আটলান্টিকের ওপারে বিচ্ছেদের আরেক দৃশ্য:
ইতালি কেন ইউরোপকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নির্ভরতা থেকে মুক্ত করতে চায়?
-
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জর্জিয়া মেলোনি
পার্সটুডে: ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি ইউরোপকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নির্ভরতা থেকে মুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
পার্সটুডে জানিয়েছে, ইতালির প্রধানমন্ত্রী ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতি ওয়াশিংটনের ওপর নিরাপত্তা নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসা এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে স্বাধীনতার মূল্য পরিশোধের আহ্বান জানিয়েছেন। জর্জিয়া মেলোনি রোববার এক বৈঠকে বলেন, "মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নিতে চায় এবং ইউরোপীয়দের নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য সংগঠিত হতে হবে। এর অর্থ হলো- স্বাধীন ও মুক্ত ইউরোপে পুনরায় প্রত্যাবর্তন।"
মেলোনি বলেন, “আশি বছর ধরে আমরা আমাদের নিরাপত্তা যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিয়েছি এবং ভেবেছি এটি বিনামূল্যে পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু এর একটি মূল্য ছিল আর তা ছিল আমাদের শর্তাধীন হয়ে যাওয়া ও নির্ভরশীলতা। এখন আমাদের স্বাধীনতার মূল্য আমাদেরই পরিশোধ করতে হবে।”
জর্জিয়া মেলোনি যুক্তরাষ্ট্রের নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলকে ইউরোপের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, “আমরা এমন একটি ইতালি চাই, যে তার অংশীদারদের প্রতি বিশ্বস্ত থাকবে, কিন্তু কারও প্রভাবাধীন হবে না।”
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে জর্জিয়া মেলোনি বারবার জোর দিয়ে বলেছেন, ইউরোপকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নির্ভরতা থেকে মুক্ত হতে হবে। মনে করা হচ্ছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন নিরাপত্তা কৌশলের পরিবর্তন, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল প্রকাশ এবং ইউরোপের প্রতি ওয়াশিংটনের প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি কমে যাওয়ার সম্ভাবনার প্রেক্ষাপটেই ইতালির প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য সামনে এসেছে। মেলোনির মতে, "মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর এই নির্ভরতা বজায় রাখলে ইউরোপকে রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে অনেক বেশি মূল্য দিতে হবে। তাই ইউরোপের উচিত তার স্বাধীনতা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় মূল্য পরিশোধ করা।"
এই অবস্থানের পেছনের কারণগুলো কয়েকটি মূল বিষয়ের আলোকে বিশ্লেষণ করা যায়।
প্রথমত, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষিত যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের পরিবর্তন। এই কৌশলে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের প্রতিরক্ষা বোঝা কমাতে চায় এবং ইউরোপীয় দেশগুলোকে নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য স্বতন্ত্রভাবে সংগঠিত হতে হবে। ইউরোপীয় নেতাদের কাছে এটি একটি গুরুতর সতর্কসংকেত, কারণ এতে বোঝা যায় যে, ইউরোপ আর আগের মতো যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর করতে পারবে না।
দ্বিতীয়ত, ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মতপার্থক্য। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ওয়াশিংটন একাধিকবার কিয়েভকে মস্কোর সঙ্গে সমঝোতার আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু ইউরোপীয় দেশগুলো এই প্রস্তাবকে রাশিয়ার দাবি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখছে এবং এর বিরোধিতা করছে। একই সঙ্গে ইউক্রেনকে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা অব্যাহত রাখার ইউরোপীয় প্রতিশ্রুতি ভলোদিমির জেলেনস্কিকে ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ২৮ দফা শান্তি পরিকল্পনা গ্রহণে অনীহা দেখাতে উৎসাহিত করেছে। এই মতভেদ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ইউরোপের নিরাপত্তা স্বার্থ সবসময় যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সঙ্গে এক নয় এবং অতিরিক্ত নির্ভরতা ইউরোপকে কঠিন অবস্থায় ফেলতে পারে।
তৃতীয়ত, মেলোনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, ইউরোপের নিরাপত্তা স্বাধীনতা কেবল একটি কৌশলগত প্রয়োজন নয়, বরং একটি ঐতিহাসিক পছন্দ। তার মতে, স্বাধীনতার একটি মূল্য আছে এবং ইউরোপকে সেই মূল্য দিতে প্রস্তুত থাকতে হবে। এই বক্তব্য ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে বিদ্যমান বৃহত্তর উদ্বেগের প্রতিফলন, যারা মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ইউরোপের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাকে সীমিত করেছে এবং ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতি ইউরোপকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার ইউরোপীয় প্রচেষ্টার ফলাফলও গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। নিরাপত্তা স্বাধীনতা মানে প্রতিরক্ষা শিল্পে ব্যাপক বিনিয়োগ, সামরিক বাজেট বৃদ্ধি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন পর্যায়ে যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা। এতে স্বল্পমেয়াদে অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি ইউরোপের প্রতিরোধক্ষমতা জোরদার করবে।
দ্বিতীয়ত, ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্কের পুনর্গঠন ঘটবে। ইউরোপ যদি সত্যিকার অর্থে নিরাপত্তা স্বাধীনতার পথ অনুসরণ করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার ঐতিহ্যবাহী সম্পর্ক নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হবে। এর ফলে ইউরোপে ওয়াশিংটনের প্রভাব কমতে পারে এবং মহাদেশে একটি নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি হতে পারে।
তৃতীয়ত, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ সংহতি বাড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা অনেক ক্ষেত্রে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি করেছে, কারণ কিছু দেশ অন্যদের তুলনায় বেশি মার্কিন সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু নিরাপত্তা স্বাধীনতার লক্ষ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নকে আরও গভীর সহযোগিতার দিকে ঠেলে দিতে পারে এবং একটি অভিন্ন প্রতিরক্ষা নীতির পথ প্রশস্ত করতে পারে। একই সঙ্গে এই প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ইউরোপের অবস্থানকে শক্তিশালী করবে এবং তাকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর না করেই নিজের স্বার্থ রক্ষায় সক্ষম এক স্বাধীন ও শক্তিশালী খেলোয়াড়ে পরিণত করতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, মেলোনির বক্তব্য একটি ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। বিশ্ব একটি নতুন ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে, যেখানে বড় শক্তিগুলো তাদের বৈদেশিক প্রতিশ্রুতি কমাতে চাইছে। এই নতুন ব্যবস্থায় ইউরোপ যদি একটি স্বাধীন ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে চায়, তবে তাকে অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছায়া থেকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং নিজের নিরাপত্তা ও সামরিক স্বাধীনতার মূল্য দিতে প্রস্তুত থাকতে হবে। এই পথ কঠিন ও ব্যয়বহুল হলেও, এটি ইউরোপীয় মহাদেশের জন্য বিশেষ করে নিরাপত্তা ও সামরিক ক্ষেত্রে এক ভিন্ন ভবিষ্যৎ গড়ে দিতে পারে।#
পার্সটুডে/এমএআর/১৫