প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা
‘মুক্তিকামী জাতিগুলোর কাছে ইরানের ইসলামী বিপ্লব অনুপ্রেরণার এক অফুরন্ত উৎস’
১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লব বিজয়ের পর থেকেই ইরান বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও জনপদের নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। ইরানের এ ভূমিকার সাথে বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে পরিচিতি করার লক্ষ্যে ‘আইআরআইবি ফ্যান ক্লাব, কিশোরগঞ্জ’ বিশেষ প্রবন্ধ প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল। ওই প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের পাশাপাশি মানসম্মত লেখাগুলো ধারাবাহিকভাবে পার্সটুডে ডটকমে প্রকাশ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আজ প্রকাশিত হলো প্রতিযোগিতায় যৌথভাবে তৃতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের প্রতিযোগী রুম্পা ঘোষের লেখা।
ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান। ইরান পারস্য উপসাগরে অবস্থিত। পারস্য উপসাগরের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোয় রয়েছে তেলের প্রচুর মজুদ। শুধু তাই না, পৃথিবীর ৪০ শতাংশ তেল এখান দিয়েই রফতানি করা হয়। ইরান যদি কোনোভাবে পারস্য উপসাগর বন্ধ করে দেয়, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতি জোর ধাক্কা খাবে। পারস্য উপসাগর রক্ষার জন্য আমেরিকার নৌবহর সবসময় পারস্য উপসাগরে অবস্থান করে, যা ইরানের জন্য একটি হুমকি। ইরানের সরকারের নীতির কারণে ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোর বিভিন্ন সমস্যায় তাদের বিরোধী ভূমিকায় থাকে। ফলে ইরানের বেশির ভাগ প্রতিবেশী দেশ ইরানকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করে।
মজলুম জনগোষ্ঠী কান্নায় পৃথিবীর আকাশ ভারী হয়ে উঠছে। মজলুম নারী-পুরুষ ও শিশুরা বাঁচাও বাঁচাও বলে আর্তচিৎকার করছে। তাদের উপর নির্যাতনের স্ট্রিম রোলার চালাচ্ছে। হত্যা করছে অসংখ্য নিষ্পাপ শিশু, যুবক, বৃদ্ধাদেরকে। ধর্ষণ করে কলঙ্কিত করছে অসংখ্য মা-বোনদের। বিধবা করছে হাজারো নারীদের। সন্তানহারা করছে অসংখ্য মাকে। স্বামীহারা করছে অসংখ্য স্ত্রীকে। ভাইহারা করছে অসংখ্য বোনকে। মজলুম জনগোষ্ঠী আহাজারীতে পৃথিবীর আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠছে। কোথায় আজ বিশ্ব মজলুম দের সহযোগিতা ও ভ্রাতৃত্বের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত সংস্থা ওআইসি। নীরব কেন আজ মানবধিকার সংস্থা? নিশ্চুপ কেন জাতিসংঘ? পৃথিবীতে থাকার পরও কেন দেশে-দেশে মজলুমরা আজ নির্যাতিত? মজলুম জনগণের ওপর সামরিক শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে, অমানবিক এবং অবৈধ, নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে মজলুম শূন্য করার খেলায় মেতে উঠেছে।
মজলুম যদি অমুসলিমও হয়, তবুও তাকে সাহায্য করতে ইসলাম নির্দেশ দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমার ভাইকে সাহায্য করো। চাই সে জালিম হোক বা মজলুম। জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! মজলুমের সাহায্যের বিষয়টি তো স্পষ্ট। কিন্তু জালেমকে কীভাবে সাহায্য করব? তিনি বলেন, তাকে জুলুম থেকে বিরত রাখ। এটাই তার প্রতি তোমার সাহায্য’। (বুখারি শরিফ)
মজলুম মুসলমানদের সাহায্য করা আল্লাহর নির্দেশ। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহপাক কুরআনুল কারীমে ইরশাদ করেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের কী হলো, তোমরা কেন আল্লাহর রাস্তায় অসহায় নর-নারী ও শিশুদের জন্য লড়াই করছ না, যারা দুর্বলতার কারণে নির্যাতিত হয়ে ফরিয়াদ করে বলছে, হে আমাদের রব! এই জনপদ থেকে আমাদের বের করে নিয়ে যাও, যার অধিবাসীরা জালিম এবং তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য কোন বন্ধু, অভিভাবক ও সাহায্যকারী পাঠাও।’
মূলত কুরআনের এ নির্দেশনার আলোকে ১৯৭৯ সালে তাগুতি ও সাম্রাজ্যবাদের শীর্ষস্থানীয় অনুচর রেজা শাহের রাজতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করে। কেবল শাহ সরকারকে উৎখাত করেই ক্ষান্ত হয়নি, ‘প্রাচ্যও নয়, পাশ্চাত্যও নয়- বরং ইসলামই শ্রেষ্ঠ’-এই নীতির আলোকে আধিপত্যকামী শক্তিগুলোসহ বিশ্ব-সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধেও এক বলিষ্ঠ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে ইরান। তাই এ বিপ্লবের আবেদন কোনো বিশেষ অঞ্চলে সীমিত থাকেনি, বিশ্বে ইরানের সহযোগিতা ছড়িয়ে গেছে।
ফিলিস্তিন, বসনিয়া ও কাশ্মিরের মজলুম জনগণসহ মুক্তিকামী জাতিগুলোর কাছে ইরানের ইসলামী বিপ্লব হয়ে ওঠে অনুপ্রেরণার এক অফুরন্ত উৎস। এইসব কারণেই গত চার দশক ধরে এ বিপ্লব নব্য-উপনিবেশবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর জন্য প্রধান আতঙ্ক হয়ে বিরাজ করছে। খাঁটি মুহাম্মাদি ইসলামের পতাকাবাহী এ বিপ্লব ইসলামী আইন, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের ক্ষেত্রে কখনও বিন্দুমাত্র আপোষ করেনি। জালিমের বিরুদ্ধে ইরানের ইসলামী সরকারের কঠোর প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ এবং মজলুমের পক্ষে সর্বাত্মক সাহায্য ও সমর্থনই এই বাস্তবতার বড় প্রমাণ।
ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, রাখাইন, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, ইয়েমেনসহ বঞ্চিত, দুর্বল, মজলুম ও নির্যাতিত জাতিগুলোর প্রতি সর্বাত্মক সমর্থন ও সহায়তা প্রদান ইসলামী ইরানের সংবিধানের অন্যতম প্রধান নীতি। স্বাধীন ও ন্যায়বিচারকামী রাষ্ট্র হিসেবে ইসলামী ইরান এক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে একটি শক্তিশালী দেশ হিসেবে ভূমিকা পালন করে।
মজলুম প্রথম কিবলার শহর বায়তুল মুকাদ্দাসকে ইহুদিবাদী দখলদারদের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য ইরানের ইসলামী বিপ্লবের রূপকার ইমাম খোমেনী (রহ) রমজানের শেষ শুক্রবারকে বিশ্ব-কুদস দিবস বলে ঘোষণা করেন। আর মজলুম মাজহাবগুলোর মধ্যে নৈকট্য গড়ে তোলার জন্য ইসলামী ঐক্য প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী রাষ্ট্রের এ দু’টি প্রভাবশালী পদক্ষেপ অমর হয়ে থাকবে। পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক মিলন নিষিদ্ধ করেছে ও তাদের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে অসহায় মজলুম জনগোষ্ঠী পাশে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান সহযোগিতা ও সমর্থন যুগিয়েছে।
বিশ্বকুদস দিবস পালন বিশ্বব্যাপী ফিলিস্তিনি জাতির প্রতি সমর্থন ও সহায়তা এবং ইসরাইলি দখলদারিত্ব বিরোধী প্রতিরোধ জোরদার মোকাবিলা করেছে ইরান।
ধীরে ধীরে যখন মানুষের চোখ খুলে দিচ্ছিল তখনই এই বিশ্বলুটেরা গোষ্ঠী এ বিপ্লব ও তার নেতার প্রতি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। বিশ্বব্যাপী তাদের নিয়ন্ত্রিত সকল মিডিয়া ও তাদের দোসরদের মাধ্যমে ইসলামী বিপ্লব ও ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে তারা পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার প্রচেষ্টা চালালো। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদীদের সকল হিসাবকে ভুল প্রমাণ করে এ বিপ্লব স্বমহিমায় এগিয়ে যাচ্ছে।
বছর ধরে এই শোষক পুঁজিবাদী গোষ্ঠী বিশ্বের তাবৎ জনগোষ্ঠীর চোখে ধুলা দিয়ে বিশ্বকে একচেটিয়াভাবে শোষণ করে আসছিল; ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের কারণে যেন তাতে ছেদ পড়ল। ইরান আজকে যেটা করছে, আগামীতে উন্নয়নশীল তা কয়েক বছর পর তা অনুকরণ করে।
রুম্পা ঘোষ
গ্রাম: ইসলামপুর, জেলা: মুর্শিদাবাদ
পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।
পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/১২