কাজভিনের প্রাচীন বাগেস্তান: জাতিসংঘের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত হাজার বছরের কৃষি ঐতিহ্য
https://parstoday.ir/bn/news/iran-i162924-কাজভিনের_প্রাচীন_বাগেস্তান_জাতিসংঘের_স্বীকৃতিপ্রাপ্ত_হাজার_বছরের_কৃষি_ঐতিহ্য
পার্সটুডে : ইরানের কাজভিন প্রদেশের চারপাশের প্রাচীন কৃষিভূমি 'বাগেস্তান'-এর ইতিহাস হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো। প্রায় ২৭০০ হেক্টর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই প্রাচীন বাগান এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজভিনের মানুষের জীবন, কৃষি ও সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
(last modified 2026-09-08T12:48:04+00:00 )
সেপ্টেম্বর ০৮, ২০২৬ ১৮:৩৭ Asia/Dhaka
  • কাজভিনের প্রাচীন বাগেস্তান
    কাজভিনের প্রাচীন বাগেস্তান

পার্সটুডে : ইরানের কাজভিন প্রদেশের চারপাশের প্রাচীন কৃষিভূমি 'বাগেস্তান'-এর ইতিহাস হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো। প্রায় ২৭০০ হেক্টর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই প্রাচীন বাগান এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজভিনের মানুষের জীবন, কৃষি ও সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

ইরানের উত্তর-পশ্চিমে এবং তেহরান থেকে ১৩০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত কাজভিন শহরটি বেশিরভাগ ভ্রমণপিপাসুদের কাছে ঐতিহাসিক ইমারত ও স্থাপত্যের খনি হিসেবে পরিচিত। তবুও, কাজভিনের এই বাগেস্তান নিজেই শহরটির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ—আঞ্চলিক ও জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন একটি ব্যতিক্রমী সাংস্কৃতিক দৃশ্যপট।

প্রেস টিভির বরাত দিয়ে পার্স টুডে'র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় নিবন্ধিত এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) কর্তৃক স্বীকৃত কাজভিনের বাগেস্তান একসময় শহরটির পূর্ব, দক্ষিণ ও পশ্চিম দিক ঘিরে রেখেছিল এবং এর চারপাশে একটি 'U' আকৃতির সবুজ বেষ্টনী তৈরি করেছিল।

বাদাম ও পেস্তা গাছ এই ঐতিহ্যবাহী উদ্যানের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে, যা এই অঞ্চলের আধা-শুষ্ক জলবায়ুর প্রতিফলন এবং স্থানীয় সম্প্রদায়গুলো কীভাবে পরিবেশগত পরিস্থিতির সাথে তাদের কৃষিপদ্ধতি মানিয়ে নিয়েছে তা ফুটিয়ে তোলে। এই বাগানে আঙুর, এপ্রিকট এবং বাদামও ব্যাপকভাবে চাষ করা হয়।

এই বিশাল সবুজ ঐতিহ্য একসময় স্থানীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ ছিল, যা বর্তমানে শহরের 'ফুসফুস' হিসেবে কাজ করছে। এটি ধূলিঝড়, বন্যা ও তীব্র বাতাসের বিরুদ্ধে একটি প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবেও কাজ করে এবং পরিবেশগত বিভিন্ন বিপদের প্রভাব কমাতে সাহায্য করে।

ইতিহাসের ধারায় বাগেস্তান

বহু পরিব্রাজক ও ঐতিহাসিক তাঁদের ভ্রমণকাহিনী ও লেখায় কাজভিনের বাগান ও উদ্যানসমূহের কথা উল্লেখ করেছেন এবং এই প্রাচীন দৃশ্যপটের গুরুত্ব ও সৌন্দর্যের এক ঝলক তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে অন্যতম বিখ্যাত ঐতিহাসিক বিবরণ পাওয়া যায় নামী ইরানি পরিব্রাজক নাসের খসরুর লেখায়। তিনি কাজভিনকে প্রাচীর বা বাধা ছাড়াই বিস্তৃত বাগানঘেরা এক মনোরম শহর হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।

কিছু সূত্র আবার ৩৫০ হিজরি সালের দিকে কাজভিনের বাগেস্তানের প্রথম দিকের একটি উল্লেখে আরব ভূগোলবিদ ইবন হাওকালের নাম উল্লেখ করেছে। তিনি লিখেছিলেন যে, শহরটিতে প্রচুর গাছ ও দ্রাক্ষাক্ষেত্র (আঙুরবাগান) রয়েছে এবং এগুলোর সেচ মূলত বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভরশীল ছিল।

সাফভি রাজবংশের সময় ইরান সফরকারী ফরাসি পর্যটক জঁা-বাতিস্ত তাভেরনিয়ারও কাজভিনের বাগানগুলোর জাঁকজমক ও সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন যে শহরটিতে কোনো প্রাচীর বা দুর্গ নেই এবং এর অর্ধেকেরও বেশি অংশ বাগান দ্বারা গঠিত।

বিশিষ্ট ইরানি ভূগোলবিদ হামদাল্লাহ মোস্তফি; কাজভিনের ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থ 'আত-তাদভিন ফি আখবার কাজভিন'-এর লেখক আবদালকিম বিন মুহাম্মদ আল-রাফি; 'আসার আল-বিলাদ' গ্রন্থের লেখক জাকারিয়া বিন মুহাম্মদ বিন মাহমুদ কাজভিনী এবং ফরাসি পর্যটক জঁ শার্দার রচনাতেও কাজভিনের বাগানগুলির উল্লেখ পাওয়া যায়।

চাহখানা: বাগানের বুকে ঐতিহাসিক আশ্রয়স্থল

চাহখানা বা বাগানের ঐতিহ্যবাহী আশ্রয়কেন্দ্রগুলো কাজভিনের বাগেস্তানের একটি স্বতন্ত্র আকর্ষণ হতে পারে।

এই কাঠামোটি একসময় বাগানকর্মীদের বিশ্রামের জায়গা হিসেবে কাজ করত এবং গুদাম হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। ধারণা করা হয় যে, বাগেস্তানে প্রায় ১০০টি আশ্রয়কেন্দ্র ছিল, যদিও সময়ের সাথে সাথে এর বেশিরভাগই ধ্বংস হয়ে গেছে।

অতীতে, বাগানকর্মীরা প্রায়শই এই কাঠামো যৌথভাবে ব্যবহার করতেন। কেউ কেউ তাদের ফসল বাজারে নিয়ে যাওয়ার জন্য পুরোপুরি কাটা না হওয়া পর্যন্ত সেখানে সাময়িকভাবে সংরক্ষণ করতেন।

বাকি থাকা আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর কিছু সাফভি আমলের, আবার নতুনগুলো পাহলভি রাজবংশের সময় নির্মিত হয়েছিল। ঐতিহ্যবাহী বাগানে কর্মসংস্থান ও কৃষিকাজ কমে যাওয়ায় এই কাঠামোগুলো ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। যদিও অনেক আশ্রয়কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে, তবে অবশিষ্ট নিদর্শনগুলো কাজভিনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য কর্তৃপক্ষের সুরক্ষার অধীনে রয়েছে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলিতে কিছু সংস্কার করা হয়েছে।

দেওয়ালহীন বাগান

কাজভিনের বাগেস্তানের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো- এর কোনো প্রাচীর বা বেড়া না থাকা, যা এটিকে আজকের অনেক ঘেরাও করা বাগান ও উদ্যান থেকে আলাদা করেছে।

এই বৈশিষ্ট্যটি কোনো সাম্প্রতিক পরিবর্তনের ফল নয়। ঐতিহাসিক বিবরণগুলিতেও কাজভিনের বাগানগুলোকে উন্মুক্ত ও প্রবেশযোগ্য হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং এই বৈশিষ্ট্যটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তাদের পরিচয়ের অংশ হয়ে রয়েছে।

দর্শনের সেরা সময়

গত অর্ধশতাব্দীতে শহরের বিস্তার, জমির লোভ এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে কাজভিনের বাগেস্তানের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও, এই সবুজ বেষ্টনীর অবশিষ্ট অংশগুলো এখনও পরিবেশের সাথে শহরটির গভীর সম্পর্কের এক চমৎকার দৃশ্য উপহার দেয়।

ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাদাম গাছে ফুল ফোটে এবং বাগানটিকে ফুলের এক মনোরম সমুদ্রে পরিণত করে।

যে পর্যটকরা ইরানি নববর্ষের ছুটির দিন নওরোজের সময় কাজভিন ভ্রমণ করেন, তারা বছরের অন্যতম সুন্দর সময়ে এই মূল্যবান সবুজ ঐতিহ্য অনুভব করার সুযোগ পান।

মৃদু বসন্তের বাতাস, বাদামের ফুল এবং শীতের শেষের ও বসন্তের শুরুর বৃষ্টির কারণে তৃণভূমিতে পরিণত হওয়া সবুজ প্রান্তর পর্যটকদের অন্বেষণ করার এবং উপভোগ করার মতো এক অপূর্ব দৃশ্য তৈরি করে।

এফএও'র স্বীকৃতি

২০২৩ সালের নভেম্বরে, বাগেস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) কর্তৃক বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ কৃষি ঐতিহ্যের (GIAHS) ৫৬তম সিস্টেম হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।

এই স্বীকৃতির অন্যতম প্রধান সুবিধা হলো বাগেস্তানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন গন্তব্য হিসেবে পরিচিত করা এবং এর কৃষিপণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করা।

আজ ৩,০০০-এরও বেশি কৃষক ও জমির মালিক এই বিশিষ্ট ঐতিহ্যবাহী দৃশ্যপটের চাষ ও ব্যবস্থাপনায় অংশগ্রহণ করছেন এবং কাজভিনের হৃদয়ে কয়েক দশকের কৃষি ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।#

পার্সটুডে/এমএএআর/৮