পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন নীতি: আলোচনার আড়ালে সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ
পার্সটুডে: ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের কূটনৈতিক তৎপরতা এবং দুই পক্ষের কর্মকর্তাদের জোরালো আলোচনার পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বহুমাত্রিক চাপের কৌশল অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত মিলছে। এটি এমন এক কৌশল যা অঞ্চলের দেশগুলোর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
পশ্চিম এশিয়া আবারও যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের তৎপরতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওয়াশিংটন সফর ও মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক, 'যুদ্ধের অবসান' নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত মন্তব্য, ইরাকে মার্কিন বাহিনীর ধারাবাহিক সামরিক উপস্থিতি এবং একই সঙ্গে লেবাননের হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ- এসব এমন এক ধাঁধার অংশ তৈরি করছে, যার লক্ষ্য পশ্চিম এশিয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্বিন্যাস এবং প্রতিরোধ অক্ষকে নিয়ন্ত্রণে আনা বলে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
পার্সটুডের এই সংবাদ প্রতিবেদনে পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন সরকারের বক্তব্য ও তৎপরতাগুলো তুলে ধরা হলো:
নেতানিয়াহুর সফরের ছায়ায় ওয়াশিংটন-তেল আবিবের ঐক্যের সুর
ইহুদিবাদী ইসরায়েলে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সফরে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জে.ডি. ভ্যান্সের সঙ্গে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। মার-আ-লাগোতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাতের পর এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।
ইহুদিবাদী সূত্রগুলোর মতে, 'আঞ্চলিক ইস্যু' ছিল আলোচনার মূল বিষয়। নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছেন। বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে ওই বৈঠকগুলো প্রতিরোধ অক্ষের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের কৌশলগত সমন্বয় অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত।
মার্কিন গণমাধ্যমে 'বিপজ্জনক যোগসাজশ'-এর বর্ণনা
ওয়াশিংটন পোস্ট এক বিশ্লেষণে নেতানিয়াহুর সফর ও ট্রাম্পের সঙ্গে তার সাক্ষাৎকে পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা বাড়াতে দুই পক্ষের যোগসাজশের প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করেছে। পত্রিকাটি ট্রাম্পের যুদ্ধের অবসানসংক্রান্ত দাবিকে ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছে। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক জন মিয়ারশাইমারও জোর দিয়ে বলেছেন, ২০২৫ সাল সাফল্যের বছর নয়, বরং ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির একের পর এক ব্যর্থতার বছর ছিল; ইয়েমেনের আনসারুল্লাহর উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থতা এবং গাজা যুদ্ধ বন্ধ করা থেকে শুরু করে ইরান, ইউক্রেন এবং ভেনেজুয়েলা সম্পর্কিত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অক্ষমতা= তার উদাহরণ।
ইরান ও আঞ্চলিক প্রতিরোধের সমীকরণ
ইহুদিবাদী ইসরায়ের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাত প্রসঙ্গে মিয়ারশাইমার বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলার কৌশল তেহরানকে অচল করতে পারেনি; বরং ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা প্রকাশ পেয়েছে। তার মতে, এই সক্ষমতা ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মজুদকে গুরুতর চাপে ফেলেছে এবং শেষ পর্যন্ত তেল আবিবকে যুদ্ধবিরতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। এদিকে নেতানিয়াহুর উপস্থিতিতেই ট্রাম্প আবারও ইরানবিরোধী চিরাচরিত হুমকি দিয়েছেন- বিশ্লেষকদের মতে যা শক্তির প্রকাশ নয়, বরং ওয়াশিংটনের কৌশলগত বিভ্রান্তির প্রতিফলন।
ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়বহুল উপস্থিতি
ইরাকে আইন আল-আসাদ ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সামরিক কর্মকাণ্ড নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। আনবার প্রদেশের স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ এবং বিকিরণ দূষণের সন্দেহযুক্ত গোলাবারুদ ব্যবহার করে আবারও সামরিক মহড়া শুরু হয়েছে। পরিবেশ ও স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর সতর্কতা সত্ত্বেও এসব কার্যক্রম অব্যাহত থাকায় আশপাশের বাসিন্দাদের মধ্যে ক্যান্সারসহ নানা রোগের ঝুঁকি বেড়েছে। এসব তৎপরতা ইরাকি নাগরিকদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যের ওপর মার্কিন সামরিক উপস্থিতির মূল্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
হিজবুল্লাহ নিরস্ত্রীকরণ: লেবাননের গণ্ডি ছাড়িয়ে
লেবাননে, হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার প্রকল্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চাপের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল লেবাননের অভ্যন্তরীণ সংকটে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার উত্তরণ পর্যায়ে প্রতিরোধ অক্ষকে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য ওয়াশিংটনের বৃহত্তর কৌশলের একটি অংশ।
প্রতিরোধ অক্ষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধক শক্তি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমীকরণে নির্ধারক ভূমিকা পালনকারী হিজবুল্লাহ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত চাপের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে।
লেবাননের অর্থনীতি ও পশ্চিমা চাপের লিভার
নিরাপত্তা চাপের পাশাপাশি লেবাননের ভেঙে পড়া অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে শত শত বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতিও সামনে আনা হয়েছে- যার মধ্যে রয়েছে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ থেকে শুরু করে লেবানন সেনাবাহিনীর আধুনিকীকরণ। পর্যবেক্ষকদের মতে, এসব প্রস্তাবিত প্যাকেজ যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের এমন প্রচেষ্টার অংশ, যার মাধ্যমে লেবানন সরকারকে হিজবুল্লাহবিরোধী কাঙ্ক্ষিত দৃশ্যপটে রাজি করানো যায়। তবে দক্ষিণ লেবাননের দখলকৃত অঞ্চল থেকে ইহুদিবাদী শাসনের পূর্ণ প্রত্যাহারসহ মাঠপর্যায়ের শর্ত পূরণ না হলে এসব দৃশ্যপট বাস্তবায়ন অচলাবস্থায় পড়বে।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের সারসংক্ষেপে দেখা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনও পশ্চিম এশিয়াকে তার আধিপত্য বজায় রাখার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গন হিসেবে বিবেচনা করে; প্রহসনের কূটনীতি ও তেলআভিভের সাথে সমন্বয় থেকে শুরু করে ইরাক ও লেবাননে মাঠ পর্যায়ের চাপ পর্যন্ত। তবে ইরান ও প্রতিরোধ অক্ষের অব্যাহত প্রতিরোধী ভূমিকা, আঞ্চলিক খেলোয়াড়দের মধ্যকার বিভাজন এবং মাঠপর্যায়ের জটিল সমীকরণ ওয়াশিংটনের লক্ষ্য অর্জনকে গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে- যার যার ভবিষ্যৎ কোনো একক সিদ্ধান্তে নয়, বরং পশ্চিম এশিয়ায় পরিবর্তনশীল ক্ষমতার ভারসাম্যে নির্ধারিত হবে।#
পার্সটুডে/এমএআর/১