'সামরিক লক্ষ্য ব্যর্থ হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে নয়া নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে'
ইরান যুদ্ধ সমাপ্তি টানার ঘোষণা দেয়ার কথা ভাবছে ট্রাম্প: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল
-
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
পার্সটুডে: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণা করার সম্ভাবনা নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে তাঁর জ্যেষ্ঠ সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা করছেন বলে মার্কিন কর্মকর্তারা দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-কে জানিয়েছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে—এমন ঘোষণা দেওয়ার ধারণার প্রতি ট্রাম্প ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন। কর্মকর্তারা জানান, ট্রাম্প বিশ্বাস করেন যে অব্যাহত অর্থনৈতিক চাপ শেষ পর্যন্ত ইরানকে তার পারমাণবিক কর্মসূচি ভেঙে ফেলতে বাধ্য করতে পারে অথবা ইরানি সরকারের পতনের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসন তেহরানের বিরুদ্ধে চলমান চাপ অভিযানের অংশ হিসেবে গত ১৯ আগস্ট ইরানের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা নীতি ঘোষণা করে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, এর উদ্দেশ্য হলো ইরানের অবশিষ্ট সব আর্থিক পথ বন্ধ করে দিয়ে দেশটিকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা।
তবে বিশেষজ্ঞরা যুক্তি দিয়েছেন যে, এই অভিযান মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক ও প্রচারমূলক পদক্ষেপ, যার উদ্দেশ্য সামরিকভাবে লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ সহজ করা।
ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ শুরু করার ছয় মাস পর এই আলোচনা সামনে এসেছে। ট্রাম্পের যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথ শুরুতে এই যুদ্ধকে একটি দ্রুত ও সিদ্ধান্তমূলক অভিযান হিসেবে তুলে ধরেছিলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাত এড়ানো।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, ট্রাম্পের জ্যেষ্ঠ সহযোগীরা তাঁকে সতর্ক করেছেন যে, সাম্প্রতিক গোলাগুলির বাইরে বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টি হলে নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
পত্রিকাটির মতে, গত মাসে ট্রাম্পকে অতিরিক্ত কয়েকটি সামরিক বিকল্প সম্পর্কে অবহিত করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে বিমান হামলা আরও জোরদার করা, হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি ইরানের দ্বীপগুলো দখলের জন্য স্থলবাহিনী মোতায়েনের সম্ভাবনা এবং কারকাস পর্বতে সম্ভাব্য হামলা।
তবে মার্কিন সামরিক নেতারা তাঁকে সতর্ক করেছেন যে, এ ধরনের অভিযান পরিচালনার জন্য ওয়াশিংটনকে এই অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সামরিক সম্পদ দীর্ঘ সময় ধরে মোতায়েন রাখতে হবে, যার ফলে সেনা মোতায়েনের মেয়াদ আরও দীর্ঘায়িত হবে।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল আরও জানিয়েছে, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করার দায়িত্বে থাকা মার্কিন সেনাবাহিনীর বিমান প্রতিরক্ষা ইউনিটগুলোর স্বাভাবিক নয় মাসের মোতায়েন ইতোমধ্যে বাড়িয়ে ১২ মাস করা হয়েছে।
ইউরোপ ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জন্য মূলত নির্ধারিত কিছু ইউনিট এক বছরেরও বেশি সময় ধরে পশ্চিম এশিয়ায় অবস্থান করছে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মিসাইল ডিফেন্স প্রজেক্টের পরিচালক টম কারাকো বলেন, যুদ্ধ শুরুর আগেও বিমান প্রতিরক্ষা ইউনিটগুলোর অপারেশনাল কার্যক্রমের গতি মার্কিন যৌথ বাহিনীর মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ ছিল।
তিনি সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনের কারণে সেনাসদস্যদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে, রক্ষণাবেক্ষণ কাজ বিলম্বিত হতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদি আধুনিকায়ন পরিকল্পনা ব্যাহত হতে পারে।
মার্কিন নৌবাহিনীও একই ধরনের চাপের মুখে রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের ১৯টি যুদ্ধজাহাজ রয়েছে, যার মধ্যে দুটি বিমানবাহী রণতরী এবং ১৩টি গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার রয়েছে।
যুদ্ধের শুরুতে এই অঞ্চলে মোতায়েন করা বেশ কয়েকটি ডেস্ট্রয়ার এখন নিয়মিত বিরতি ছাড়াই মাসের পর মাস সমুদ্রে অবস্থান করছে, যে ধরনের বিরতি তাদের নাবিকদের সাধারণত পাওয়ার কথা।
এই সংঘাতের ফলে কয়েক দশকের মধ্যে মার্কিন নৌবাহিনীর সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের মোতায়েন ঘটেছে।
মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড দেশে ফেরার আগে ১১ মাস সমুদ্রে অবস্থান করে এবং গত মে মাসে দেশে ফিরে আসে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এটি ছিল কোনো মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর দীর্ঘতম মোতায়েন।
ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনও দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েন শেষে দেশে ফিরছে। অন্যদিকে ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দীর্ঘ একটি মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং এটিকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হতে পারে।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল আরও জানিয়েছে, এই যুদ্ধের কারণে মার্কিন নৌবাহিনীর লজিস্টিক বা সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় ক্রমবর্ধমান সমস্যা দেখা দিয়েছে। সংঘাত স্বাভাবিক রসদ সরবরাহের ব্যবস্থা ব্যাহত করেছে এবং মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোকে ভারত মহাসাগরে অবস্থিত দূরবর্তী মার্কিন-ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি দিয়েগো গার্সিয়ার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে বাধ্য করেছে।
এর ফলে নাবিকদের কাছে ডাক পৌঁছানো এবং পরিবারের পাঠানো বিভিন্ন উপহার বা যত্নসামগ্রী সরবরাহের পরিমাণ কমে গেছে। পাশাপাশি নাবিকদের যুদ্ধজাহাজের বাইরে সময় কাটানোর সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েন সামরিক সরঞ্জাম ও যুদ্ধজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণেও বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর ফলে সংঘাত দীর্ঘায়িত করার সামরিক ও লজিস্টিক ব্যয় আরও বেড়ে যেতে পারে। #
পার্সটুডে/এমএআর/০৩
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।
ট্যাগ