ঘোষণা করেছিলেন, “আমরা এই দেশকে রক্ষা করব।”

সিএনএন-এর মতে, চলতি বছর সেই প্রতিশ্রুতি সবচেয়ে বড় পরীক্ষার মুখোমুখি হয়। উপসাগরীয় দেশগুলোর আঞ্চলিক সংঘাত এড়ানোর প্রচেষ্টা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের পাশে দাঁড়িয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, যার ফলে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে পাল্টা হামলা শুরু হয় এবং আঞ্চলিক সরকারগুলো আবারও প্রশ্নের মুখে পড়ে—মার্কিন নিরাপত্তা সুরক্ষার প্রকৃত অর্থ কী?

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও  বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও কুয়েত সফর করছেন। সিএনএন-এর মতে, তাঁর অন্যতম কঠিন দায়িত্ব হলো উপসাগরীয় দেশগুলোকে বোঝানো যে ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি এখনও বহাল রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে উপসাগরীয় দেশগুলোর মূল প্রশ্ন হলো—ইরানের সঙ্গে উদীয়মান সমঝোতা তাদের যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থার তুলনায় ভালো অবস্থানে নিয়ে যাবে, নাকি আরও খারাপ পরিস্থিতিতে ফেলবে।

আইআইএসএস (International Institute for Strategic Studies)-এর সিনিয়র গবেষক হাসান আলহাসান (Hasan Alhasan) বলেছন, “উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর দৃষ্টিকোণ থেকে ইরান যুদ্ধ আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য একটি বিপর্যয়কর মোড়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে যাওয়া এবং ইরানের দিকে অর্থনৈতিক সম্পদের প্রবাহ বৃদ্ধি তেহরানকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে পারে।”

তবে তিনি যোগ করেন, “তা সত্ত্বেও পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে সমর্থন করেছে। তাদের কাছে একটি খারাপ চুক্তিও যুদ্ধের চেয়ে ভালো।”

সিএনএন-এর দাবি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা ইরানকে হরমুজ প্রণালিতে (Strait of Hormuz) বাণিজ্যিক নৌ চলাচল তদারকির ক্ষেত্রে ওমানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক ভূমিকা এনে দিয়েছে। এর ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর সামুদ্রিক বাণিজ্য, বিশেষ করে জ্বালানি রপ্তানি, ইরানের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া সিএনএন বলেছে, এই সমঝোতায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা তার মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, চুক্তির অংশ হিসেবে ইরানের পুনর্গঠনের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের কথা বলা হয়েছে, যেখানে উপসাগরীয় দেশগুলোর অংশগ্রহণ প্রয়োজন হতে পারে। তবে সৌদি আরব জানিয়েছে যে এ বিষয়ে তাদের কাছে “কোনো বিস্তারিত তথ্য নেই”, আর কাতার আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর না করেও আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

সিএনএন-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, উপসাগরীয় দেশগুলো এখনও যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের প্রধান নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে দেখে, কারণ বর্তমানে এর বিকল্প খুবই সীমিত। তবে একই সঙ্গে তারা ধীরে ধীরে নিজেদের সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের উৎস বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করছে, বিশেষ করে তুরস্কের (Turkey) দিকে বিকল্প অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে নজর দিচ্ছে।

একজন সিনিয়র উপসাগরীয় কূটনীতিক সিএনএন-কে বলেছেন, “বর্তমানে কোনো আঞ্চলিক শক্তিই উপসাগরীয় নিরাপত্তার গ্যারান্টর হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প হতে পারে না। তবে কর্মকর্তারা এমন একটি ভবিষ্যৎ নিয়ে ক্রমবর্ধমানভাবে ভাবছেন, যেখানে ওয়াশিংটনের ভূমিকা অনেক কম হবে। সম্ভাব্য একটি কাঠামো হতে পারে ইরানের সঙ্গে একটি আঞ্চলিক অনাক্রমণ চুক্তি।”

সিএনএন-এর মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা গ্যারান্টির ওপর আস্থা কমে যাওয়ায় উপসাগরীয় দেশগুলোর হাতে তেহরানের ওপর প্রভাব বিস্তারের প্রধান মাধ্যম হিসেবে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাই রয়ে গেছে। তবে বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা হলো, কেবল কূটনীতি দিয়ে তাদের কাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

হাসান আলহাসান বলেন, “একটি অনাক্রমণ চুক্তি ইরানের কৌশলগত হিসাব-নিকাশ পরিবর্তন করবে—এমন সম্ভাবনা কম। এর জন্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলোকে প্রথমে বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধ ক্ষমতা, উন্নত ও সমন্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী স্থিতিস্থাপকতার মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে বিদ্যমান কৌশলগত ভারসাম্যহীনতা দূর করতে হবে।”

ইউরোশিয়া (Eurasia Group)এর মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিভাগের প্রধান ফিরাস মাকসাদ (Firas Maksad) বলেছেন, “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে একটি নির্ভরযোগ্য কৌশলগত মিত্র হিসেবে দেখার ধারণা এখন উপসাগরীয় দেশগুলোতে গভীর প্রশ্নের মুখে পড়েছে।”

তিনি আরও বলেছেন, “উপসাগরীয় দেশগুলোকে ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে, কারণ তারা আর যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সম্পূর্ণ আস্থা রাখতে পারছে না। দীর্ঘমেয়াদে শুধু উত্তেজনা কমানোই যথেষ্ট নয়; তাদের নিজস্ব সামরিক সক্ষমতাও শক্তিশালী করতে হবে।”#
 

পার্স টুডে/এমএএইচ/২৫

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।