"তুমি ইউসুফ হবে": কারাগারের স্বপ্ন যেভাবে হয়ে উঠল ইতিহাস
-
জামেরান হুসাইনিয়া, ১৯৮১। ইমাম খোমেনির উপস্থিতিতে বক্তব্য রাখছেন সাইয়্যেদ আলী খামেনি।
আশরাফুর রহমান: ১৯৬৭ সালের এক রাত। তেহরানের নীরব পরিবেশে ঘুমিয়ে ছিলেন তরুণ আলেম সাইয়্যেদ আলী খামেনি। তখন তিনি ছিলেন শাহের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ইসলামী আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী। রাজনৈতিক সংগ্রাম, গোপন তৎপরতা, গ্রেপ্তার, কারাবরণ ও নির্যাতন তখন তাঁর জীবনের অংশ হয়ে উঠেছিল।
সেই রাতের একটি স্বপ্ন বহু বছর পর তাঁর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। তিনি স্বপ্নে দেখলেন, ইসলামী বিপ্লবের নেতা ইমাম রুহুল্লাহ খোমেনি ইন্তেকাল করেছেন। মানুষজন তাঁর কফিন কাঁধে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। বিশাল জনতা কান্না ও আহাজারি করতে করতে কফিনের পেছনে হাঁটছে। কিন্তু কফিনটি যত শহরের বাইরে যেতে থাকে, মানুষের সংখ্যা তত কমতে থাকে। একসময় কয়েকজন মানুষ ছাড়া আর কেউ থাকে না।
কফিনটি একটি উঁচু স্থানে রাখা হয়। তিনি সামনে এগিয়ে গিয়ে দেখেন, এটি ইমাম খোমেনির কফিন। হঠাৎ কফিনের ভেতর থেকে ইমাম খোমেনি উঠে বসলেন। এরপর আমার দিকে তাকালেন এবং আঙুল দিয়ে আমার কপালে ইশারা করে বললেন: 'তুমি ইউসুফ হবে।'
এরপরই তাঁর ঘুম ভেঙে যায়। তখন তিনি এই স্বপ্নের অর্থ বুঝতে পারেননি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর জীবনের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে এই স্বপ্নকে অনেকে একটি প্রতীকী বার্তা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
ইমাম রুহুল্লাহ মুসাভি খোমেনি (রহ.) ছিলেন ইরানের ইসলামী বিপ্লবের প্রধান নেতা, যিনি শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রামের নেতৃত্ব দেন। নির্বাসন, রাজনৈতিক নিপীড়ন ও আন্দোলনের বহু বছর পর ১৯৭৯ সালে তাঁর নেতৃত্বে ইরানে ইসলামী বিপ্লব সংঘটিত হয়। খামেনি ছিলেন সেই আন্দোলনের অন্যতম সক্রিয় কর্মী। শাহের গোয়েন্দা সংস্থা সাভাকের নজরদারি, গ্রেপ্তার ও কারাবাস তাঁর জীবনের নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। এই সংগ্রামের সময়ই ঘটে সেই স্বপ্নের ঘটনা, যা পরে তাঁর জীবনের সঙ্গে নতুনভাবে যুক্ত হয়।
কারাগারে “তুমি ইউসুফ হবে” স্বপ্নের পুনরাবির্ভাব
১৯৭০ সালের দিকে সাভাক (শাহ’র গুপ্তচর সংস্থা) তাঁকে গ্রেপ্তার করে মাশহাদের কারাগারে পাঠায়। সেখানে তাঁর সঙ্গে ছিলেন হুজ্জাতুল ইসলাম জাওয়াদ হাফেজি। হাফেজির বর্ণনা অনুযায়ী, একদিন দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর খামেনি কারাগারে ফিরে আসেন। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত তাঁকে জেরা করা হয়েছিল। ক্লান্ত অবস্থায় ফিরে এসে তিনি নামাজ আদায় করেন। পরে তাঁরা একসঙ্গে খাবার খেতে বসেন।
সেই সময় খামেনি বলেন, “আমার বিরুদ্ধে যে মামলা তৈরি করা হয়েছে, তা খুবই গুরুতর। আমার মনে হচ্ছে তারা আমাকে দীর্ঘদিন কারাগারে রাখতে চায়।”
এর পরপরই তিনি তাঁর সেই স্বপ্নের কথা হাফেজিকে বলেন। তিনি জানান, স্বপ্নে তিনি দেখেছিলেন কফিন থেকে ইমাম খোমেনির উঠে বসা এবং সেই রহস্যময় বাক্য: “তুমি ইউসুফ হবে।”
হাফেজি তখন তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, হযরত ইউসুফ (আ.)-ও অন্যায়ভাবে কারাগারে গিয়েছিলেন, কিন্তু পরে তিনি মর্যাদা ও সম্মানের উচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছিলেন। বহু বছর পর হাফেজি মনে করেন, এই স্বপ্নের পূর্ণ ব্যাখ্যা হয়েছিল ১৯৮৯ সালে ইমাম খোমেনির ইন্তেকালের পর, যখন খামেনি ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হন। হযরত ইউসুফের মতোই তাঁকে আজীবন ঘরের মানুষ ও বাইরের শত্রুর নানামুখী চক্রান্ত, একাকীত্ব ও কঠিন পরীক্ষা পেরিয়েই বিপ্লবের হাল ধরে রাখতে হয়েছিল।
দ্বিতীয় স্বপ্ন: মিনারের চূড়া থেকে আকাশের পথে
খামেনির কারাসঙ্গীদের একজন আরেকটি স্বপ্নের কথা তাঁকে জানিয়েছিলেন। তিনি বলেন, স্বপ্নে তিনি দেখেছেন যে, তিনি খামেনির সঙ্গে রেই শহরের হযরত আবদুল আজিম হাসানি (আ.)-এর মাজারে গিয়েছেন। সেখানে খামেনি একটি উঁচু মিনারের দিকে তাকিয়ে বলেন: “আমি এই মিনারের চূড়ায় উঠতে চাই।”
কারাসঙ্গী বলেন: “এটা অসম্ভব।”
খামেনি উত্তর দেন: “না, সম্ভব।”
এরপর তিনি দেখেন, খামেনি মাটি থেকে ওপরে উঠে মিনারের সর্বোচ্চ স্থানে পৌঁছে গেছেন। সেখান থেকে হাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছেন। এরপর তিনি আরও ওপরে উঠতে থাকেন, যেন আকাশে উড়ে যাচ্ছেন।
স্বপ্নের কথা শুনে খামেনি বলেছিলেন: “আমি মনে করেছিলাম এর ব্যাখ্যা হয়তো শাহাদাত।” কিন্তু পরে তিনি বলেন: “এর ব্যাখ্যা ছিল মুক্তি। কারণ কয়েক দিন পরই আমি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন।”
তবে আধ্যাত্মিক ভাবুকদের মতে, মাজারের চূড়া থেকে আকাশের বুকে বিলীন হওয়ার এই রূপকটি ছিল মূলত তাঁর জীবনের অন্তিম নিয়তি ও শাহাদাতেরই এক প্রচ্ছন্ন আধ্যাত্মিক ইশারা।
শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষা: ক্ষমতার আড়ালে এক আধ্যাত্মিক জীবন
রাজনৈতিক নেতৃত্বের সর্বোচ্চ পর্যায়ে থেকেও খামেনির জীবন ছিল গভীর আধ্যাত্মিক অনুশীলনে পরিপূর্ণ। তাঁর বক্তব্য, দোয়া ও মোনাজাতে বারবার প্রকাশ পেয়েছে আল্লাহর পথে আত্মত্যাগ তথা শাহাদতের আকাঙ্ক্ষা। কারাবাস, নির্বাসন ও একাধিক হত্যাচেষ্টার মধ্যেও তিনি নিজের পথ থেকে বিচ্যুত হননি। শহীদ পরিবারের সদস্যরা তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলে তিনি তাঁদের কাছে নিজের জন্যও শাহাদাতের দোয়া করতে বলতেন।
বিশেষ করে জেনারেল কাসেম সোলাইমানির শাহাদাতের পর এক জনসভায় হাত তুলে আল্লাহর দরবারে কেঁদে কেঁদে তিনি যে মোনাজাত করেছিলেন, তা আজ কোটি ইরানির হৃদয়ে কাঁপন ধরায়:
"হে আল্লাহ! আমার এই জীর্ণ শরীর, হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত আমার এই অবশ হাত এবং আমার এই তুচ্ছ জীবনকে আপনার রাস্তায় শহীদ হিসেবে কবুল করুন। আমাকে শহীদদের কাফেলা থেকে পৃথক রাখবেন না।"
১৯৮১ সালের রক্তাক্ত জুন: মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা
১৯৮১ সালের ২৭ জুন। দক্ষিণ তেহরানের আবুযার মসজিদে যোহরের নামাজের পর বক্তব্য দিচ্ছিলেন সাইয়্যেদ আলী খামেনি। তখন তিনি ছিলেন তেহরানের জুমা নামাজের খতিব, ইমাম খোমেনির প্রতিনিধি এবং ইরানের সংসদ সদস্য। তিনি মুসল্লিদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন। তাঁর বক্তব্য কয়েকটি রেকর্ডারে ধারণ করা হচ্ছিল। কিন্তু একটি রেকর্ডারের ভেতরে লুকানো ছিল বিস্ফোরক।
দুপুরের দিকে হঠাৎ ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। মুহূর্তেই মসজিদের পরিবেশ বদলে যায় এবং খামেনি গুরুতর আহত হন। তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকদের দীর্ঘ প্রচেষ্টা, জটিল অস্ত্রোপচার ও বিপুল পরিমাণ রক্ত দেওয়ার পর তাঁর জীবন রক্ষা পায়।
বিস্ফোরণে তাঁর ডান কাঁধ, বুক ও ফুসফুস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ডান হাতের স্নায়ু ও রক্তনালীর ক্ষতির কারণে পরবর্তী জীবনে তাঁর হাত প্রায় অচল হয়ে যায়। কিন্তু এই আঘাত তাঁর মনোবল ভাঙতে পারেনি।
হামলার পর নিজের অনুভূতি বর্ণনা করতে গিয়ে খামেনি বলেন:
“আমি যখন বিস্ফোরণের পর মাটিতে পড়ে গেলাম, বুঝতে পারিনি কীভাবে পড়েছি। কয়েকবার অল্প সময়ের জন্য জ্ঞান ফিরে এসেছিল। এক মুহূর্তে আমি অনুভব করলাম, মৃত্যু আমার সামনে দাঁড়িয়ে। তখন বুঝলাম, মানুষের কাছে আল্লাহ ছাড়া কোনো আশ্রয় নেই। কোনো আমল, কোনো অর্জনই যথেষ্ট নয়, যদি আল্লাহর রহমত না থাকে। আমি ভাবছিলাম, আমার কাজগুলো কি খাঁটি ছিল? আমার মধ্যে কি লোক দেখানোর কিছু ছিল? আমরা ভুলে ভরা মানুষ। আমাদের নিয়ত সবসময় পরিপূর্ণ থাকে না। সেই মুহূর্তে আমি নিজেকে আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানে একটি খড়কুটোর মতো অনুভব করছিলাম। আমি আল্লাহর কাছে বলেছিলাম: ‘হে প্রভু, আপনি জানেন আমি কতটা শূন্য। আপনার রহমত ছাড়া আমার কোনো আশ্রয় নেই।’”
এক বিস্ফোরণ থেকে এক নতুন অধ্যায়
১৯৮১ সালের সেই হামলা খামেনির জীবনে শুধু শারীরিক ক্ষতির ঘটনা ছিল না, বরং তাঁর অনুসারীদের দৃষ্টিতে এটি ছিল আত্মিক উপলব্ধির একটি গভীর মুহূর্ত। হাসপাতাল থেকে ফিরে তিনি আবার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হন। একই বছরের অক্টোবরে তিনি ইরানের তৃতীয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং ১৯৮১ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৯ সালের ৪ জুন ইমাম খোমেনির ইন্তেকালের পর তিনি ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হন।
স্বপ্নের পূর্ণতা: এক দীর্ঘ যাত্রার সমাপ্তি
দীর্ঘ ছয় দশকের সংগ্রাম, কারাবাস, নির্বাসন, সন্ত্রাসী হামলা, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং আধ্যাত্মিক সাধনার পর ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রাসনে আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনি শাহাদাত বরণ করেন। যে মানুষটি সারাজীবন আল্লাহর কাছে শাহাদাত কামনা করেছিলেন, যে মানুষটি শহীদ পরিবারের সদস্যদের কাছে নিজের জন্যও শাহাদাতের দোয়া চাইতেন, শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাঁর সেই আকাঙ্ক্ষা কবুল করেছিলেন।
১০ জুলাই ভোর রাতে মাশহাদে নবীবংশের অষ্টম ইমাম, হযরত ইমাম রেজা (আ.)-এর পবিত্র মাজারে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, সামরিক প্রটোকল এবং কোটি মানুষের অশ্রুসিক্ত উপস্থিতিতে—তাঁকে সমাহিত করা হয়েছে। বিপ্লব, প্রতিরোধ এবং আত্মত্যাগের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়ও যেন গভীর প্রতীকী তাৎপর্য বহন করে।
কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে উচ্চারিত সেই রহস্যময় বাক্য, "তুমি ইউসুফ হবে", আজ তাঁর অনুসারীদের কাছে একটি দীর্ঘ আধ্যাত্মিক যাত্রার পূর্ণতার প্রতীক। একজন তরুণ বিপ্লবী কর্মী থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতৃত্বে পৌঁছানো এবং পরিশেষে শাহাদাতের মর্যাদায় অভিষিক্ত হওয়া—এই দীর্ঘ পথচলা ছিল কারাবাস, রক্তাক্ত হামলা, আত্মত্যাগের আকুলতা এবং বিশ্বাসের এক কঠিন পরীক্ষা।
হয়তো সেই কারণেই তাঁর জীবনের দিকে ফিরে তাকালে অনেকের কাছে মনে হয়, কারাগারের সেই স্বপ্নটি ছিল শুধু ভবিষ্যতের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ইঙ্গিত নয়; বরং ছিল দীর্ঘ পরীক্ষার পর মর্যাদা, ত্যাগ ও আত্মসমর্পণের এক আধ্যাত্মিক পরিণতির পূর্বাভাস। আর মাশহাদের পবিত্র মাটিতে তাঁর পরম শ্রদ্ধায় সমাদৃত ও সমাহিত হওয়ার মধ্য দিয়ে সেই দীর্ঘ যাত্রা যেন ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করল, যেখানে সংগ্রাম, নেতৃত্ব এবং শাহাদাত এক সুতোয় গাঁথা হয়ে রইল।#
লেখক: আইআরআইবি বাংলা বিভাগের সিনিয়র সাংবাদিক
পার্সটুডে/এমএআর/১৪
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।