হজ ও মিনা ট্র্যাজেডি
https://parstoday.ir/bn/news/west_asia-i19351-হজ_ও_মিনা_ট্র্যাজেডি
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সবচেয়ে বেশি বিপর্যয়গুলো ঘটেছে মিনা অঞ্চলে। কখনও অগ্নিকাণ্ড ও কখনও ভিড়ের চাপে দেখা দিয়েছে মানবীয় বিপর্যয়। এসব ট্র্যাজেডিতে প্রাণ হারিয়েছেন হাজার হাজার হজযাত্রী। 
(last modified 2026-03-14T11:23:49+00:00 )
সেপ্টেম্বর ০৬, ২০১৬ ০৬:১৪ Asia/Dhaka
  • হজ ও মিনা ট্র্যাজেডি

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সবচেয়ে বেশি বিপর্যয়গুলো ঘটেছে মিনা অঞ্চলে। কখনও অগ্নিকাণ্ড ও কখনও ভিড়ের চাপে দেখা দিয়েছে মানবীয় বিপর্যয়। এসব ট্র্যাজেডিতে প্রাণ হারিয়েছেন হাজার হাজার হজযাত্রী। 

হজ ও মিনা ট্র্যাজেডি-১

হজ ইসলামের অন্যতম প্রধান সামষ্টিক ইবাদত যা এনে দেয় মহান আল্লাহর নৈকট্য ও আধ্যাত্মিক পূর্ণতা।

'এবং কেবল আল্লাহর জন্য মানুষের ওপর এ ঘরের হজ করা ওয়াজিব, যাদের সেখানে পৌঁছার ক্ষমতা রয়েছে এবং যারা (ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও) অস্বীকার করে ( তথা হজ করবে না তারা আসলে নিজেদেরই ক্ষতি করেছে তারা জেনে রাখুক যে), আল্লাহ বিশ্বের কারো মুখাপেক্ষী নন, তথা কারোরই পরোয়া করেন না।' (সুরা আলে ইমরান-৯৭)

নিরাপদ পরিস্থিতিতে আর্থিক ও শারীরিক দিক থেকে সক্ষম প্রত্যেক  মুসলমানের জন্য জীবনে একবার হজ পালন করা ফরজ। হজ পালন করতে হয় নির্দিষ্ট সময়ে ও কয়েকটি নির্দিষ্ট পবিত্র স্থানে। অবশ্য শারীরিক দিকে থেকে কেউ অক্ষম হলে অন্য কোনো সুস্থ ব্যক্তি তার জন্য হজ পালন করতে পারেন। আর্থিক সক্ষমতা বলতে এটা বোঝায় যে হজ পালনের খরচ এবং  হজের সময়  হজ থেকে ঘরে ফিরে আসা পর্যন্ত পরিবারের ভরণ-পোষণের খরচ জোগানোর সক্ষমতা থাকতে হবে। হজ পালনের সক্ষমতা বা শর্তের ক্ষেত্রে প্রথম দু’টি শর্ত  হজযাত্রীর নিজের শারীরিক ও আর্থিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে। কিন্তু পথের এবং মক্কা ও মদিনার নিরাপত্তা ও শান্তি সুনিশ্চিত করা মূলত নির্ভর করে হজ-সংশ্লিষ্ট পবিত্র স্থানগুলোর নিয়ন্ত্রক এবং নিরাপত্তা কর্মীদের ওপর। 

অতীতকালে মুসলমানরা হজে যেত মূলত ঘোড়ায় বা উটে চড়ে এবং সাগর-পথে নৌকায় চড়ে। সেযুগে হজযাত্রীদের কাফেলা মাঝে-মধ্যেই চোর-ডাকাতের পাল্লায় পড়ত। কিন্তু বর্তমান যুগে হজ-কাফেলাগুলোর জন্য সে ধরনের আশঙ্কা প্রায় নেই বললেই চলে। বর্তমান যুগে হজযাত্রীদের নিরাপত্তা বলতে যা বোঝায় তা হল পবিত্র মক্কা ও মদিনার নিরাপত্তা।

হজকে বিশ্বের মুসলমানদের বৃহত্তম বার্ষিক সমাবেশও বলা হয়। তাই এই সম্মেলনের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্বটি বর্তায় পুণ্যভূমি মক্কা ও মদিনার নিয়ন্ত্রক সরকারের ওপর তথা সরকারের ওপর যে সরকার নিজেকে ইসলামের দুই প্রধান পবিত্র স্থানের খাদেম বলে দাবি করে থাকে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি রাজ-সরকার হজযাত্রীদের যথাযথ ও প্রত্যাশিত নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
 

সৌদি সরকার পেট্রো-ডলার ব্যবহার করে মক্কা ও মদিনার হারাম শরিফের সম্প্রসারণ করেছে। আর এ অজুহাতে সৌদি ওয়াহাবি সরকার অনেক ঐতিহাসিক ইসলামী স্থাপনা ধ্বংস করেছে। কিন্তু তারা নিরাপত্তা দিতে পারছে না হজযাত্রীদের। সৌদি সরকারের পরিকল্পনাহীনতা, অব্যবস্থাপনা ও উদাসীনতার কারণে নানা দুর্ঘটনায় দেশটিতে প্রতি বছরই মারা যাচ্ছেন অনেক হজযাত্রী। অথচ নিরাপত্তা এবং যোগাযোগের আধুনিক নানা প্রযুক্তি ও সাজ-সরঞ্জাম ব্যবহার করে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব কিংবা হতাহতের সংখ্যা সর্বনিম্ন রাখা সম্ভব। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হজ মওসুমে ও হজের সময় বড় ধরনের নানা দুর্ঘটনা থেকে বোঝা যায় আলে-সৌদ সরকার হজযাত্রীদের নিরাপত্তা দেয়ার যোগ্যতাই রাখে না। 

হজ ও মিনা ট্র্যাজেডি-২

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সবচেয়ে বেশি বিপর্যয়গুলো ঘটেছে মিনা অঞ্চলে। এ অঞ্চলটি পবিত্র মক্কা শহর থেকে ৫ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত। কখনও অগ্নিকাণ্ড ও কখনও ভিড়ের চাপে দেখা দিয়েছে মানবীয় বিপর্যয়। এসব ট্র্যাজেডিতে প্রাণ হারিয়েছেন হাজার হাজার হাজি বা হজযাত্রী। সৌদি হজ-কর্তৃপক্ষ ও সরকারের উদাসীনতার কারণেই বার বার ঘটছে এসব বিপর্যয়।

মিনায় হাজিরা আসেন দশ জিলহজ তথা পবিত্র কুরবানির ঈদের দিন। এখানে তারা ১২ জিলহজ পর্যন্ত থাকেন এবং শয়তানের তিন প্রতীকী স্তম্ভে তিন দফায় পাথর নিক্ষেপ করেন। পশু কুরবানি দেয়ার পর তারা ফিরে আসেন মক্কায়। [এখানেই তথা মিনায় হযরত ইব্রাহিম (আ) মহান আল্লাহর নির্দেশে নিজ পুত্র ইসমাইল (আ)-কে কুরবানি করতে উদ্যত হয়েছিলেন। আর পথে শয়তান (মানুষের বেশ ধরে) একাজে ইব্রাহিম (আ)-কে বিরত রাখার জন্য কুমন্ত্রণা দেয়ার চেষ্টা করায় তিনি তার দিকে ছোটো ছোটো পাথর নিক্ষেপ করেছিলেন কয়েকবার।]

১৯৭৫ সালে মিনায় গ্যাসের ক্যাপসুল বিস্ফোরণে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডে নিহত হন ২০০রও বেশি হাজি এবং আহত হন আরও কয়েক শত হাজি। এ ঘটনায় সৌদি ত্রাণ ও উদ্ধার-কর্মীরা ছিল নীরব দর্শক।  মিনায় ১৯৯৫ সালেও অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ১০০ জন হতাহত হন। অর্থাৎ ২২ বছর পরও মিনার নিরাপত্তা-পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে ব্যর্থ হয় সৌদি কর্তৃপক্ষ। 

সৌদি সরকার হাজিদের জান-মালের নিরাপত্তার প্রতি উদাসীন হলেও নানা প্রচারণার কাজে বিপুল অংকের অর্থ খরচ করে থাকে। হজ পরিচালনায় সৌদি সরকারের ব্যর্থতার খতিয়ান অত্যন্ত দীর্ঘ। যেমন, ২০০৬ সালে মিনায় পদদলিত হওয়ার ঘটনায় নিহত হয় ৩৫০ জন হজযাত্রী। সে বছর হজ শুরুর আগের দিন মসজিদুল হারামের পাশে একটি ৮ তলা হোটেল ভবন ভেঙ্গে পড়ার ঘটনায় নিহত হয় ৭৩ জন। ২০০৪ সাল মিনায় হজের শেষ দিনে নিহত হয় ২৪৪ জন হজযাত্রী। ২০০১ সালে হজের শেষ দিনে মিনায় পদদলিত হয়ে নিহত ৩৫ জন হাজি। ১৯৯৮ সালে মিনার একটি ওভারপাস থেকে কয়েকজন হজযাত্রী পড়ে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট আতঙ্কের ফলে পদদলিত হয়ে মারা যান ১৮০ জন হাজি। ১৯৯৭ সালে মিনার তাবুতে আগুন লাগার ঘটনায় নিহত হন ৩৪০ জন হজযাত্রী। আহত হন ১৫০০ জন। ১৯৯৪ সালে মিনায় পদদলিত হয়ে মারা যান প্রায় ২৭০ জন। ১৯৯০ সালে মক্কাগামী একটি সুড়ঙ্গ পথে পদদলিত হওয়ার ঘটনায় নিহত হন এক হাজার ৪২৬ জন হজযাত্রী।

১৯৮৭ সালে ইরানি হজযাত্রীদের ওপর হামলা

১৯৮৭ সালে হজযাত্রীরা কাফির ও মুশরিকদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা দেয়ার ফরজ দায়িত্ব পালন করার সময় মার্কিন ও ইসরাইল-বিরোধী শ্লোগান দেয়ায় সৌদি সেনাদের গুলিতে প্রায় ৪০০ থেকে ৬০০ হাজি শহীদ হন। শহীদদের বেশিরভাগই ছিলেন ইরানি নারী ও পুরুষ হজযাত্রী। 

গত বছরের হজের সময় পবিত্র ঈদের দিন মিনায় ভিড়ের চাপে বিপুল সংখ্যক হাজি নিহত হন। নিহতের সংখ্যা ছিল প্রায় দেড় হাজার ও নিখোঁজ ছিলেন প্রায় ১৬০০ জন। সৌদি নিরাপত্তা-কর্মীদের ভুল পদক্ষেপ বা উদাসীনতার ফলে সৃষ্ট এ ঘটনায়ও সৌদি উদ্ধারকর্মী ও নিরাপত্তা কর্মী চরম উদাসীনতার পরিচয় দিয়েছে বলে বিশ্বের বহু দেশ থেকে তীব্র সমালোচনা উঠেছে।
উল্লেখ্য, এর অল্প কয়েকদিন আগে ১১ সেপ্টেম্বর মক্কার মসজিদুল হারামে ক্রেন ভেঙে পড়ার ঘটনায় বেশ কয়েকজন ইরানি হজযাত্রীসহ প্রায় ১১০ জন হজযাত্রী নিহত ও কয়েক শত হজযাত্রী আহত হন।

আর কেবল মিনার ঘটনায় নিহত হয়েছেন ইরানের প্রায় ৫০০ হাজি। তাই এটা স্পষ্ট যে সৌদি সরকারের একার পক্ষে সুষ্ঠুভাবে হজ পরিচালনা করা সম্ভব নয়। পারস্য উপসাগরীয় বিষয়ক ইন্সটিটিউটের ডিরেক্টর আলী আল আহমাদ জানিয়েছেন, ১৯৮৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় দশ হাজার হজযাত্রী সৌদি অব্যবস্থাপনার কারণে নিহত হয়েছেন। তাই বহুজাতিক হজ ব্যবস্থাপনা চালুর দাবি জোরদার করা উচিত বলে তিনি মনে করেন। আলী আল আহমাদ আরও বলেছেন,  পদদলিত হয়ে মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনাগুলোর আলোকে শান্তির নগরী মক্কা এখন সম্ভবত মানব-ইতিহাসে  বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক শহর।

মিশরের ওয়াকফ বা দান বিষয়ক মন্ত্রী শেইখ সালমান মুহাম্মাদ মিনার সর্বশেষ বিপর্যয়সহ সাম্প্রতিক কয়েক দশকে হজ পরিচালনায় নানা ভুলের কথা তুলে ধরে বলেছেন,  হজ-প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনায় একটি বিপ্লব না আনা পর্যন্ত ভবিষ্যতেও এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে।
আর কারা হজ করতে আসবে বা কারা হজ করতে পারবে না তাও সৌদি সরকারের  একদেশদর্শী রাজনৈতিক সিদ্ধান্তর  মাধ্যমে নির্ধারণ করা ইসলাম-সম্মত নয় বলে ইসলাম বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। যেমন, সৌদি সরকার গত বছর ইয়েমেনি ও সিরিয়দের হজ করতে দেয়নি।#

ইহুদিবাদী ইসরাইলের সঙ্গে সৌদি সরকারের ঘনিষ্ঠতা ক্রমেই বাড়ছে

                                                       হজ ও মিনা ট্র্যাজেডি-৩

‘হজ ও মিনা ট্রাজেডি’ শীর্ষক ধারাবাহিকের গত পর্বে আমরা ২০১৫ সালের হজ মৌসুমে ঘটে যাওয়া দু’টি মর্মান্তিক ঘটনা অর্থাৎ মসজিদুল হারামে হাজিদের মাথার উপর ক্রেন ভেঙে পড়া এবং মিনার গণহত্যা সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করেছি। সেই সঙ্গে মিনার বিয়োগান্তক ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ইরানি হাজি মোহাম্মাদের স্মৃতিচারণ জেনেছি। এ পর্বে মোহাম্মাদের বর্ণনায় গত বছরের হজের বাকি ঘটনাগুলো জানা যাক:

মোহাম্মাদ বলেন, “বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.)’র শহর মদীনায় প্রবেশ করলাম। সবার মন তখন পড়ে রয়েছে মসজিদে নববীর কাছে। অচিরেই আমরা পৌঁছে গেলাম রাসূলুল্লাহ (সা.)’র স্মৃতি বিজড়িত এই মসজিদে। আমাদের দলনেতা মসজিদের প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে এটির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, এর গুরুত্ব এবং আধ্যাত্মিক দিক দিয়ে এই পবিত্র স্থাপনার মাহাত্ম বর্ণনা করেন। কিন্তু আমাদের সবাইকে অবাক করে দিয়ে সৌদি পুলিশ এসে আমাদের জটলাকে ভেঙে দেয়। একদল হজযাত্রীর সমবেত হওয়া এবং তাদের দলনেতার পক্ষ থেকে বক্তব্য দেয়ায় কি এমন ক্ষতি হলো যে, পুলিশ আমাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দিলে তা বুঝে ওঠা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। এর পরবর্তী দিনগুলোতেও মদীনার অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থান জিয়ারতের সময়ও আমাদের সঙ্গে সৌদি পুলিশ একই ধরনের আচরণ করে। এখান থেকে আমরা বুঝতে পারি মদীনা শহরকে তারা সেনানিবাসের মতো কঠোর নিরাপত্তা এলাকায় পরিণত করে রেখেছে।

মসজিদে নববীর ভেতরেও পুলিশ হজযাত্রীদের শান্তিতে ইবাদত করতে দেয়নি। হজযাত্রীরা বহু বছরের প্রতীক্ষার পর মদীনায় এসেছেন রাসূলের রওজা মুবারক জিয়ারত এবং দোয়া-দরুদ পাঠ করার আশা নিয়ে। কিন্তু সৌদি পুলিশ নিরাপত্তা রক্ষার অজুহাতে দোয়া পড়ার কোনো সুযোগই আমাদেরকে দেয়নি। তারা আমাদেরকে রাসূলের পবিত্র রওজার কাছেই ঘেঁষতে দেয়নি। ফলে আমরা দূরে দাঁড়িয়ে বিশ্বনবীর রুহ মুবারকের প্রতি দরুদ ও সালাম জানিয়ে দোয়া ইস্তেগফার পাঠ করেছি।

সৌদি পুলিশের এই কড়াকড়ি আরো বেড়ে যায় ‘বাকী’ কবরস্থানে। ওই কবরস্থানে শুয়ে আছেন অনেক মহান ইসলামি ব্যক্তিত্ব। বিশ্বনবীর স্ত্রীগণ, তাঁর একাধিক সন্তান, তাঁর একজন চাচা এবং দুই চাচাতে ভাইসহ বহু সাহাবীর কবর রয়েছে বাকি কবরস্থানে। এ ছাড়া, এখানে শুয়ে আছেন রাসূলুল্লাহ (সা.)’র চার পবিত্র বংশধর ও ইমাম। ১৯২৬ সালের আগ পর্যন্ত এসব কবরের উপর নির্মিত ছিল সুদৃশ্য মাজার। কিন্তু ওই বছর ওয়াহাবিরা তাদের নিজস্ব মতাদর্শের ওপর ভিত্তি করে সেই পবিত্র মাজারগুলোকে গুঁড়িয়ে দেয়।

সৌদি কর্তৃপক্ষের দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী, শুধুমাত্র পুরুষ হজযাত্রীদের দিনের নির্ধারিত কিছু সময়ে বাকি কবরস্থানে যাওয়ার অনুমতি রয়েছে। সেখানে কোনো কবরের কাছে দাঁড়ানো বা দোয়া করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই নিষেধাজ্ঞা শিয়া মুসলমানদের ইমামদের কবরের সামনে সবচেয়ে কঠোরভাবে বলবৎ রয়েছে। চার ইমামের কবরের সামনে মোতায়েন পুলিশ সেখানে রীতিমতো আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে। আমি অবাক হয়ে দেখলাম, সৌদি আরবে ধর্মীয় স্বাধীনতা বলে কিছু নেই এবং আলে সৌদ সরকার মক্কা ও মদীনায় তাদের ওয়াহাবি চিন্তাধারার প্রচার ও প্রসারে ব্যস্ত।”

মিনায় নিহতদের কয়েকজন

ইরানি হাজি মোহাম্মাদ নিজের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আরো বলেন, “এভাবে মদীনায় কয়েকদিন অবস্থানের পর পবিত্র মক্কা নগরীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করি। মরু পথে কয়েক ঘন্টার ভ্রমণ শেষে আল্লাহর ঘর সমৃদ্ধ মক্কা নগরীতে পৌঁছে যাই। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে এই শহরকে ‘নিরাপদ নগরী’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আমরা হোটেলে পৌঁছেই সেখান থেকে মসজিদুল হারামে যাওয়ার প্রস্তুতি নেই। অনেক আশা-আকাঙ্ক্ষা ও উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে মুসলমানদের পবিত্রতম মসজিদের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি। মসজিদুল হারামের প্রবেশপথের বিশালতা, পবিত্রতা ও আধ্যাত্মিক মাহাত্ম আমাদেরকে মুগ্ধ করে। কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করার পর কাবাশরীফের চারপাশে নির্মিত সুউচ্চ ভবনগুলো দেখে আমাদের মধ্যে তীব্র বিরক্তি সৃষ্টি হয়। আল্লাহর ঘরে চারপাশে কী উদ্দেশ্যে এত উঁচু ভবন নির্মাণ করা হয়েছে তা আমাদের বোধগম্য নয়। অনেক ক্ষেত্রেই এসব স্থাপনা কাবাঘর তাওয়াফকারী হাজিদের মনঃসংযোগে ব্যাঘাত ঘটায়।

যাই হোক, আমরা আল্লাহর ঘর তাওয়াফ এবং নামাজ শেষে মসজিদুল হারাম থেকে বেরিয়ে আসি। কিন্তু পায়ে হেঁটে কিছুদূর যেতে না যেতেই প্রচণ্ড ও বিকট শব্দে আমরা সবাই কেঁপে উঠি। এ শব্দ ভেসে আসে মসজিদুল হারামের ভেতর থেকে। কী হয়েছে তা দেখার জন্য সবাই শব্দের উৎসস্থলের দিকে দৌড়ে যাই। সেখানে গিয়ে এক মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখতে পাই। মসজিদুল হারামের আঙিনার আকাশে যেসব বিশাল ক্রেন বসানো ছিল তার একটি মাকামে ইব্রাহিমের ঠিক পেছনে ভেঙে পড়েছে। এর ফলে কাবাঘর জিয়ারতকারী বহু হাজি হতাহত হয়েছেন। যাদের মাথার উপর এটি ভেঙে পড়েছে তাদের অনেকের পুরো শরীর থেঁতলে গেছে। অনেকের হাত-পা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। আমরা তখন হতাহতদের সাহায্যে এগিয়ে যাই। কিন্তু সৌদি পুলিশ আমাদেরকে সে অনুমতি দেয়নি। তারা দ্রুততার সঙ্গে মসজিদুল হারাম থেকে সব হাজিকে বের করে দেয়। কাউকে ছবি তোলার বা ভিডিও করার অনুমতি দেয়া হয়নি।

ওই রক্তাক্ত পরিবেশ দেখার পর কয়েকদিন ধরে মনটা ভীষণ খারাপ ছিল। কোনো কাজেই মন বসছিল না। সৌদি সরকার এ ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ১০৭ এবং তাদের প্রায় দ্বিগুণ সংখ্যক মানুষ আহত হয় বলে ঘোষণা করে। সৌদি কর্তৃপক্ষ যথারীতি এ ঘটনায় তাদের দোষ অস্বীকার করে এবং প্রচণ্ড বাতাস ও ‘আল্লাহর ইচ্ছা’কে এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী করে।”

                                                       ‘হজ ও মিনা ট্র্যাজেডি’-৪

গত পর্বের আলোচনায় আমরা মুহাম্মাদ নামের একজন ইরানি হাজির স্মৃতিচারণ শুনেছি। তিনি পবিত্র মদিনায় সৌদি নিরাপত্তা কর্মীদের নৃশংসতা ও পবিত্র মক্কার কাবাঘর-সংলগ্ন মসজিদুল হারামের আঙ্গিনায় হজযাত্রীদের মাথার ওপর ক্রেন ভেঙ্গে পড়ার ভয়াবহ ঘটনার বিবরণ দিয়েছিলেন। আজ আমরা তার স্মৃতিচারণের বাকি অংশ শুনব। জনাব মুহাম্মাদ বলছিলেন: মসজিদুল হারামের আঙ্গিনায় হজযাত্রীদের মাথার ওপর ক্রেন ভেঙ্গে পড়ার ঘটনার পর এই মসজিদে গিয়ে ও কাবা ঘরের চারদিক প্রদক্ষিণ করে এবং ক্রেন-ট্র্যাজেডির শহীদদের জন্য নামাজ পড়ে ও দোয়া করে নিজেকে প্রশান্ত করার চেষ্টা করি। কিন্তু যতবারই  মসজিদুল হারামের দিকে যেতাম ততবারই এই পবিত্র মসজিদের চারদিকে থাকা বহু ক্রেন দেখে এই ভয়ে থাকতাম যে আবারও হয়তো কোনো একটি ক্রেন নিরপরাধ হজযাত্রীদের মাথার ওপর ভেঙ্গে পড়বে!
গতবছরের হজযাত্রী জনাব মুহাম্মাদ আরও বলছিলেন,

 দিনগুলো খুব দ্রুত অতিক্রান্ত হল। ওমরা হজ শেষ করার পর এবার আসল হজ পালনের সময় এলো। সবাই একসঙ্গে ইহরাম বাধলাম ও সবার সঙ্গে দল-বেঁধে পবিত্র আরাফাতের ময়দানের দিকে রওনা হলাম। এখানে সব কিছুতেই রয়েছে খোদার রঙ এবং ছড়িয়ে পড়ছিল আধ্যাত্মিকতার আলো। নয়ই জিলহজ আরাফা-দিবসে হযরত ইমাম হুসাইন (আ)’র বিখ্যাত আরাফার দোয়া পড়া হল। আধ্যাত্মিক বরকতে সমৃদ্ধ এ দোয়া বয়ে আনলো এক ভিন্ন অনুভূতি ও পরিবেশ। বিশেষ করে মোহসেন হাজি হাসানির কণ্ঠে পবিত্র কুরআনের সুমধুর তিলাওয়াত  গোটা আরাফাতের পরিবেশকে ভরিয়ে দিল পবিত্র আধ্যাত্মিক সৌরভে। সূর্যাস্তের দিকে হজযাত্রীরা ধীরে ধীরে ‘মাশারাল হারাম’ বা মুজদালিফা নামের পবিত্র স্থানের দিকে রওনা হলেন। সেখানেও সবাই ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল হলেন। আর কেউ কেউ ছোটো ছোটো পাথরের টুকরো সংগ্রহ করছিলেন যাতে পরের দিন মিনায় শয়তানের প্রতীকী স্তম্ভে সেগুলো নিক্ষেপ করা যায়।
গত বছরের হজযাত্রী জনাব মুহাম্মাদ আরও বলছিলেন:

পরের দিন পবিত্র ঈদুল আজহা। হজযাত্রীদের মধ্যে দেখা গেল ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা। সবাই দলে দলে এগিয়ে যাচ্ছিলেন পুণ্যভূমি মিনার দিকে। পথ বেশ দীর্ঘ। কিন্তু হজের মত এক পবিত্র ইবাদত সম্পন্ন করার প্রবল উৎসাহ ও উদ্দীপনা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একান্ত বাসনা পথের সমস্ত কষ্ট ও ক্লান্তিকে সহজ করে দিচ্ছিল। অবশেষে পৌঁছলাম সেই মহল্লাটিতে যে মহল্লাটিকে সৌদিরা প্রতি বছর হজের সময় ছেড়ে দেয় ইরানি হজযাত্রীদের কাছে। এলাকাটি ছিল নোংরা ও শয়তানের প্রতীকী স্তম্ভে পাথর নিক্ষেপ করার স্থান থেকে সবচেয়ে দূরে। সকালে নাস্তা খাব খুব কম। ক্লান্ত হওয়া সত্ত্বেও মিনার প্রচণ্ড গরম এড়ানোর জন্য ভোরেই রওনা দেব। আমাদের এটাও জানা ছিল যে সৌদিদের অব্যবস্থাপনার কারণে বিগত বছরগুলোতে মিনায় ঘটেছিল নানা দুর্ঘটনা। কিন্তু এ বছর অর্থাৎ ২০১৫ সালে হজ-যাত্রীর সংখ্যা লক্ষণীয় হারে কমে যাওয়ায় আবারও কোনো দুর্ঘটনা এখানে ঘটবে- এমন আশঙ্কা খুব কমই করা হচ্ছিল। অবশ্য সৌদিদের অযোগ্যতার কারণে মসজিদুল হারামে ক্রেন ভেঙ্গে পড়ার মত অপ্রীতিকর ঘটনার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছিলাম না কেউই। 

                                                     ‘হজ ও মিনা ট্র্যাজেডি’-৫
  
গত বছরের হজযাত্রী জনাব মুহাম্মাদ আরও বলছিলেন: সৌদি পুলিশ ইরানি হজযাত্রীদেরকে ২০৪ নম্বর সড়কের দিকে নিয়ে যায়। সড়কটি সংকীর্ণ ও শয়তানের প্রতীকী স্তম্ভে পাথর নিক্ষেপের স্থানে গিয়ে শেষ হয়েছে।  সকাল আটটা বেজে যাওয়ার পর ভিড়ের কারণে হজ-যাত্রীদের পথ-চলার গতি ধীর হয়ে আসে। এ অবস্থায় সবিস্ময়ে লক্ষ্য করলাম যে সৌদি পুলিশ আফ্রিকান হজযাত্রীদেরকেও অন্য এক সড়ক দিয়ে এই সংকীর্ণ পথে নিয়ে আসছে। ফলে হজযাত্রীদের এগুনোর গতি হয়ে পড়ে শম্ভুক গতির মত ধীর। আর প্রতি মুহূর্তে বাড়ছিল গরম। আমাদের কাফেলার প্রধান বলছিলেন, অন্য বছরগুলোর অভিজ্ঞতার আলোকে আশা করছি যে সৌদি কর্মীরা অনেকগুলো সিসি টিভিতে হজ-যাত্রীর গতিবিধি লক্ষ্য করে থাকেন। তাই হাজিদের চলমান প্রবল ভিড় ও ধীর-গতির কথা বিবেচনা করে ভিড় কমানোর জন্য কোনো শাখা-পথ বা সড়ক খুলে দিয়ে ভিড় কমানোর পদক্ষেপ নেবেন।
জনাব মুহাম্মাদ আরও বলছিলেন, 

কিন্তু মহা-বিস্ময়ের ব্যাপার হল ২০৪ নম্বর সড়কে হজযাত্রীদের এত ভিড়  দেখা সত্ত্বেও এ সড়কের সঙ্গে যুক্ত শাখা-সড়কগুলো ও এমনকি ২০৪ নম্বর সড়কের শেষ মাথাটিও বন্ধ রেখেছে সৌদি হজ-ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। ফলে আমরা হাজার হাজার হজযাত্রী যেন একটি ফাঁদে আটকা পড়লাম। প্রতি মুহূর্তেই বাড়ছিল হজ-যাত্রীর সংখ্যা। তাদের খাবার পানির রিজার্ভ কমে যাওয়ায় প্রতি মুহূর্তে অবস্থার অবনতি ঘটছিল। প্রচণ্ড গরম, তৃষ্ণা ও ক্লান্তি কমিয়ে দিচ্ছিল দেহের শক্তি। দু’টি সৌদি ত্রাণ-কেন্দ্র ছিল কাছেই। সেখান থেকে আসতে পারতো খাবার পানি বা অন্তত হাজিদের গায়ে ছিটানো যেত পানি। কিন্তু তা ঘটেনি। 
জনাব মুহাম্মাদ আরও বলছিলেন, 

মনে হচ্ছিল যেন সৌদিরা আল্লাহর ঘরের মেহমান তথা হজযাত্রীদেরকেই ঈদের দিন কুরবানি দিতে চেয়েছে। সকাল নটা বেজে গেল। দুর্বল হাজিরা বেহুঁশ হচ্ছিলেন একের পর এক। মহান  আল্লাহর নির্দেশে হজ করতে এসে সবাই আল্লাহর ওপরই ভরসা করছিলেন, কিন্তু সৌদি কর্তৃপক্ষের অযোগ্যতার কারণে তারা দুঃসহ বিপদের শিকার হলেন। যাদের কণ্ঠে কিছু শক্তি ছিল তারা তখনও মহান আল্লাহর নাম জপছিলেন গুনগুনিয়ে। অবশেষে এ বিশ্বাসই টিকে রইল যে ভিড়ের ক্রমবর্ধমান চাপ ও গরমে মৃত্যু অত্যাসন্ন এবং কেবল কোনো অলৌকিক ঘটনাই আমাদের রক্ষা করতে পারে।

মিনায় শহীদ হন আন্তর্জাতিক পুরস্কার-প্রাপ্ত ইরানি কারি মুহসিন হাজি হাসানি

                                                           ‘হজ ও মিনা ট্র্যাজেডি’-৬

গত পর্বের আলোচনায় আমরা মুহাম্মাদ নামের এক ইরানি হাজির স্মৃতিচারণ শুনছিলাম যিনি গত বছরের মিনা ট্র্যাজেডিতে সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়েছিলেন।

জনাব মুহাম্মাদ জানান যে, তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন যে ভিড়ের চাপে ও প্রচণ্ড গরমের প্রভাবে তৃষ্ণায় কাতর হজযাত্রীরা একে একে জ্ঞান হারাচ্ছিলেন ও অনেকেই মারা যাচ্ছিলেন। ফলে তিনি নিজের জন্যও একই পরিণতির কথা ভাবছিলেন। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে কয়েকজন হজযাত্রী দূর থেকে এসে তাকে ও আরও কয়েকজন হজযাত্রীকে ভিড়ের চাপে সৃষ্ট কয়েক-স্তরের মানব-স্তূপ থেকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করেন। কোনো এক হজযাত্রী তাকে সামান্য পানিও পান করতে দেন। ধীরে ধীরে কয়েকটি দেশের উদ্ধার-কর্মীরা এসে মৃত্যুর মুখোমুখি বহু হজযাত্রীকে উদ্ধার করেন। কিন্তু এর আগেই ভিড়ের চাপে পদপিষ্ট হয়ে নিহত হন হাজার হাজার হজযাত্রী। 

গত বছরের হজযাত্রী মুহাম্মাদ আরও জানান মিনা ট্র্যাজেডি ঘটার দুই ঘণ্টা পর সৌদি উদ্ধার-কর্মীরা ঘটনাস্থলে আসেন। অথচ ঘটনাস্থল থেকে খুব কাছেই ছিল তাদের অবস্থান এবং এ ধরনের পরিস্থিতি বা সংকট সমাধানের উপায়-উপকরণও তাদের কাছে ছিল। মিনা ট্রাজেডি ঘটার তিন ঘণ্টা পর সৌদি পুলিশ বা নিরাপত্তা কর্মীরা ঘটনাস্থল থেকে বিদেশী ত্রাণ-কর্মীদের তাড়িয়ে দেয়। অথচ এই বিদেশী স্বেচ্ছাসেবীরা খুব কার্যকরভাবে উদ্ধার ও সেবা-তৎপরতা চালাচ্ছিলেন।  সৌদিরা মৃত ও আধা-জীবিত বা আহত নির্বিশেষে জমিনে পড়ে থাকা সব হজযাত্রীকে তালাবদ্ধ-কনটেইনারে তুলে নিয়ে যায়। অথচ আহত বা আধা-জীবিত হজযাত্রীদেরকে পানি দিয়ে ও সেবা-যত্ন দিয়ে বাঁচানো সম্ভব হত। 

গত বছরের মিনা ট্র্যাজেডিতে  ইরানের বেশ কয়েকজন বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব শহীদ হন। যেমন, লেবাননে নিযুক্ত ইরানের সাবেক রাষ্ট্রদূত গাজানফার রোকনাবাদি এবং আন্তর্জাতিক-পুরস্কার-প্রাপ্ত ইরানি কারি মুহসিন হাজি হাসানি। রোকনাবাদির প্রতি সৌদি সরকার ক্ষুব্ধ ছিল। কারণ, লেবাননিদের বিপ্লবী ও ঐক্যের তৎপরতায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ও অবদান ছিল রোকনাবাদির। এ ছাড়াও মসজিদুল হারামে ক্রেন ভেঙ্গে পড়ার ঘটনায় শহীদ হন ইরানের একজন মহাকাশ-বিজ্ঞানী। 

আহত হাজিদের চিকিৎসা এবং নিখোঁজ ও শহীদ হাজিদের লাশ অনুসন্ধান ও তাদের লাশ দেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে সৌদি সরকারের হয়রানি, টালবাহানা ও অসহযোগিতাও ছিল লক্ষণীয়। এ বিষয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার কঠোর হুঁশিয়ারির পর সৌদি কর্তৃপক্ষ একান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও ইরানি হাজিদের লাশ দ্রুত ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করতে বাধ্য হয়।  

মিনায় শয়তানের একটি প্রতীকী স্তম্ভে পাথর মারার দৃশ্য

                                                     ‘হজ ও মিনা ট্র্যাজেডি’-৭ 
 
মিনা ট্র্যাজেডিসহ পবিত্র হজের সময় মক্কা ও মদিনায় অতীতে সংঘটিত নানা বিপর্যয় প্রমাণ করেছে যে সৌদি কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত অত্যাধুনিক যোগাযোগ-ব্যবস্থা ও সাজ-সরঞ্জামের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও হজ পরিচালনায় এবং হজের সময় দেখা-দেয়া কোনো সংকট মোকাবেলায় সক্ষম নয়। হজ পালনের ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতার কারণে অতীতের বছরগুলোর তুলনায় হজযাত্রীর সংখ্যাও অর্ধেকে হ্রাস পেয়েছে।
হজযাত্রীদের জন্য নিরাপদ ও সহজ চলাচলের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হলে গত বছরের মিনা ট্র্যাজেডি ঘটতো না বলে নানা দেশের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। মিনা ট্র্যাজেডিতে বিশ্বের নানা দেশের সাত হাজারেরও বেশি হজযাত্রী শহীদ হয়েছেন বলে মনে করা হয়। অথচ সৌদি সরকার নিহত হজযাত্রীর সংখ্যা প্রায় দশগুণ কমিয়ে উল্লেখ করছে। এই ট্র্যাজেডির জন্য কারা দায়ী তা তদন্ত করার জন্য আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবিকেও নাকচ করে আসছে সৌদি সরকার। মিনার সড়কগুলোতে হাজার হাজার ক্যামেরা বসানো থাকা সত্ত্বেও সৌদি সরকার এইসব ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজও প্রকাশ করা থেকে বিরত রয়েছে।

বলা হয় যে শয়তানের প্রতীকী স্তম্ভে পাথর মারার জন্য সেখানে আগত সৌদি ডেপুটি যুবরাজ মুহাম্মাদ বিন সালমান ও তার দেহরক্ষীদের গাড়ি-বহরকে যায়গা দিতে এবং তাদেরকে নিরাপত্তা দিতেই ২০৪ নম্বর সড়কটির শেষ মাথা বন্ধ করে দেয়া হয় ও এই সড়কের আশপাশের শাখা সড়কগুলোও বন্ধ রাখা হয়। আর এ কারণেই ঘটেছে প্রায় ৯০ বছরের সৌদি শাসনের ইতিহাসে বৃহত্তম হজ-বিপর্যয়। মিনায় ভিড়ের চাপে ও প্রচণ্ড গরমে আহত হজযাত্রীদের ওপর যদি হেলিকপ্টার থেকে পানি ছিটানো হত তাহলেও এত বেশি সংখ্যক হাজি শহীদ হতেন না। হজযাত্রীদের উদ্ধারের জন্য এগিয়ে আসা দক্ষ বিদেশী ত্রাণ-কর্মীদেরকে ঘটনাস্থল থেকে সৌদি পুলিশের মাধ্যমে তাড়িয়ে দেয়া এবং ঘটনাস্থলের খুব কাছেই থাকা বহু সৌদি ত্রাণ ও উদ্ধার-কেন্দ্রগুলোর নীরব দর্শকের ভূমিকা পালনের বিষয়ও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

জানা গেছে সৌদি সরকার মিনা-ট্র্যাজেডিতে নিহত ও নিখোঁজ হাজিদের ব্যাপারে নীরব থাকার জন্য বিশ্বের বহু দেশের সরকারকেই বিপুল অংকের অর্থ ঘুষ দিয়েছে। তা সত্ত্বেও কোনো কোনো দেশের সরকার, কর্মকর্তা ও হাজিদের প্রতিবাদ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। কেবল ইরানের ইসলামী সরকারই মিনা-ট্র্যাজেডির পূর্ণাঙ্গ তদন্তের ও দোষীদের বিচারের বিষয়টি আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে। ইরান তার কয়েকজন নিখোঁজ হাজির লাশ ছাড়া সব ইরানি হাজির লাশ সনাক্ত করতে ও তাদের দেশে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। অ-ইরানি বহু বিদেশী হাজিকে গোপনে সৌদি ভূখণ্ডে দাফন করা হয়।

ইরান মিনা ট্র্যাজেডির ক্ষতিপূরণ দিতে সৌদি সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছে ও সৌদি সরকারকে এ বিপর্যয়ের জন্য ক্ষমা চাইতে হবে বলে দাবি করে আসছে। এ ছাড়াও ইরান ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার তত্ত্বাবধানে হজ পরিচালনার দাবি জানাচ্ছে। আর ইরানের এইসব দাবির কারণেই সৌদি সরকার এ বছর ইরানিদেরকে হজ করার সুযোগ দেয়নি।  এ ছাড়াও সৌদি সরকার এ বছরও বিগত কয়েক বছরের মতই সৌদি হস্তক্ষেপকামীতা ও ইসরাইল-বিরোধী হওয়ার কারণে ইয়েমেনি এবং সিরিয় মুসলমানদেরও হজে আসার ওপর নিষেধাজ্ঞা বজায় রেখেছে।

মিনায় অতীতেও হজের সময় কয়েক বার ঘটেছে অগ্নিকাণ্ড

                                                            ‘হজ ও মিনা ট্র্যাজেডি’-৮ 

 সৌদি কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে হজের সময় সংঘটিত নানা বিপর্যয় ও মহা-বিপর্যয়ের দায় যে সৌদি সরকারকেই বহন করতে হবে সে বিষয়ে মুসলিম সরকার এবং জাতিগুলোর পক্ষ থেকে প্রবল আন্দোলন ও চাপ সৃষ্টি করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এ ব্যাপারে ইরান ছাড়া অন্য সরকারগুলোর দায়সারা গোছের ভূমিকার কারণে সৌদি সরকার মিনা বিপর্যয়ের ব্যাপারে ক্ষমা না চেয়ে বরং অত্যন্ত ঔদ্ধত্যপূর্ণ ভাষায় ইরান ও ইরানি হাজিদের ওপর দোষ চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছে এবং কোনো কোনো লেজুড়-বৃত্তিক প্রচার-মাধ্যমও সৌদি এ নীতির পক্ষে কাজ করেছে। অন্যদিকে হারাম-অর্থ কামাইয়ে অভ্যস্ত সৌদি আরবের দরবারি আলেমরা বিবেকের মাথা খেয়ে এবং কুরআনের বিধান লঙ্ঘন করে সৌদি রাজ-সরকারের যে কোনো অন্যায় আচরণকে বৈধতা দান করছেন। তারা বলছিলেন, মিনা-ট্র্যাজেডি ছিল হাজিদের জন্য খোদায়ি তকদিরের লিখন এবং এর সঙ্গে হজ-ব্যবস্থাপনার কোনো সম্পর্ক নেই!  

 স্বৈরতান্ত্রিক সৌদি সরকার ইসলামী মানবাধিকার ও ইসলামী বিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয় বলেই ইরান মিনা ট্র্যাজেডির বিচারের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক আদালতের শরণাপন্ন হতে বাধ্য হয়েছে। তাই অন্যান্য সরকারেরও উচিত এ ব্যাপারে ইরানের সহযোগী হওয়া। উল্লেখ্য সৌদি আরবে নেই গণতন্ত্র ও নির্বাচিত সংসদ, নেই বাক-স্বাধীনতা ও নারী-অধিকার। সেখানে মহিলাদের গাড়ি চালানোও নিষিদ্ধ!

বাস্তবতার ময়দানে হজ পরিচালনায় সৌদি ব্যর্থতা বার বার প্রমাণিত হয়েছে। মক্কা ও মদিনার পবিত্র মসজিদের নামাজ ও হজসহ নানা ধর্মীয় কার্যক্রমের নেতৃত্বে রাখা হয়েছে ইসলামের নামে নানা বিভ্রান্ত মতবাদ ও বিকৃত চিন্তায় বিশ্বাসী ওয়াহাবি আলেমদেরকে যা ইসলামের প্রধান মাজহাবগুলোর দৃষ্টিতে সৌদি সরকারের অন্যায় ও পক্ষপাতমূলক নীতির দৃষ্টান্ত।

 এ ছাড়াও ওয়াহাবি মতবাদে বিশ্বাসী সৌদি ও ওয়াহাবিদের জোট বিগত দুই শতকে ও বিশেষ করে গত প্রায় ৯০ বছরে মক্কা ও মদিনাসহ দেশটির অন্যান্য অঞ্চলে বার বার সুন্নি এবং শিয়া মাজহাবের অনুসারীদের ওপর নৃশংস দমন-অভিযান ও গণহত্যা চালিয়েছে। তারা জোর করে বহু সুন্নি মুসলমানকে ওয়াহাবিতে পরিণত করেছে। দায়েশ বা আইএসআইএল, আলকায়দা ও আননুসরার মত তাকফিরি-ওয়াহাবি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক বা গড-ফাদার হল সৌদি সরকার। বর্তমান যুগে সব নিরপেক্ষ বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞই মনে করেন যে ওয়াহাবি মতবাদই হচ্ছে তাকফিরি-জঙ্গিবাদের  প্রেরণার মূল উৎস।

ওয়াহাবি-সালাফিদের দৃষ্টিতে শিয়া ও সুন্নি মুসলমানরা মুশরিকের সমতুল্য। তাই তাদের জান-মাল ও স্ত্রী বা পরিবারকে গণিমতের মাল করে নেয়া ওয়াহাবিদের দৃষ্টিতে বৈধ এবং হজ করতে এসে যদি তারা গরু-ছাগলের মত মারা যায় তাতে কট্টর ওয়াহাবিরা খুশি হয় বৈকি। একজন সৌদি রাজা বলেছিলেন, একজন সুন্নি মুসলিম মহিলাকে বিয়ে করার চেয়ে পাশ্চাত্যের ইহুদি খ্রিস্টানের মেয়েকে বিয়ে করা সৌদি শাসকদের জন্য উত্তম! সৌদিরা অ-ওয়াহাবিদেরকে হজের সুযোগ দিচ্ছে কেবল অর্থনৈতিক কারণে এবং মুসলিম বিশ্বের ওপর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রভাবের পথ খোলা রাখার স্বার্থেই।  

২০৪ নম্বর সড়কে হজযাত্রীদের মাত্রাতিরিক্ত ভিড় হওয়ার একটি দৃশ্য 

সৌদি সরকারের  উস্কানিতে ওয়াহাবিরা বিশ্বনবী (সা)’র জন্মস্থান এবং হযরত খাদিজা (সা.আ)’র স্মৃতি-বিজড়িত স্থানসহ নানা ঐতিহাসিক স্থান ধ্বংস করেছে। ধ্বংস করেছে আহলে বাইতের সদস্যদের পবিত্র মাজার ও অনেক সাহাবির মাজার। সম্ভব হলে তারা বিশ্বনবীর (সা) পবিত্র মাজারও গুড়িয়ে দিত। কিন্তু বিশ্বব্যাপী প্রতিক্রিয়ার ভয়ে তারা তা করছে না। মুসলিম ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর প্রতি  বিদ্বেষের ক্ষেত্রে ইহুদিবাদী ইসরাইল এবং ওয়াহাবিরা একই বা ঐক্যবদ্ধ অবস্থানে রয়েছে। ইহুদিবাদী ইসরাইলের সঙ্গে সৌদি সরকারের সব সময়ই গোপন সম্পর্ক ও সহযোগিতা ছিল। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এই সম্পর্ক প্রায় প্রকাশ্য বন্ধুত্বের রূপ নিয়েছে। তাই পবিত্র কুরআনে ঘোষিত মুসলমানদের সবচেয়ে বড় শত্রু  ইহুদিদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখার কারণেই সৌদি সরকারকে আর পবিত্র মক্কা ও মদিনার ওপর কর্তৃত্ব করতে দেয়া যায় না।   কারণ, এতসব দোষ-ত্রুটি ও দুর্বলতার কারণে হজ পরিচালনার এবং মক্কা ও মদিনার ওপর কর্তৃত্ব করার কোনো নৈতিক অধিকার নেই সৌদি কর্তৃপক্ষের। #

 

পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আশরাফুর রহমান/৬