জানুয়ারি ১৬, ২০২৪ ২০:৩১ Asia/Dhaka

বাংলাদেশের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। চতুর্থবারের মতো আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করেছে। তবে নির্বাচন নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা বিতর্কের কথাও শোনা যাচ্ছে।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী বিষয় নিয়ে আমরা কথা বলেছি অর্থনীতিবিদ, রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ'র সাথে।

সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন সিরাজুল ইসলাম। উপস্থাপনা ও তৈরি করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

জনাব অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ রেডিও তেহরানের আলাপন অনুষ্ঠানে আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছি।

রেডিও তেহরান: জনাব, অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি নিবন্ধিত দল এই নির্বাচনে অংশ নেয়নি। সরকার বিরোধীরা একে একতরফা নির্বাচন বলছেন। বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

b

বাংলাদেশের নতুন সরকার

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ: বাংলাদেশের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি যে একতরফা হয়েছে তাতে বোধহয় খুব বেশি বিতর্ক করার সুযোগ নেই। কারণ এ নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিসহ আরো বেশ কয়েকটি দল অংশগ্রহণ করেনি। ফলে দেশের জনগণের বিরাট একটি অংশের আশা-আকাঙ্খা, স্বপ্ন এবং প্রত্যাশা এই নির্বাচনে প্রতিফলিত হয়নি। যে কারণে সবসময় বলা হয় নির্বাচন হতে হবে অংশগ্রহণমূলক। তো ৭ জানুয়ারি ২০২৪ এ যে নির্বাচনটি হয়েছে সে নির্বাচনকে যথার্থ অর্থে অংশগ্রহণমূলক বলতে পারিনা। আর সেটা আরও প্রমাণিত হয়েছে ভোটার টার্ন আউটে। অর্থাৎ ভোটার উপস্থিতি কম। যদিও বলা হচ্ছে ৪০ শতাংশ ভোট দিয়েছে কিন্তু বাস্তবে কতজন ভোট দিয়েছে বা বাস্তবে কতজন ভোট দিয়েছে এটা হয়তো কখনই জানা যাবে না। তবে বাহ্যিক ছবি বা দৃশ্য থেকে বলা যায় এখানে ৫ থেকে ১০ শতাংশের বেশি মানুষ ভোট দেয়নি। এটা এই নির্বাচনের বিড়াল একটা দুর্বলতা এবং সীমাবদ্ধতা।

রেডিও তেহরান: ড. মাহবুব উল্লাহ, বাংলাদেশে নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি বলে আমেরিকা ও ব্রিটেন বিবৃতি দিয়েছে। এছাড়া পশ্চিমা দেশগুলো কেউই তেমন পর্যবেক্ষক পাঠায়নি এই নির্বাচনে। পশ্চিমা বিশ্ব ও তাদের মিত্ররা এই নির্বাচন মেনে নেবে না বলে কী আপনার মনে হয়?

আমেরিকা-ব্রিটেন

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ: কূটনীতির ভাষা যদি আমি বুঝে থাকি তাহলে একটা পর্যায় গিয়ে তারা এই নির্বাচনকে মেনে নিতে পারে। তারা নির্বাচনের সমালোচনা করলেও কিন্তু বলছে এই সরকারের সঙ্গে তারা কাজ করে যাবে। এরকম একটা বাক্য মার্কিন বিবৃতির মধ্যে আছে। তাতে মনে হচ্ছে আবারও অতীতের মতো অর্থাৎ ২০১৪ ও ১০১৮ সালে যা হয়েছে এখন ২০২৪ সালের ঘটনাও অনেকটা অনুরূপ হবে। পশ্চিমই হোক বা পূর্বই হোক বড় বড় রাষ্ট্রগুলো তাদের জাতীয় স্বার্থে কাজ করে। তাদের কাছে স্ট্রাটিজিক ইন্টারেস্ট বলে একটা কথা আছে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো দেশের মানুষের অধিকারের ব্যাপারে তারা অতটা মাথা ঘামায় না। যদিও তাদের আদর্শিক অবস্থান হচ্ছে স্বাধীনতা, বাক স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ইত্যাদি। সেটার বাস্তব প্রতিফলনে তারা যে সব কিছু করে তেমনটি নয়। তাদের স্বার্থ কীভাবে সিদ্ধিলাভ করবে সেটাই তাদের কাছে বড় বিবেচনা।

রেডিও তেহরান: ফিরে এলাম সাক্ষাৎকারে। অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক না হলে পশ্চিমা বিশ্ব তা মেনে নেবে না বরং সরকারের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে বা নতুন নির্বাচন দিতে বাধ্য করা হবে এমন একটা ধারণা তৈরি করা হয়েছিল। বিষয়টি এখন কী হতে যাচ্ছে বলে আপনার মনে হয়?

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ: দেখুন, গণতন্ত্রের সংগ্রামই বলুন বা স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংগ্রামই বলুন এটা অবশ্যই একটা আত্মনির্ভরশীল সংগ্রাম হতে হবে। কোন বিদেশি রাষ্ট্র আপনাকে সমর্থন দেবে বা অপরপক্ষকে বাঁধাগ্রস্ত করবে সেই চিন্তা থেকে যদি আপনি আন্দোলন করেন তাহলে সেই আন্দোলনে সফল হওয়া অত্যন্ত কঠিন একটা ব্যাপার। তবে ঘটনা চক্রে বিদেশি সমর্থন আসতে পারে এবং আপনি হয়তো বা সফলভাবে নতুন একটা নির্বাচন করে ক্ষমতায় চলে যেতে পারেন কিন্তু সেটাকে স্বতঃসিদ্ধ মনে করা কখনই যুক্তিসঙ্গত হবে না। আপনাকে আপনার নিজের শক্তির ওপর নির্ভর করতে হবে এবং নিজের শক্তি দিয়েই জনগণকে ঐক্যবদ্ধ ক্ষমতাসীনদের বুঝিয়ে দিতে হবে যে জনগণ আপনাদেরকে চায় না। সুতরাং একটা পরিবর্তন দরকার।

রেডিও তেহরান: অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, আমরা সাক্ষাৎকারের একেবারে শেষ দিকে এসে গেছি। এবারে জানতে চাইছি,  নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠিত হতে যাচ্ছে এবং পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে- সবকিছুই স্বাভাবিক গতিতে এগুবে। প্রশ্ন হচ্ছে- বিরোধীদলগুলো এ অবস্থায় কী করতে পারে বা তাদের কৌশল কী হবে?

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ: দেখুন, বিরোধী দলগুলো নির্বাচন বর্জনের আহ্বান জানিয়েছিল এবং তারা এটাও বলেছিল যে অসহযোগ আন্দোলন করবে। তবে অসহযোগ আন্দোলন যে মাত্রা, তাল এবং লয়ে চলে সেভাবে অসহযোগ আন্দোলন কিন্তু আমরা প্রত্যক্ষ করিনি। তবে জনগণ এটুকু বুঝতে পেরেছিল যে নির্বাচনটা সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। এটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে একটি দলীয় সরকারের অধীনে। গত কয়েকমাস ধরে বিরোধীপক্ষ জনগণের কাছে বলে আসছে তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন চায় এবং আমাদের দেশের যে অভিজ্ঞতা সেই অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে এখানে দলীয় সরকারের অধীনে যতগুলো নির্বাচন হয়েছে সেই নির্বাচনগুলো আর যাইহোক সত্যিকারার্থে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নির্দলীয় সরকার অত্যন্ত প্রয়োজন। জনগণ বিরোধী দলের বক্তব্য গ্রহণ করেছে। আর সে কারণে তারা ভোট কেন্দ্রে যায়নি বা ভোট দিতে আগ্রহী হয়নি কিন্তু এখন যে অবস্থা সেখানে আরও অনেক কিছু করার আছে। যদি সত্যিকারার্থে একটি আন্দোলন গড়ে তুলতে হয় তাহলে বারবার জনগণের কাছে ফিরে যেতে হবে। আর জনগণকে নিষ্ক্রিয়ভাবে বাড়িতে বসে থাকলে হবে না।  তাদেরকে রাজপথে নিয়ে আসতে হবে। আর রাজপথে নিয়ে আসার জন্য যেসব কথা বলা দরকার তা বলতে হবে। একদিক দিয়ে এই আন্দোলন ব্যাপকভাবে সমর্থিত হলেও এটাকে আরও গভীরে যাওয়ার জন্য অনেক কিছু করার আছে।

রেডিও তেহরান: অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ-বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে রেডিও তেহরানকে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে আবারও ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ: আপনাকেও ধন্যবাদ।

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/১৮

ট্যাগ