ডিসেম্বর ০৭, ২০২২ ১৪:৩৯ Asia/Dhaka
  • নীতিবান রাজার ন্যয়নিষ্ঠ মন্ত্রী

প্রিয় পাঠক ও শ্রোতাবন্ধুরা! সালাম ও শুভেচ্ছা নিন। আশা করি যে যেখানেই আছেন ভালো ও সুস্থ আছেন। ইরানের কালজয়ী গল্পের পসরা গল্প ও প্রবাদের গল্পের আজকের আসরে আমরা শুনবো চমৎকার একটি গল্প। গল্পটি এরকম:

প্রাচীনকালের এক ন্যায়-নীতিবান শাসক ছিলেন। কেবল ন্যায়পরায়নই নন বরং দয়ালুও ছিলেন তিনি। শাসনকাজে তিনি তাই কোনোরকম বৈষম্য কিংবা স্বজনপ্রীতি আর বৈমাত্রেয় সুলভ আচরণ করতেন না এবং কেউ করলেও তা পছন্দ করতেন না। এ ব্যাপারে খুবই কঠোর ছিলেন। তাঁর আশপাশের কেউ যদি ছোটোখাটো ভুল ভ্রান্তিও করে বসতো তিনি তার সঠিক বিচার করতেন এমনকি কারাগারেও পাঠাতেন। কাছের মানুষ বলে কাউকে ছাড় দিতেন না।

তাঁর ছিল বেশ কয়েকজন জ্ঞানীগুণি মন্ত্রী। তারা রাজনীতিতে ছিলো বেশ পটু। তাদেরই একজন মন্ত্রী কেবল জ্ঞানীই ছিলো না বরং দয়ালু, উদার এবং কল্যাণকামীও ছিল। সে সবসময়ই মানব সেবায় নিয়োজিত ছিল এবং আল্লাহর প্রতি সদা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতো। কিন্তু যত ভালো মানুষই হোক না কেন, মানুষ তো। আর মানুষমাত্রই তো ভুলের উর্ধ্বে কেউ নয়। এই মন্ত্রীরও সেরকম একটা ভুল হয়ে গিয়েছিল। কোনোরকম অসৎ উদ্দেশ্য ছাড়াই শাসকের একটা আদেশ পালনে অবহেলা করে বিপরীত রকমের কাজ করে বসেছিল। শাসক তো রেগেমেগে আগুন হয়ে গেল। 

কী অদ্ভুত ব্যাপার। এই মন্ত্রী এতোদিনে অনেক অনেক ভালো কাজ করেছে। মানুষের সেবা করেছে। কিন্তু একটা অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারণে শাসক মন্ত্রীর পুরোণো ভালো কাজগুলোর কথা ভুলেই গেলেন। শাসক আদেশ দিলেন ওই মন্ত্রীর মালামাল যেন বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং মন্ত্রীকে কারাগারে পাঠানো হয়। অপরাপর মন্ত্রীরা যারা এই মন্ত্রীর কোনো খারাপ দিক কখনও দেখে নি বরং ভালোই দেখেছে সবসময়, তারা মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করলো। শাসককে তারা বললো ওই মন্ত্রীর অতীতের ভালো কাজগুলো বিবেচনা করে তাকে শাস্তি না দিয়ে যেন ক্ষমা করে দেওয়া হয়। কিন্তু শাসক শুনলেন না। মন্ত্রী বেচারাকে তাই বেশ লম্বা সময় কারাগারে কাটাতে হলো।  এমনকি শাসক মন্ত্রীর কথা ধীরে ধীরে ভুলেই গেলেন। না কেবল শাসকই নয় অন্যরাও ভুলে গেল। কিন্তু হঠাৎ করেই একটা ঘটনা ঘটলো। ওই ঘটনাটা মন্ত্রীর জীবন এবং ভাগ্য পরিবর্তন করে দিলো।

ঘটনাটা হলো: পার্শ্ববর্তী দেশের শাসক ওই মন্ত্রীকে একটি চিঠি লিখলো। চিঠিটি কারাগারে পৌঁছানো হলো। চিঠিতে ওই শাসক লিখেছিলো: তোমাদের শাসক গুণের সম্মান দিতে জানে না। তিনি লবণ খান কিন্তু লবণদানি ভেঙে ফেলেন। তোমার মতো একজন বিজ্ঞ ও সৎ মন্ত্রীর মর্যাদা দিতে অপারগ তোমার শাসক। আমরা তোমার মতো একজন নিরপরাধ মানুষের বন্দিত্ব মেনে চেয়ে চেয়ে দেখতে পারবো না। কিছু একটা করতেই হবে। সেজন্য আমি তোমাকে কারাগার থেকে মুক্ত করে আমার দেশে নিয়ে আসতে চাই। আমার দেশে তুমি সুন্দরভাবেই জীবনযাপন করতে পারবে। 

পার্শ্ববর্তী দেশের বাদশার ওই চিঠি পড়লো মন্ত্রী। পড়ে সবিনয়ে চিঠির একটা উত্তর লিখলো। দূতের হাতে চিঠিটা দিয়ে বললো পাশের দেশের শাসকের হাতে পৌঁছাতে। দূতের হাতে ওই চিঠি দেয়ার সময় একজন কারারক্ষী দেখে ফেলেছিল। কিন্তু চিঠিতে কী লেখা ছিল তা সে জানতো না। মনে মনে চিন্তা করছিল হয়তো পাশের দেশের পক্ষে মন্ত্রী গোয়েন্দাবৃত্তি করছে। তাড়াহুড়ো করে ওই কারারক্ষী শাসকের কাছে চলে গেল। শাসককে বললো: হে মান্যবর শাসক! আপনি তো নিশ্চিন্তই আছেন কিন্তু আপনার সাবেক মন্ত্রী তো বসে নেই। সে তো পাশের দেশের জন্য গোয়েন্দাবৃত্তি করে বেড়াচ্ছে। আমি দেখেছি সে একটি চিঠি লিখেছে এবং দূতের হাতে দিয়েছে চিঠিটা যেন প্রতিবেশি দেশের শাসকের হাতে পৌঁছে দেয়।

শাসক তো এই খবর শুনে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন। আদেশ দিলেন এই খবর যথার্থই সত্য কিনা তা যেন তাঁকে স্পষ্ট করা হয়। ব্যস, কয়েকজন সঙ্গে সঙ্গে চলে গেল পত্রবাহক দূতের কাছে। তাকে ধরে নিয়ে গেল শাসকের দরবারে। শাসক পত্রবাহকের কাছ থেকে পত্রটি নিয়ে পড়লো। চিঠিতে প্রতিবেশি দেশের শাসকের উদ্দেশে লেখা ছিল: আপনার সহানুভূতি ও দয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আপনার আহ্বানে আমি সাড়া দিতে পারছি না। কেননা আমি আমার দেশের নেয়ামতের ভেতর লালিত পালিত হয়েছি এবং এই পরিবারের নিয়ামতের লালনপালনকারী। সামান্য কষ্টে ভুগছি বলে আমি আমার দেশের নিয়ামতের অভিভাবক মানে শাসকের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারবো না। 

চিঠি পড়ে শাসক কিঞ্চিত ভাবলেন। তিনি বুঝতে পারলেন যে তাঁর বিজ্ঞ মন্ত্রী দেশের প্রতি কোনোরকম খেয়ানত তো করেই নি বরং প্রতিবেশি দেশের শাসকের আহ্বান প্রতি উত্তরে সবিনয়ে এবং সসম্মানে প্রত্যাখ্যান করেছে। আরও নসিহত করে বলেছে-"এ ধরনের কোনো প্রস্তাব যেন আর কাউকে না দেয়। কেননা কোনো ভদ্র বা স্বাধীন মানুষই ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য কিংবা কারাগার থেকে মুক্তির লোভে নিজের দেশের মানুষ ও মাটির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে না।" পুরো চিঠির মর্ম উপলব্ধি করে শাসক তার দেশপ্রেমিক মন্ত্রীর জবাবে গর্ব বোধ করলেন। ভীষণ খুশি হলেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে আদেশ দিলেন মন্ত্রীকে যেন মুক্তি দেওয়া হয় এবং তাকে যেন প্রচুর নিয়ামত দেওয়া হয়। সেইসঙ্গে তাঁর মন্ত্রীকে দীর্ঘসময় কারাগারে বন্দি করে রাখার কারণে তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন শাসক।  । 

ন্যায়পন্থি মন্ত্রী পুনরায় তার দায়িত্বে ফিরে পেল। তার যেসব মালামাল বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল সব ফেরত দেওয়া হলো। মন্ত্রী আবার শুরু করে দিলো মানব সেবায় তার কাজকর্ম।#

মূল ফার্সি গল্পের রূপান্তর: নাসির মাহমুদ

পার্সটুডে/এনএম/৭