সিরিয়ায় ইসরাইলের বিপর্যয় এবং আসাদ, ইরান ও রাশিয়ার বিজয়ে নেতানিয়াহুর আতঙ্ক
https://parstoday.ir/bn/news/world-i44994-সিরিয়ায়_ইসরাইলের_বিপর্যয়_এবং_আসাদ_ইরান_ও_রাশিয়ার_বিজয়ে_নেতানিয়াহুর_আতঙ্ক
দখলদার ইহুদিবাদী ইসরাইলের সরকারি টেলিভিশন চ্যানেল-টু সিরিয়ার যুদ্ধ বিষয়ক এক আলোচনায় বলেছে, এই যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি পরাজয় ঘটেছে ইসরাইলের।
(last modified 2026-03-14T11:23:49+00:00 )
আগস্ট ২৮, ২০১৭ ১৬:২৬ Asia/Dhaka
  • ইসরাইলের আবাসন বিষয়ক মন্ত্রী ইয়াওভ গলান্ত
    ইসরাইলের আবাসন বিষয়ক মন্ত্রী ইয়াওভ গলান্ত

দখলদার ইহুদিবাদী ইসরাইলের সরকারি টেলিভিশন চ্যানেল-টু সিরিয়ার যুদ্ধ বিষয়ক এক আলোচনায় বলেছে, এই যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি পরাজয় ঘটেছে ইসরাইলের।

ইসরাইলের আরব ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক এক বিশেষজ্ঞ সিরিয়ার যুদ্ধে ইহুদিবাদী দখলদার শক্তির পরাজয়ের কথা স্বীকার করে বলেছেন, সিরিয়ার যুদ্ধে ইসরাইলের সবচেয়ে বেশি হেরে যাওয়ার কারণ হল ইসরাইলি গোয়েন্দা সার্ভিসগুলো দেশটির চলমান পরিস্থিতি বুঝতে দেরি করেছে। ওই বিশ্লেষক বলেছেন, 'সিরিয়ার বিষয়ে অবশ্যই এটা বলতে হয় যে ইসরাইল হেরে গেছে, সেখানে সবচেয়ে বেশি হেরেছি আমরাই। আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে বিলম্ব করেছে।'

ইসরাইলের ওই বিশ্লেষক আরও বলেছেন, সিরিয়া যুদ্ধে অনেক ব্যক্তি ও পক্ষই হেরেছে, তবে সেখানে সবচেয়ে বেশি পরাজয় ঘটেছে ইসরাইলের। 

তিনি আরও বলেন, হয়তো আমার এ কথা খুবই তিক্ত, কিন্তু এটাই হচ্ছে  সিরিয়া বিষয়ে কয়েক মাসের বরং আরও বেশি সময়ে করা চিন্তার ফসল। ইসরাইলি বিশ্লেষক আরও স্বীকার করেছেন যে, ফ্রি সিরিয়ান আর্মি বলতে এখন আর বাস্তবে কিছু নেই, তারা এখন আর সিরিয় সংকটের কোনো সক্রিয় পক্ষই নয়। ওদের বিলুপ্তি এখন কেবলই সময়ের ব্যাপার।  

সম্প্রতি ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের প্রধান ইউসি কোহেনও তাকফিরি জঙ্গি গোষ্ঠী দায়েশ বা আইএসএল (আইএস) ব্যাপক মাত্রায় হেরে যাওয়ায় ও এ অঞ্চলে ইরানের প্রভাব বাড়তে থাকায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

ইসরাইলের সামরিক রেডিওকে দেয়া সাক্ষাতকারে ইউসি কোহেন বলেন, যেসব জায়গায় দায়েশ হেরে যাচ্ছে ও যেসব জায়গা থেকে দায়েশ পিছু হটছে সেসব জায়গায় অবস্থান নিচ্ছে ইরান। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখন খুবই জটিল ও স্পর্শকাতর হয়ে পড়েছে। সংঘাতের পরিধি বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করাও খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। ইরান তার সহযোগী ও মিত্রদের মাধ্যমে সিরিয়া ছাড়াও লেবানন, ইরাক ও ইয়েমেনে তার প্রভাব জোরদার করে যাচ্ছে এবং এ বিষয়টি ইসরাইলের নিরাপত্তার জন্য খুবই বিপজ্জনক ও মারাত্মক হুমকি।

ইসরাইল তার চির-শত্রু সিরিয়ার আসাদ সরকারকে ইরানের বন্ধুত্বের বলয় থেকে বের করতে ব্যর্থ হওয়ায় এর শোধ নিতে আসাদ বিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে নানা ধরনের সহায়তা দিয়ে আসছে। তবে আসাদ বিরোধী গোষ্ঠীগুলো সিরিয়ায় একের পর এক বিপর্যয়ের শিকার হওয়ায় ইসরাইল এখন ওই গোষ্ঠীগুলোর চূড়ান্ত পতনের আশঙ্কায় যেন দিশাহারা হয়ে পড়েছে।

বিশেষ করে সিরিয়ার সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে খুব বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন খোদ ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু।

 নেতানিয়াহু আবারো রাশিয়ার সোচিতে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাতে ইসলামি ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যসহ সারা বিশ্বের জন্য অত্যন্ত বিপদজনক দেশ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তবে ইরানের বিরুদ্ধে নেতানিয়াহুর এ অভিযোগকে মোটেই আমলে নেননি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট।

এ অবস্থায় ইসরাইলের কর্মকর্তারা আরও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন সিরিয়ায় ইরানের প্রভাব বৃদ্ধির আশঙ্কায়।

ইসরাইলের আবাসন বিষয়ক মন্ত্রী ইয়াওভ গ'লান্ত সুন্নি মুসলিম বিশ্বের প্রতি কৃত্রিম দরদ দেখিয়ে বলেছেন, ইরান এখন পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল পর্যন্ত শিয়া ক্রিসেন্ট (চাঁদ) গড়ে তোলার কাজ পরিপূর্ণ করতে যাচ্ছে শিয়া সেনা ও রাশিয়ার মাধ্যমে। 

সোচিতে নেতানিয়াহুর ব্যর্থ মিশনের পর ইসরাইলের যুদ্ধমন্ত্রী অ্যাভিগডোর লিবারম্যানও সিরিয়ায় ইরানের পা শক্ত হওয়ার ব্যাপারে ইসরাইল নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকবে না বলে ঘোষণা করেছেন। 

পুতিন ও নেতানিয়াহু

 

সিরিয়ায় আসাদ বিরোধী নানা পক্ষের, বিশেষ করে ইসরাইলের সবচেয়ে বড় পরাজয় ঘটা এবং আসাদ সরকার, রাশিয়া ও ইরানের সাফল্য সম্পর্কে নানা লেখা দেখা যাচ্ছে বিশ্বের খ্যাতনামা নানা গণমাধ্যমে।

এ বিষয়ে সম্প্রতি অ্যারাব নিউজে এক নিবন্ধ লিখেছেন রুশ লেখিকা ও মধ্যপ্রাচ্য গবেষণা বিষয়ক একটি রুশ সংস্থার প্রধান মারিয়া ডুবোভিকভা (Maria Dubovikova)। ইরান বিরোধী লেখা লেখতে অভ্যস্ত বলেই তার লেখা প্রায়ই ছাপানো হয় অ্যারাব নিউজে।

মারিয়া লিখেছেন, সিরিয়ায় ইসরাইলি স্বার্থ রক্ষায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও ট্রাম্পের প্রশাসনকে সক্রিয় করতে ব্যর্থ হওয়ার পর নেতানিয়াহু গত সপ্তায় ছুটে গেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের কাছে। মার্কিন সরকার এখন সিরিয়ার কুর্দিদের নিয়েই নতুন খেলা শুরু করতে চায়। (কুর্দিদের জন্য সিরিয়ার কিছু অঞ্চলকে স্বাধীন বা আধা-স্বাধীন করা ছাড়া অন্য কোনো দিকেই তার মনোযোগ নেই।) সিরিয়ায় রাশিয়া, আসাদ, ইরান ও হিজবুল্লাহর অক্ষকে ঘাঁটানোর কিংবা তাদের সঙ্গে সংঘাতে যাওয়ার ইচ্ছে আর নেই ওয়াশিংটনের। 

মারিয়ার মতে মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ে যে ঝামেলায় আছে মার্কিন সরকার তার বাইরে নতুন ঝামেলায় বা মস্কোর সাথে সংঘাতে জড়াতে চায় না ট্রাম্প সরকার। 

নেতানিয়াহু ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের প্রধানসহ আরও কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে নিয়ে (গত বুধবার) পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। 
নেতানিয়াহু পুতিনকে বোঝাতে চেয়েছে যে ইরাক, ইয়েমেন এবং এমনকি লেবাননের নিয়ন্ত্রণ নিতে যাচ্ছে ইরান। তিনি বলেন, 'আমরা একটা মিনিটের জন্যও এটা ভুলতে পারছি না যে ইরান ইসরাইলকে ধ্বংস করে ফেলার হুমকি দিচ্ছে প্রতিদিন। ইসরাইল সিরিয়ায় ইরানের ক্রমেই শক্ত হয়ে বসার বিরোধী। আমরা সব উপায় ব্যবহার করে এর মোকাবেলায় ও যে কোনো হুমকির মোকাবেলায় আমাদেরকে রক্ষা করব।' অর্থাৎ কেউ আমাদের সাহায্য না করলে আমরাই সিরিয়ায় আমাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য একতরফা পদক্ষেপ নেব। 

মারিয়া আরও লিখেছেন, পুতিন নীরব থেকে নেতানিয়াহুর বক্তব্যগুলোর সরাসরি কোনো জবাব দেননি। কিন্তু তার নীরবতা ছিল অনেক বেশি বাকময়। রাশিয়া শোনে ও খেলোয়াড়দের তথা নানা পক্ষের অবস্থানকে গুরুত্ব দেয়। কিন্তু দেশটির সরকার তার স্বার্থের আলোকেই পদক্ষেপ নেয়, বিশেষ করে যখন তার অবস্থান খুবই উঁচুতে বা সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে।সিরিয়ার সংঘাত প্রায় শেষ হয়ে এসেছে ঠিক যেভাবে তা শেষ করতে চাচ্ছে মস্কো। এখন সিরিয়ার ভবিষ্যৎ কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে রাশিয়া।এই প্রক্রিয়ায় ইরানকে দূরে রাখাটা ইসরাইলের জন্য খুবই জরুরি।কিন্তু সেটা করাটা অসম্ভব। কারণ সিরিয়ায় সংঘাত-প্রশমন অঞ্চলগুলোর অন্যতম নিশ্চয়তা-দাতা হল ইরান। এক্ষেত্রে তুরস্ক ও রাশিয়ার মতোই তার অবস্থান। আর এ প্রক্রিয়া থেকে ইরানকে বের করে দেয়া হলে তাতে এই শান্তি প্রক্রিয়া ভণ্ডুল হতে বাধ্য। উপরন্তু রাশিয়া ইরানকে দেখছে গঠনমূলক পক্ষ হিসেবে এবং ইরানকে এ প্রক্রিয়ায় ধরে রাখতে চায়।

মারিয়া আরও লিখেছেন: জাতিসংঘে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভ্যাসিলি নেবেনজিয়া (Vassily Nebenzia) বলেছেন, সিরিয়ার মর্মান্তিক বা ট্র্যাজিক যুদ্ধ শেষ করার ক্ষেত্রে প্রকৃত অগ্রগতি হচ্ছে। রাশিয়া ইরানের ব্যাপারে ইসরাইলের নীতি সম্পর্কে জানে এবং তা সত্ত্বেও তেহরানকে সিরিয়ায় গঠনমূলক ভূমিকা পালনকারী বলেই মনে করে। 

মারিয়া আরও লিখেছেন: সিরিয়ার ভয়াবহ যুদ্ধে বিজয়ী বলে কেউ থেকে থাকলে তিনি হচ্ছেন ভ্লাদিমির পুতিন- আর তিনি ও অন্য কেউই ইসরাইলের স্বার্থান্ধ দাবিগুলোতে কান দিচ্ছে না।

তিনি লিখেছেন: একই দিনেই রুশ ও ইসরাইলি কর্মকর্তারা সোচি অবকাশ কেন্দ্রে সাক্ষাত করেছেন পরস্পরের সঙ্গে। রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী  সের্গেই শোইগু সেখানে ঘোষণা করেছেন যে সিরিয়ার যুদ্ধ উত্তেজনা-প্রশমন জোনগুলো গঠনের সুবাদে কার্যকরভাবে শেষ হতে চলেছে। সিরিয়ার যুদ্ধ যে শেষ হতে চলেছে তা এ অঞ্চল সফরকারী মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিস, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উপদেষ্টা জেয়ার্ড কুশনার, মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক মার্কিন দূত জ্যাসন গ্রিনব্লাট এবং মার্কিন সহকারী জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ডিনা পাওয়েলও বিশ্বাস করেন বলে জানিয়েছেন। রাশিয়া অপেক্ষাকৃত কম সময়ে সিরিয়ায় তার লক্ষ্যগুলো হাসিল করেছে। আসাদ বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে মধ্যপন্থী বা উদার রাজনৈতিক বিরোধী ও জঙ্গি গোষ্ঠীর বিভাজন টেনেই তা করতে সক্ষম হয়েছে রাশিয়া। ফলে জেগে উঠছে নতুন সিরিয়া।

মারিয়া আরও লিখেছেন: এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল নেতানিয়াহু এমন সময় রাশিয়া সফরে যান যখন রুশ-মার্কিন ও জর্দানের যৌথ তত্ত্বাবধানে দক্ষিণ সিরিয়ায় যুদ্ধ-বিরতি তদারকের কেন্দ্র কাজ শুরু করেছে গত সাত জুলাই থেকেই। এই তিন দেশের মধ্যে কয়েক মাস ধরে সংলাপ চলার পর ওই সমঝোতা অর্জিত হয় যা ছিল সিরিয়ায় শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।

মারিয়া তার নিবন্ধের শেষ প্যারায় লিখেছেন যে, এটা এখন স্ফটিকের মতোই স্বচ্ছ যে সিরিয়ার সরকারি বাহিনী তথা আসাদ সরকারের বাহিনী এখন সবচেয়ে ভালো অবস্থায় রয়েছে। তারা ইরাক ও জর্ডান সীমান্তের এবং তুরস্ক ও লেবানন সীমান্তের  ক্রসিং পয়েন্টগুলো আবারও নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছে। সিরিয়া যে আবারও স্বাভাবিক অবস্থার দিকে ফিরে আসছে তার জোর আভাসগুলো স্পষ্ট। কেবল তুরস্ক-সংলগ্ন ইদলিব প্রদেশের বাব আল হাওয়া ক্রসিং পয়েন্ট এখনও সিরিয়ার সরকারি সেনাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়ে গেছে। আর শিগগিরই এ অঞ্চলেও সরকারি সেনাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াই শুরু হবে বলে মনে হচ্ছে।

আমেরিকা ও ইসরাইল সিরিয়ায় এখনও ধ্বংসাত্মক তৎপরতা চালাচ্ছে। আমেরিকার সবুজ সংকেতে ইসরাইল বহুবার সিরিয়ায় সরাসরি হামলা চালিয়েছে। ইসরাইলের বিমান বাহিনীর সাবেক কমান্ডার আমির ইশেল স্বীকার করেছেন, ইসরাইলের জঙ্গিবিমানগুলো গত পাঁচ বছরে প্রায় ১০০ বার সিরিয়ায় হামলা চালিয়েছে। ইসরাইল নিজে সিরিয়ায় হামলা চালানোর পাশাপাশি যুদ্ধে আহত সন্ত্রাসীদেরও চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন হাসপাতালগুলোতে। এ থেকেই সন্ত্রাসীদের প্রতি ইসরাইলের সমর্থনের বিষয়টি সবার কাছেই স্পষ্ট। আর সিরিয়ায় ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে ইসরাইলের জড়িত থাকার বিষয়ে রাশিয়া ভালোভাবেই অবহিত আছে। #  

পার্সটুডে/এমএএইচ/২৮