নাগরিকত্ব বিলের বিরুদ্ধে ভারতে ক্ষোভ বাড়ছে, কেন্দ্রীয় সরকারকে ‘আসু’র হুঁশিয়ারি
নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল ‘ক্যাব’-এর বিরুদ্ধে অসম ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। গত (সোমবার) সারা অসম ছাত্র সংস্থার (আসু) পক্ষ থেকে গুয়াহাটিতে রাজভবন ঘেরাও করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয়। এসময় সংগঠনটি কেন্দ্রীয় সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে তাঁদের কথা কানে না তুললে ভয়ঙ্কর পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে!
গতকাল (মঙ্গলবার) ‘ক্যাব’-এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে মণিপুরে ১৮ ঘণ্টার সর্বাত্মক বনধ পালিত হয়েছে। মণিপুর পিপল এগেইনিস্ট সিটিজেনশিপ এমেন্ডমেন্ট বিল (ম্যানপ্যাক) এবং আদিবাসী জনগণের উত্তর-পূর্ব ফোরামের (এনইএফআইপি) আহ্বানে ওই বনধ পালিত হয়। বনধের ফলে এদিন সমস্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, দোকান, হোটেল, তেলের ডিপো ইত্যাদি বন্ধ ছিল। কোনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা হয়নি। আন্তঃরাজ্য ও আন্তঃজেলা বাস চলাচলও বন্ধ ছিল। সড়কে ট্যাক্সি ও অটোরিকশাও চলাচল করেনি।
অসমে ‘আসু’র মুখ্য উপদেষ্টা ড. সমুজ্জ্বল ভট্টাচার্য বলেন, ‘বিজেপি এখন ‘বাংলাদেশিদের ভোটে’ নির্বাচন জিততে চাচ্ছে। সেজন্য ওই বিল (নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল) পাস করিয়ে লাখ লাখ ‘অবৈধ হিন্দু বাংলাদেশি’কে নাগরিকত্ব প্রদানের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কিন্তু অসমে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। এ রাজ্যে প্রভুত্ব থাকবে শুধু স্থানীয়দের।’
তিনি সাফ জানান, ‘১৯৭১ সালের পরে আসা হিন্দু-মুসলিম সবাইকে এ রাজ্য ও এ দেশ ত্যাগ করতে হবে। এরপরেও যদি সরকারের কানে এসব কথা না যায় পরে আরও ভয়ঙ্কর পরিণতির সম্মুখীন হতে হবে!’
অন্যদিকে, ‘আসু’র সাধারণ সম্পাদক লুরিনজ্যোতি গগৈ বলেছেন, ‘বিজেপি গদি রক্ষার স্বার্থে এখন বাংলাদেশিদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল, অর্থমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মারা একমাত্র নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য দিল্লির কাছে ‘জি-হুজুর’ করে যাচ্ছেন। অসমবাসীর মনের কথা দিল্লিতে জানানোর সাহস দেখাতে পারছেন না কেউ।’

‘আসু’র সভাপতি দীপাঙ্ক নাথের মতে, ‘সরকারকে বুঝিয়ে দিতে হবে ওই বিল আইনে পরিণত হলে ভয়ঙ্কর অবস্থা হবে এ রাজ্যের! সেজন্য ওই বিল কোনোভাবেই মানা সম্ভব নয়। যদি ‘ক্যাব’-এর মাধ্যমে ৪ লাখ মানুষকেও নাগরিকত্ব দেওয়া হয় তাহলে তা ৪০ লাখ হতে বেশিদিন সময় লাগবে না।’
এদিকে, অসমে ‘ক্যাব’-এর বিরুদ্ধে সিপিএম-সিপিআই, সিপিআই (এমএল), আরসিপিআই, আম আদমি পার্টিসহ ৮ টি বাম ও গণতান্ত্রিক দলের মঞ্চ যৌথভাবে গত সোমবার অবস্থান ধর্মঘট পালন করেছে।
অসমে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক দেবেন ভট্টাচার্য বলেন, ‘সংসদে যে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল আনার চেষ্টা করছে তা সম্পূর্ণ অসম বিরোধী ও অসাংবিধানিক।’
অন্যদিকে, নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের বিরুদ্ধে অসমের পাশাপাশি মণিপুর, নাগাল্যান্ড, মেঘালয়েও তুমুল বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। সোমবার থেকে এসব রাজ্যে বিভিন্ন সংগঠন রাস্তায় নেমে ধর্না-অবস্থান, বিক্ষোভ শুরু করেছে। অসমসহ গোটা উত্তর-পূর্ব ভারতের আন্দোলনকারীদের দাবি, কোনও ধর্মীয় চিহ্ন নয়, অনুপ্রবেশকারী হলেই তাদের বিতাড়িত করতে হবে। এক্ষেত্রে হিন্দু, মুসলিম কোনও বিভাজন করা চলবে না। নাগরিকত্ব আইন সংশোধিত হলে উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রকৃত বাসিন্দারা অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়বে বলে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ।

এরইমধ্যে উত্তর-পূর্বভারতের সাতটি রাজ্যের ছাত্র ইউনিয়নের সম্মিলিত সংগঠন নর্থ ইস্ট স্টুডেন্টস অর্গানাইজেশন (নেসো) সাত রাজ্যজুড়ে ‘ক্যাব’-এর বিরুদ্ধে আন্দোলনের ডাক দিয়েছে। কৃষক মুক্তি সংগ্রাম সমিতি, জাতীয়তাবাদী যুব ছাত্র পরিষদ, বামপন্থী প্রগতিশীল মোর্চাও ওই আন্দোলনে শামিল হয়েছে।
আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, বিজেপি ক্ষমতায় আসার আগে এতকাল ধরে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের’ বিতাড়িত করে উত্তর-পূর্ব ভারতের সব রাজ্যের জনজাতিদের নিজস্ব সংস্কৃতি, ভাষা ও জীবিকার সুযোগ সুবিধা রক্ষার দাবিকে সমর্থন করে এসেছে। কিন্তু আজ সেই বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরে ‘ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতি’র কারণে বৈধ নাগরিকত্ব ইস্যুকে ‘ধর্মীয় দৃষ্টিকোণে’ পর্যবসিত করে আসল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হচ্ছে।#
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল পাসের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান থেকে আসা হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন, খ্রিস্টানদের এদেশে শরণার্থীর মর্যাদা ও তাদের নাগরিকত্ব দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ দেশে এভাবে ধর্মীয়ভিত্তিতে নাগরিকত্ব দেয়ার চেষ্টার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মহল থেকে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে।
পার্সটুডে/এমএএইচ/এআর/২০
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।