মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত হানতে সক্ষম ইরানের কৌশলগত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র 'রা'দ-৭০০'
https://parstoday.ir/bn/news/iran-i159798-মার্কিন_ঘাঁটিতে_আঘাত_হানতে_সক্ষম_ইরানের_কৌশলগত_ব্যালিস্টিক_ক্ষেপণাস্ত্র_'রা'দ_৭০০'
পার্সটুডে: ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) অ্যারোস্পেস ফোর্স মার্কিন ও ইহুদিবাদী শত্রুদের বিরুদ্ধে 'তৃতীয় চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ' অর্থাৎ রমজান যুদ্ধের সময় বিভিন্ন ধরণের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে এবং তাদের ওপর মারাত্মক আঘাত হেনেছে।
(last modified 2026-05-29T11:29:01+00:00 )
মে ২৯, ২০২৬ ১৭:১৫ Asia/Dhaka
  • ইরানের কৌশলগত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র 'রা'দ-৭০০'
    ইরানের কৌশলগত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র 'রা'দ-৭০০'

পার্সটুডে: ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) অ্যারোস্পেস ফোর্স মার্কিন ও ইহুদিবাদী শত্রুদের বিরুদ্ধে 'তৃতীয় চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ' অর্থাৎ রমজান যুদ্ধের সময় বিভিন্ন ধরণের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে এবং তাদের ওপর মারাত্মক আঘাত হেনেছে।

পার্সটুডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আইআরজিসি'র অ্যারোস্পেস ফোর্সের বহরে যুক্ত হওয়া এবং কার্যকর হওয়া ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর একটি হলো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র 'রা'দ-৫০০' (জুহাইর-১)। বর্তমানে নিখুঁত লক্ষ্যভেদী কৌশলগত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের উন্নয়নের ক্ষেত্রে এক নতুন মাইলফলক হিসেবে সামনে এসেছে আধুনিক ও কার্যক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র 'রা'দ-৭০০' (জুহাইর-২)।

একটি সামগ্রিক পর্যালোচনা

রা'দ-৫০০ (জুহাইর-১) এবং বর্তমানে রা'দ-৭০০ (জুহাইর-২) ক্ষেপণাস্ত্রের উন্নয়নের মধ্য দিয়ে মনে হচ্ছে যে, ফাতেহ ক্লাসের (ফাতেহ-১১০, ফাতেহ-৩১৩ এবং জুলফিকার) স্ট্রাইক ক্ষেপণাস্ত্র পরিবারের যাত্রা শেষের পথে। এই ক্ষেপণাস্ত্র সিরিজটিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শিল্পের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ হাসান তেহরানি-মোকাদ্দামের এক চিরস্থায়ী ঐতিহ্য হিসেবে স্মরণ করা হয়, যা বছরের পর বছর ধরে ইরানের নিখুঁত লক্ষ্যভেদী ক্ষেপণাস্ত্র ক্ষমতার মূল ভিত্তি ছিল।

এখন এই অভিজ্ঞ প্রজন্মটি তাদের জায়গা ছেড়ে দিয়েছে আরও আধুনিক নকশা ও উন্নত প্রযুক্তির একটি নতুন ক্ষেপণাস্ত্রের কাছে এবং এটি এখন আর কারখানার উৎপাদন লাইনে নেই। এই ক্ষেপণাস্ত্রের নাম রা'দ-৫০০ বা জুহাইর-১; যা শহীদ তেহরানি-মোকাদ্দামের শুরু করা পথেরই একটি বড় অগ্রগতি  এবং আজ তা হালকা, দ্রুত ও নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্রের নতুন প্রজন্মের হাত ধরে এগিয়ে চলেছে।

রা'দ-৫০০ (জুহাইর-১) হলো উপযুক্ত পাল্লা, উচ্চ নির্মাণ গুণমান, ছোট আকৃতি, শক্তিশালী ওয়ারহেড এবং অসাধারণ চালচলন বা ম্যানুভারেবিলিটি সম্পন্ন একটি ক্ষেপণাস্ত্র, যা কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্রের পরিবারে এক নতুন মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে। ৫০০ কিলোমিটার পাল্লা এবং ছোট ও কমপ্যাক্ট আকারের কারণে এটিকে যথাযথভাবেই ইরানের কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্রের নতুন প্রজন্ম বলা যেতে পারে; এমন এক প্রজন্ম যা আগের মডেলগুলোর চেয়ে অনেক হালকা, উন্নত এবং কার্যকর।

রা'দ-৫০০ ক্ষেপণাস্ত্রটি তার সুবিধাজনক আকারের কারণে 'টুইন-লঞ্চার' (একসাথে দুটি বহনকারী যান) এর ওপর বহন করা যায় এবং নিকট ভবিষ্যতে এর তিন ও চার ক্ষেপণাস্ত্র বিশিষ্ট সংস্করণও কল্পনা করা সম্ভব। এটি দেখায় যে, ক্ষেপণাস্ত্রটির নতুন নকশা এর পরিবহন ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে কতটা অপ্টিমাইজড বা কার্যকর হয়েছে।

প্রযুক্তিগত দিক থেকে, রা'দ-৫০০ তার আগের প্রজন্মের তুলনায় উচ্চ নির্মাণ গুণমান এবং অসাধারণ চালচলন ক্ষমতার অধিকারী। তৃতীয় চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে এর কার্যকারিতা বিষয়টি প্রমাণ করেছে; যেখানে এটি নিজস্ব জটিল এবং বুদ্ধিমান ফ্লাইট প্রোফাইলের ওপর নির্ভর করে মার্কিন প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সফল পারফরম্যান্স দেখিয়েছে এবং বেশিরভাগ লড়াইয়ে আধিপত্য বজায় রেখেছে।

রা'দ-৫০০ এর বৈশিষ্ট্যসমূহ

এই ক্ষেপণাস্ত্রটি নতুন প্রজন্মের প্রপালশন সিস্টেম এবং কম্পোজিট উপাদান ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। এতে কার্বন ফাইবার প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যা প্রায় ১০০ বার চাপ সহ্য করতে পারে এবং প্রায় ৩০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা পর্যন্ত স্থিতিশীল থাকতে সক্ষম।

রা'দ-৫০০ হলো একটি নতুন প্রজন্মের ক্ষেপণাস্ত্র যা ইস্পাতের বডি বিশিষ্ট ফাতেহ-১১০ ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় অর্ধেক ওজনের, কিন্তু এর পাল্লা অনেক বেশি। ফাতেহ পরিবারের প্রচলিত মডেলগুলোর তুলনায় রা'দ-৫০০ এর ওজন ৫০% হ্রাস পেলেও, এর পাল্লা ২০০ কিলোমিটার বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৫০০ কিলোমিটারে উন্নীত হয়েছে।

এই ক্ষেপণাস্ত্রে পূর্ববর্তী প্রজন্মের ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে আরও উন্নত বিস্ফোরক ব্যবহারের কারণে ওয়ারহেডের ওজন কম হলেও, এর কার্যকারিতা ফাতেহ পরিবারের ৪৫০ কেজি ওজনের ওয়ারহেডের সমান। রা'দ-৫০০ ক্ষেপণাস্ত্রে প্রায় ১২০ কেজি বিস্ফোরক রয়েছে এবং এর ওয়ারহেডটি উচ্চ-বিস্ফোরক ফ্র্যাগমেন্টেশন   ধরণের, যার মোট ভর সম্ভবত ২০০ থেকে ২৫০ কেজির কাছাকাছি।

রা'দ-৫০০ ক্ষেপণাস্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং মূল বিষয় হলো এর নির্মাণে উন্নত প্রযুক্তি ও উপাদানের ব্যবহার। কারণ এই ক্ষেপণাস্ত্রটি কেবল বডির ক্ষেত্রে নয়, বরং এর প্রোপালশন সিস্টেমের ক্ষেত্রেও "জুহাইর" কম্পোজিট প্রোপালশনে সজ্জিত। এভাবে ইঞ্জিন এবং বডি উভয় ক্ষেত্রেই কার্বন ফাইবার প্রযুক্তির কম্পোজিট উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে, যা ফাতেহ-১১০ পরিবারের অন্যান্য মডেলের তুলনায় এই ক্ষেপণাস্ত্রের ওজন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করেছে। প্রতিরক্ষা শিল্পের ঘোষণা অনুযায়ী, ইরান ২০১৪ সালেই এই প্রযুক্তি অর্জন করেছে।

রা'দ-৭০০ (জুহাইর-২)-এর বৈশিষ্ট্যসমূহ

তবে রা'দ-৫০০ (জুহাইর-১) এই পরিবারের একমাত্র সদস্য নয়। এর পাশাপাশি একটি উন্নত এবং অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত সংস্করণও রয়েছে—যা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি এবং তথ্যও সীমিতভাবে প্রকাশিত হয়েছে।

রা'দ-৭০০ (জুহাইর-২) কে এর প্রথম প্রজন্ম অর্থাৎ রা'দ-৫০০ এর ওপর ভিত্তি করে একটি গভীর ও ভারী আপগ্রেড বা আধুনিকায়ন হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। ক্ষেপণাস্ত্রটি রা'দ-৫০০ এর মূল কাঠামো বজায় রাখলেও কিছু মূল খুঁটিনাটি বিষয়ে বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে।

এই সংস্করণে সামগ্রিক আকৃতি প্রায় একই রয়েছে; ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যাস আগের মতোই আছে, বুস্টারের দৈর্ঘ্য পরিবর্তন হয়নি এবং কেবল এর কলার বা ওয়ারহেডটি কিছুটা দীর্ঘায়িত করা হয়েছে। তবে আপাতদৃষ্টিতে ছোট এই পরিবর্তনটি, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের সাথে মিলে ক্ষেপণাস্ত্রের পুরো চরিত্রকে সম্পূর্ণরূপে বদলে দিয়েছে:

জুহাইর-২ এর ওয়ারহেডে একটি ছোট সলিড-ফুয়েল (কঠিন জ্বালানি) মোটর যুক্ত করা হয়েছে; এমন একটি বৈশিষ্ট্য যা এটিকে ইরানের হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। এই আপগ্রেডের ফলে ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ৭০০ কিলোমিটারে পৌঁছেছে; যা এর কমপ্যাক্ট বা ছোট আকৃতির বিবেচনায় একটি দুর্দান্ত প্রকৌশলগত কৃতিত্ব।

আইআরজিসি'র অ্যারোস্পেস ফোর্সের কর্মীদের মাঝে এই ক্ষেপণাস্ত্রটি তার আচরণ এবং উড্ডয়ন শৈলীর মিলের কারণে "ফাত্তাহ কুচুলু" (ছোট ফাত্তাহ) ডাকনামও পেয়েছে। এটি ইরানের হাইপারসনিক পরিবারের অন্যতম কম পরিচিত সদস্য যা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করা হয়নি, তবে যুদ্ধের সাংগঠনিক কাঠামোতে এর উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে এবং প্রথমবারের মতো এর রহস্য উন্মোচন করা হলো।

প্রথম সংস্করণের মতো জুহাইর-২ ক্ষেপণাস্ত্রটিও তৃতীয় চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছিল এবং এটি তিন মিনিটেরও কম সময়ে মার্কিন সেনাদের একটি সমাবেশস্থলে আঘাত হানতে সক্ষম হয়। এই হামলায় নিশ্চিতভাবেই ভারী ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল এবং এটি ক্ষেপণাস্ত্রটির কর্মক্ষমতা চমৎকারভাবে প্রমাণ করেছে।#

পার্সটুডে/এমএআর/২৯