বিশ্লেষণ | মার্কিন-ইসরায়েলি অস্ত্রের বহুমাত্রিক সংকট
-
হেলিকপ্টার
পার্সটুডে- বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নানা কারণে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইসরায়েলের কাছে অস্ত্র সরবরাহে অনেক বিলম্ব দেখা দিয়েছে।
পার্সটুডে'র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেরুজালেম পোস্ট এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ইহুদিবাদী ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে 'এএইচ-৬৪ই অ্যাপাচি হেলিকপ্টার' কেনার চুক্তি বাতিল হয়নি। তবে ইসরায়েলি অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ১৫ বিলিয়ন শেকেল অর্থ পরিশোধে বিলম্বের কারণে চুক্তিটি বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ইসরায়েলি শাসক গোষ্ঠী উৎপাদন লাইনে নিজেদের নির্ধারিত অবস্থান হারাতে পারে। এর ফলে হেলিকপ্টার সরবরাহ কয়েক বছর পিছিয়ে যেতে পারে এবং ক্রয় ব্যয়ও বাড়তে পারে।
গোলাবারুদের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি জটিল। সিনেটের পররাষ্ট্র সম্পর্কবিষয়ক কমিটির জ্যেষ্ঠ ডেমোক্র্যাট সিনেটর জিন শাহিন এবং প্রতিনিধি পরিষদের পররাষ্ট্র সম্পর্কবিষয়ক কমিটির জ্যেষ্ঠ ডেমোক্র্যাট গ্রেগরি মিক্স পৃথকভাবে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের কাছে ২.৮ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি সাময়িকভাবে স্থগিত করেছেন। এই অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ৪০ হাজার এক টন ওজনের বোমা। একই সময়ে বোয়িং ইসরায়েলের কাছে সর্বোচ্চ ৫ হাজার নতুন স্মার্ট বোমা সরবরাহের জন্য ২৮৯ মিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি করেছে। তবে এসব অস্ত্রের সরবরাহ আগামী ৩৬ মাসের আগে শুরু হওয়ার কথা নয়।
যুদ্ধবিমান সরবরাহের ক্ষেত্রেও বিলম্ব দেখা দিয়েছে। হোয়াইট হাউস ইসরায়েলি সরকারের কাছে ৫০টি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির চুক্তি পিছিয়ে দিয়েছে। ইসরায়েল ২০২০ সালে প্রথমবার ২৫টি এফ-১৫এক্স কেনার আবেদন করেছিল। কিন্তু রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে এই বিক্রি স্থগিত হয়ে যায়। বর্তমানে ধারণা করা হচ্ছে, এসব যুদ্ধবিমানের সরবরাহ ২০৩১ সাল থেকে শুরু হয়ে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত চলতে পারে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ ও বিমানবাহিনী তাদের মিত্রদের—এর মধ্যে ইসরায়েলও রয়েছে—সতর্ক করে জানিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ গোলাবারুদ সরবরাহে বিলম্ব পাঁচ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের মজুত ব্যাপকভাবে কমে যাওয়াকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৬ সালে ইসরায়েলের কাছে মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহে এই বিলম্বকে শুধু একটি সাধারণ লজিস্টিক বা প্রশাসনিক সমস্যা হিসেবে দেখা যায় না, বরং এর পেছনে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি, ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক পরিবর্তন, আঞ্চলিক যুদ্ধের চাপ এবং দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্কের পুনর্বিন্যাস—এমন একাধিক জটিল কারণ কাজ করছে। সাধারণ অস্ত্র চুক্তিতে যে ধরনের বিলম্ব দেখা যায়, এর সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির পার্থক্য হলো—একই সময়ে একাধিক সংকট একত্রে কাজ করছে, যার যেকোনো একটি কারণই সরবরাহ প্রক্রিয়া ধীর করে দিতে পারত।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিতে বাজেট সংকট এখন অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় তিন বছর ধরে পাঁচটি ফ্রন্টে চলমান যুদ্ধের পর ইসরায়েলি সেনাবাহিনী প্রায় ৪০ বিলিয়ন শেকেল বাজেট ঘাটতির মুখে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এর বড় অংশই চলমান সামরিক অভিযান এবং রিজার্ভ সেনাদের দায়িত্ব পালনের ব্যয় থেকে তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলি অর্থ মন্ত্রণালয় অ্যাপাচি হেলিকপ্টার কেনার জন্য প্রতিশ্রুত ১৫ বিলিয়ন শেকেল পরিশোধ না করায় একের পর এক চুক্তিগত সময়সীমা পার হয়ে যাচ্ছে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে বিরোধ শুধু নির্দিষ্ট অর্থের পরিমাণ নিয়ে নয়; ভবিষ্যতের বহু-বছরের বাজেট কাঠামো নিয়েও মতবিরোধ রয়েছে। ফলে এই প্রশাসনিক অচলাবস্থা অস্ত্র সংগ্রহে অর্থায়নের একটি কাঠামোগত সংকটে রূপ নিয়েছে। বর্তমানে ব্যবহৃত অ্যাপাচি হেলিকপ্টারগুলোর পুরোনো হয়ে যাওয়া এবং খুচরা যন্ত্রাংশ সংগ্রহের সমস্যাও সংকটকে আরও তীব্র করেছে। দীর্ঘমেয়াদে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর অন্তত ৫০টি নতুন অ্যাটাক হেলিকপ্টার প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরেকটি কারণ হলো, ইসরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে গভীর মতপার্থক্য তৈরি হওয়া। গাজা যুদ্ধে বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা নিয়ে বিশেষ করে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে মার্কিন জনমত উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। জুলাই মাসে প্রতিনিধি পরিষদে ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা বন্ধের বিষয়ে ভোটে ১০৪ জন পক্ষে এবং ৩১৪ জন বিপক্ষে ভোট দেন। এতে দেখা যায়, সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ এখনো সামরিক সহায়তার পক্ষে থাকলেও এই সমর্থন আগের মতো স্বয়ংক্রিয় বা নিঃশর্ত নয়।
ইসরায়েলকে ২.৮ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন বোমা বিক্রির প্যাকেজ সাময়িকভাবে স্থগিত করতে দুই জ্যেষ্ঠ ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতার পদক্ষেপকে দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাসে নজিরবিহীন পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এর আগে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সময়ও সীমিত পরিসরে এমন পদক্ষেপ দেখা গিয়েছিল। এসব আইনপ্রণেতার প্রধান উদ্বেগ হলো, নেতানিয়াহু সরকার মার্কিন অস্ত্র আন্তর্জাতিক ও মার্কিন আইন অনুযায়ী ব্যবহার করা হচ্ছে—এমন যথেষ্ট নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। গাজা ও লেবাননে ব্যাপক বোমাবর্ষণ অব্যাহত থাকায় অস্ত্র সরবরাহের বৈধতা ও যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তৃতীয় কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সামরিক মজুতের ওপর চাপ। ইরানের বিরুদ্ধে ৪০ দিনের যুদ্ধে মার্কিন সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ব্যাপকভাবে কমে যায়। ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনের বরাতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের সতর্ক করেছে যে, কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও ইন্টারসেপ্টর সরবরাহে পাঁচ বছর পর্যন্ত বিলম্ব হতে পারে।
একই প্রেক্ষাপটে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে ইসরায়েলকে রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র একটি মাত্র হামলাতেই থাড ক্ষেপণাস্ত্রের অর্ধেক, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতকারী ইন্টারসেপ্টরের এক-তৃতীয়াংশ এবং এক বছরের সমপরিমাণ স্ট্যান্ডার্ড-৩ ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন ব্যবহার করেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এর ফলে ওয়াশিংটনকে নিজেদের সামরিক রপ্তানির অগ্রাধিকার পুনর্বিবেচনা করতে হয়েছে। এমনকি ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য প্রতিশ্রুত কিছু চালানও বাতিল বা স্থগিত করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।#
পার্সটুডে/এসএ/২২
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।