ইমাম বাকিরের (আ.) চির-স্মরণীয় ও চিন্তা-উদ্দীপক একগুচ্ছ বাণী
-
মদিনার জান্নাতুল বাকিতে ইমাম বাকিরের পবিত্র কবর (সর্বডান দিক থেকে যথাক্রমে ইমাম হাসান, ইমাম জাইনুল আবেদিন, ইমাম বাকির ও ইমাম জাফর সাদিকের কবর)
১১৪ হিজরীর ৭ জিলহজ্জ্ব মহানবীর (সা.) পবিত্র আহলুল বাইতের (আ.) পঞ্চম ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে আলী ইবনিল হুসাইন ইবনে আলী আল-বাকিরের (আ.) শাহাদত দিবস। বিশ্বব্যাপী পালন করা হয় এ বার্ষিকী। ইমাম বাকির (আ) হিজরী ৫৭ সালে মদিনায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি চতুর্থ ইমাম আলী ইবনুল হুসাইন যাইনুল আবিদিনের (আ.) পুত্র এবং সাইয়েদুশ শুহাদা ইমাম হুসাইনের (আ.) পৌত্র।
তাঁর কুনিয়া আবূ জাফার এবং উপাধি (লকব) 'আল-বাকির' বা 'বাকিরুল উলূম' (باقر و باقر العلوم) যার অর্থ হচ্ছে জ্ঞান-বিজ্ঞানের ব্যবচ্ছেদকারী (জ্ঞান সংক্রান্ত সমস্যাবলীর সমাধানকারী এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিশ্লেষণকারী ও বিস্তৃতি দানকারী) বা জ্ঞান-বিজ্ঞানের দ্বার উন্মুক্তকারী। আর এই উপাধি দিয়েছেন স্বয়ং মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)।
প্রসিদ্ধ জলীলুল কদর সাহাবী হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ আল-আনসারী (রা.) বলেন, একদিন মহানবী (সা.) আমাকে বললেন, আমার পরে আমার আহলুল বাইতের অন্তর্ভুক্ত এক ব্যক্তির সাথে তোমার সাক্ষাৎ হবে যাঁর নাম হবে আমার নাম ( অর্থাৎ মুহাম্মাদ ) এবং চেহারা হবে আমার চেহারার অনুরূপ। তিনি জ্ঞান-বিজ্ঞানের দ্বার উন্মুক্তকারী হবেন। মহানবী ( সা. ) যখন এই ভবিষ্যদ্বাণী করেন তখনও ইমাম বাকির (আ.) ভূমিষ্ঠ হননি।
এ ঘটনার পর বহু বছর অতিক্রান্ত হলে একদিন মদিনা নগরীর রাস্তা অতিক্রম কালে হযরত জাবিরের (রা.) দৃষ্টি এক ব্যক্তির (ইমাম বাকিরের (আ.) উপর নিবদ্ধ হয়। যখন তিনি সূক্ষ্মভাবে তাকালেন তখন তিনি দেখতে পেলেন যে মহানবী (সা. ) ইমাম বাকিরের চেহারা সংক্রান্ত যে বিবরণ দিয়েছিলেন তা হুবহু এই ব্যক্তির চেহারার সাথে মিলে যাচ্ছে। তাই তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন: আপনার নাম কি? তিনি বললেন: আমার নাম মুহাম্মাদ ইবনে আলী ইবনুল হুসাইন।
হযরত জাবির (রা.) তাঁর কপাল চুম্বন করে বললেন: আপনার বড় নানা বা দাদার নানা রাসূলুল্লাহ (সা.) আমার মাধ্যমে আপনাকে সালাম দিয়েছেন।
হযরত জাবির (রা.) ঐ দিন থেকে মহানবীর (সা.) সম্মানার্থে এবং এই ইমামের বিরাট মর্যাদার নিদর্শনস্বরূপ প্রত্যহ দুই বার ইমাম বাকিরের (আ.) সাথে দেখা করতেন। তিনি (জাবির) মসজিদ-ই নববীতে উপস্থিত বিশাল জনতার মাঝে বসে মহানবীর (সা.) (ইমাম বাকির (আ.) সংক্রান্ত) ভবিষ্যদ্বাণীটি বর্ণনা করতেন (দ্র: আল্লামাহ মাজলিসী প্রণীত বিহারুল আনওয়ার , খ: ৪৬, পৃ: ২২৬, ২য় সংস্করণ, আল-মাকতাব আল- ইসলামী কর্তৃক মুদ্রিত, তেহরান, ১৩৯৪ হিজরী)।
এখন আমরা এই মহান ইমামের কিছু অমিয় বাণীর অনুবাদ নিচে তুলে ধরছি:
بسم الله الرحمن الرّحیم
১. ইমাম বাকির (আ.) বলেন: আল্লাহ শব্দের অর্থ ঐ মাবূদ (উপাস্য) যাঁর সত্ত্বাকে উপলব্ধি এবং তাঁর গুণ সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান অর্জন করার ক্ষেত্রে সকল মানুষ (সৃষ্টিকুল) অস্থির ও পেরেশান হয়ে গেছে (অর্থাৎ অপারগ)। (দ্র: আত্- তাওহীদ, পৃ: ৮৯, হাদীস নং: ২)
اَللهُ مَعنَاهُ المَعبُودُ الَّذِی أَلِهَ الخَلقُ عَن دَرکِ مَاهِیَّتِهِ وَ الإِحَاطَةِ بِکَیفِیَّتِهِ.
২.ইমাম বাকির (আ.) বলেন: এক মুমিন অপর মুমিনের আপন ভ্রাতা(তুল্য)। (দ্র: আল-কাফী: খ: ২,পৃ: ১৬৬,হাদীস নং ২ ও ৭)
المُؤمِنُ أَخُوالمُؤمِنِ لِأَبِیهِ وَ أُمِّهِ.
৩. যে ব্যক্তি মহান আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের ভিত্তিতে, ইসলামী দ্বীনী ভ্রাতৃত্বের প্রতি বিশ্বস্ততা (প্রদর্শন) স্বরূপ এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে কোনো দ্বীনী ভাইকে পাবে ও অর্জন করবে (অর্থাৎ কোনো মুমিন মুসলমানকে দ্বীনী ভাই হিসাবে পাবে এবং ইসলামী ভ্রাতৃত্বের নীতিমালা ও আদব-কায়দা অনুযায়ী তার সাথে আচরণ করবে) সে অবশ্যই আল্লাহ পাকের নূরের (আলো) রশ্মি ও (জ্যোতি) প্রভা লাভ করবে ( এবং তা থেকে উপকৃত ও লাভবান হবে)।(দ্র: তুহাফুল উকূলঃ২৯৫)
مَنِ استَفادَ أَخَاً فِي اللهِ عَلَی إِيمَانٍ بِاللهِ وَ وَفَاءٍ بِإِخَائِهِ، طَلَبَاً لِمَرضَاةِ اللهِ فَقَدِ استَفَادَ شُعَاعَاً مِن نُورِاللهِ
৪. ইমাম বাকির (আ.) বলেন: তোমার অন্তরে তোমার (দ্বীনী) ভাইয়ের প্রতি তোমার যে পরিমাণ ভালোবাসা (মাওয়াদ্দাত) আছে ঠিক সেটার ভিত্তিতে তার অন্তরে তোমার প্রতি তার ভালোবাসা সম্পর্কে জ্ঞাত ও অবগত হও।(দ্র: কাশফুল গাম্মাহ , খ: ২, পৃ: ৩৩১)
اِعرِفِ المَوَدَّةَ لَکَ فِی قَلبِ أَخِیکَ بِمَا لَهُ فِی قَلبِکَ.
৫.ইমাম বাকির (আ.) বলেছেন: নিকৃষ্ট ও মন্দ ভাই হচ্ছে সেই ভাই যে তোমার সুখে ও স্বচ্ছলাবস্থায় তোমার সাথে সম্পর্ক ও যোগাযোগ রক্ষা করে (খোঁজ-খবর রাখে) এবং তোমার অভাব, দারিদ্র্য ও প্রয়োজনের সময় তোমার সাথে সম্পর্ক ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে (অর্থাৎ তোমার খোঁজ-খবর নেয় না)।(দ্র: আল-ইরশাদ,খ: ২,পৃ: ১৬৬)
بِئسَ الأَخُ أَخٌ یَرعَاکَ غَنِیَّاً وَ یَقطَعُکَ فَقِیرَاً
৬.ইমাম বাকির (আ.) বলেন: যে ব্যক্তি চায় যে খাদ্য তার ক্ষতি না করুক সে যেন ক্ষুধার্ত না হওয়া এবং তার পেট খালি (ও পরিষ্কার ) না হওয়া পর্যন্ত খাবার না খায় । অতঃপর যখন সে খাবার খাবে তখন তার উচিৎ আল্লাহ পাকের নাম নেয়া (অর্থাৎ বিসমিল্লাহ বলে আহার শুরু করা), ভালোভাবে খাবার চিবানো এবং খাবার খাওয়ার ইচ্ছা ও ক্ষুধা থাকাবস্থায় খাওয়া শেষ করা। (দ্র: ওয়াসাইলুশ শীআ, খ: ১৬, পৃ: ৫৩৯.হাদীস নং: ১ ও ১৬ , পৃ: ৫৪০, হাদীস নং: ৩)
مَن أَرَادَ أَن لَا یَضُرَّهُ طَعَامٌ ، فَلَا یَأکُل طَعَامَاً حَتَّی یَجُوعَ وَ تَنقَی مِعدَتُهُ ، فَإِذَا أَکَلَ فَلیُسَمِّ اللهَ ، وَلیُجِدِ المَضغَ ،وَلیَکُفَّ عَنِ الطَّعَامِ وَ هُوَ یَشتَهِیهِ وَ یَحتَاجُ إِلَیهِ.
৭.ইমাম বাকির (আ.) বলেন: (দুনিয়া অর্থাৎ পার্থিব জগত-সংক্রান্ত) আশা-আকাঙ্ক্ষা সংক্ষিপ্ত ও খাটো (হ্রাস) করার মাধ্যমে দুনিয়া হতে (আখেরাতের জন্য) পাথেয় সংগ্রহ ও সঞ্চয় কর।(দ্র: তুহাফুল উকূল: ২৮৫)
تَزَوَّد مِنَ الدُّنیَا بِقِصَرِ الأَمَلِ
৮.ইমাম বাকির (আ.) বলেন: (দুনিয়া অর্থাৎ পার্থিব জগত সংক্রান্ত ) আশা-আকাঙ্ক্ষা সংক্ষিপ্ত ও খাটো (হ্রাস) করার মাধ্যমে দুনিয়াবিমুখতার (যুহদ যাহাদাহ) মিষ্টি স্বাদ আস্বাদন কর।(দ্র: তুহাফুল উকূল,পৃ: ২৮৬)
اِستَجلِب حَلَاوَةَ الزَّهَادَةِ بِقِصَرِالأَمَلِ
৯. ইমাম বাকির (আ.) বলেন: নিশ্চয়ই মুমিন যখন সন্তুষ্ট হয় তখন তার সন্তুষ্টি তাকে পাপ ও বাতিল ( ভ্রান্ত) কাজে প্রবেশ করায় না ( পাপ ও ভ্রান্ত কাজ করতে তাকে উদ্বুদ্ধ করে না) এবং যখন সে হয় ক্রুদ্ধ তখন তার ক্রোধ সত্য বলা থেকে তাকে বিরত রাখে না। মুমিন হচ্ছে সেই ব্যক্তি যখন সে ক্ষমতাবান হয় ( ক্ষমতা লাভ করে) তখন তার ক্ষমতা (ও শক্তি) তাকে সীমালঙ্ঘন করতে উদ্বুদ্ধ করে না এবং যে বিষয় সত্যিকার অর্থে তার নয় সেদিকে তাকে ধাবিত করে না। ( দ্র: বিহারুল আনওয়ার, খ: ৭১ , পৃ: ৩৫৮ , হাদীস নং ৩)
إِنَّمَا المُؤمِنُ الّذِی إِذَا رَضِیَ لَم یُدخِلهُ رِضَاهُ فِی إِثمٍ وَ لَا بَاطِلٍ ، وَ إِذَا سَخِطَ لَمیُدخِل سَخَطُهُمِن قَولِ الحَقِّ ، وَ المُؤمِنُ الَّذِی إِذَا قَدَرَ لَم تُخرِجهُ قُدرَتُهَإِلَی التَّعَدِّی وَ إِلَی مَا لَیسَ لَهُ بِحَقٍّ .
১০. ইমাম বাকির (আ.) বলেন: মহান আল্লাহ মুমিনকে তিনটি বৈশিষ্ট্য দিয়েছেন। আর সেগুলো হচ্ছে: ১. ইহকাল (দুনিয়া) ও ধর্মের ক্ষেত্রে সম্মান (ইজ্জত), ২.আখেরাতে (পরকাল) সফলতা( فَلَحٌ ) এবং ৩.জগতবাসীদের অন্তরে তার ব্যাপারে ভয়-বিজড়িত ভক্তি ও শ্রদ্ধাবোধ ( مهابة )।(দ্র: বিহারুল আনওয়ার , খ: ৬৭, পৃ: ৭১ , হাদীস নং ২৪)
إِنَّ الله أَعطَی المُؤمِنَ ثَلَاثَ خِصَالٍ : العِزُّ فِی الدُّنیَا وَ فِی الدِّینِ ، وَ الفَلَحُ فِی الآخِرَةِ ، وَ المَهَابَةُ فِی صُدُورِالمُؤمِنِینَ .
১১. ইমাম বাকির (আ.) বলেন: এমন তিনটি বিষয় আছে যেগুলোর ব্যাপারে মহান আল্লাহ (কাউকে) কোন ছাড় ( অব্যাহতি) দেন নি। আর ঐ বিষয়গুলো হচ্ছে: ১. যে কোন ব্যক্তির আমানত তার কাছে পৌঁছে দিতে হবে তা সে সৎ বা অসৎ হোক না কেন, ২. কারো সাথে ওয়াদা ( প্রতিশ্রুতি) করলে তা পালন ও রক্ষা করা চাই, তা সেই ব্যক্তি সৎ হোক বা অসৎ হোক না কেন এবং ৩. পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ করতে হবে তা তারা সৎ হোক বা অসৎ হোক না কেন । (আল-কাফী, খ: ২ , পৃ: ১৬২, হাদীস নং ১৫)
ثَلَاثٌ لَم یَجعَلِ اللهُ عَزَّ و جَلَّ لِأَحَدٍ فِیهِنَّ رُخصَةً : أَدَاءُ الأَمَانَةِ إِلَی البَرِّ وَ الفَاجِرِ،وَالوَفَاءُ بِالعَهدِ لِلبَرِّ و الفَاجِرِ ، وَ بِرُّ الوَالِدَینِ بَرَّینِکَانَا أَو فَاجِرَینِ.
১২. ইমাম বাকির (আ.) বলেন: মহান আল্লাহ মুমিন অপেক্ষা আল্লাহর কাছে বেশি সম্মানিত আর কাউকে সৃষ্টি করেন নাই। কেননা ফেরেশতারা হচ্ছেন মুমিনদের খাদেম ( সেবক)। ( আল-কাফী, খ: ২, পৃ: ৩৩, হাদীস নং ২)
مَا خَلَقَ اللهُ عَزَّ وَ جَلَّ خَلقَاً أَکرَمَ عَلَی اللهِ عَزَّ وَ جَلَّ مِنَ المُؤمِنِ لِأَنَّالمَلَائِکَةَ خُدَّامُ المُؤمِنِینَ.
১৩. ইমাম বাকির (আ.) বলেন: চারটি বিষয় হচ্ছে পূণ্যের খনিগুলোর অন্তর্গত। আর সেগুলো হচ্ছে: ১. প্রয়োজন (অভাব) গোপন রাখা, ২. দান ( সদকা) গোপন রাখা , ৩. ব্যথা-বেদনা ( রোগ-ব্যাধি) গোপন রাখা এবং ৪.বিপদাপদ গোপন রাখা। (তুহাফুল উকূল, পৃ:)
أَربَعٌ مِن کُنُوزِ البِرِّ : کِتمَانُ الحَاجَةِ و کِتمَانِ الصَّدَقَةِ وَ کِتمَانِ الوَجَعِ وَ کِتمَانِالمُصِیبَةِ .
১৪.ইমাম বাকির (আ.) বলেন: নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ গালিগালাজকারী অসৎ ব্যক্তিকে ঘৃণা করেন।
إِنّ اللهَ یُبغِضُ الفَاحِشَ المُتَفَحِّشَ .
১৫. ইমাম বাকির (আ.) বলেন: নিশ্চয় মহান আল্লাহ অজ্ঞ বৃদ্ধকে , অত্যাচারী ধনীকে এবং প্রতারক ( ধোঁকাবাজ) দরিদ্রকে ঘৃণা করেন।
إِنَّ اللهَ تَبَارَکَ وَ تَعَالَی یُبغِضُ الشَّیخَ الجَاهِلَ وَ الغَنِیَّ الظَّلُومَ وَ الفَقِیرَ المُحتَالَ .
১৬. হযরত আলী (আ.) যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন তাদের কথা উল্লেখ করার পর ইমাম বাকির (আ.) বলেন: যারা মহানবীর (সা.) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল তাদের চেয়ে এরা ( যারা হযরত আলী (আ.) -এব় বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল তারা) বেশি অপরাধী। তখন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল: হে রাসুলুল্লাহর (সা.) সন্তান, এ ব্যাপারটা কেমন? তথা এ ব্যাপারে ব্যাখ্যা দেবেন কি?) তখন তিনি বললেন: ওরা (যারা মহানবীর সা. বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল তারা) ছিল জাহেলী যুগের লোক আর এরা (যারা হযরত আলীর-আ. বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে তারা) পবিত্র কুরআন পাঠ করেছিল (পবিত্র কুরআনের সাথে তারা পরিচিত ছিল) এবং মহৎ চারিত্রিক গুণের অধিকারীদেরকে (আহলুল ফাযল) তারা চিনেছিল। কিন্তু এতদসত্ত্বেও বিচক্ষণতা অর্জন করার পর যা করা অনুচিত তারা তাই করেছে। (দ্র: মুস্তাদরাকুল ওয়াসাইল, খ: ১১, পৃ: ৬২, হাদীস নং ১২৪২৮)
بَعدَ ذِکرِ الّذِینَ حَارَبُهم عَلِیٌّ ( ع) :أَمَا أَنَّهُم أَعظَمُ جُرمَاً مِمَّن حَارَبَ رَسُولَ اللهِ ( ص) قِیلَ لَهُ : وَ کَیفَ ذَالِکَ یَا بنَ رَسُولِ اللهِ ؟ قَالَ :أُولئِکَ کَانُوا أَهلَ جَاهِلِیَّةٍ وَ هؤُلَاءِ قَرَؤُؤا القُرآنَ وَ عَرَفُوا أَهلَ الفَضلِ ، فَأَتَوا مَا أَتَوا بَعدَ البَصِیرَةِ.
১৭.ইমাম বাকির (আ.) বলেন: ঐ ব্যক্তির ব্যাপারে বিস্মিত হই যে রোগাক্রান্ত ও অসুস্থ হওয়ার ভয়ে খাদ্য গ্রহণের ব্যাপারে সতর্কতাবলন্বন করে অথচ সে কেন পরকালে দোজখের আগুনের ভয়ে পাপ থেকে নিজেকে রক্ষা করবে না?!(বিহারুল আনওয়ার, খ: ৫৯,পৃ: ২৬৯)
عِجِبتُ لِمَن یَحتَمِی مِنَ الطَّعَامِ مَخَافَةَ الدَّاءِ کَیفَ لَا یَحتَمِی مِنَ الذُّنُوبِ مَخَافَةَ النَّارِ.
১৮.ইমাম বাকির (আ.) বলেন: লোকেরা যে একে অপরের কাছে চাওয়া ও যাচ্ঞা করার ব্যাপারে পরস্পর পীড়াপীড়ি করে তা মহান আল্লাহ অপছন্দ করেন বরং তিনি পছন্দ করেন যে লোকেরা তাঁর কাছে চাওয়া ও প্রার্থনা করার ব্যাপারে পীড়াপীড়ি করুক।( বিহারুল আনওয়ার , খ: ৭৫, পৃ: ১৭৩)
إنَّ اللهَ کَرِهَ إِلحَاحَ النَاسِ بَعضَهُم عَلَی بَعضٍ فِی المَسأَلَةِ وَ أَحَبَّ ذَالِکَ لِنَفسِهِ .
১৯. ইমাম বাকির (আ.) বলেন: যে ব্যক্তি কল্যাণকর কোন বিষয় আঞ্জাম দেয়ার ব্যাপারে চিন্তা করে তার উচিৎ তা আঞ্জাম দেয়ার জন্য ত্বরা করা। কারণ যে কোন কল্যাণকর বিষয়ের ক্ষেত্রে বিলম্ব করা হলে শয়তান তাতে কুদৃষ্টি দেয় (ও হস্তক্ষেপ করে)। ( বিহারুল আনওয়ার , খ: ৬৮, পৃ: ২২৫)
مَن هَمَّ بِشَیءٍ مِنَ الخَیرِ فَلیُعَجِّلهُ فَإِنَّ کُلَّ شَیءٍ فِیهِ تَأخِیرٌ فَإِنَّ لِلشَّیطَانِ فِیهِ نَظرَةً .
২০.ইমাম বাকির (আ.) বলেন: যার ভাগ্যে নির্বুদ্ধিতা ও মূঢ়তা আছে ( অর্থাৎ যে ইচ্ছা করে নিজেকে বোকামি ও মূঢ়তা থেকে মুক্ত করে না তথা স্বেচ্ছায় বোকা ও নির্বোধ থেকে যায় ) তার হতে ঈমান (নির্বুদ্ধিতা ও মূঢ়তার আবরণে) ঢাকা পড়ে যায়।( আল-কাফী , খ: ২, পৃ: ২৪১, হাদীস নং ৩৭)
مَن قُسِمَ لَهُ الخُرقُ حُجِبَ عَنهُ الإِیمَانُ .
২১.ইমাম বাকির (আ.) বলেন: পরম পূর্ণতা হচ্ছে ধর্মে গভীর ব্যুৎপত্তি ও জ্ঞানার্জন (তাফাক্কুহ), বিপদাপদে ধৈর্য-ধারণ এবং জীবনযাত্রার উপকরণ নির্ধারণ (করা)। (তুহাফুল উকূল, পৃ: ২৯২)
الکَمَالُ کُلُّ الکَمَالِ التَّفَقُهُ فِی الدِّینِ ، وَ الصَّبرُ عَلَی النَّائِبَةِ ، و تَقدِیرُ المَعِیشَةِ
২২.ইমাম বাকির (আ.) বলেন: এমন তিনটি বিষয় আছে যা দুনিয়া ও আখেরাতের উৎকৃষ্ট চারিত্রিক গুণাবলীর অন্তর্ভুক্ত। এই তিনটি বিষয় হচ্ছে যে ১.তোমাকে যে অত্যাচার করেছে তুমি তাকে ক্ষমা করবে , ২. যে তোমার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করেছে তার সাথে তুমি সম্পর্ক স্থাপন করবে এবং ৩. তোমাকে অজ্ঞতাবশত: প্রত্যাখ্যান করা হলে তুমি (সেক্ষেত্রে) ধৈর্য ও সহিষ্ণুতাবলম্বন করবে। (তুহাফুল উকূল, পৃ: ২৯৩)
ثَلَاثَةٌ مِن مَکَارِمِ الدُّنیَا و الآخِرَةِ : أَن تَعفُوَ عَمَّن ظَلَمَکَ وَ تَصِلَ مَنقَطَعَکَ وَ تَحلُمَ إِذَا جُهِلَ عَلَیکَ .
২৩. ইমাম বাকির (আ.) বলেন: মহান আল্লাহ পাকের প্রতিটি সিদ্ধান্তে (অর্থাৎ যা কিছু তিনি নির্ধারণ ও চূড়ান্ত ফয়সালা করেন সেগুলোর সব কিছুতেই অর্থাৎ মহান আল্লাহর সকল কাজা ও কদরে ) মুমিনের জন্য কল্যাণ নিহিত আছে। (তুহাফুল উকূল, পৃ: ২৯৩)
فِی کُلِّ قَضَاءِ اللهِ خَیرٌ لِلمُؤمِنِ .
২৪. ইমাম বাকির (আ.) বলেন: যে ব্যক্তির জাহের (বাহ্য ও প্রকাশ্য রূপ ও অবস্থা ) তার বাতেনের (অভ্যন্তরীণ আত্মিক রূপ ও অবস্থা) চেয়ে বেশি প্রাধান্য-প্রাপ্ত হবে (কিয়ামত দিবসে) তার আমলের মানদণ্ড ( মীযান) হালকা হবে ( অর্থাৎ কিয়ামত দিবসে স্থাপিত মানদণ্ড বা দাঁড়িপাল্লায় তার আমলগুলোর ওজন হালকা হবে)। ( তুহাফুল উকূল, পৃ: ২৯৪)
مَن کَانَ ظَاهِرُهُ أَرجَحَ مِن بَاطِنِهِ خَفَّ مِیزَانُهُ
২৫. ইমাম বাকির (আ.) বলেন: যে আলেমের জ্ঞান হতে উপকৃত হওয়া যায় সে ৭০ হাজার ইবাদতকারীর চেয়েও উত্তম। ( তুহাফুল উকূল,পৃ: ২৯৪)
عَالِمٌ یُنتَفَعُ بِعِلمِهِ أَفضَلُ مِن سَبعِینَ أَلفَ عَابِدٍ .
২৬.ইমাম বাকির (আ.) বলেন: ঐ ব্যক্তি মহান আল্লাহকে চিনে নাই যে তার বিরুদ্ধাচরণ করেছে। এরপর তিনি আবৃত্তি করেন:
মাবূদের (উপাস্য) বিরুদ্ধাচরণ কর আর দেখাও যে তুমি তাকে মহব্বত কর
শপথ করে বলছি যে এটা হচ্ছে কার্যত: বিদাত
যদি (স্রষ্টার প্রতি)তোমার মহব্বত সত্য হত তাহলে তুমি তাঁর আনুগত্য করতে।
নিশ্চয়ই প্রেমিক যাকে ভালোবাসে তার প্রতি সে হয় আনুগত্যশীল।
( দ্র: তুহাফুল উকূল , পৃ: ২৯৪)
مَا عَرَفَ اللهَ مَن عَصَاهُ وَ أَنشَدَ :
تَعصِی الإِلهَ وَ أَنتَ تُظهِرُ حُبَّهُ هذَا لَعَمرُکَ فِی الفِعَالِ بَدِیعُ
لَو کَانَ حُبُّکَ صَادِقَاً لَأَطَعتَهُ إِنَّ المُحِبَّ لِمَن أَحَبَّ مُطِیعُ
২৭. ইমাম বাকির (আ.) বলেন: ঈমান হচ্ছে (মহান আল্লাহকে এবং তাঁর বন্ধুদেরকে) ভালোবাসা ও (আল্লাহ পাকের শত্রুদেরকে)ঘৃণা করা। (দ্র: তুহাফুল উকূল, ২৯৫)
اَلإِیمَانُ حُبٌّ وَ بُغضٌ.
২৮. ইমাম বাকির (আ.) বলেন: জ্ঞান ও পরিচিতি ( মারেফৎ) ব্যতীত আমল ( কর্ম) গৃহীত ( কবুল) হবে না। আর আমল ( কর্ম) ব্যতীত জ্ঞানও নেই। কেবল জ্ঞানের ভিত্তিতে আমল ( কর্ম ) কবুল হবে। আবার আমল(কর্ম)-বিহীন জ্ঞানও সম্ভব নয়। আর যে জেনেছে চিনেছে তার এ জ্ঞান ও পরিচিতি ( মারেফৎ) তাকে কর্মের দিকে পরিচালিত করে ( অর্থাৎ তাকে কর্ম সম্পাদনে উদ্বুদ্ধ করে)। আর যে ব্যক্তি জ্ঞাত হয়নি ( জ্ঞান লাভ করে নি ) তার কোন আমলও নেই ( অর্থাৎ বিনা জ্ঞানে তার কর্ম গৃহীত হবে না )। ( দ্র: তুহাফুল উকূল, পৃ: ২৯৪)
لَا یُقبَلُ عَمَلٌ إِلَا بِمَعرِفَةٍ . وَ لَا مَعرِفَةَ إِلَّا بِعَمَلٍ . وَ مَن عَرَفَ دَلَّتهُ مَعرِفَتُهُ عَلَی العَمَلِ . وَ مَن لَم یَعرِف فَلَا عَمَلَ لَهُ .
২৯. ইমাম বাকির (আ.) বলেন: যে ব্যক্তির জিহ্বা সত্য (কথা) বলে তার আমল (কর্ম) হয় পবিত্র । আর যার নিয়ত ভালো তার রিজিক ( জীবিকা) বৃদ্ধি পায় । আর যে ব্যক্তি নিজ পরিবারের সাথে সদাচরণ করে তার আয়ু বৃদ্ধি পায়। ( দ্র: তুহাফুল উকূল, পৃ: ২৯৫)
مَن صَدَقَ لِسَانُهُ زَکَا عَمَلُهُ . وَ مَن حَسُنَت نِیَّتُهُ زِیدَ فِی رِزقِهِ وَ مَن حَسُنَ بِرُّهُ بِأَهلِهِ زِیدَ فِی عُمرِهِ .
৩০. ইমাম বাকির (আ.) বলেন: আলস্য ও অস্থিরতা সম্পর্কে তোমাকে সতর্ক করছি। কারণ এ দুই জিনিস হচ্ছে সকল মন্দ ও অকল্যাণের চাবিকাঠি। যে অলস সে কোনো (ন্যায্য) হক (অধিকার) আদায় করে না। আর যে অস্থিরচিত্ত ও ব্যাকুল সে কোনো হক বা অধিকারের ক্ষেত্রে ধৈর্য ধারণ করে না। ( দ্র: তুহাফুল উকূল, পৃ: ২৯৫)
إِیَّاکَ وَ الکَسَلَ وَ الضَّجرَ فَإِنَّهُمَا مِفتَاحُ کُلِّ شَرٍّ ، مَن کَسِلَ لَم یُؤَدِّ حَقَّاً وَ مَن ضَجِرَ لَم یَصبِر عَلَی حَقٍّ .
৩১.ইমাম বাকির (আ.) বলেন: লজ্জা (হায়া) এবং ঈমান (একই রশিতে বাঁধা দুই উটের মত) একই সূত্রে গাঁথা ও পরস্পর সংযুক্ত। তাই এ দুই-এর যে কোন একটি যদি প্রস্থান করে ও চলে যায় তাহলে অন্যটিও তার অনুসরণ করবে অর্থাৎ প্রস্থান করবে ও চলে যাবে। (দ্র: শেখ আব্বাস কোমী প্রণীত ১৪ মাসূমের জীবনী, পৃ: ২২১)
اَلحَیَاءُ وَ الإِیمَانُ مَقرُونَانِ فِی قَرَنٍ ، فَإِذَا ذَهَبَ أَحَدُهُمَا تَبِعَهُ صَاحِبُهُ .
৩২.ইমাম বাকির (আ.) বলেন: যে ব্যক্তির অন্তরে তার জন্য মহান আল্লাহ পাক কোন উপদেশদাতা ( নসিহতকারী) স্থাপন করেননি অন্য মানুষের হিতোপদেশ তার কোন উপকারে আসে না। ( দ্র: প্রাগুক্ত , পৃ: ২২০)
مَن لَم یَجعَلِ اللهُ لَهُ فِی نَفسِهِ وَاعِظَاً ، فَإِنَّ مَواعِظَ النَّاسِ لَن تُغنِیَ عَنهُ شَیئَاً .
৩৩.ইমাম বাকির (আ.) বলেন: যে ব্যক্তি সদাচরণ ও নম্র স্বভাবের অধিকারী হবে সে কল্যাণ , সৌভাগ্য ও শান্তি প্রাপ্ত হবে। আর তার ইহলৌকিক ও পারলৌকিক জীবনে (দুনিয়া ও আখেরাতে) তার অবস্থা ভালো হবে। আর যে ব্যক্তি সদাচার ও নম্র স্বভাব অর্জন করা থেকে বঞ্চিত হবে তার জন্য তা হবে সকল অমঙ্গল ও বিপদাপদের কারণ। তবে মহান আল্লাহ পাক যাকে রক্ষা করবেন কেবল সে ছাড়া। (দ্র: প্রাগুক্ত, পৃ: ২২২)
مَن أُعطِیَ الخُلقَ وَ الرِّفقَ فَقَد أُعطِیَ الخَیرَ وَ الرَّاحَةَ ، وَ حَسُنَ حَالُهُ فِی دُنیَاهُ وَ آخِرَتِهِ ، وَ مَن حُرِّمَ الخُلقَ وَ الرِّفقَ ، کَانَ ذَالِکَ سَبِیلَاًإِلَی کُلِّ شَرٍّ وَ بَلِیَّةٍ إِلَّا مَن عَصِمَهَ اللهُ .
৩৪. এক অনুসারী সফর করার প্রাক্কালে ইমাম বাকিরের (আ.) কাছে উপস্থিত হয়ে আরজ করল: আমাকে নসিহত করুন এবং উপদেশ দিন। তখন তিনি (আ.) বললেন, খালি পায়ে হেটো না । রাতের বেলা পায়ে জুতা না পরে কোন স্থানে নেমো না। সুড়ঙ্গ বা গর্তে প্রস্রাব করো না। কোনো সবজি (উদ্ভিদ) যে পর্যন্ত জানবে না যে তা কী, সে পর্যন্ত তা খেও না এবং তার ঘ্রাণও নিও না। যে পর্যন্ত কোনো পাত্রস্থ তরল পানীয়ের ধরন সম্পর্ক অবগত না হবে সে পর্যন্ত উক্ত পাত্র হতে পান করো না। যাকে তুমি চেনো কেবল সে ছাড়া আর কারো সাথে পথ চলো না এবং সফর করো না। আর যাকে তুমি চেনো না তার ব্যাপারে সতর্ক থেকো। (দ্র: প্রাগুক্ত, পৃ: ২২২)
لَا تَسِیرَنَّ سَیرَاً وَ أَنتَ حَافٍ ، وَ لَا تَنزِلَنَّ عَن دَابَّتِکَ لَیلَاً إِلَّا وَ رِجلَاکَ فِی خُفٍّ ، وَ لَا تَبُولَنَّ فِی نَفَقٍ ، وَ لَا تَذُوقَنَّ بَقلَةً ، وَ لَا تَشُمُّهَاحَتَّی تَعرِفَ مَا فِیهِ وَ لَا تَسِیرَنَّ إِلَّا مَعَ مَن تَعرِفُ ، وَاحذَرمَن لَا تَعرِفُ.
# (সংগ্রহ ও অনুবাদ: মুহাম্মাদ মুনীর হুসাইন খান)
পার্সটুডে/এমএএইচ/১৯