চলতি শতকের বৃহত্তম হলোকাস্ট বা গণহত্যা এবং ইসরাইলের সম্ভাব্য বিলুপ্তি  
https://parstoday.ir/bn/news/west_asia-i129938-চলতি_শতকের_বৃহত্তম_হলোকাস্ট_বা_গণহত্যা_এবং_ইসরাইলের_সম্ভাব্য_বিলুপ্তি
গাজায় একটানা প্রায় বিশ দিন ধরে ইসরাইলি গণহত্যা অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ইসরাইলের নির্বিচার বোমা বর্ষণে প্রতিদিনই শহীদ হচ্ছেন বহু বেসামরিক গাজাবাসী এবং নিহতদের ৭০ শতাংশই হল শিশু ও নারী।
(last modified 2026-04-22T13:03:21+00:00 )
অক্টোবর ২৭, ২০২৩ ১৬:২৬ Asia/Dhaka

গাজায় একটানা প্রায় বিশ দিন ধরে ইসরাইলি গণহত্যা অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ইসরাইলের নির্বিচার বোমা বর্ষণে প্রতিদিনই শহীদ হচ্ছেন বহু বেসামরিক গাজাবাসী এবং নিহতদের ৭০ শতাংশই হল শিশু ও নারী।

নিহতের সংখ্যা সাত হাজার ছাড়িয়ে গেছে এবং তাদের মধ্যে প্রায় তিন হাজারই হল শিশু ও দুই হাজার জন নারী। আহতের সংখ্যা ১৮ হাজারেরও বেশি। অন্যদিকে ধ্বংসস্তূপের নীচে আটকা পড়ে আছে অন্তত দেড় হাজার ফিলিস্তিনির লাশ।  

দখলদার ইসরাইলি শাসকগোষ্ঠী স্বাধীনতাকামী হামাসকে উল্লেখ করছে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে। অথচ দখলদারদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রাম জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বৈধ। ইসরাইল গাজার উত্তরাঞ্চলের অধিবাসীদেরকে এই উপত্যকার দক্ষিণাঞ্চলে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। এ ধরনের অবৈধ নির্দেশ থেকেও বোঝা যায় ইসরাইল জাতিগত শুদ্ধি অভিযান চালাচ্ছে গাজায়।

মার্কিন সরকারসহ পশ্চিমা সরকারগুলো গাজায় ইসরাইলি গণহত্যা বন্ধের জন্য কোনো চাপ প্রয়োগ করছে না তেল-আবিবের সন্ত্রাসী সরকারের ওপর। মার্কিন সরকার ছাড়াও ফ্রান্স, ব্রিটেন ও জার্মানির সরকার মানবাধিকারের প্রতি বিন্দুমাত্রও শ্রদ্ধা না দেখিয়ে গাজায় ইসরাইলি গণহত্যা অভিযানে সমর্থন ও সহযোগিতা যুগিয়ে যাচ্ছে এবং তারা বলছে ইসরাইলের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে। বেসামরিক নারী ও শিশুদেরকে হত্যা করাই কি আত্মরক্ষা? গাজার স্কুল, হাসপাতাল, মসজিদ ও গির্যাও ইসরাইলি হামলার হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। গাজায় ইসরাইলের নির্বিচার গোলা বর্ষণে এ পর্যন্ত ইসরাইলের ৫০ জন যুদ্ধবন্দিও নিহত হয়েছে।  

ইসরাইল গাজার ওপর সর্বাত্মক অবরোধ আরোপ করে রেখেছে এবং সেখানে খাদ্য, জ্বালানী, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহেও বাধা দিচ্ছে। তাই এটা স্পষ্ট যে ইসরাইল গাজায় যুদ্ধ অপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে পরিকল্পিত জাতিগত শুদ্ধি-অভিযানের মাধ্যমে । 

জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক প্রধান কর্মকর্তা মার্টিন গ্রিফিতস বলেছেন, মানবতার একটি অংশের অকাট্য অধিকার রক্ষা করতে গোটা বিশ্ব ব্যর্থ হচ্ছে। স্পেনের সামাজিক অধিকার বিষয়ক মন্ত্রী আইয়োনি বেলাররা পরিকল্পিত গণহত্যা চালানোর দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর বিচার করার দাবি জানিয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় জোটও গাজায় ইসরাইলি অপরাধযজ্ঞের শরিক বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।  তাই এটা স্পষ্ট গাজায় ইসরাইলের পরিচালিত গণহত্যা ও জাতিগত শুদ্ধি অভিযান চলতি শতকের সবচেয়ে বড় গণহত্যা ও জাতিগত শুদ্ধি অভিযান। ইসরাইল গত শতকেও এমন অনেক গণহত্যা অভিযান চালিয়েছে। ইরানসহ বিশ্বের অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি গাজায় চলমান ইসরাইলি অপরাধযজ্ঞকে প্রকৃত হলোকাস্ট বলেও অভিহিত করেছেন। 

সম্প্রতি নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে জাতিসংঘ মহাসচিব গুতেরেসও বলেছেন, ‘হামাসের হামলা শূন্য থেকে হয়নি। ফিলিস্তিনের মানুষ ৫৬ বছর ধরে শ্বাসরুদ্ধকর দখলদারিত্বের শিকার হয়েছে। তাঁরা তাদের ভূখণ্ড বসতিতে পরিণত হতে এবং সহিংসতায় জর্জরিত হতে দেখেছে। তাঁদের অর্থনীতি থমকে গেছে। এই মানুষগুলো বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং তাঁদের ঘরবাড়ি ধ্বংস করা হয়েছে। তাঁদের দুর্দশার রাজনৈতিক সমাধানের আশা ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।’

ইসরায়েলের নাম উল্লেখ না করে গুতেরেস বলেন, ‘বেসামরিক লোকজনকে রক্ষা করার অর্থ তাঁদের মানব ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা নয়। সুরক্ষা দেওয়ার অর্থ এই নয় যে, ১০ লাখ মানুষকে দক্ষিণে চলে যেতে বলা, যেখানে কোনো আশ্রয় নেই, খাবার নেই, পানি নেই, ওষুধ নেই, জ্বালানি নেই। আর মানুষকে দক্ষিণে যেতে বলে সেখানে বোমাবর্ষণ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।’ গুতেরেস বলেন, ‘গাজায় মানবিক আইনের যে সুস্পষ্ট লঙ্ঘন আমরা দেখতে পাচ্ছি, তা নিয়ে আমি গভীর উদ্বিগ্ন।।’   

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সর্বশেষ পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেছে, উপত্যকাটিতে ৭ অক্টোবর থেকে ইসরায়েলের অব্যাহত বোমা হামলায় ৭ হাজার ২৮ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে শিশু ২ হাজার ৯১৩, নারী ১ হাজার ৭০৯ জন এবং বৃদ্ধ ৩৯৭ জন। এর মধ্যে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নিহত হয়েছেন প্রায় ৫০০ জন। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে আসলেই এত বিপুল সংখ্যক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে কিনা! এরপর  গাজার ফিলিস্তিন সরকার সাত হাজারেরও বেশি নিহত ব্যক্তির নামের তালিকা প্রকাশ করেছে  ২১২ পৃষ্ঠায়! হত্যাযজ্ঞ নিয়ে কি নিষ্ঠুর মার্কিন  পরিহাস! 

ইসরাইলি হামলায় আহত ফিলিস্তিনি শিশু 

২০ দিন ধরে অবিরাম বোমাবর্ষণে গাজায় দুই লাখ আবাসিক ইউনিট ধ্বংস হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন গাজার গণপূর্তমন্ত্রী মোহাম্মদ জিয়ারা। স্থানীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে গাজার ২৩ লাখ মানুষের মধ্যে অর্ধেকের বেশি গৃহহীন হয়েছেন। মারা গেছেন ১০১ স্বাস্থ্যকর্মী।

গাজার সর্বত্র জরুরি পণ্যের জন্য হাহাকার চলছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পানি, খাবার ও চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে ভীষণ মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন উপত্যকাটির অধিবাসীরা। এ অবস্থার মধ্যে শনিবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ছয় দিনে গাজায় ত্রাণ নিয়ে মাত্র ৭৪টি ট্রাক প্রবেশ করেছে। অথচ সংঘাত শুরুর আগে স্বাভাবিক অবস্থায় উপত্যকাটিতে প্রতিদিন গড়ে ৪৫০ ট্রাক ত্রাণ-সহায়তা যেত।

অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার নিরপরাধ মানুষের ওপর দখলদার ইসরাইল সরকারের অপরাধযজ্ঞে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘নিশ্চিত সহযোগী’র ভূমিকা পালন করছে বলে মন্তব্য করেছেন ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী। 

আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী আরও বলেন, গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধযজ্ঞ কোনো না কোনোভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই পরিচালনা করছে। দখলদার ইসরাইলকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতেই আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশগুলোর শীর্ষ নেতারা একের পর এক তেল আবিব সফর করছে বলে মন্তব্য করেন সর্বোচ্চ নেতা।

আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী বলেন, “যদি তারা ইসরাইলকে ধ্বংস হয়ে যেতে না দেখত তাহলে তারা সংহতি জানানোর জন্য এভাবে একের পর এক লাইন ধরে তেল আবিবে ছুটে আসত না। ফিলিস্তিনি যোদ্ধারা ইসরাইলের ওপর অত্যন্ত শক্ত ও ভাগ্য নির্ধারণী আঘাত হেনেছে। কিন্তু এই আঘাতপ্রাপ্ত ও আহত ইসরাইল সরকারকে পশ্চিমা শয়তানি শক্তিগুলো জোর করে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে।  আর দখলদার এই সন্ত্রাসী ইসরাইল ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের কোনো ক্ষতি করতে না পেরে এখন নিরীহ ও নিরস্ত্র বেসামরিক ফিলিস্তিনিদের ওপর সকল ক্ষোভ ঝাড়ছে।”

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, “ইহুদিবাদী ইসরাইল এখন পর্যন্ত ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের কোনো ক্ষতি করতে পারেনি এবং ভবিষ্যতেও পারবে না।” তিনি বলেন, ফিলিস্তিনি যোদ্ধারা সর্বোচ্চ মনোবল নিয়ে ইহুদিবাদীদের পরাজিত করার জন্য পূর্ণ প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে।  ইহুদিবাদী অপরাধী-চক্র ও তার পশ্চিমা দোসরদের ব্যাপারে উদাসীন অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে তিনি মুসলিম দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানান। আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী বলেন, “নিঃসন্দেহে ফিলিস্তিন বিজয়ী হবে।”

বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞদের অনেকেই বলছেন, ইসরাইল যদি  মজলুম ফিলিস্তিনি জাতি ও তাদের সংগ্রামী অংশ ও তাদের প্রতি সহানুভূতিশীলদের প্রতিশোধের আগুনে নিকট ভবিষ্যতে ধ্বংস হয়ে যায় তা হবে খুব স্বাভাবিক ও যৌক্তিক প্রতিক্রিয়া। এ সংক্রান্ত সর্বশেষ দু'টি খবর হল: এক.  ইরিত্রিয়ায় ইসরাইলের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে এবং এতে ইসরাইলি ঘাটিগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়া ছাড়াও ইসরাইলের একজন পদস্থ সেনা কর্মকর্তা নিহত হয়েছে।

দুই. অবসর প্রাপ্ত মার্কিন জেনারেল ডগলাস ম্যাক আর্থার বলেন : কয়েক দিন আগে ইসরাইলী বন্দিদের মুক্ত করতে গাজায় এক কমান্ডো অভিযান চালিয়েছিল, কিন্তু তা ব্যাপক লজ্জাজনক ক্ষয়ক্ষতিসহ ব্যর্থ হয়েছে। গত পরশু ইসরাইল আবারো গাযায় অনুপ্রবেশের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। ইসরাইলের একটি শহরে ইসরাইলি মন্ত্রীসভার গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক চলার সময় আশপাশে এসে পড়ে হামাসের রকেট! 

 ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির আবদুল্লাহিয়ান মার্কিন সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, গাজায় হামলা বন্ধ না হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়া ঠেকান, গাজায় গণহত্যা বন্ধ না হলে আগুনে আমেরিকাও আক্রান্ত হবে। #

পার্সটুডে/এমএএইচ/২৭

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।