সিরিয়ায় ইসরাইলি হামলার রহস্য, বৃহত্তর ইসরাইল-ষড়যন্ত্র ও ইয়েমেন-পরিস্থিতি
https://parstoday.ir/bn/news/world-i38942-সিরিয়ায়_ইসরাইলি_হামলার_রহস্য_বৃহত্তর_ইসরাইল_ষড়যন্ত্র_ও_ইয়েমেন_পরিস্থিতি
সিরিয়ার প্রেসিডেন্টের ব্যাপক জনপ্রিয়তা, দেশটিতে সাম্প্রতিক ইসরাইলি হামলা ও মুসলিম বিশ্বকে ভেঙ্গে বৃহৎ ইসরাইল গড়ার নীলনকশা প্রসঙ্গে অভিমত ব্যক্ত করেছেন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষক মোহাম্মাদ মুনীর হোসেন খান।
(last modified 2026-03-14T11:23:49+00:00 )
মে ২৯, ২০১৭ ১২:২০ Asia/Dhaka
  • সিরিয়ায় ইসরাইলি হামলার রহস্য, বৃহত্তর ইসরাইল-ষড়যন্ত্র ও ইয়েমেন-পরিস্থিতি

সিরিয়ার প্রেসিডেন্টের ব্যাপক জনপ্রিয়তা, দেশটিতে সাম্প্রতিক ইসরাইলি হামলা ও মুসলিম বিশ্বকে ভেঙ্গে বৃহৎ ইসরাইল গড়ার নীলনকশা প্রসঙ্গে অভিমত ব্যক্ত করেছেন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষক মোহাম্মাদ মুনীর হোসেন খান।

রেডিও তেহরানকে দেয়া তার ওইসব অভিমতের দ্বিতীয়  কিস্তি তুলে ধরা হল এখানে: 

( এই সাক্ষাৎকারের  প্রখস কিস্তি দেখতে ক্লিক করুন :"জনপ্রিয়তাই আসাদের মূল শক্তি, বিরোধীরা ‘বৃহত্তর-ইসরাইল’ প্রকল্পের সেবক : বিশ্লেষক")

রেডিও তেহরান: ‘নীল থেকে ফুরাত-ব্যাপী বৃহত্তর ইসরাইল’ গঠনের এক মহা-ষড়যন্ত্রের কথা এক সময় শোনা যেত। সিরিয়ায় সংকট জিইয়ে রাখাসহ মধ্যপ্রাচ্যে অশান্তির আগুন জ্বালিয়ে রাখার পশ্চিমা প্রচেষ্টার প্রেক্ষাপটে সেই মহা-ষড়যন্ত্রের বাস্তবায়ন কী এখনও  বজায় রয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

মোহাম্মাদ মুনীর হোসেন খান: হিজবুল্লাহ ও ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস, জিহাদ-ই ইসলামীর কাছে বেশ কয়কটি যুদ্ধে পরাজিত ও ব্যর্থ হওয়ার পর বাহ্যত: ‘নীল থেকে ফুরাত’ পর্যন্ত বৃহত্তর ইসরাইল গঠন প্রক্রিয়া মুখ থুবড়ে পড়ে। কিন্তু আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া ও লিবিয়াসহ এ অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দেশে মার্কিন সরকার ও তার মিত্রদের দখলদারিত্বমূলক উপস্থিতি,সামরিক আগ্রাসন ও হামলা হচ্ছে ‘নয়া মধ্যপ্রাচ্যের’ শিরোনামে যেন সেই নীল থেকে ফুরাত-ব্যাপী বৃহত্তর ইসরাইল গঠনের পুরনো নীল-নকশা বাস্তবায়নের পূর্ব প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ।  আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইয়েমেন ও সিরিয়ায় আলকায়দা, দায়েশ ইত্যাদি জঙ্গি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সংগ্রামের ধুয়ো তুলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অহরহ ড্রোন ও বিমান হামলা এই পূর্ব-প্রস্তুতিরই কিছু অংশ। এইসব ড্রোন হামলায় বহু বেসামরিক নারী পুরুষ ও শিশু হতাহত হচ্ছে।

 সৌদি আরব, কাতার, আরব আমিরাত, তুরস্ক এবং এদের সমর্থিত ও মদদপুষ্ট সালাফি তাকফিরি ওয়াহাবি জঙ্গি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো যেমন: আলকায়দা,তালিবান,আই.এস (দায়েশ),জাবহাতুন  নুসরা, বোকো হারাম, তাহরিক-ই তালিবান পাকিস্তান ইত্যাদি মধ্যপ্রাচ্যসহ সমগ্র মুসলিম বিশ্বে ইসলাম ও মুসলমানদের মহাশত্রু মার্কিন সরকার, পাশ্চাত্য ও ইসরাইলের পাকানো সেই বৃহত্তর ইসরাইল গড়ার মহা-ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের কাজ করছে।

 এটা স্পষ্ট যে, সৌদি –কাতার-আমিরাত-তুরস্ক কর্তৃক ইরাকে আইএস (দায়েশ) সমস্যার সৃষ্টি, সিরিয়ায় জাবহাতুন নুসরা,আহরারুশ শাম,আলকায়দা,দায়েশ (আইএস) প্রভৃতি উগ্র, হিংস্র, চরম রক্তপিপাসু সালাফি তাকফিরি ওয়াহাবি জঙ্গি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে দিয়ে গোলযোগ, যুদ্ধ ও সংঘাত জিইয়ে রাখা, ন্যায্য গণতান্ত্রিক ও নাগরিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামরত বাহরাইনের জনগণকে সৌদি সেনাবাহিনী পাঠিয়ে দমিয়ে রাখা- এসবই বৃহত্তর ইসরাইল গড়ার ওই মহা-ষড়যন্ত্রেরই সহায়ক তৎপরতা।

ইঙ্গ-মার্কিন-ইসরাইলি-সৌদি-কাতারি-আমিরাতি আধিপত্যবাদ বানচালকারী আন্দোলন আনসারুল্লাহকে ধ্বংস করে ইয়েমেনের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পলাতক প্রেসিডেন্ট আব্দু রাব্বিহ মনসুর আলহাদিকে ক্ষমতায় পুনর্বহাল করার অজুহাতে ইসরাইল-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ব্রিটেন কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে সৌদি আরব-কাতার-আমিরাত ২০১৫সালের মার্চ থেকে দুবছরেরও বেশি সময় ধরে ইয়েমেনে সর্বাত্মক যুদ্ধ ও অবরোধ চালিয়ে যাচ্ছে।  অথচ এ যুদ্ধে ইসরাইল-ইঙ্গ-মার্কিন-সৌদি-কাতারি-আমিরাতি চক্রের ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর কোন একটিও বাস্তবায়িত হয়নি।তাদের ঘোষিত লক্ষ্যগুলো হচ্ছে: আনসারুল্লাহ আন্দোলনের কাছ থেকে ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণভার ছিনিয়ে নেয়া ও এ আন্দোলনের নিরস্ত্রীকরণ, পলাতক প্রেসিডেন্ট আব্দু রাব্বিহ মনসুর আলহাদিকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা এবং আনসারুল্লাহ ও ইয়েমেনি সেনাবাহিনীর আক্রমণ ও অনুপ্রবেশ থেকে সৌদি সীমান্ত ও সীমান্তবর্তী শহরগুলোকে রক্ষা করা! অথচ সৌদি আরব ইয়েমেনে আগ্রাসন না চালালে এবং সেদেশের ঘরোয়া বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করলে আনসারুল্লাহ বা ইয়েমেনি সেনাবাহিনী সৌদি সীমান্তে হামলা চালাত না।

ইয়েমেনে রক্তক্ষয়ী প্রলয়ঙ্কর আগ্রাসন ও দু’ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলমান চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে বর্বর পিশাচ সৌদি’র নির্বিচার বিমান হামলায় ১২০০০এরও বেশি ইয়েমেনি নারী,পুরুষ ও শিশু শহীদ হয়েছে এবং দরিদ্র এ আরব মুসলিম দেশটির অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।  ইয়েমেনের দুই কোটি ৬০ লাখ জনগণের মধ্যে প্রায় এক কোটি ৭০ লাখেরও বেশি আজ তীব্র খাদ্য-সংকট, অপুষ্টি, ঔষধ সংকট এবং বিভিন্ন ধরণের রোগের শিকার হয়েছে। এ ছাড়াও আনসারুল্লাহ ইয়েমেন থেকে যে আলকায়দা সন্ত্রাসীদেরকে ইয়েমেনের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চল থেকে বিতাড়িত করেছিল তারা ও দায়েশ সৌদি আগ্রাসনের সুযোগ নিয়ে আবারও ইয়েমেনের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে ফিরে এসেছে। এ ছাড়াও ইরাক ও সিরিয়ায় পরাজয় বরণরত সালাফি তাকফিরি ওয়াহাবি জঙ্গি সন্ত্রাসীদেরকে বিশেষ করে আলকায়দা, দায়েশ ও জাবহাতুন নুসরার সদস্যদেরকে ইয়েমেনে চালান দেয়া হচ্ছে।

উল্লেখ্য, গণ-আন্দোলন কর্তৃক পদচ্যুত আলহাদি  সৌদি-মার্কিন আয়োজিত প্রহসনমূলক নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিল এবং এ নির্বাচনে কেবল সে ছাড়া আর কোন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ছিল না!  

সৌদি আরব দু বছরেরও বেশি সময় ধরে ইয়েমেনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন কর্তৃক সরবরাহকৃত যুদ্ধবিমানের সুবাদে জঘন্য বর্বর বিমান হামলা চলিয়ে যাচ্ছে যা আমরা ইতোমধ্যে উল্লেখ করেছি। অথচ এ দীর্ঘ সময়ে আনসারুল্লাহ ও ইয়েমেনি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কোন কার্যকর সফল গ্রাউন্ড অফেন্সিভ বা স্থল আক্রমণ চালাতে সক্ষম হয়নি সৌদি আরব ও তার মিত্ররা তথা আরব আমিরাত, কাতার, জর্দান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও সুদান।

সুদান ও মার্কিন সরকার আনসারুল্লাহ ও ইয়েমেনি সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত কোনো কোনো অঞ্চল যেগুলো আব্দু রাব্বিহ মনসুরের সমর্থক এবং আলকায়দা সন্ত্রাসী নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলোর কাছাকাছি কেবল সেই অঞ্চলগুলোকে দখলের চেষ্টা করেছিলো কমান্ডো সেনা পাঠিয়ে। কিন্তু আনসারুল্লাহ ও ইয়েমেনি সেনাবাহিনীর আক্রমণের মুখে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে সেসব এলাকা থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে তারা।

সংবাদ প্রতিবেদনগুলোতে দেখা গেছে কুখ্যাত মার্কিন সামরিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাক ওয়াটারের ভাড়াটে এজেন্টরা ইয়েমেনে সৌদি,আরব আমিরাত ও আব্দু রাব্বিহ মনসুর আলহাদির সমর্থকদের সাহায্য করছে। আর মিশর তো আনসারুল্লাহ ও ইয়েমেনি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে স্থল যুদ্ধে  কয়েক’শ সৈন্য এবং কিছু ট্যাংক পাঠিয়ে দায়সারাভাবে সৌদি কোয়ালিশনে অংশ গ্রহণ করেছে। কারণ, গত শতকের ষাটের দশকে ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ চলাকালে এই হুথি অধ্যুষিত উত্তর ইয়েমেনের বিরুদ্ধে দক্ষিণের মার্ক্সিস্ট বামপন্থীদের সাহায্য করতে  মিসরের জামাল আব্দুন নাসের সরকার সেনা পাঠিয়েছিল। কিন্তু ৪০০০০এরও বেশি মিসরীয় সেনা ঐ যুদ্ধে নিহত হয়েছিল এবং হুথি অধ্যুষিত উত্তর-ইয়েমেন দখলদার মিসরীয় সেনাবাহিনী ও তাদের বশংবদ দেশীয় মার্ক্সবাদী তল্পিবাহকদের কাছে পরাজয় বরণ ও নতি স্বীকার করেনি ।

 শোনা যায়, সৌদি বিমান বাহিনীর বৈমানিকদের এক উল্লেখযোগ্য অংশ হচ্ছে বিদেশী ভাড়াটে। যেমন: জর্দানি, পাকিস্তানি,মিসরীয়, মার্কিন, ইসরাইলি, ব্রিটিশ পাইলট ইত্যাদি। কারণ অতিরিক্ত ভোগবিলাস ও আমোদ-প্রমোদে আকণ্ঠ-লিপ্ত ও নিমজ্জিত সৌদিরা অত্যাধুনিক জঙ্গি বিমান চালানোয় সেরকম দক্ষ নয় এবং পাকিস্তানী সেনাবাহিনী যে সব সময় যুগের পর যুগ ধরে সৌদি বাদশাহতন্ত্রকে প্রহরা দিয়ে টিকিয়ে রেখেছে তা ওয়াকিবহাল মহলের অজানা নয়।

যে কোন যুদ্ধে চূড়ান্ত সামরিক বিজয় নির্ভর করে স্থলযুদ্ধ ও আক্রমণের উপর। বিমান-শক্তি এ ক্ষেত্রে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজে আসে মাত্র। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায় সৌদি আরবের স্থলযুদ্ধ করার মুরোদ নেই। আর সাম্প্রতিক লিবার্টি ফাইটার্স নামের এক ব্রিটিশ বার্তা সংস্থার খবরে প্রকাশ যে, সৌদি সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র জেনারেল আহমাদ আল আসিরি বলেছেন: ২০১৫ সালের মার্চ থেকে এ পর্যন্ত ইয়েমেনের উপর সৌদি কর্তৃক চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে এফ-১৫ জঙ্গি বিমানের ৩০ জন সৌদি পাইলট নিহত হয়েছে। আর উক্ত বার্তা সংস্থার মতে এটা হচ্ছে ইয়েমেনের বিরুদ্ধে চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে সৌদিদের ব্যর্থতারই অন্যতম বড় প্রমাণ।

আর এ কারণেই সৌদি প্রশাসন ইসরাইলকে ইয়েমেন যুদ্ধে অংশগ্রহণের অনুরোধ জানায়। এ অনুরোধে সাড়া দিয়ে এক স্কোয়াড্রন ইসরাইলী জঙ্গি বিমান এখন সৌদি বিমান বাহিনীর সাথে যুক্ত হয়েছে এবং ইয়েমেনের তায়েজে সাম্প্রতিক হামলা যে ইসরাইলী জঙ্গি বিমানগুলো চালিয়েছে তা উক্ত সৌদি সামরিক মুখপাত্রও স্বীকার করেছেন।

কিছুদিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সৌদি আরব সফর করেছেন। এটা এখন স্পষ্ট যে সৌদির কাছে আরও বিপুল মার্কিন সমরাস্ত্র বিক্রি এবং ইয়েমেনের আলহুদাইদা বন্দর দখল করতে মার্কিন-ইসরাইল যৌথ অংশগ্রহণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করাই ছিল এ সফরের আসল লক্ষ্য। সৌদি আরব সফর শেষ করেই ট্রাম্প সৌদি থেকে সরাসরি ইসরাইল সফরে যান। 

ইয়েমেনের বিরুদ্ধে চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে সৌদি কোয়ালিশন জোটে ইসরাইলের যোগদান সংক্রান্ত আরও তথ্যের জন্য দেখুন: MARCUS THUNDERBOLT প্রণীত ‘ISRAEL JOINS SAUDI COALITION AGAINST YEMEN…….UNINVITED’ শীর্ষক  লেখাটি। এ লেখাটি   ‘www.the Mideast.beast’-শীর্ষক সাইটে প্রকাশিত হয়েছে। কেবল পেট্রো ডলারের জোরে ইঙ্গ মার্কিন ফরাসী অত্যাধুনিক জঙ্গি বিমান কিনে এবং ভাড়াটে বৈমানিক এনে বিমান আক্রমণ এবং জল-স্থল-অন্তরীক্ষে (আকাশ পথে) সার্বিক অবরোধ আরোপের  মাঝেই কেবল এ যুদ্ধটাকে এ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রেখেছে সৌদি আরব ও তার মিত্ররা।

মিশরের উপর আধিপত্য বিস্তারে সৌদি-কাতার দ্বন্দ্বের পরিণতিতে মিশরের প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুরসির সরকারের পতন ঘটে সেনাপ্রধান জেনারেল সিসির সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। আর এ সামরিক অভ্যুত্থানের আগের ও পরের ঘটনাবলীতে দু’হাজারেরও বেশি - মতান্তরে চার হাজার-মিসরীয় প্রাণ হারিয়েছে এবং দেশটিতে এখনও আলকায়দা ও দায়েশের মতো সন্ত্রাসী জঙ্গি সালাফি তাকফিরি ওয়াহাবি গোষ্ঠীগুলোর হামলায় অহরহ বহু মিসরীয় জনতা,পুলিশ ও সেনা সদস্য প্রাণ হারাচ্ছে। গত এপ্রিল মাসে মিসরের তানতা ও আলেক্সান্ড্রিয়া নগরীর দু’টি গির্জায় বোমা হামলায় প্রায় ৪৪ জন মিসরীয় নিহত হয়।

উল্লেখ্য মিসরের উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা নিয়ে সৌদি-কাতারি শাসকচক্রের কামড়া-কামড়ির কারণে‌ই দেশটির গণতন্ত্র মুখ থুবড়ে পড়েছে। আসলে এটা স্পষ্ট যে মিসরের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াই সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে গেছে। এ কামড়াকামড়ির লড়াইয়ে বাহ্যত: সৌদি আরব জয়ী হয় এবং কাতার পরাজয় বরণ করে। কারণ সৌদি শাসকচক্রের চাইতে কাতারের শাসকচক্রের সঙ্গেই মুরসি সরকারের বেশি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও সখ্যতা ছিল। মুরসি সিরিয়া সংকটে অত্যন্ত ন্যক্কারজনক ভূমিকা নিয়েছিলেন এবং এ ক্ষেত্রে বাশার আল আসাদ সরকার ও ইরানের সাথে তীব্র বিরোধিতায়ও লিপ্ত হয়েছিলেন তিনি। মুরসি ইরানের সাথে পুনরায় কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনেরও কোন উদ্যোগ নেননি। কিন্তু মুরসিসহ ৬০০এরও বেশি শীর্ষ ইখওয়ানি নেতাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হলে ইরান সরকার ও সেদেশের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ আনুষ্ঠানিকভাবে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছিলেন।

উল্লেখ্য মিসরের সিসি সরকার সিরিয়া সংকটে আসাদ সরকার বিরোধী ভূমিকা গ্রহণ করা থেকে দুরে থাকার নীতি গ্রহণ করেছে সম্ভবত: মিসরে সালাফি তাকফিরি ওয়াহাবি সন্ত্রাসবাদী ভূতের ভয়াল কালো থাবার বিস্তারের কারণেই। অন্য কথায় বলা যায় সৌদি-কাতারি-আমিরাতি-তুর্কী-ইঙ্গ-মার্কিন–ইসরাইলি চক্র এবং তাদের ভৃত্য ওয়াহাবি-সালাফি-তাকফিরি জঙ্গি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোই গোটা মুসলিম বিশ্বকে অক্ষত থাকতে দিচ্ছে না। বরং এদের হিংস্র ছোবল ও থাবায় আজ পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন, মিসর, লিবিয়া, তিউনিসিয়া, নাইজেরিয়া, চাদ, নাইজার, মালি, সোমালিয়া রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত। এমনকি অধুনা তুরস্কের জনগণও কমবেশি এ অবস্থার শিকার হচ্ছে।

নব্য জে এম বি এবং বাংলাদেশের গত এক-দেড় বছরের ঘটনাবলীও সেই একই কথাই প্রমাণ করে। ইঙ্গ-মার্কিন-ইসরাইলী-সৌদি প্ল্যান ও মদদে  বিশ্বব্যাপী বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলোয় ভয়ংকর জঙ্গি সন্ত্রাসী উগ্র সালাফি তাকফিরি ওয়াহাবি চিন্তাধারার তথাকথিত জিহাদি গোষ্ঠীগুলোর উদ্ভব ও ধ্বংসাত্মক তৎপরতার অনেক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের মধ্যে সবচেয়ে প্রধান উদ্দেশ্যই হচ্ছে সমগ্র মুসলিম বিশ্বকে ঘরোয়াভাবে ক্ষতবিক্ষত করে ধসিয়ে দিয়ে এর উপর ইঙ্গ-মার্কিন-ইসরাইলি-সৌদি  আধিপত্য ও প্রভুত্ব কায়েম করা। (এ প্রসঙ্গে স্বতন্ত্র আলোচনার অবকাশ আছে।)

যে আলকায়দা, তালিবান, দায়েশ ও এ ধরণের উগ্র সালাফি তাকফিরি ওয়াহাবি জঙ্গি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর হিংস্র পাশবিক সন্ত্রাসী তৎপরতায় সমগ্র বিশ্ব বিশেষ করে মুসলিম বিশ্ব ক্ষতবিক্ষত ও জর্জরিত সেগুলো মূলত: সৌদি-কাতারি-কুয়েতি-আমিরাতি অর্থায়নে ও সৌদি আরবের তথাকথিত ভয়ংকর উগ্রবাদী সংকীর্ণমনা সালাফি তাকফিরি ওয়াহাবি মতবাদের ভিত্তিতে  সিআইএ (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র), এমআইসিক্স (ব্রিটেন), মোসাদের (ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা) পরিকল্পনা ও প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে  সৃষ্ট হয়েছিল। এবারকার মার্কিন নির্বাচনের প্রচারাভিযান ও বিতর্ক অনুষ্ঠানে ডোনাল্ড ট্রাম্প দায়েশ ও আলকায়দা তৈরিতে হিলারি ক্লিনটনের হাত ছিল বলে অভিযুক্ত করেছেন। পর্যবেক্ষক মহল হিলারি ক্লিনটনকে দায়েশ তথা আইএসের জননী বলে মনে করেন। আর হিলারি নিজেও বেশ কয়েকবার বলেছেন, আমরাই তথা মার্কিন সরকারই আলকায়দা-তালিবান তৈরি করেছি।

এখন পাশ্চাত্য ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবৈধ জারজ সন্তানসম এইসব উগ্র জঙ্গি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো যেন আজ ফ্রাংকেনস্টাইন হয়ে পাশ্চাত্য, তুরস্ক ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও সন্ত্রাসী আঘাত হানছে। ভয়ংকর সন্ত্রাসী জঙ্গিদের জনক জননী ও লালন-পালনকারী যুক্তরাষ্ট্র ও তার চেলা-চামুণ্ডারা তথা ব্রিটেন, ফ্রান্স, সৌদি আরব, কাতার  ও আমিরাতের মতো সরকারগুলো ইরানকে জঙ্গি সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক বলে অভিযুক্ত করছে যা সত্যি দুঃখজনক। আর এটাই হচ্ছে চোরের মার বড় গলা—এ প্রবাদের উৎকৃষ্ট নমুনা।

তাই এটা পরিষ্কার যে আজ বিশ্ব শান্তির জন্য প্রকৃত হুমকি ইরান নয় বরং এই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার সাঙ্গ-পাঙ্গোরাই তথা ইসরাইল, ব্রিটেন, ফ্রান্স, সৌদি আরব, কাতার, আমিরাত, তুরস্ক -  এসবই হচ্ছে প্রকৃত হুমকি। ইরান ইসলামি বিপ্লব বিজয়ের পর থেকে বিগত বছরগুলোয়  ইঙ্গ-মার্কিন-ইসরাইলের লালিত ও মদদপুষ্ট বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর সন্ত্রাসী আক্রমণ ও হামলার শিকার হয়েছে। ইরান সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ইরাকে ও সিরিয়ায় নিষ্ঠার সাথে সংগ্রাম করছে ইরাকি ও সিরিয় সরকার আর জনগণের পাশে থেকে।

যে আলকায়দা ও তালিবানি জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ আফগানিস্তান ও পাকিস্তানেই প্রধানত: সীমাবদ্ধ ছিল আজ তা মার্কিন সরকার ও তার মিত্রদের আক্রমণের বদৌলতে ইরাক, সিরিয়া, জর্দান, তুরস্ক, ইয়েমেন, মিসর, লিবিয়া, তিউনিসিয়া, নাইজেরিয়া, মালি,ঘানা, চাদ ও নাইজারসহ এশিয়া ইউরোপ এমনকি স্বয়ং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও ছড়িয়ে গেছে। ১১সেপ্টেম্বর ২০০১ সালে তদানীন্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী তথাকথিত ‘ক্রুসেড’ শুরু হওয়ার পর থেকে গোটা বিশ্ব আজ সম্পূর্ণ অনিরাপদ হয়েছে। এ সবের জন্য কে দায়ী ইরান নাকি যুক্তরাষ্ট্র এবং তার সাঙ্গ-পাঙ্গো ও চেলা-চামুণ্ডা?

রেডিও তেহরান: সিরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যে হিজবুল্লাহর তৎপরতা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন ও অভিমত  তুলে ধরুন।

 মোহাম্মাদ মুনীর হোসেন খান:  মার্কিন সরকার ও তার মিত্রদের প্রসূত সন্ত্রাসবাদ পৃথিবীতে একের পর এক অবৈধ সন্তান (সন্ত্রাসবাদ) প্রসব করেই যাচ্ছে। এসব সন্ত্রাসবাদ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সাধারণ নিরীহ জনগণকেও রেহাই দিচ্ছে না। আর ইমাম খোমেনীর খাঁটি ইসলামী চিন্তাধারা ও ইসলামী বিপ্লবের আদর্শে অনুপ্রাণিত লেবাননের ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন হিজবুল্লাহ কখনোই লেবাননি সরকার, সেনাবাহিনী ও জনগণের বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ চালায়নি। বরং হিজবুল্লাহ ইসরাইলি দখলদারিত্ব থেকে ২০০০ সালের মে মাসে দক্ষিণ লেবাননকে মুক্ত করে আরব-ইসরাইল যুদ্ধের ইতিহাসে প্রথম বার বিজয় পতাকা উত্তোলন করে সমগ্র মুসলিম ও আরব বিশ্বের মুখ উজ্জ্বল করে। আবার ২০০৬ সালে এই হিজবুল্লাহ ৩৩ দিনের যুদ্ধে আগ্রাসী ইসরাইলকে দ্বিতীয়বারের মত পরাজিত করে।

 আর এই একই হিজবুল্লাহ ইঙ্গ-মার্কিন-ইসরাইল-সৌদি –কাতার-তুরস্ক কর্তৃক লেলিয়ে ও চাপিয়ে দেয়া সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সিরিয় সরকার ও জনগণের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করছে। শুধু সিরিয়াতেই নয় হিজবুল্লাহ লেবানন সরকার, সেনাবাহিনী ও জনগণের সাথে সহযোগিতা করে ইঙ্গ-মার্কিন-ইসরাইল-সৌদি-কাতার-তুরস্ক সমর্থিত জঙ্গি সালাফি তাকফিরি ওয়াহাবি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে সিরিয়া-লেবানন সীমান্তে প্রতিহত করে ও ঠেকিয়ে দিয়ে লেবাননে ফিৎনা ও গোলযোগ সৃষ্টি করার সুযোগ দেয়নি, যদিও এসব গোষ্ঠীর চরেরা বৈরুতে হিজবুল্লাহর সমর্থকদের এলাকা ও মহল্লায় কয়েকবার বোমা ফাটিয়ে বেশ কিছু নিরীহ মানুষকে হতাহত করেছিল।

লেবাননে ১০ লক্ষাধিক সিরিয় শরণার্থীর আশ্রয় গ্রহণ সত্ত্বেও হিজবুল্লাহ সিরিয়ায় সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার মধ্য দিয়ে  আজ লেবাননে শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। আর হিজবুল্লাহর সাথে দেশটির সুন্নি মুসলমান, খ্রিষ্টান,দ্রুজসহ সব ধর্মীয় সম্প্রদায় ও রাজনৈতিক দলগুলোর সুসম্পর্ক রয়েছে। তাই কেমন করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের চোখে হিজবুল্লাহ সন্ত্রাসী জঙ্গি গোষ্ঠী বলে বিবেচিত হতে পারে?

রেডিও তেহরান: সিরিয়ায় যদি বাশার আল আসাদ সরকারের পতন ঘটে তাহলে সেখানে কী হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

 মোহাম্মাদ মুনীর হোসেন খান: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার চেলা-চামুণ্ডাদের প্রসবকৃত জঙ্গি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো যারা সিরিয়ায় বাশার আল আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে তারা এতটা হিংস্র, পিশাচ, রক্তপিপাসু ও বর্বর যে নিজেদের মধ্যে সামান্য বিরোধ ও মতপার্থক্য হলেই পরস্পর রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। বহুবার জাবহাতুন নুসরা, আহরারুশ শাম , আইএস ইত্যাদি গ্রুপ সিরিয়ায় বিভিন্ন অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ ও দখলকে কেন্দ্র করে একে অপরের হাজার হাজার সমর্থক ও যোদ্ধাকে হত্যা করেছে। বাশার আল আসাদ বিরোধী এ সব গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে কোন ঐক্য ও একতা নেই। তাই বাশার আল আসাদ সরকারের পতন ঘটলে আর এক ও ঐক্যবদ্ধ সিরিয়াও থাকবে না।

 গাদ্দাফি-উত্তর লিবিয়াকে যেমন পাশ্চাত্য তিন টুকরো করেছে ঠিক তেমনি বাশার আল আসাদ সরকারের পতন হলে সিরিয়াকে তিনেরও বেশি টুকরায় বিভক্ত করবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্য। তারা চায় যেন সিরিয়ায় বিভিন্ন গোষ্ঠী, সম্প্রদায় ও অঞ্চলের মধ্যে গৃহযুদ্ধ ও সংঘর্ষ অবিরাম চলতেই থাকে। আর এভাবেই ইসরাইলের শক্তির শ্রেষ্ঠত্ব, নিরাপত্তা ও অত্র অঞ্চলের উপর এর আধিপত্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তাই  এ কারণেই মার্কিন সরকার ও তার মিত্ররা বাশার আল আসাদ সরকারের পতন ঘটানোর ব্যাপারে এত জোর গুরুত্বারোপ করে থাকে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তথা পাশ্চাত্য যে দেশে হস্তক্ষেপ করেছে সেদেশেরই বারোটা বেজে গেছে। আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইরাক,লিবিয়া, মিসর, তিউনিসিয়া, তুরস্ক, কোরিয় উপদ্বীপ, ফিলিস্তিন, আফ্রিকান ও লাতিন আমেরিকান দেশগুলোর বর্তমান অবস্থা ও সংকট এর জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। আর এই রুঢ় বাস্তবতা বেশ ভালো করে উপলব্ধি করার কারণেই বাশার আল আসাদ সরকারের প্রতি সিরিয়ার জনগণের সমর্থন বজায় রয়েছে।

 মধ্যপ্রাচ্যে ও সিরিয়ায় সমস্যা জিইয়ে রাখার মধ্যেই রয়েছে পাশ্চাত্য বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর স্বার্থের সুষ্ঠু সংরক্ষণ। তবে সিরিয়ায় ইসরাইলের স্বার্থে সমস্যা জিইয়ে রাখতে হলে আমেব়িকার দৃষ্টিতে বাশার আল আসাদ সরকারের দ্রুত পতন দরকার।

অন্য কথায় বাশার আল আসাদের পতন না হওয়ার অর্থই হচ্ছে বাশার আল আসাদ বিরোধী শিবিরগুলোর হতাশা, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বৃদ্ধি এবং পরিণতিতে ব্যর্থতা ও পরাজয়। যার ফলে হতাশ, পরাজিত, ব্যর্থ জঙ্গি সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন দেশে এমনকি পাশ্চাত্যে ছড়িয়ে পড়ে ঐসব দেশে তারা মনের রাগ ও ব্যর্থতাজনিত ক্ষোভ মিটানোর জন্য নাশকতামূলক ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের যে প্রসার ও বিস্তার ঘটাবে তা  আমরা আগেও উল্লেখও করেছি। এছাড়া বাশার আসাদ সরকারের টিকে থাকা ইসরাইলের জন্যও সুখকর নয় বরং তা হচ্ছে ইসরাইলের জন্য ভয়ংকর দুঃস্বপ্নও (NIGHTMARE) বটে।

 তাই ইদলিব প্রদেশের জঙ্গি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী জাবহাতুন নুসরা নিয়ন্ত্রিত খানশাইখুন অঞ্চলের কথিত ব়াসায়নিক হামলার দায়দায়িত্ব বাশার আলা আসাদ সরকারের  ওপর চাপিয়ে এই সরকারের পতন ঘটানোর প্রেক্ষাপট রচনা, পরাজয় বরণরত জঙ্গি-সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর মনোবল চাঙ্গা করা এবং সিরিয় সেনা অবস্থানগুলোর উপর বিমান আক্রমণ চালাতে গিয়ে দু-দু’টি জঙ্গি বিমান হারানোজনিত ইসরাইলের মনের খেদ ও ক্রোধ প্রশমনের উদ্দেশ্যেই  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সিরিয় সরকারের আল-শুআইরাত বিমান-ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।

কিন্তু সিরিয় সরকার, ইরান ও রাশিয়ার কার্যকর ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণের কারণে হালে পানি না পাওয়ায় পুনঃআক্রমণের আস্ফালন করা ছাড়া আর তেমন কিছুই করতে পারেনি ট্রাম্প প্রশাসন। এ অবস্থায় গত ২৭ -৪-২০১৭ বৃহস্পতিবার ইসরাইল দামেস্কের অদূরে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে কথিত এক অস্ত্রের গুদামে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। ইসরাইল দাবি করে যে, হিজবুল্লাহর জন্য ইরান থেকে বিমানে পাঠানো অস্ত্র-শস্ত্র ও গোলাবারুদ উক্ত গুদামে রাখা হত!

রেডিও তেহরান: তাহলে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের কাছে সাম্প্রতিক ইসরাইলি হামলার বহুমুখী ও মূল কারণগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরবেন কী?

 মোহাম্মাদ মুনীর হোসেন খান: বাস্তবে এ হামলার কিছু লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য রয়েছে যেগুলো হচ্ছে:

১.সিরিয় সরকারকে ইসরাইলে পাল্টা আঘাত করার ব্যাপারে উস্কানি দেয়া।  আর সিরিয়া যদি এতে সাড়া দিয়ে ইসরাইলের ওপর কোনো হামলা চালায় তাহলে ইসরাইলের নিরাপত্তা লঙ্ঘন করা হয়েছে- এ ধরণের ধুয়ো তুলে মার্কিন সরকার সিরিয়ায় ব্যাপক হামলা ও আগ্রাসন চালানোর মওকা পেয়ে যাবে এবং এ বাহানায় তথা ইসরাইলের নিরাপত্তা ও অস্তিত্ব বিপন্ন ও হুমকির সম্মুখীন- এ ধরণের অজুহাত দাঁড় করিয়ে জাতিসংঘের কাছ থেকে সিরিয়ার ওপর হামলার ও বাশার আল-আসাদ সরকারের পতন ঘটানোর ম্যান্ডেট এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমর্থন আদায় ও এতে করে রাশিয়া ও ইরানকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে জব্দ করাও সম্ভব হবে।

২.সিরিয় সেনাবাহিনীর মনোযোগ ও দৃষ্টিকে জঙ্গি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর দিক থেকে অন্যত্র সরানো।

৩.সিরিয় সেনাবাহিনীর মনোবলকে হেয় ও দুর্বল এবং পরাজয় বরণরত বিদ্রোহী জঙ্গি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর হৃত মনোবলকে চাঙ্গা করা।

৪.এ হামলা চালিয়ে সিরিয় সরকার ও সেনাবাহিনী, ইরান ও রাশিয়ার সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার ধরণ ও মাত্রা পরিমাপ ও সেটার ভিত্তিতে ভবিষ্যতে অঘোষিত পরিকল্পনা ও নীল নকশা বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ। এরই আভাস পাওয়া গেছে সাম্প্রতিক সময়ে (মঙ্গলবার ১৯-২-৯৬) জর্দান-সিরিয়া সীমান্তে ৭০০০-এরও বেশি মার্কিন, ব্রিটিশ, জর্দানি ও সৌদি সেনাবাহিনীর যৌথ যুদ্ধ মহড়া থেকে।  পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা:  এ মহড়া, সুযোগ পেলেই সিরিয়ার ভিতরে অনুপ্রবেশ করবে। বিশেষ করে দামেস্ক অভিমুখে অভিযান চালানোর লক্ষ্যেই করা হচ্ছে এই মহড়া।

রেডিও তেহরান: সিরিয়ার সর্বশেষ পরিস্থিতি ও নিকট ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?

 মোহাম্মাদ মুনীর হোসেন খান:  আমরা যেমন আগেও উল্লেখ করেছি আসলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ইসরাইল এবং এদের পোষ্য বশংবদ তল্পিবাহক সৌদি কাতারি আমিরাতি শাসকচক্রের মূল টার্গেট হল: যেমন করেই হোক না কেন বাশার আল আসাদ সরকারের পতন ঘটাতেই হবে। তাই, তারা আজ পর্যন্ত বাশার আল-আসাদ সরকারের পতন ঘটাতে সক্ষম না হলেও সবসময় এ লক্ষ্যে নানা ধরণের বাহানা, ষড়যন্ত্র, কূটকৌশল ও অপচেষ্টা চালিয়েই যাচ্ছে।

ইরান ও রাশিয়ার উদ্যোগে বেশ কিছুদিন ধরে উগ্র জঙ্গি সন্ত্রাসী সালাফি তাকফিরি ওয়াহাবি গোষ্ঠীগুলো যেমন:  জাবহাতুন নুসরা ও আইএস তথা দায়েশ ইত্যাদি ছাড়া আর সব বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও দলগুলোর সাথে বাশার আল আসাদ সরকারের সেনাবাহিনীর যুদ্ধবিরতি চলছে যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের এবং সকল বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও দলের ব্যর্থতা ও বাশার আল আসাদ সরকারের সাফল্যেরই প্রমাণ। এ ধরনের যুদ্ধ-বিরতি যুদ্ধ-বিধ্বস্ত সিরিয়ায় সংকট সমাধান ও শান্তি ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে। আর এ প্রচেষ্টারই ধারাবাহিকতায় কাজাখিস্তানের রাজধানী আস্তানায় রাশিয়ার প্রস্তাবে ইরান-রাশিয়া-তুরস্কের সমঝোতায় সিরিয়ায় ৪টি ‘ডিএস্কেলেশন জোন’ বা ‘নিরাপদ অঞ্চল’ স্থাপন সত্যিই প্রশংসনীয় এবং তা বাস্তবায়িত হলে সিরিয়ায় শান্তি ফিরে আসাটা সুদূর পরাহত নয়।

উল্লেখ্য যে, বাশার আল আসাদ সরকার নিরাপদ অঞ্চল গঠনের এ প্রস্তাবে সম্মত আছেন। আর এতে দেখা যাচ্ছে যে কেবল তুরস্ক ছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের আর কারও এই প্রক্রিয়ায় না থাকা বা এর সাথে সংশ্লিষ্ট না হওয়াটা মার্কিন শিবিরের নৈতিক পরাজয় ও ব্যর্থতা বৈ আর কিছুই নয়। আর এ থেকেই স্পষ্ট যে সিরিয়ার সংকট নিরসনে ইরান, রাশিয়া ও বাশার আল আসাদ সরকারের আন্তরিকতা ও সদিচ্ছার বিন্দুমাত্র অভাব নেই, বরং এ ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদেরই রয়েছে সীমাহীন অসদিচ্ছা ও আন্তরিকতাহীনতা।

 তাই যখন ইরান, রাশিয়া,তুরস্ক ও দামেস্ক সিরিয়ায় ‘ডিএস্কেলেশন জোন’ গঠন প্রস্তাবে সম্মত হয়েছে এবং এই প্রক্রিয়াটা যখন কার্যত: বাস্তবায়িত হওয়ার প্রক্রিয়াধীন ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সাথে বাশার আল আসাদ সরকারের যুদ্ধবিরতিও চলছে ঠিক তখন জর্দান-সিরিয়া সীমান্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, জর্দান ও সৌদি সেনাবাহিনীর ৭০০০-এরও বেশি সৈন্য নিয়ে যুদ্ধের মহড়া চালানোর নামে সুযোগমত সিরিয়ার ভিতরে সামরিক অভিযান চালিয়ে বাশার আল আসাদ সরকারের পতন ঘটানো মোটেই  সম্ভব হবে না। কিন্তু এ মহড়ার মাধ্যমে তারা সিরিয়ায় বর্তমানে কার্যকর যুদ্ধ বিরতি চুক্তি এবং ডিএস্কেলেশন   জোন গঠনের উদ্যোগ ভণ্ডুল করে ইঙ্গ-মার্কিন-ইসরাইলী-সৌদি-কাতারি সাম্রাজ্যবাদী নীল নকশা বাস্তবায়নকে সম্ভবপর করতে চায়।

আর সিরিয়া সংকটে তুরস্কের ভূমিকারও সুষ্ঠু মূল্যায়ন জরুরি। যে তুরস্ক বরাবর সিরিয়া সংকটে বাশার আল আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে ছিল এবং বছর খানেক আগেও ব়াশিয়ার একটি জঙ্গি বিমান ভূপাতিত করে সেদেশের সাথে প্রকাশ্য শত্রুতায় লিপ্ত হয়েছিল সেই তুরস্ক কেন এই ‘ডিএস্কেলেশন জোন’ গঠনে ইরান ও রাশিয়ার সাথে সম্মত হল?---এ প্রশ্নের এক বিশ্লেষণধর্মী জবাব প্রয়োজন যা স্বতন্ত্র আলোচনার দাবী রাখে। আমরা এ ব্যাপারে ভবিষ্যতে বিস্তাব়িত আলোচনা করব।

রেডিও তেহরান: চমৎকার ও বিস্তারিত ব্যাখ্যাসহ সাক্ষাৎকার দেয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

মোহাম্মাদ মুনীর হোসেন খান: শ্রোতা ও পাঠক এবং আপনাদের সবাইকেও জানাচ্ছি ধন্যবাদ।#

পার্সটুডে/মু.আ.হুসাইন/১৯