ইরান ও আজারবাইজান নিয়ে এরদোগানের মন্তব্য ঔদ্ধত্য ও রাজনৈতিক অদক্ষতার প্রমাণ
নাগরনো-কারাবাখ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সাম্প্রতিক যুদ্ধে আর্মেনিয়ার হাত থেকে নিজের ভূখণ্ড পুনরুদ্ধার উপলক্ষে আজারবাইজান এক উৎসব পালন করে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগান ওই উৎসবে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
রাজধানী বাকুতে অনুষ্ঠিত এক সামরিক কুচকাওয়াজে আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভের উপস্থিতিতে বক্তব্য প্রদান করেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট। তিনি তার বক্তব্যে আজারবাইজান ও ইরানের সীমান্তবর্তী আরাস নদী নিয়ে একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী কবিতা আবৃত্তি করেন। ওই কবিতায় ইরানের আজারবাইজান প্রদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় আরাস নদীর উত্তর অংশে অবস্থিত বর্তমান স্বাধীন রাষ্ট্র আজারবাইজানের পক্ষ থেকে আক্ষেপ প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট এরদোগানের এ ধরনের বক্তব্যের ব্যাপারে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাঈদ খাতিবযাদেহ ওই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় তেহরানে নিযুক্ত তুরস্কের রাষ্ট্রদূতকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করার কথা উল্লেখ করে বলেছেন, এ ব্যাপারে তুরস্কের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আরো বলেছেন, তুর্কি রাষ্ট্রদূতকে একথা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, অপর দেশের ভূমি দখল ও সম্প্রসারণকামী সাম্রাজ্যবাদী শাসনের যুগ বহু আগে শেষ হয়ে গেছে। তাকে আরো জানানো হয়েছে, ইরান তার সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার ব্যাপারে কারো সঙ্গে আপোষ করবে না। ইরান তার জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নেও কাউকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেবে না বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে দেয়া এরদোগানের বক্তব্যকে দু’দিক থেকে মূল্যায়ন করো যায়। প্রথমত, তিনি হয় ইতিহাস জানেন না অথবা অবিবেচকের মত কথা বলেছেন যেকারণে তাকে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে। আর দ্বিতীয়ত, তিনি জেনেশুনে উদ্দেশ্যমূলকভাবে এ ধরনের কথা বলে থাকতে পারেন যার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট এরদোগান ওসমানীয় সাম্রাজ্যকে পুনরুজ্জীবিত করার স্বপ্ন দেখছেন।
এ ব্যাপারে এক প্রতিক্রিয়ায় ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী মোহাম্মদ জাওয়াদ জারিফ টুইটবার্তায় বলেছেন, কেউ কি তুর্কি প্রেসিডেন্টকে একথা বলে দেয়নি যে, তিনি যে কবিতা আবৃত্তি করেছেন তা আরাস নদীর উত্তরে অবস্থিত ভূখণ্ড তার মাতৃভূমি ইরান থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার বেদনায় রচনা করেছিল! ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এরদোগান কি একথা জানেন না যে, তিনি তার কবিতার মাধ্যমে প্রকারান্তরে আজারবাইজানের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন? এরপর জারিফ লিখেছেন, আমাদের প্রিয় আজারবাইজান নিয়ে উল্টোপাল্টা মন্তব্য করার অধিকার কারো নেই।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার এ প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে শুধু যে কূটনৈতিকভাবে তুরস্ককে সতর্ক করে দিয়েছেন তাই নয় একইসঙ্গে আরো ঐতিহাসিক কিছু দিক উঠে এসেছে। কারণ এ অঞ্চলের ইতিহাসকে কেবল ওসমানি সাম্রাজ্যের ইতিহাসের আলোকে ব্যাখ্যা করা যায় না। কেননা বৃহৎ ককেশিয় অঞ্চল ও মধ্যএশিয়ার বিশাল অংশ একসময় ইরান ভূখন্ডের অংশ ছিল যা প্রেসিডেন্ট এরদোগান অস্বীকার করতে পারেন না। ইতিহাস ঘটলে দেখা যাবে ইরান নয় বরং ওইসব ভূখণ্ডই নিজ মাতৃভূমি অর্থাৎ ইরান থেকে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল।
যাইহোক, ইতিহাস না জেনে এ অঞ্চলের জাতিগুলোকে অবমাননা করে দেয়া এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে তুর্কি কর্মকর্তারা আসলে রাজনৈতিক দৈন্যতা ও অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।#
পার্সটুডে/রেজওয়ান হোসেন/১২