বর্ণবিদ্বেষের পুনরাবৃত্তি: ট্রাম্পের পোস্টে ওবামা দম্পতিকে বানরের সাথে তুলনা
-
ট্রাম্পের সামাজিক মাধ্যমেই আবারও বর্ণবাদের ছায়া
পার্সটুডে: ২০২৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোস্যাল'-এ একটি ভিডিও পোস্ট করেন। সেই ভিডিওতে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং সাবেক ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামাকে বানরের রূপে দেখানো হয়। এই ছবি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই তা ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়।
প্রথমে হোয়াইট হাউস ট্রাম্পের ব্যক্তিগত পেজে প্রকাশিত এই অবমাননাকর ছবির পক্ষে অবস্থান নেয়। পরে যখন দেশজুড়ে সমালোচনা শুরু হয়, তখন বলা হয়—এটি নাকি একজন কর্মচারীর ভুলে পোস্ট হয়েছে। ভিডিওটি মূলত নির্বাচনী জালিয়াতির মিথ্যা অভিযোগ ছড়ানোর জন্য তৈরি করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়। এতে ওবামা দম্পতির মুখ প্রাণীর শরীরের ওপর বসানো হয়েছিল, যা ইতিহাসের সেই বর্ণবাদী চিত্রগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের বানরের সঙ্গে তুলনা করা হতো।
ডেমোক্র্যাটদের পাশাপাশি অনেক রিপাবলিকান নেতাও এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেন। প্রায় ১২ ঘণ্টা পর পোস্টটি ট্রাম্পের পেজ থেকে মুছে ফেলা হয়। কিন্তু এই ঘটনার জন্য ট্রাম্প কোনো দুঃখপ্রকাশ বা ক্ষমা চাননি।
যারা ট্রাম্পের রাজনৈতিক জীবন অনুসরণ করে আসছেন, তাদের কাছে এই ঘটনা নতুন কিছু নয়। রাজনীতিতে আসার শুরু থেকেই তিনি বর্ণবাদী বক্তব্য ও আচরণের জন্য পরিচিত। এই পোস্টটি আসলে তার দীর্ঘ বর্ণবাদী ধারাবাহিকতারই আরেকটি উদাহরণ।
২০১৫ সালে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করার সময়ই ট্রাম্প মেক্সিকান অভিবাসীদের উদ্দেশ করে বলেন, “মেক্সিকো যখন মানুষ পাঠায়, তখন তারা ভালো মানুষ পাঠায় না। তারা অপরাধী আর ধর্ষকদের পাঠায়।”
এই বক্তব্য শুধু মেক্সিকানদের অপমান করেনি, বরং লাতিনো জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বর্ণবাদী ধারণাকে আরও শক্তিশালী করেছে।
এরপর তিনি মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের প্রস্তাব দিয়ে বলেন, মেক্সিকোকেই এর খরচ দিতে হবে। এই নীতির পেছনে ছিল জাতিগত ভয় দেখানো এবং বিভাজনের রাজনীতি।
২০১৮ সালে তিনি আফ্রিকার দেশগুলো ও হাইতিকে “নোংরা নর্দমার দেশ” বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, হাইতির মানুষদের সবাই নাকি এইডসে আক্রান্ত এবং নাইজেরিয়ানরা নাকি কখনো নিজের দেশে ফিরে যেতে চায় না। এসব কথা ছিল শুধু বর্ণবাদীই নয়, বরং মিথ্যা ও অপমানজনক।
ট্রাম্পের এই মানসিকতা প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগেও দেখা গেছে। ১৯৭০-এর দশকে তার কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল কৃষ্ণাঙ্গদের ঘর ভাড়া না দেওয়ার কারণে। অভিযোগ ছিল, তিনি নিজের ভবন ব্যবস্থাপকদের নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন কৃষ্ণাঙ্গদের আবেদন বাতিল করা হয়।
১৯৮৯ সালে তিনি পাঁচজন কৃষ্ণাঙ্গ ও লাতিনো কিশোরের মৃত্যুদণ্ড দাবি করেন, যাদের পরে নির্দোষ প্রমাণিত হয়। এমনকি তারা নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার পরও ট্রাম্প নিজের বক্তব্য প্রত্যাহার করেননি।
বারাক ওবামার ক্ষেত্রেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রচার চালান যে, ওবামা যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করেননি এবং তিনি বৈধ প্রেসিডেন্ট নন। এই প্রচারণার পেছনেও ছিল বর্ণবাদী উদ্দেশ্য—ওবামাকে “বিদেশি” হিসেবে দেখানো এবং কৃষ্ণাঙ্গদের সামাজিকভাবে ছোট করে দেখা।
ট্রাম্প মুসলমানদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের ভাষা ব্যবহার করেছেন। তিনি মুসলমানদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দেন এবং মুসলিম দেশগুলোকে “সন্ত্রাসীতে ভরা দেশ” বলে উল্লেখ করেন। ২০১৭ সালে তথাকথিত “মুসলিম নিষেধাজ্ঞা” কার্যকর হয়, যা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোকেই লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়েছিল। এর ফলে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণাজনিত অপরাধও বেড়ে যায়।
ট্রাম্পের বর্ণবাদ শুধু কথায় নয়, নীতিতেও দেখা যায়। সীমান্তে পরিবার বিচ্ছিন্নকরণ নীতি, কঠোর অভিবাসন আইন—এসব সিদ্ধান্ত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে অশ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীকে। তিনি “প্রাউড বয়েজ”-এর মতো শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী গোষ্ঠীর প্রতিও সমর্থন দেখিয়েছেন।
ট্রুথ সোস্যাল-এ ওবামা দম্পতিকে বানরের সঙ্গে তুলনা করার ঘটনাটি এই দীর্ঘ ধারাবাহিকতারই অংশ। এমন এক সময়ে, যখন আমেরিকা বর্ণগত বিভাজন, সামাজিক উত্তেজনা ও রাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, এ ধরনের কাজ সমাজকে আরও বিভক্ত করে।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, ট্রাম্প ইচ্ছাকৃতভাবেই এই ভাষা ও আচরণ ব্যবহার করেন, যাতে তার বর্ণবাদী সমর্থক গোষ্ঠী আরও শক্ত হয়। আবার অনেক মানুষের কাছে এটি শুধু একটি ব্যক্তির আচরণ নয়, বরং আমেরিকার ভেতরে থাকা গভীর সামাজিক সমস্যার প্রতিচ্ছবি।
এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বর্ণবাদ শুধু ব্যক্তিগত মানসিকতার বিষয় নয়, এটি একটি জাতীয় সংকট। যদি এই মানসিকতার বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে কাজ না করা হয়, তাহলে এটি ভবিষ্যতে আমেরিকান সমাজকে আরও অস্থির, বিভক্ত ও উত্তপ্ত করে তুলবে।#
পার্সটুডে/এমএআর/৭