ইরান লস অ্যাঞ্জেলেস ও সান দিয়েগোকে “ধ্বংস করে দিতে” পারে: ট্রাম্প
'ট্রাম্প ইরানকে দানব হিসেবে তুলে ধরার প্রচেষ্টা থামাতে পারছেন না'
-
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
পার্সটুডে: সোমবার নেব্রাস্কার গ্র্যান্ড আইল্যান্ডে এক নির্বাচনী সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ইরান লস অ্যাঞ্জেলেস ও সান দিয়েগোকে “ধ্বংস করে দিতে” পারে।
মার্কিন কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন দ্রুত এগিয়ে আসায় জনমতকে উত্তেজিত করার জন্য ট্রাম্প এ ধরনের অবাস্তব বক্তব্য দিচ্ছেন। তিনি আশঙ্কা করছেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানবিরোধী যে অযৌক্তিক যুদ্ধ তিনি ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু শুরু করেছিলেন এবং যা এখনো চলছে, তার কারণে রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে।
নির্বাচনী সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, নভেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি “একটি বিশাল বিজয়” দেখতে চান।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কারণে দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানির দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প এমন বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তব্য দিচ্ছেন। আকস্মিক ও অবৈধ আগ্রাসনের জবাবে ইরান কৌশলগত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
বিশেষ করে জনমত জরিপগুলোতে যখন দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ আমেরিকান ইরানের বিরুদ্ধে তাঁর যুদ্ধকে অনুমোদন করছেন না, তখন সহযোগী রিপাবলিকানদের ভোট আদায়ের জন্য ট্রাম্প এসব কথা বলেছেন।
ইরান যুদ্ধের কারণে এখন আমেরিকানরা গ্যাস স্টেশনগুলোতে এর উচ্চ মূল্য চুকাচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ প্রশ্ন তুলছে—যে প্রেসিডেন্ট তাঁর পূর্বসূরিদের 'অন্তহীন যুদ্ধ-বিগ্রহে' জড়িয়ে পড়ার জন্য নিন্দা করেছিলেন, তিনি নিজেই কীভাবে ইরানের বিরুদ্ধে নিজের পছন্দের একটি যুদ্ধ শুরু করলেন?
ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে যাচ্ছিল—এমন দাবি করে ট্রাম্প ব্যর্থভাবে এই যুদ্ধকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করে আসছেন।
মাত্র কয়েক দিন আগেও তিনি দাবি করেছিলেন, তিনি প্রেসিডেন্ট না হলে ইরান পারমাণবিক বোমা দিয়ে ইসরায়েল, সৌদি আরব এবং আরও বিভিন্ন দেশকে “পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিত”। সোমবারের তাঁর বক্তব্যও এ ধরনের বিভ্রান্তিকর ও ভিত্তিহীন দাবিরই অংশ।
প্রেসিডেন্টের এ ধরনের বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছিল—এমন কোনো প্রমাণ পায়নি। তাছাড়া, ইরান তার ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লার ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে এবং লস অ্যাঞ্জেলেস বা সান দিয়েগোর মতো শহরে আঘাত হানতে সক্ষম আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও তার নেই।
ট্রাম্প মিথ্যা কথা বলায় অভ্যস্ত, কিন্তু ইরান সম্পর্কে সোমবারের তাঁর দাবি বিশেষভাবে বিস্ময়কর। এসব বক্তব্যের প্রধান উদ্দেশ্যই হলো ইরানকে দানব হিসেবে উপস্থাপন করা।
ট্রাম্প জনগণকে বোঝাতে চান যে জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং এর ফলে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতি এমন একটি খরচ, যা আমেরিকানদের মেনে নেওয়া উচিত।
তিনি নির্বাচনী সমাবেশে বলেন, “বিশ্বকে নিরাপদ রাখা, আমাদের দেশকে নিরাপদ রাখার জন্য এটি একটি সামান্য মূল্য।” তিনি আরও বলেন, “তারা একটি শহর ধ্বংস করে দিতে পারে, লস অ্যাঞ্জেলেস ধ্বংস করে দিক, সান দিয়েগো ধ্বংস করে দিক। এটি খুবই সামান্য মূল্য।”
লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস জানিয়েছে, ট্রাম্পের এই বেপরোয়া মন্তব্যের সমালোচনা করেছেন ক্যালিফোর্নিয়ার নেতারা। তাঁদের মধ্যে সান দিয়েগোর অন্তত একজন ট্রাম্প-সমর্থিত রিপাবলিকান প্রার্থীও রয়েছেন।
ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউজম এক্স-এ লিখেছেন, “ন্যাশনাল গার্ড ও মেরিনদের ক্যালিফোর্নিয়া দখলে পাঠানোর পর ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন বলছেন, আমাদের বিদেশি শত্রুদের উচিত লস অ্যাঞ্জেলেস ও সান দিয়েগোকে ‘ধ্বংস করে দেয়া’। ... তিনি বিভ্রান্ত এবং বিপজ্জনক।”
সান দিয়েগোর মেয়র টড গ্লোরিয়াও লিখেছেন, “সান দিয়েগো কোনো মুক্তিপণ নয়।” তিনি আরও বলেন, “আমরা বিসর্জনযোগ্য নই। এবং আমরা কখনোই ‘দেয়ার মতো সামান্য মূল্য’ নই। আপনার বেপরোয়া যুদ্ধের কথাবার্তা থেকে আমাদের শহরকে দূরে রাখুন।”
লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়র কারেন বাস এক বিবৃতিতে ট্রাম্পের মন্তব্যকে “বিপজ্জনক” বলে অভিহিত করেছেন এবং বলেছেন, এর ফলে “সম্ভাব্যভাবে আমাদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে।”
তিনি বলেন, “একজন প্রেসিডেন্টের ভূমিকা হলো দেশকে সুরক্ষা দেওয়া, সক্রিয়ভাবে দেশকে হুমকি না দেয়া এবং আমেরিকানদের জীবনের ওপর হামলায় উৎসাহ দেয়াও নয়।”
ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট সিনেটর অ্যাডাম শিফও সোমবার সন্ধ্যায় ট্রাম্পের মন্তব্যের সমালোচনা করেন। সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ তিনি লিখেছেন, “প্রেসিডেন্ট বলছেন, ইরান যুদ্ধ ‘খুব শিগগিরই’ শেষ হবে। আমরা এই প্রতিশ্রুতি কতবার শুনেছি? আর যদি এর অর্থ হয় যে প্রক্রিয়াটিতে আমেরিকার দুটি বড় শহরের ওপর হামলা হবে, তাহলে এর মূল্য নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন নন।”
যদিও এসব কর্মকর্তা জানেন যে ট্রাম্প মিথ্যা বলছেন এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তাঁর বিভ্রান্তিকর বক্তব্যকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছেন, তবুও ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি-সংক্রান্ত বক্তব্যগুলো বিস্ময়করভাবে বিভ্রান্তিকর ও খামখেয়ালিপূর্ণ। #
সূত্র: তেহরান টাইমস
পার্স টুডে/এমএএইচ/০৭
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।