পঞ্চম বছরে ইয়েমেন যুদ্ধ: আগ্রাসন সহসাই বন্ধ হবে কি?
ইয়েমেনের ওপর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের চার বছর পূর্ণ হয়েছে এবং আগামীকাল ২৬ মার্চ এ যুদ্ধ পঞ্চম বছরে পা দেবে। অথচ এ যুদ্ধের শুরুতে সৌদি আরব ঘোষণা করেছিল, আরব বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র দেশটির বিরুদ্ধে এ যুদ্ধ দুই থেকে তিন সপ্তাহ স্থায়ী হবে এবং রিয়াদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হওয়ার মাধ্যমে শেষ হবে।
এ যুদ্ধ শুরু করার প্রধান লক্ষ্য ছিল ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ সংগঠনকে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসের পূর্বের অবস্থায় অর্থাৎ ক্ষমতা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়া। কিন্তু গত চার বছরে সৌদি আরবের সে লক্ষ্য তো পূরণ হয়নি উল্টো আনসারুল্লাহ বর্তমানে ইয়েমেনের প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়ার পেছনে সৌদি আরবের আরেকটি ঘোষিত লক্ষ্য ছিল ইয়েমেনে কথিত ‘বৈধ সরকারকে’ ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা। পলাতক প্রেসিডেন্ট আব্দ রাব্বু মানসুর হাদিকে সৌদি আরব কথিত বৈধ সরকারের প্রেসিডেন্ট বলে স্বীকৃতি দিয়ে আসছে। কিন্তু গত চার বছরে মানসুর হাদির পক্ষে রিয়াদ থেকে সানায় ফেরা সম্ভব হয়নি বরং ইয়েমেনের বেশিরভাগ মানুষ তাকে দেশটির ওপর রিয়াদের ভয়াবহ আগ্রাসন ও অপরাধযজ্ঞের শরিক বলে মনে করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সৌদি আরব ইয়েমেনে অন্যায়ভাবে আগ্রাসন চালিয়ে চার ধরনের অপরাধ করেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের আইন অনুযায়ী সৌদি আরব ইয়েমেনে যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ এবং আগ্রাসনের অপরাধ করেছে।
ইয়েমেনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইউসুফ আল হাজিরি গতকাল বলেছেন, গত চার বছরে সৌদি আগ্রাসনে তার দেশের ১২ হাজার মানুষ নিহত ও প্রায় ২৬ হাজার লোক আহত হয়েছেন। এ ছাড়া, এই চার বছরে যুদ্ধের কারণে বিদেশে চিকিৎসা নিতে যেতে না পারার কারণে বিভিন্ন রোগে ভুগে মারা গেছেন আরো ৩২ হাজার ইয়েমেনি। অর্থাৎ সৌদি আগ্রাসনে গত চার বছরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৪৪ হাজার মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। এদের মধ্যে নারী ও শিশু রয়েছেন অন্তত ছয় হাজার জন।
শুধু হতাহতের সংখ্যা দিয়ে ইয়েমেন যুদ্ধের ভয়াবহতা পরিমাপ করা যাবে না। এ যুদ্ধে এত মানুষের প্রাণহানি ছাড়াও বাস্তুহারা হয়ে শরণার্থীতে পরিণত হয়েছেন প্রায় ৩০ লাখ মানুষ। সেইসঙ্গে দেশটির ২ কোটি ৪০ লাখ অধিবাসীর মধ্যে ২ কোটি ২০ লাখেরই জরুরি সাহায্য প্রয়োজন। প্রায় ৩০ লাখ শিশু অপুষ্টির শিকার এবং এদের মধ্যে প্রায় চার লাখ পুষ্টির অভাবে মৃত্যুর ঝুঁকিয়ে রয়েছে। এ ছাড়া, সৌদি আগ্রাসনে ইয়েমেনের শতকরা ৮০ ভাগ অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। এ কারণে অনেক আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব ও সংস্থা এরইমধ্যে জানিয়ে দিয়েছেন, ইয়েমেন এখন যে মানবিক সংকটের মুখোমুখি তা বিশ্বে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকট।
প্রশ্ন হচ্ছে, ইয়েমেন যুদ্ধের পঞ্চম বছরের শুরুতে এ যুদ্ধের ভবিষ্যত কেমন হতে পারে বলে মনে হয়?
এ প্রশ্নের উত্তরে বেশিরভাগ পর্যবেক্ষক বলছেন, সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনের ওপর আগ্রাসন অব্যাহত রাখবে বলেই ধারনা করা যায়। কারণ, আলে সৌদ সরকার এ পর্যন্ত দারিদ্র পীড়িত দেশটিতে কোনো লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। এ অবস্থায় যুদ্ধের ইতি ঘটানোর অর্থ হবে এতে সৌদি আরবের পরাজয় মেনে নেয়া। তরুণ সৌদি যুবরাজ মোহাম্মাদ বিন সালমান আরব বিশ্বে বীরের মর্যাদা পাওয়ার জন্য ইয়েমেনে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। কাজেই এ যুদ্ধের একটা হেস্তনেস্ত না দেখে তিনি থামবার পাত্র নয়; প্রয়োজনে আরো হাজার হাজার মানুষের রক্ত ঝরাতেও বিন সালমান দ্বিধা করবেন না।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে, চার বছর আগের তুলনায় আনসারুল্লাহ যোদ্ধাদের শক্তি বর্তমানে কয়েক গুণ বেড়েছে। তারা এখন ইচ্ছা করলেই সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মারাত্মক ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখেন। কাজেই তারাও সৌদি যুবরাজকে ছেড়ে দেয়ার পাত্র নন।
বাস্তবতা হচ্ছে, ইয়েমেন যুদ্ধ অবসানের এখন একটাই মাত্র পথ আর তা হলো, এ যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য সৌদি আরবের ওপর প্রবল আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করা যাতে রিয়াদ স্বেচ্ছায় এ আগ্রাসন বন্ধ করে। বিশেষ করে মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের চাপ সৃষ্টি করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। কিন্তু ওয়াশিংটন শুধু যে চাপ সৃষ্টি করছে না তাই নয় বরং ইয়েমেন আগ্রাসনে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন রিয়াদকে সার্বিক সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে।#
পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/২৫