পুঁজিবাদ: প্রাকৃতিক সম্পদ শোষণ ও পরিবেশের ওপর চাপ বৃদ্ধির হাতিয়ার
https://parstoday.ir/bn/news/world-i156294-পুঁজিবাদ_প্রাকৃতিক_সম্পদ_শোষণ_ও_পরিবেশের_ওপর_চাপ_বৃদ্ধির_হাতিয়ার
পার্সটুডে- বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী অর্থনৈতিক কাঠামো হচ্ছে পুঁজিবাদ। এই কাঠামোতে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার পাশাপাশি মুনাফা এবং বাজারের নিরবচ্ছিন্ন সম্প্রসারণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
(last modified 2026-01-25T10:57:22+00:00 )
জানুয়ারি ২১, ২০২৬ ১৬:২৮ Asia/Dhaka
  • পুঁজিবাদ: প্রাকৃতিক সম্পদ শোষণ ও পরিবেশের ওপর চাপ বৃদ্ধির হাতিয়ার
    পুঁজিবাদ: প্রাকৃতিক সম্পদ শোষণ ও পরিবেশের ওপর চাপ বৃদ্ধির হাতিয়ার

পার্সটুডে- বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী অর্থনৈতিক কাঠামো হচ্ছে পুঁজিবাদ। এই কাঠামোতে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার পাশাপাশি মুনাফা এবং বাজারের নিরবচ্ছিন্ন সম্প্রসারণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

পার্সটুডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ব্যবস্থা কিছু ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে, তবে এর অন্তর্নিহিত কাঠামো এমন যে, তা প্রাকৃতিক সম্পদের শোষণ এবং পরিবেশের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টি করে। পুঁজিবাদের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক মূলত শোষণমূলক; প্রকৃতিকে একটি ইকোসিস্টেম হিসেবে নয়, বরং মুনাফা আহরণের জন্য সম্পদ হিসেবে দেখা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গিই আজকের বহু পরিবেশগত সংকটের মূল কারণ।

এই সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ব্যাপক মাত্রায় প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলন। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে হতে হয় স্থায়ী ও ঊর্ধ্বমুখী; আর এই প্রবৃদ্ধি বেশি শক্তি, পানি, মাটি, বন ও খনিজ সম্পদ ব্যবহার ছাড়া সম্ভব নয়। বড় বড় কোম্পানি মুনাফা ধরে রাখতে লাগামহীনভাবে সম্পদ আহরণে নামে, যার ফলে বন উজাড়, মাটির ক্ষয়, জীববৈচিত্র্য হ্রাস এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস হয়। আমাজনে বন উজাড়, সংবেদনশীল এলাকায় অতিরিক্ত তেল উত্তোলন এবং আফ্রিকায় খনির চরম শোষণ—এই প্রবণতার স্পষ্ট উদাহরণ।

আরেকটি দিক হলো শিল্প উৎপাদনজনিত ব্যাপক দূষণ। গণউৎপাদন ও ভোগবাদকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে পুঁজিবাদ বিপুল পরিমাণ শিল্প, রাসায়নিক ও প্লাস্টিক বর্জ্য সৃষ্টি করে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ব্যয় কমানোর জন্য পরিবেশগত মানদণ্ড উপেক্ষা করে এবং বায়ু, পানি ও মাটির দূষণকে সমাজের ওপর “বহিরাগত খরচ” হিসেবে চাপিয়ে দেয়। এই দূষণ শুধু মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি নয়, বরং পৃথিবীর প্রাকৃতিক চক্রগুলোকেও ব্যাহত করে। বৈশ্বিক উষ্ণতা, গ্রিনহাউস গ্যাসের বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তন এই মুনাফাকেন্দ্রিক যুক্তির সরাসরি ফল।

পুঁজিবাদ ভোগবাদকেও একটি সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ হিসেবে প্রচার করে। ব্যাপক বিজ্ঞাপন মানুষকে বেশি কেনাকাটা ও দ্রুত পণ্য বদলাতে উৎসাহিত করে। এই অন্তহীন ভোগের প্রবণতা আরও বেশি উৎপাদনের প্রয়োজন তৈরি করে এবং এর ফলে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ আরও বাড়ে। স্বল্পস্থায়ী পণ্য কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে এমনভাবে তৈরি পণ্য যা দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়- এগুলো ইলেকট্রনিক ও শিল্প বর্জ্যের পরিমাণ বাড়ায়; আর এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনাই নিজেই একটি বড় পরিবেশগত সমস্যায় পরিণত হয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, পরিবেশগত বৈষম্য। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় ধনী দেশ ও বড় করপোরেশনগুলো প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে সর্বাধিক সুবিধা পায়, কিন্তু দরিদ্র দেশ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি সহ্য করতে হয়। দরিদ্র অঞ্চলগুলো প্রায়ই বিপজ্জনক বর্জ্য ফেলার স্থান, ধ্বংসাত্মক খনন কার্যক্রম বা দূষণকারী কারখানার অবস্থানস্থলে পরিণত হয়। এই বৈষম্যের ফলে পরিবেশগত সংকট সামাজিক ও মানবিক সংকটে রূপ নেয়।

এই ধারার পরিণতি অত্যন্ত ব্যাপক ও গভীর। প্রথমত, জলবায়ু পরিবর্তন তীব্রতর হয়। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, মেরু অঞ্চলে বরফ গলা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং বন্যা, খরা ও ঝড়ের মতো চরম আবহাওয়াজনিত নানা ঘটনা—এসবই বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোতে অতিরিক্ত জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের এবং বন ধ্বংসের সরাসরি ফল। এই পরিবর্তনগুলো শুধু ইকোসিস্টেমকেই নয়, খাদ্য নিরাপত্তা, পানি সম্পদ ও মানুষের স্বাস্থ্যকেও হুমকির মুখে ফেলে।

দ্বিতীয় পরিণতি হলো জীববৈচিত্র্যের হ্রাস। আবাসস্থল ধ্বংস, দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হাজার হাজার উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতিটি প্রজাতির বিলুপ্তি ইকোসিস্টেম ধারাবাহিক প্রভাব সৃষ্টি করে এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করে।

তৃতীয় পরিণতি হলো সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের তীব্রতা বৃদ্ধি। সামগ্রিকভাবে বলা যায়, কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া পুঁজিবাদ পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে না।#

পার্সটুডে/এসএ/২১

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।