রেডিও তেহরানের ৪০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী
রেডিও তেহরান আমার ইথার তরঙ্গের বন্ধু
ছোট বেলায় পারিবারিক সূত্রে রেডিও শোনা আমার হাতে খড়ি। সৌখিন বাবার কাঠের বাক্সের মতো বড় আকারের একটি রেডিও ছিল। যত দূর মনে পড়ে, রেডিওটি মার্কনী যুগের ছিল। 'মেড ইন ইংল্যান্ড'। তখন আমরা রেডিওকে ট্রানডেস্টার বলতাম। আমাদের এলাকায় তৎসময়ে ট্রানডেস্টার বা রেডিও কারো ছিল না বললেই চলে। প্রতিদিন বিশেষ করে সন্ধ্যায় আমাদের বাড়িতে পাড়া পড়শীদের বেশ সমাগম হতো। উদ্দেশ্য ছিল ট্রানডেস্টারে গান, খবর ও নাটক শোনা। কোনো কোনো দিন যাত্রা পালাও শোনা হতো।
আমাদের উঠোনে খেজুর পাতার পাটি বিছিয়ে মাঝখানে ট্রানডেস্টারটি রেখে সবাই গোল হয়ে বসে বাবার হুক্কা টানতো আর কানন বালা, নীনা হামিদ, আব্দুল আলীম, আব্বাস উদ্দীন আহমদ, নও মুসলিম হাজেরা বেগম এবং আব্দুল হালিম বয়াতির গান মুগ্ধ মনে শুনতো। আগাম বার্তায় তৎসময়ের জনপ্রিয় নাটক 'মধুমালা মদন কুমার' ও "'বেহুদা লখিন্দর' নাটক এবং অসম্ভব জনপ্রিয় 'নবাব সিরাজ উদ্দৌলা' যাত্রা পালাও শোনার জন্য অসংখ্য নারী-পুরুষের ভীড় জমতো।
গ্রামের মাতুব্বর বাবার পান তামাকের ডিব্বা ঐদিন শেষ হয়ে যেতো। বাবা কোলে বসে রেডিও শুনতে শুনতেই ঘুমিয়ে পড়েছি, আবার রেডিও'র আওয়াজেই ঘুম থেকে উঠেছি। আজও মনে পড়ে গা গ্রামের সেই রেডিও শোনার অকৃত্রিম দৃষ্টি নন্দন দৃশ্য। আমি বলতে গেলে পারিবারিকভাবে রেডিও শুনতে শুনতেই বড়ো হয়েছি। আজো রেডিও শোনা বাদ দিতে পারিনি। রেডিও নামক শব্দটি আমার জীবনের সাথে মিশে যাওয়া একটি নাম। আমার মনে হয় আমি যতটুকু বয়সে রেডিও'র শুনে শ্রোতা হয়েছি, অন্য কেউ এভাবে শ্রোতা হয়েছে কিনা আমার তা জানা নেই।
বিবিসি, ভয়েজ অফ আমেরিকা, রেডিও পাকিস্তান এবং আকাশ বাণী কলকাতা'র খবর বাবা নিয়মিত শুনতেন শুধু ইরানের ইসলামী বিপ্লবের খবরাখবর জানার জন্য। মক্তবে উস্তাদের কাছে ইরান দেশের কবি শেখ সা'দী এবং মাওলানা জালালুদ্দিন রুমির ফার্সি বয়াতের জ্ঞানগর্ব অনুবাদ শুনে মুগ্ধ হতাম।
সেই থেকে ইরানের সাথে আমার পরিচয়। বাবা বলতেন, 'শেখ সা'দীর দেশে ইসলামী বিপ্লব হচ্ছে। হে খোদা! তুমি ইরানে ইসলামী বিপ্লবের বিজয় দান করে রহম করো। মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমির দেশে ইসলামী বিপ্লব চলছে। হে খোদা ! তুমি ইরানীদের কামিয়াবি দান করো'।
আমি বাবার কোলে বসে না বুঝেই বাবার মতো ইরানকে ভালোবেসেছি। সেই সুত্রে পরবর্তীতে রেডিও তেহরানকে। ছোট্ট বুকের ভালোবাসা এখন বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে। রেডিও তেহরান থেকে প্রতিদিন ঠিকানা বলা হতো। দ্রুত লিখতে পারতাম না। প্রত্যেক দিন দুই একটি শব্দ লিখে লিখে পুরো ঠিকানায় রেডিও তেহরানের বাংলা বিভাগে জীবনের প্রথম চিঠি লেখি। কি লিখেছিলাম,এখন অতোটা মনে নেই। তবে কিছুটা মনে আছে। সেই লেখার বানানে নিশ্চয়ই ভুল ছিল। প্রতিদিন
রেডিও তেহরানের বাংলা অনুষ্ঠান শুনতাম আর দুই একদিন পরপর চিঠি লিখে পাঠাতাম। প্রায় মাস খানেক পরে আমার ঠিকানায় রেডিও তেহরান থেকে চিঠির উত্তর এলো। আমাদের বাড়ীতে বা গ্রামে ওটাই ছিল প্রথম বিদেশি চিঠি। আমাদের বাড়িতে প্রতি সন্ধ্যায় রেডিও শোনার মজলিসে আমার নামের ঐ চিঠি বেশ আলোচিত হয়েছিল। শুরু হলো ইথার তরঙ্গে বন্ধুত্ব। রেডিও তেহরানের বাংলা বিভাগের সূচনাতেই শ্রোতা হিসেবে আমার সংশ্লিষ্টতা। জীবন প্রভাতে সঙ্গী হওয়া রেডিও তেহরানের বাংলা বিভাগ হাঁটি হাঁটি পা পা করে ৪০টি বছরে পদার্পণ করেছে। নিঃসন্দেহে এটা গর্বের ও ইতিহাস ঐতিহ্যের। স্বমহিমায় এগিয়ে চলা রেডিও তেহরান আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে যথেষ্ট সমৃদ্ধ। গৌরবের চল্লিশ বছর আরো পূর্ণতায় পৌঁছে যাক, এই প্রত্যাশা অনুক্ষণ। এখনো রেডিও তেহরানকে প্রান্ত ছোঁয়া নীল আকাশের মতো সীমাহীন ভালোবাসা দিয়ে অন্তরে স্হান করে দিয়েছি।
বহতা নদীর মতো বয়ে চলা জীবনের সাথে রেডিও তেহরান একাকার হয়ে আছে। কারণ, 'রেডিও তেহরান আমার ইথার তরঙ্গের বন্ধু'।
এম, এম, গোলাম সারওয়ার।
সভাপতি, ওয়ার্ল্ড রেডিও লিসেনার্স ক্লাব।
গ্রাম-জগন্নাথদী, পোষণ-ব্যাসদী-৭৮৫০
থানা-মধুখালী, জেলা-ফরিদপুর।
পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/২৪