'ইরানি জাতির অধিকার পুনরুদ্ধার বিচার বিভাগের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার'
মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধ অপরাধের বিচার জোরদারের নির্দেশ দিলেন নতুন সর্বোচ্চ নেতা
-
ইরানের ইসলামী বিপ্লবের নতুন সর্বোচ্চ নেতা সাইয়্যেদ মুজতাবা হোসেইনি খামেনেয়ী -হাফিজাকুমুল্লাহ
পার্সটুডে: ইরানের ইসলামী বিপ্লবের নতুন সর্বোচ্চ নেতা সাইয়্যেদ মুজতাবা হোসেইনি খামেনেয়ী বলেছেন, জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠা কেবল ব্যক্তিগত বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, গত ফার্সি ১৪০৪ ও ১৪০৫ সালে (২০২৫-২৬) সংঘটিত আন্তর্জাতিক অপরাধে ইরানি জাতির ক্ষুণ্ণ হওয়া অধিকার পুনরুদ্ধার করা দেশের বিচার বিভাগের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।
ইসলামী বিপ্লবের নতুন নেতা 'বিচার-বিভাগ সপ্তাহ' এবং বিচার বিভাগের সাবেক প্রধান আয়াতুল্লাহ বেহেশতি ও তাঁর সহযোদ্ধাদের শাহাদাত-বার্ষিকী উপলক্ষে দেয়া বাণীতে এই ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁর এই বাণীর পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ নিচে দেওয়া হল:
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে
[মহানবীর (সা)] পবিত্র আহলুল বাইতের শোকাবহ দিনগুলো এবং হযরত সাইয়্যিদুশ শুহাদা ইমাম হুসাইন (আ.) ও তাঁর বিশ্বস্ত সঙ্গীদের শাহাদাত উপলক্ষে আমি ইরানের সমগ্র জাতি এবং মুসলিম উম্মাএক গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।
ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আন্দোলন ও কিয়াম তথা জাগরণ ছিল সত্য প্রতিষ্ঠা, উম্মাহর সংস্কার এবং জুলুম-নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামের এক অনন্য শিখর। সত্য ও মিথ্যা, ন্যায় ও অন্যায়ের সংঘাতে এটি মানব ইতিহাসের সর্বোচ্চ আদর্শগুলোর একটি এবং বিশ্বের সকল স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য এতে রয়েছে অমূল্য ও অবিস্মরণীয় শিক্ষা।
সাইয়্যিদুশ শুহাদার (আ.) রক্তকে ‘আল্লাহর রক্ত’ বলা হয়, যা সমগ্র বিশ্বে প্রবাহিত হয়ে জীবনদায়ী মহাকাব্যের জন্ম দিয়েছে। ইরানের ইসলামী বিপ্লবও যেহেতু সেই আলোকিত উৎস থেকেই উৎসারিত, তাই এর লক্ষ্য হওয়া উচিত সর্বদা আশুরার আন্দোলনের উদ্দেশ্যসমূহ বাস্তবায়নের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।
প্রতি বছরের ৭ তীর আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ইসলামী বিপ্লবের এক মহান ব্যক্তিত্বকে—যিনি বিচার বিভাগের প্রধান হিসেবে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও ন্যায়বিচারের জন্য নিরলসভাবে কাজ করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত বিপ্লবের একদল নিষ্ঠাবান সহযোদ্ধার সঙ্গে শাহাদাতের অমৃত পান করেছেন। তাঁর শাহাদাত এবং তাঁর সঙ্গে ৭২ জন শহীদের আত্মত্যাগ প্রমাণ করেছে যে এই ইসলামী ব্যবস্থা এবং এর নির্মাতারা হুসাইনি আদর্শের অনুসারী।
ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রে বিচার বিভাগের মর্যাদা হল জনগণের অধিকার সংরক্ষণ, জনস্বার্থ রক্ষা, বৈধ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, আল্লাহর বিধান কার্যকর করা এবং আইনের সঠিক প্রয়োগ তদারকি করা।
এই পথে সাফল্যের ফল কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন নয়, একইসঙ্গে বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় করা।
রাষ্ট্রের সব অঙ্গ, প্রতিষ্ঠান ও দায়িত্বশীল সংস্থার কাছে প্রত্যাশা হল, তারা যেন নিজেদের কার্যক্রম ইসলামী প্রজাতন্ত্রের আদর্শ এবং জাতির উচ্চ মর্যাদার আলোকে পুনর্গঠন করে।
এই ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের অবস্থান অনন্য। রাষ্ট্রের অন্যান্য অঙ্গের সংস্কার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে এজন্য বিচার বিভাগের ভেতরেও সংস্কার ও পুনর্গঠনের ধারা অব্যাহত রাখতে হবে।
আজ সমাজের সাধারণ প্রত্যাশা হল, বিচার বিভাগের কার্যক্রমে এই সংস্কারের বাস্তব প্রতিফলন দেখতে পাওয়া। বিচার বিভাগের রূপান্তর যেন কেবল নীতিপত্র বা পরিকল্পনায় সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবে রূপ নেয় এবং আদালত, বিচারিক কমপ্লেক্স থেকে শুরু করে সমাজজীবনের সর্বত্র এর ইতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান হয়।
মানুষ যেন নিজেদের দৈনন্দিন জীবনে এর সুফল অনুভব করতে পারেন—দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান, অধিকারহানি কমে আসা, দ্রুত বিচার, বিচারকদের রায়ের নির্ভুলতা ও সততা বৃদ্ধি এবং ন্যায়বিচারে সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হওয়ার মাধ্যমে।
এমন একটি বিচারব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে নির্যাতিত প্রত্যেক মানুষ এটিকে নিজের নিরাপদ আশ্রয় মনে করবেন এবং বিশেষ করে ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা অন্যের অধিকার লঙ্ঘনের সাহস করবেন না। সুপারিশ, প্রভাব বা পরিচয়ের মাধ্যমে বিচারিক সুবিধা পাওয়ার সব পথ পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হবে।
তবে জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠা কেবল ব্যক্তিগত বিষয়েই সীমাবদ্ধ নয়। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সমান সুযোগের অধিকার, প্রাকৃতিক সম্পদের ন্যায্য ব্যবহার, সুস্থ পরিবেশ, বৈধ স্বাধীনতা এবং কার্যকর শাসনব্যবস্থা—এসবও জনগণের মৌলিক অধিকার এবং ন্যায়বিচার সম্প্রসারণের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
বর্তমান সময়ে সমগ্র ইরানি জাতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও বিচারিক বিষয়গুলোর একটি হল, ১৪০৪ ও ১৪০৫(২০২৫-২৬) সালে আন্তর্জাতিক অপরাধী, দাম্ভিক শক্তি ও বিশ্ব-আগ্রাসীদের অপরাধের ফলে ক্ষুণ্ণ হওয়া জাতীয় অধিকার পুনরুদ্ধার করা।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় আরোপিত যুদ্ধের নিরপরাধ শহীদদের রক্ত থেকে শুরু করে আমাদের প্রিয় দেশের ওপর এবং দেশের অভ্যন্তরে ও বিদেশে বসবাসকারী প্রতিটি ইরানি নাগরিকের শারীরিক, মানসিক, বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক ক্ষয়ক্ষতি—সবকিছুই বিচারিকভাবে অনুসরণযোগ্য তথা বিচার-প্রক্রিয়াধীন রাখতে হবে।
মিনাব ও লামের্দে শিশু হত্যাকাণ্ড এবং নজিরবিহীন যুদ্ধাপরাধ, চিকিৎসা ও সেবা-কেন্দ্রে হামলা, কয়েক দিনের নবজাতক থেকে শুরু করে প্রবীণ নাগরিকদের হত্যা, এবং সর্বোপরি অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব, অনন্য রত্ন, যুগের অনন্য সংগ্রামী নেতার (আয়াতুল্লাহিল উজমা সাইয়্যেদ আলী হোসেইনি খামেনেয়ী,-আল্লাহ তাঁর মর্যাদা সমুন্নত রাখুন) শাহাদাত— এইসব প্রতিটি ঘটনাই শত শত, বরং হাজার হাজার গুরুত্বপূর্ণ আইনি মামলার ভিত্তি, যা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আদালতে গুরুত্বসহকারে চালিয়ে যেতে হবে।
এটি নিশ্চিত যে, অপরাধীদের অবশ্যই আইনের আওতায় এনে তাদের অপরাধের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
এই প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, মার্কিন ও ইহুদিবাদী শত্রুপক্ষের কয়েকজন নেতা নিজ মুখে প্রকাশ্যে এসব অপরাধের কথা স্বীকার করেছে, এমনকি তা নিয়ে গর্বও প্রকাশ করেছে। এইসব স্বীকারোক্তি নিঃসন্দেহে অপরাধের স্বীকারোক্তি হিসেবে গণ্য হবে এবং জাতির ক্ষুণ্ণ-হওয়া অধিকার পুনরুদ্ধারের জন্য শক্তিশালী আইনি-ভিত্তি তৈরি করবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, গত বছরের তির মাস তথা জুন মাসে বিচার বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে শেষ বৈঠকে শহীদ বিপ্লবী নেতার যে নির্দেশনা ছিল তথা —দ্বিতীয় আরোপিত যুদ্ধের অপরাধগুলোর বিচার নিশ্চিত করা—তা এখন তৃতীয় আরোপিত যুদ্ধের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করতে হবে এবং চূড়ান্ত রায় কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে এই প্রক্রিয়ার কাজ চালিয়ে যেতে হবে। এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অবশ্য বিচার বিভাগের সর্বাত্মক সংস্কার ও ঘোষিত লক্ষ্যসমূহ দ্রুত অর্জনের জন্য বিভিন্ন প্রস্তুতি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। এসব বিষয়ে শহীদ মহান নেতা বিচার বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বার্ষিক বৈঠকগুলোতে বহুবার বিস্তারিত নির্দেশনা ও সুপারিশ দিয়েছেন। আমি আশা করি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সেগুলোর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেবেন এবং বাস্তবায়নের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করবেন।
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং জুলুম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রামের পথ সহজ নয়। আন্তরিকতা, আল্লাহর ওপর ভরসা, উচ্চস্তরের তাকওয়া তথা খোদাভীতি, দৃঢ় সংকল্প, অক্লান্ত পরিশ্রম, সাহস, দৃঢ়তা, উদ্ভাবনী চিন্তা, আধুনিক প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের মাধ্যমে এই পথ সুগম হবে।
আল্লাহর ইচ্ছায় এবং প্রতীক্ষিত ন্যায়ের অধিপতি হযরত ইমাম মাহদি (আ.)-এর অনুগ্রহে এসব লক্ষ্য বাস্তবায়িত হবে—ইনশাআল্লাহ।
সাইয়্যিদ মুজতাবা হোসেইনি খামেনেয়ি
৭ তীর ১৪০৫ (২৮ জুন,২০২৬)
পার্স টুডে/এমএএইচ/২৮
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।