আজ কারবালায় শহীদ কৃষ্ণাঙ্গ বীর জুনের লাশ দাফন করা হয়
https://parstoday.ir/bn/news/religion_islam-i96592-আজ_কারবালায়_শহীদ_কৃষ্ণাঙ্গ_বীর_জুনের_লাশ_দাফন_করা_হয়
আজ হতে ১৩৮২ চন্দ্র-বছর আগে ৬১ হিজরির এই দিনে তথা ২০ মহররম ইসলামী জাগরণের অনন্য আদর্শ সৃষ্টিকারী কারবালার অসম যুদ্ধে শহীদ কৃষ্ণাঙ্গ বীর জুন বিন হুওয়াওয়ির (جوْنِ بْنِ حُوَیِّ) লাশ দাফন করা হয়।
(last modified 2025-11-28T10:09:50+00:00 )
আগস্ট ২৯, ২০২১ ১২:১৫ Asia/Dhaka
  • আজ কারবালায় শহীদ কৃষ্ণাঙ্গ  বীর জুনের লাশ দাফন করা হয়

আজ হতে ১৩৮২ চন্দ্র-বছর আগে ৬১ হিজরির এই দিনে তথা ২০ মহররম ইসলামী জাগরণের অনন্য আদর্শ সৃষ্টিকারী কারবালার অসম যুদ্ধে শহীদ কৃষ্ণাঙ্গ বীর জুন বিন হুওয়াওয়ির (جوْنِ بْنِ حُوَیِّ) লাশ দাফন করা হয়।

জুন ছিলেন কারবালা বিপ্লবের মহানায়ক হযরত ইমাম হুসাইনের ৭২ জন বীর সঙ্গীর অন্যতম। তিনি আশুরার দিন বীর-বিক্রমে লড়াই করে শাহাদাত বরণ করেছিলেন। 

সাবেক খ্রিস্টান জুন বিন হুওয়াওয়ি এক সময় মহানবীর (সা) বিখ্যাত নিবেদিত-প্রাণ সাহাবি হযরত আবু জার গিফারির ক্রীতদাস ছিলেন। তৃতীয় খলিফা ওসমান বিন আফফান যখন আবু জারকে রাবাধা মরুভূমিতে নির্বাসনে পাঠান তখন তিনি আমিরুল মু'মিনিন হযরত আলীর (আ) কাছে চলে আসেন। হযরত আলীর অনুরোধে জুন তাঁর কাছেই থেকে যান। 

৪০ হিজরিতে হযরত আলী (আ) শহীদ হলে জুন ইমাম হাসান (আ)'র কাছে থাকেন। এরপর ইমাম হাসান (আ) ৫০ হিজরিতে শহীদ হলে জুন ইমাম হুসাইনের সঙ্গে যোগ দেন। ইমাম হুসাইন (আ) মদিনা ত্যাগ করলে তিনি ইমামের সঙ্গেই থাকার জন্য পীড়াপীড়ি করেন। কারবালায় প্রায় সময়ই তিনি ইমামকে সঙ্গ দিয়েছিলেন। সুন্দর আচার-আচরণ ও অগাধ জ্ঞানের কারণে ধুসর ও কোঁকড়ানো চুলের অধিকারী  বৃদ্ধ জুনকে সবাই শ্রদ্ধা করতেন। 

আশুরার আগের রাতে ইমাম জুনকে নিরাপদ কোনো স্থানে চলে যেতে বললে এই কৃষ্ণাঙ্গ বীর বলেন, 'আমি আপনার সাহচর্য ও মেহমানদারিতে উপকৃত হওয়া সত্ত্বেও আপনার বিপদের সময় আপনাকে ত্যাগ করব?-এটা তো ন্যায় বিচার হতে পারে না।' 

পরের দিন ১০ মহররম ইমামের ক্ষুদ্র বাহিনীর ওপর জালিম উমাইয়া শাসক ইয়াজিদের লেলিয়ে-দেয়া বিশাল বাহিনীর প্রথম দু'টি হামলা প্রতিহত করেছিলেন জুন। জোহরের নামাজের পরই যুদ্ধে নেমেছিলেন তিনি। যুদ্ধে নেমে জুন আবৃত্তি করছিলেন:

লড়তে প্রস্তুত আত্মার অধিকারী আমি রাহে আল্লাহর
আল্লাহর দুষমনদের রক্তের জন্য তৃষ্ণার্ত একটি তরবারি আছে আমার।
মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমি লড়ে যাব তাদের সঙ্গে শত্রু যারা আল্লাহর, 
আল্লাহর রাসুলের নাতির সেবায় মশগুল হবে আমার তরবারি আর জিহ্বা বারবার। 

জুনের বীরত্ব ও আত্মত্যাগের ঘটনা প্রসঙ্গে শহীদ অধ্যাপক মুর্তাজা মুতাহ্‌হারি (র) 'ইমাম হুসাইনের (আ) কালজয়ী বিপ্লব' শীর্ষক বইয়ে লিখেছেন: আশুরার দিন যারা রাসূলের (সা.) খান্দানের পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন তাদের মধ্যে ক’জনকেই শেষ মুহূর্তে ইমাম হুসাইন (আ.) নিজে এসে ধরেছিলেন। এই ক’জনের মধ্যে দু’জন মুক্ত হওয়া গোলাম ছিল। তাদের একজন হযরত আবুজারের গোলাম ছিলেন ও পরে তিনি তার মুক্তিদান করেন। তিনি ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ, নাম জুন। মুক্ত হবার পরও তিনি নবী-বংশকে ছেড়ে চলে যাননি। নবী-বংশের খাদেম হিসেবে তিনি স্বেচ্ছায় থেকে গিয়েছিলেন।

আশুরার দিন এই জুন ইমাম হোসাইনের (আ.) কাছে এসে বললেন,‘আমাকে যুদ্ধে যাবার অনুমতি দিন।’ ইমাম বললেন,‘দেখ,জুন। তুমি সারা জীবন লোকের খেদমত করলে। তোমার উচিত বাড়ীতে ফিরে গিয়ে এখন থেকে মুক্ত জীবন শুরু করা। তুমি এ পর্যন্ত যা করছে তাতেই আমরা তোমার উপর সন্তুষ্ট।’ কিন্তু জুন নাছোড়বান্দা। ইমামের কাছে অনেক কাকুতি-মিনতি করে যুদ্ধে যেতে চাইলেন। তবুও ইমাম হুসাইন (আ.) না করলেন। কিন্তু এরপর জুন কৌশল হিসেবে এমন এক কথা বললেন যা শুনে ইমাম হুসাইন (আ.) আর তাঁকে আটকানো জায়েজ হবে না বলে মনে করলেন। জুন বললেন: হে ইমাম! বুঝতে পেরেছি কেন আমাকে অনুমতি দিচ্ছেন না! আমি যে কালো! আমার গা থেকে যে দুর্গন্ধ বের হয়! আমার কি শহীদ হওয়ার যোগ্যতা আছে! আমি কোথায় আর এ সৌভাগ্য কোথায়!

একথা শুনে ইমাম হুসাইন বললেন: না,তার জন্যে না। ঠিক আছে তুমি যাও। জুন অনুমতি পেয়ে খুব খুশী হলেন। বীরদর্পে (ঘোড়া নিয়ে) ময়দানে প্রবেশ করলেন। প্রাণপণ লড়াই করলেন এবং শেষ পর্যন্ত আহত হয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন। এবার কিন্তু ইমাম হুসাইন (আ.) নিজেই তাঁর কাছে ছুটে এলেন। তাঁর মাথা কোলে তুলে নিয়ে ইমাম দোয়া করলেন:
« ...أللهمَّ بَیِّض وَجهَهُ وَ طَیِّب ریحَهُ» 
 হে আল্লাহ,পরকালে তাঁকে সাদা চামড়ার করে দিন, তাঁর গা থেকে সুগন্ধ ছড়িয়ে দিন। তাকে আবরারদের সাথে পুনরুত্থান করুন। (আবরার অর্থাৎ যারা মুত্তাকিনদের চেয়েও উচ্চ-শ্রেণীর মু'মিন ) কুরআনে সূরা মুতাফফেফিফেনর ১৮ নম্বর আয়াতে এসেছে :
(کَلَّا إِنَّ کِتَابَ الْأَبْرَارِ لَفِی عِلِّیِّینَ)
‘‘অবশ্যই পুণ্যবানদিগের (আবরার) আমলনামা ইল্লিয়িনে’’।

এবার এক মর্মভেদী দৃশ্যের অবতারণা হলো। আঘাতের চোটে জুন বেহুশ হয়ে গিয়েছিলেন। তার চোখের ওপর রক্ত জমাট বেধে ছিল। ইমাম হুসাইন (আ.) আস্তে আস্তে তাঁর চোখের উপর থেকে রক্ত সরিয়ে দিলেন। এসময় জুনের হুশ ফিরলো। ইমাম হুসাইন  (আ.)-কে দেখে তিনি হাসলেন। ইমাম হুসাইন (আ.)ও তাঁর মুখের উপর মুখ রাখলেন যা কেবলমাত্র জুনের এবং হযরত আলী আকবরের ভাগ্যেই হয়েছিল।

ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁর মুখের ওপর নিজের মুখ রাখায় জুন এতোই খুশি হলেন যে মৃদু হাসলেন এবং ঐ হাসি মুখেই শাহাদাত বরণ করলেন।

তাঁর দেহের রং অলৌকিকভাবে ফর্সা বা সাদা হয়ে গিয়েছিল। শাহাদাতের দশ দিন পর জুনের লাশ সনাক্ত করা সম্ভব হয় এবং বনি আসাদ গোত্রের লোকেরা তাঁকে দাফন করে।  

শাহাদাতের তিন দিন পরও কারবালার ময়দানে শহীদদের লাশ পড়ে ছিল!

উল্লেখ্য, শাহাদাতের তিন দিন পরও কারবালার ময়দানে শহীদদের লাশ পড়ে ছিল। ওইসব লাশ ফুলে উঠেনি ও সেখানে কোনো দূর্গন্ধও দেখা দেয়নি। স্থানীয় বেদুইনরা এখানে এসে এক অপূর্ব বিশেষ সুঘ্রাণ পেয়ে বিস্মিত হত। এমন মিষ্টি সুঘ্রাণ তারা জীবনেও অনুভব করেনি। তারা এ বিষয়ে ইমাম জাইনুল আবেদিনকে (আ) প্রশ্ন করলে তিনি জানান যে এই বিশেষ সুঘ্রাণ আসছে জুনের লাশ থেকে ইমাম হুসাইনের (আ) দোয়ার বরকতে। কারবালার শহীদদের অন্য সুঘ্রাণও ছিল যা অনুভব করার যোগ্যতা সবার ছিল না। #

পার্সটুডে/এমএএইচ

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন