ইরান কেন নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গঠনের ওপর জোর দিচ্ছে?
https://parstoday.ir/bn/news/iran-i162804-ইরান_কেন_নতুন_আঞ্চলিক_নিরাপত্তা_কাঠামো_গঠনের_ওপর_জোর_দিচ্ছে
পার্সটুডে-স্পিকার কলিবফ বলেন: চীনের পক্ষ থেকে 'অভিন্ন নিরাপত্তা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ' ইরানের মূল নীতিরই প্রতিফলন।
(last modified 2026-09-06T10:58:01+00:00 )
সেপ্টেম্বর ০৫, ২০২৬ ১৮:৩৮ Asia/Dhaka
  • ইরানের সংসদ-স্পিকার মোহাম্মাদ বাকের কলিবফ
    ইরানের সংসদ-স্পিকার মোহাম্মাদ বাকের কলিবফ

পার্সটুডে-স্পিকার কলিবফ বলেন: চীনের পক্ষ থেকে 'অভিন্ন নিরাপত্তা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ' ইরানের মূল নীতিরই প্রতিফলন।

ইরানের সংসদ মজলিসে শুরার স্পিকার এবং চীনবিষয়ক ইরানের বিশেষ প্রতিনিধি মোহাম্মাদ বাকের কলিবফ এক টুইটবার্তায় লিখেছেন, চীনের পক্ষ থেকে 'অভিন্ন নিরাপত্তা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ' সেই মূল নীতিরই প্রতিফলন, যার ওপর ইরানও বহু বছর ধরে জোর দিয়ে আসছে।

পার্সটুডে আরও জানায়, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাম্প্রতিক বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়ে কলিবফ লিখেছেন, অভিন্ন নিরাপত্তা জোরদারের ওপর চীনের গুরুত্বারোপ এমন একটি নীতির প্রতিফলন, যার ওপর ইরানও বহু বছর ধরে জোর দিয়ে আসছে। আঞ্চলিক দেশগুলোকে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেদের হাতেই নির্ধারণ করতে হবে। প্রকৃত স্থিতিশীলতা কেবল একটি 'নতুন ও স্থানীয়ভাবে পরিচালিত নিরাপত্তা কাঠামো' গড়ে তোলার মাধ্যমেই সম্ভব। ইরান এ ক্ষেত্রে প্রস্তুত।

কলিবফের এই বক্তব্যকে শুধু ইরান-চীন সম্পর্কের একটি সাময়িক অবস্থান হিসেবে দেখলে এর গভীর তাৎপর্য বোঝা যাবে না। পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন, বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার পরিবর্তনশীল কাঠামোর প্রেক্ষাপটেও তাঁর বক্তব্যকে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় হলো-আঞ্চলিক নিরাপত্তা যেন আর বহিরাগত শক্তির উপস্থিতি ও হস্তক্ষেপের ওপর নির্ভরশীল না থাকে। বরং সংশ্লিষ্ট দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা কাঠামো নিজেরাই তৈরি ও বাস্তবায়ন করবে। ইরানের পররাষ্ট্রনীতিতে এটি বহুদিনের ‘অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা’ বা নিরাপত্তার স্থানীয়ীকরণ' ধারণারই ধারাবাহিকতা।

চীনের ‘অভিন্ন নিরাপত্তা’ ধারণার সঙ্গে ইরানের এই অবস্থানের যথেষ্ট মিল রয়েছে। বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে একটি দেশের নিরাপত্তা অন্য দেশের অনিরাপত্তার বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত নয়। আঞ্চলিক সমস্যার সমাধানও যতটা সম্ভব সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সংলাপ ও সহযোগিতার মাধ্যমে হওয়া উচিত।

তবে ইরান ও চীনের স্বার্থ ও লক্ষ্য পুরোপুরি অভিন্ন-এমনটি ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। বরং নিরাপত্তা নিয়ে দুই দেশের দৃষ্টিভঙ্গির কিছুটা অভিন্নতা কৌশলগত সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।

‘নতুন নিরাপত্তা কাঠামো’ বলতে শুধু কোনো সামরিক জোট বা নতুন সংগঠন বোঝায় না। এর মধ্যে থাকতে পারে অভিন্ন নিয়মনীতি, আস্থা তৈরির উদ্যোগ, সংকট ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার বিভিন্ন কাঠামো।

পশ্চিম এশিয়া দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ, অস্ত্র প্রতিযোগিতা, বিদেশি হস্তক্ষেপ, রাজনৈতিক সংকট ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় নিরাপত্তা কাঠামো প্রতিষ্ঠার জন্য দেশগুলোকে ‘অন্যের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা’ থেকে ‘অন্যের সঙ্গে নিরাপত্তা’ ধারণার দিকে এগোতে হবে। তবে বাস্তবে এর পথে রয়েছে আদর্শগত পার্থক্য, ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও ঐতিহাসিক অবিশ্বাসের মতো বড় বাধা।

কলিবফের বক্তব্যে ‘দেশগুলোকে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেদের হাতে নিতে হবে’-এই বার্তাটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি মূলত আঞ্চলিক দেশগুলোর নিরাপত্তার জন্য বহিরাগত শক্তির ওপর নির্ভরতার সমালোচনা। ইরানের দৃষ্টিতে পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন ও অন্যান্য বিদেশি শক্তির সামরিক উপস্থিতি দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হলেও তা স্থায়ী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে নি; বরং কিছু ক্ষেত্রে উত্তেজনা ও অনিরাপত্তা বাড়িয়েছে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে কলিবফের বক্তব্যকে একটি বিকল্প আঞ্চলিক নিরাপত্তা মডেলের প্রস্তাব হিসেবে দেখা যায়-যেখানে আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার প্রধান দায়িত্ব নিজেরাই নেবে।

তবে এমন একটি কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নিয়মিত সংলাপ, পারস্পরিক অনধিকার হস্তক্ষেপ না করার নীতি, সংকট মোকাবিলায় যোগাযোগের চ্যানেল, সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা, জ্বালানি ও নৌপথের নিরাপত্তা এবং সম্ভব হলে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের মতো বাস্তব উদ্যোগ।

এ ক্ষেত্রে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান শক্তিগুলোর অংশগ্রহণ ও পারস্পরিক সমঝোতা ছাড়া একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা কঠিন।

সবশেষে কলিবফের ‘ইরান প্রস্তুত’ বক্তব্যটি ইঙ্গিত দেয় যে তেহরান নিজেকে শুধু বিদ্যমান নিরাপত্তা ব্যবস্থার সমালোচক হিসেবে নয়, বরং সম্ভাব্য বিকল্প ব্যবস্থার অন্যতম নির্মাতা হিসেবেও উপস্থাপন করতে চাইছে।

সুতরাং কলিবফের বক্তব্যের গুরুত্ব কোনো নতুন সামরিক জোট ঘোষণায় নয়; বরং পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা ব্যবস্থা একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে-এই ধারণাকে সামনে আনার মধ্যে। ভবিষ্যতে ইরান, গুরুত্বপূর্ণ আরব দেশগুলো এবং চীনের মতো বহিরাগত শক্তির ভূমিকা আঞ্চলিক নিরাপত্তার নতুন সমীকরণে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।#

পার্সটুডে/এনএম/৫

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।