আফ্রিকার সেনেগালে 'টিয়ারোয়া শিবিরে' ফরাসি উপনিবেশবাদের গণহত্যা
পার্সটুডে - সেনেগালে উপনেবেশিক আমলে ফ্রান্স কর্তৃক সংঘটিত সবচেয়ে রক্তাক্ত এবং গোপন অপরাধগুলোর মধ্যে একটি হল টিয়ারোয়া গণহত্যা। ১৯৪৪ সালে টিয়ারোয়া শিবিরে আফ্রিকান সৈন্যদের এই গণহত্যা কেবল ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার নিষ্ঠুরতার উদাহরণই নয়, বরং দশকের পর দশক ধরে সত্য গোপন রাখা এবং অস্বীকার করার প্রতীকও বটে।
আফ্রিকায় বিশেষ করে সেনেগালে ফরাসি উপনিবেশবাদ কেবল অর্থনৈতিক শোষণ এবং সাংস্কৃতিক অবমাননার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এর সাথে ছিল নিয়মতান্ত্রিক সহিংসতা এবং সংগঠিত অপরাধ। ইতিমধ্যে, ডাকারের উপকণ্ঠে টিয়ারোয়া শিবিরে "তিরালর" সৈন্যদের (সেনেগালিজ রাইফেলম্যান) গণহত্যা এই নিষ্ঠুরতা এবং দীর্ঘমেয়াদী গোপন রাখার প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
১৯৪৪ সালের প্রথম দিনে, ঔপনিবেশিক আমলে ফ্রান্স কর্তৃক সংঘটিত সবচেয়ে রক্তাক্ত অপরাধগুলোর মধ্যে একটি সংঘটিত হয়েছিল। নিহতরা ছিলেন "তিরালর" নামে পরিচিত আফ্রিকান সৈন্য যারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে ফ্রান্সের মুক্তির জন্য লড়াই করেছিলেন। ঐতিহাসিক বিবরণ অনুসারে, পশ্চিম আফ্রিকান উপনিবেশ থেকে ইউরোপীয় ফ্রন্টে যুদ্ধ করা প্রায় ১,৩০০ সৈন্যকে ১৯৪৪ সালের নভেম্বরে বন্দী করে মুক্ত করার পর টিয়ারোয়া ক্যাম্পে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। সৈন্যরা বেতন ফেরত পাওয়ার আশা করছিল, কিন্তু কৃতজ্ঞতার পরিবর্তে তাদের অপমান করা হয়েছিল। তারা শ্বেতাঙ্গ ফরাসি সৈন্যদের সাথে সমান আচরণ এবং পূর্ণ বেতন দাবি করেছিল। এই দাবিকে ফরাসি ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষের জন্য একটি বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল, কারণ এটি সাম্রাজ্যবাদী বর্ণগত শ্রেণিবিন্যাসকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
৩০ নভেম্বর রাতে এবং ১ ডিসেম্বর সকালে, জেনারেল ইভেস ডি বোইসেলেস-এর নেতৃত্বে ফরাসি সেনাবাহিনী টিয়ারোয়া ক্যাম্প ঘিরে ফেলে। ভোরের দিকে, নিরস্ত্র এবং প্রতিবাদী সৈন্যদের উপর মেশিনগানের ছোড়া হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা ভয়াবহ দৃশ্য বর্ণনা করেছেন: সৈন্যরা তাদের বিছানায় গুলিবিদ্ধ হয়, পালিয়ে যাওয়ার সময় একটি দল গুলিবিদ্ধ হয় এবং আহতরা খুব কাছ থেকে গুলিবিদ্ধ হয়।
ফরাসি ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে গণহত্যা ধামাচাপা দিতে শুরু করে। মৃতের সংখ্যা ব্যাপকভাবে হ্রাস পায় এবং ঘটনাটিকে "দাঙ্গা" বলা হয়। ফরাসি সরকারী প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা ৩৫ জন বা সর্বোচ্চ ৭০ জন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু সাম্প্রতিক দশকগুলিতে ব্যাপক গবেষণা, বিশেষ করে বিখ্যাত ইতিহাসবিদ মামাদু দিউফের নেতৃত্বে সেনেগালিজ কমিটি অফ ইনকোয়ারি, অপরাধের মাত্রা প্রকাশ করেছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে সেনেগালিজ রাষ্ট্রপতির কাছে ৩০১ পৃষ্ঠার একটি সরকারী প্রতিবেদনে উপস্থাপিত কমিটির ফলাফল দেখায় যে টিয়ারোয়া গণহত্যা কোনও স্বতঃস্ফূর্ত ঘটনা ছিল না, বরং আফ্রিকান সৈন্যদের মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলে জন্ম নেওয়া সমতাবাদী আদর্শকে দমন করার লক্ষ্যে একটি "পূর্বপরিকল্পিত, সাবধানে পরিকল্পিত এবং সমন্বিত অভিযান" ছিল।
মাঠ গবেষণা এবং প্রত্নতাত্ত্বিক খনন দেখিয়েছে যে ফরাসি পরিসংখ্যান সম্পূর্ণরূপে ভুল। সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অনুমান অনুসারে, নিহতদের সংখ্যা ৩০০ থেকে ৪০০ বা তারও বেশি। এই গবেষণা অনুসারে,৪০০ জনেরও বেশি সেনেগালিজ রাইফেলম্যান নিখোঁজ হয়ে গেছেন, যেন তাদের কখনও অস্তিত্বই ছিল না।
তদন্ত কমিটি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে ফরাসি কর্তৃপক্ষ গণহত্যা ধামাচাপা দেওয়ার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিল। তারা ফ্রান্স এবং ডাকারে আগমন ও প্রস্থানের রেজিস্টার সহ নথিপত্র জাল করেছিল এবং শিবিরে উপস্থিত সৈন্যদের সংখ্যা পরিবর্তন করেছিল। গবেষকদের "ধোঁয়া এবং আয়নার" প্রাচীর এবং ফরাসি সামরিক আর্কাইভগুলোতে প্রবেশের পথে বাধা দেখা গিয়েছিল।
২০২৫ সালের মে মাসে শুরু হওয়া প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজে চমকপ্রদ আবিষ্কার হয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিকরা কবরস্থানে সাতটি কঙ্কাল আবিষ্কার করেছেন। একটি কঙ্কালের হৃদয়ে একটি গুলি পাওয়া গেছে। অন্যটিতে, মাথার খুলি, পাঁজর এবং মেরুদণ্ড অনুপস্থিত ছিল। একটি কবরে, পায়ের হাড়ের চারপাশে "লোহার শিকল" এর অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে মৃত্যুর আগে বা অবিলম্বে কিছু নিহতকে শিকল দিয়ে বাঁধা হয়েছিল। কবরগুলি মৃতদেহের ধ্বংসাবশেষের চেয়ে নতুন বলেও পাওয়া গেছে, যা মর্যাদাপূর্ণ সমাধিস্থল হিসেবে মঞ্চস্থ করার এবং ভান করার প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দেয়। প্রমাণ থেকে জানা যায় যে হত্যাকাণ্ডগুলো রেলওয়ে স্টেশন পর্যন্তও বিস্তৃত হতে পারে। সেনেগাল সরকার সমস্ত সন্দেহভাজন গণকবর স্থানে আরও খননের নির্দেশ দিয়েছে।
উপনিবেশগুলোতে ফ্রান্সের পদ্ধতিগত হত্যাকাণ্ডের একটি উদাহরণ ছিল টিয়ারোয়া। একটি প্রতিবেদনে, L’Expression পত্রিকাটি তিয়ারোয়া গণহত্যার তুলনা করেছে ১৯৬১ সালের ১৭ অক্টোবর প্যারিসে সংঘটিত গণহত্যার সাথে, যেখানে মরিস পাপনের নেতৃত্বে ফরাসি পুলিশ শত শত আলজেরিয়ান বিক্ষোভকারীকে হত্যা করে এবং তাদের মৃতদেহ সেইনে ফেলে দেয়। এই অপরাধের মূল একই: ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা আফ্রিকার জনগণের উপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মুক্তির প্রভাব মেনে নিতে পারেনি এবং সহিংস প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল। ১৯৪৫ সালের ৮ মে আলজেরিয়ায় গণহত্যাও একই যুক্তিতে ঘটেছিল। তিয়ারোয়া কোনও বিচ্ছিন্ন উদাহরণ ছিল না, বরং উপনিবেশগুলিতে সমতাবাদী আদর্শের দমনের একটি বিস্তৃত প্যাটার্নের অংশ ছিল।
১৯৬০ সালের ২০ জুন ফ্রান্সের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জনকারী সেনেগাল এখন তার সার্বভৌমত্বের উপর নির্ভর করে ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচার দাবি করছে। একটি সরকারি প্রতিবেদনে, সেনেগাল ফ্রান্সকে আনুষ্ঠানিকভাবে "ক্ষমা চাওয়ার" আহ্বান জানিয়েছে। প্রতিবেদনে অব্যাহত তদন্ত, ফরাসি আর্কাইভে পূর্ণ প্রবেশাধিকার, ভুক্তভোগীদের মৃতদেহ সনাক্তকরণ এবং প্রত্যাবাসন এবং ক্ষতিপূরণের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
অপরাধের মাত্রা স্পষ্ট হয়ে ওঠার সাথে সাথে,২০২৪ সালের নভেম্বরে,ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাকরন আট দশক ধরে অস্বীকার করার পর অবশেষে প্রথমবারের মতো তিয়ারোয়া গণহত্যাকে ফরাসি ঔপনিবেশিক শক্তির "গণহত্যা" হিসেবে স্বীকৃতি দেন, কিন্তু তিনি আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাইতে অস্বীকৃতি জানান।
তিয়ারোয়া গণহত্যা ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার বর্বরতা এবং আফ্রিকার লুকানো স্মৃতির আরেকটি প্রতীক,কিন্তু সত্য কখনও ইতিহাসের ধুলোয় মিশে যাবে না।
পার্স টুডে/এমবিএ/১৮
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।