আকাশ প্রতিরক্ষায় ইরানের শক্তি: কাঁধে বহনযোগ্য ‘মিসাক’ ক্ষেপণাস্ত্র
-
কাঁধে বহনযোগ্য বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র
পার্সটুডে– বর্তমান যুগে যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার, ড্রোন এবং অন্যান্য আকাশভিত্তিক হুমকি মোকাবিলা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সশস্ত্র বাহিনীর জন্য ক্রমবর্ধমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত ও কার্যকর আকাশ প্রতিরক্ষার প্রয়োজনীয়তা থেকেই তৈরি হয়েছে কাঁধে বহনযোগ্য বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, যা ইংরেজিতে ম্যানপ্যাডস (MANPADS - Man Portable Air Defense Systems) নামে পরিচিত।
ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্প এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে এবং এমন সব কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে, যেগুলো দ্রুত প্রতিক্রিয়া, উচ্চ নির্ভুলতা এবং বিশেষ প্রযুক্তিগত সক্ষমতার জন্য পরিচিত। এ ধরনের অস্ত্রের অন্যতম সফল উদাহরণ হলো ‘মিসাক’ (Misagh) ক্ষেপণাস্ত্র পরিবার।
মিসাক-১: ইরানের প্রথম প্রজন্মের ম্যানপ্যাড
২০০০-এর দশকের শুরুতে (ইরানি বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী ১৩৮০-এর দশকে) ইরান প্রথমবারের মতো মিসাক-১ নামের কাঁধে বহনযোগ্য বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র উন্মোচন করে।
কিছু বিদেশি সূত্রের দাবি, তেহরানের শহীদ কাকায়ি শিল্প কমপ্লেক্সে তৈরি এই ক্ষেপণাস্ত্রটি চীনের QW-1 Vanguard ক্ষেপণাস্ত্রের একটি উন্নত সংস্করণ।
মিসাক-১ একটি ইনফ্রারেড-নির্দেশিত বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। এর বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
দৈর্ঘ্য: ১.৫ মিটার
সর্বনিম্ন পাল্লা: ৫০০ মিটার
সর্বোচ্চ পাল্লা: ৫ কিলোমিটার
কার্যকর উচ্চতা: ৩০ মিটার থেকে ৪ হাজার মিটার
গতি: প্রতি সেকেন্ডে ৬০০ মিটার
মোট ওজন: ১৬.৮ কেজি
ওয়ারহেডের ওজন: ১.৪২ কেজি
মিসাক-১-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর বিস্তৃত তাপমাত্রা সহনশীলতা। এটি মাইনাস ৪০ ডিগ্রি থেকে প্লাস ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পরিবেশে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়।
এছাড়া এতে “ফায়ার অ্যান্ড ফরগেট” প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের পর অপারেটরকে আর লক্ষ্যবস্তু নিয়ন্ত্রণ করতে হয় না, ফলে সে দ্রুত স্থান পরিবর্তন করতে পারে এবং শত্রুর পাল্টা হামলার ঝুঁকি কমে যায়।
মিসাক-২: অধিক গতিশীল ও উন্নত সংস্করণ
২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে (বাহমান ১৩৮৪) মিসাক-২ ক্ষেপণাস্ত্রের গণউৎপাদন শুরু হয়।
এটি মিসাক-১-এর উন্নত সংস্করণ হিসেবে তৈরি করা হয়। এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন ছিল ইনফ্রারেড অনুসন্ধান ব্যবস্থার সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি, যাতে কম তাপ বিকিরণকারী লক্ষ্যবস্তু—বিশেষ করে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র—আরও সহজে শনাক্ত করা যায়।
মিসাক-২-এর প্রধান বৈশিষ্ট্য:
পাল্লা: ৫ কিলোমিটার
কার্যকর উচ্চতা: ৪ কিলোমিটার
গতি: ৮৫০ মিটার/সেকেন্ড
সর্বোচ্চ গতি: ২.৭ মাখের বেশি
ওয়ারহেড: প্রায় ১ কেজি
এই ক্ষেপণাস্ত্র ৬০ ডিগ্রি কোণ পর্যন্ত দ্রুত ঘুরতে পারে এবং ইলেকট্রনিক জ্যামিং (ECM) প্রতিরোধে সক্ষম।
মিসাক-২-এর অত্যন্ত উচ্চ গতি শত্রুপক্ষকে প্রতিক্রিয়া জানানোর সুযোগ প্রায় দেয় না। সর্বোচ্চ ৫ কিলোমিটার দূরত্বের লক্ষ্যবস্তুতে এটি ৮ সেকেন্ডেরও কম সময়ে আঘাত হানতে সক্ষম।
এছাড়া এটি মিসাক-১-এর তুলনায় হালকা হওয়ায় যুদ্ধক্ষেত্রে বহন ও মোতায়েন আরও সহজ।
মিসাক-৩: আরও উন্নত ও প্রাণঘাতী প্রযুক্তি
২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে (বাহমান ১৩৯৫) ইরান মিসাক-৩ ক্ষেপণাস্ত্র উন্মোচন করে এবং এর উৎপাদন লাইন চালু হয়।
এটি মিসাক-২-এর আরও উন্নত সংস্করণ।
প্রধান বৈশিষ্ট্য:
পাল্লা: ৫ কিলোমিটার
সর্বোচ্চ উচ্চতা: ৩,৫০০ মিটার
ওয়ারহেড: ১ কেজি উচ্চ-বিস্ফোরক
বাহ্যিকভাবে মিসাক-৩ আগের সংস্করণগুলোর মতোই হলেও এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন হলো নতুন ধরনের লেজার প্রক্সিমিটি ফিউজ।
এই ব্যবস্থায় ক্ষেপণাস্ত্রের ভেতরে থাকা লেজার উৎস চারদিকে ৩৬০ ডিগ্রি কোণে রশ্মি ছড়ায়। লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি পৌঁছালে প্রতিফলিত লেজার সংকেত শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওয়ারহেড বিস্ফোরিত হয়।
ফলে লক্ষ্যবস্তু সরাসরি আঘাত না করলেও তার কাছাকাছি বিস্ফোরণের মাধ্যমে ধ্বংস করা সম্ভব হয়।
এই প্রযুক্তি বিশেষ করে নিম্ন-উচ্চতায় উড়ন্ত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, হেলিকপ্টার এবং যুদ্ধবিমানের বিরুদ্ধে কার্যকারিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়।
মোবাইল প্ল্যাটফর্মে মিসাক ক্ষেপণাস্ত্র
২০২১ সালের মার্চ মাসে ইরানের তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফের উপস্থিতিতে উন্নত কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন লাইন উদ্বোধন করা হয়।
সেই অনুষ্ঠানে একটি নতুন মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্র প্ল্যাটফর্মও প্রদর্শন করা হয়, যা সম্ভবত মিসাক-৩ বা এর উন্নত সংস্করণ বহনের জন্য তৈরি।
এই ব্যবস্থায়:
একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র একটি যানবাহনের ওপর স্থাপন করা হয়।
উন্নত লক্ষ্যনির্ধারণ ব্যবস্থা সংযুক্ত থাকে।
মানব অপারেটরের কাঁধে বহনের প্রয়োজনীয়তা কমে যায়।
একই সঙ্গে বেশি সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র বহন ও নিক্ষেপ করা সম্ভব হয়।
এর ফলে:
প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
জনবল কম লাগে।
পরিচালন ব্যয় কমে।
হামলার শিকার হলেও মানবিক ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস পায়।
নিম্ন-উচ্চতার আকাশ প্রতিরক্ষায় একটি দ্রুতগতির মোবাইল স্তর যুক্ত হয়।
উপসংহার
মিসাক ক্ষেপণাস্ত্র পরিবার ইরানের স্বল্প-পাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মিসাক-১ থেকে মিসাক-৩ পর্যন্ত প্রতিটি সংস্করণে লক্ষ্য শনাক্তকরণ, গতি, নির্ভুলতা এবং প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ড্রোন, হেলিকপ্টার, যুদ্ধবিমান এবং ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মতো নিম্ন-উচ্চতার আকাশীয় হুমকি মোকাবিলায় এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী করেছে।
পার্সটুডে/এমবিএ/৮
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।