ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন:
ইরান কীভাবে বহির্বিশ্বের সাথে সন্ত্রাসীদের যোগাযোগ নেটওয়ার্ক ভেঙে দিয়েছে?
-
ইরানে সাম্প্রতিক অস্থিরতার সময় একটি সন্ত্রাসী যোগাযোগ নেটওয়ার্কের অস্তিত্ব
পার্সটুডে-২০২৬ সালের জানুয়ারীতে অস্থিরতার সময় ইরান ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে বহির্বিশ্বের সাথে সন্ত্রাসীদের যোগাযোগ নেটওয়ার্ক ব্যাহত করতে সক্ষম হয়েছে।
পার্সটুডে আরও জানায়, নৈরাজ্য মোকাবেলায় ইরানের অভিজ্ঞতা, সেইসাথে অন্যান্য দেশের গৃহীত অনুরূপ পদক্ষেপগুলো প্রমাণ করে সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে ইন্টারনেট সাময়িকভাবে সীমাবদ্ধ করা সন্ত্রাসবাদের ডিজিটাল স্পেস দমন করতে এবং বিদেশী সরকার ও গোয়েন্দা সংস্থার সাথে তাদের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে একটি প্রয়োজনীয়, দায়িত্বশীল ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। তীব্র নিরাপত্তা সংকট, সশস্ত্র বিদ্রোহ বা সন্ত্রাসী হামলার সময় ইন্টারনেট সীমাবদ্ধ করা বা বিচ্ছিন্ন করার বিশ্বব্যাপী একটি উল্লেখযোগ্য ইতিহাস রয়েছে। বিভিন্ন দেশ এমনকি পশ্চিমা দেশগুলোতেও, জাতীয় শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য জরুরি হাতিয়ার হিসেবে এটি ব্যবহার হয়ে আসছে।
এ প্রসঙ্গে, ২০২৬ সালের জানুয়ারীর অস্থিরতার সময় ইরানে ইন্টারনেট বন্ধ করা কেবল একটি প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্ত ছিল না বরং এটি ছিল একটি বৃহত্তর নিরাপত্তা কৌশলের অংশ যা সংগঠিত ধ্বংসাত্মক নেটওয়ার্ক এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলিকে ব্যাহত করার জন্য পরিচালিত হয়েছিল যারা অনলাইন যোগাযোগ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অপারেশন সমন্বয়, নির্দেশাবলী গ্রহণ এবং বিদেশে তথ্য প্রেরণ করে। ঘটনাক্রম পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে সেই সময়ে ইন্টারনেট বন্ধ করা কেবল বিক্ষোভের প্রতিক্রিয়া ছিল না, বরং সেই নেটওয়ার্কগুলোর যোগাযোগের শিরা-উপশিরাগুলো কেটে ফেলার জন্য একটি মোক্ষম ব্যবস্থা। ২০২৬ সালের জানুয়ারী অস্থিরতার সময়, প্রতিরক্ষা প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল যে সমন্বয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এনক্রিপ্ট করা বার্তাবাহক, বহিরাগত প্ল্যাটফর্ম এবং দেশের বাইরে থেকে পরিচালিত চ্যানেলগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছিল। এই চ্যানেলগুলো কেবল তথ্য প্রচারের ভূমিকাই পালন করে নি বরং ফিল্ড কমান্ড এবং নিয়ন্ত্রণের ভূমিকাও পালন করেছিল। মোলোটভ ককটেল কীভাবে তৈরি করতে হয়, কীভাবে সরকারী কেন্দ্রগুলোতে আক্রমণ করতে হয়, সমাবেশ রুট, ক্যামেরা ব্লাইন্ড স্পট এবং এমনকি অভিযানের সময় নির্ধারণের মতো নির্দেশাবলী এই নেটওয়ার্কগুলোর মাধ্যমে প্রেরণ করা হয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে, ইন্টারনেট দেশীয় উপাদান এবং বিদেশী অপারেশন রুমের মধ্যে যোগাযোগের একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছিল।
নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে, এই পরিস্থিতি "সাইবার সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক"-এর মডেলের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ; এমন একটি নেটওয়ার্ক যেখানে ছোট এবং ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা দেশীয় ব্যক্তি এবং বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠি, মিডিয়া, আর্থিক এবং বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দ্বারা পরিচালিত এবং সমর্থিত, নাগরিক প্রতিবাদের বাইরেও এমন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। এই পরিস্থিতিতে, ইন্টারনেট বন্ধ করা ছিল সহিংসতার বিস্তার রোধ এবং বিদেশে অপারেশনাল ডেটা প্রেরণ রোধ করার একটি ব্যবস্থা।
ইরানে, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ইন্টারনেট বন্ধ পর্যায়ক্রমে এবং লক্ষ্যবস্তু পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে, অপারেশন পরিচালনায় সর্বাধিক ভূমিকা পালনকারী প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। তারপর, সহিংসতা তীব্র হওয়ার সাথে সাথে সশস্ত্র ব্যক্তি এবং দলগুলো প্রবেশ করার সাথে সাথে, বিদেশী অপারেশন রুমগুলোতে ছবি, অবস্থান এবং রিয়েল-টাইম প্রতিবেদন পাঠানোর সম্ভাবনা দূর করার জন্য বিধিনিষেধ বাড়ানো হয়েছিল। এই পদক্ষেপ সংগঠিত গোষ্ঠীগুলোর যোগাযোগ নেটওয়ার্কে গুরুতর ব্যাঘাত ঘটায়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পূর্বে পরিচালিত অনেক সমন্বয় সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায় এবং বহিরাগত নির্দেশনার ওপর নির্ভরশীল ছোট অভ্যন্তরীণ দলগুলো তাদের অপারেশনাল ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
এই পদক্ষেপের সাফল্যের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল অনলাইন যোগাযোগের ওপর ধ্বংসাত্মক নেটওয়ার্কগুলোর শক্তিশালী নির্ভরতা। ক্লাসিক আন্ডারগ্রাউন্ড গ্রুপগুলোর মতো নয় যাদের একটি শ্রেণিবদ্ধ কাঠামো এবং গোপন যোগাযোগ রয়েছে, নতুন নেটওয়ার্কগুলো মূলত সাইবারস্পেসের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে এবং বহিরাগত উৎসের সাথে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ ছাড়া স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখে না। ইন্টারনেট বন্ধের ফলে এই সুবিধাটি কেড়ে নেওয়া হয়েছে এবং অনেক কার্যক্রম অসম্পূর্ণ থেকে গেছে বা একেবারেই শুরু হয় নি।
অন্যদিকে, ইন্টারনেট বন্ধের ফলে ভুয়া খবর, জাল ছবি এবং নির্দেশিত বর্ণনার ব্যাপক প্রচারের সম্ভাবনাও কমে গেছে। অস্থিরতার প্রাথমিক দিনগুলোতে, সহিংসতা উস্কে দেওয়ার এবং জনসাধারণের মাঝে ভয় সৃষ্টি করার লক্ষ্যে প্রচুর পরিমাণে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল। ইন্টারনেট সীমাবদ্ধ করার মাধ্যমে, এই প্রবণতাটিও মূলত নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে এবং দেশীয় মিডিয়া সঠিক বর্ণনা উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ইন্টারনেট বন্ধও একটি নিরাপত্তা কৌশলের অংশ ছিল যার লক্ষ্য ছিল অস্থিরতাকে একটি পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা সংকটে পরিণত হওয়া থেকে বিরত রাখা। যদিও এই পদক্ষেপটি অসুবিধা তৈরি করেছিল, জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে এটি তাদের বিদেশী পৃষ্ঠপোষকদের সাথে ধ্বংসাত্মক নেটওয়ার্কগুলোর সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে এবং তাদের কমান্ড কাঠামো ভেঙে দেয়।
পরিশেষে, এটা বলা উচিত যে সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী হামলা এবং অন্যান্য দেশে অনুরূপ পদক্ষেপ মোকাবেলায় ইরানের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে, সন্ত্রাসীরা যেখানে সাইবারস্পেস এবং ডিজিটাল স্পেস ব্যবহার করে সহিংসতা সমন্বয়, প্রচার এবং বৃদ্ধি করে, সেখানে অস্থায়ী ইন্টারনেট বিধিনিষেধ একটি প্রয়োজনীয়, দায়িত্বশীল এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হতে পারে। এই ব্যবস্থার চূড়ান্ত লক্ষ্য বৈধ স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ করা নয় বরং শত্রুর চক্রান্ত ব্যর্থ করা, জনসাধারণের সম্পত্তি রক্ষা করা এবং নিরীহ মানুষের জীবন বাঁচানো।#
পার্সটুডে/এনএম/২৬
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন