গাজা পরিস্থিতি
নতুন বছরের শুরুতে গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলা
-
নতুন বছরে গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলা
পার্সটুডে-গাজায় নতুন বছর ২০২৬ এর শুরুতে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে ইসরাইল হামলা চালিয়েছে।
গাজা উপত্যকার ফিলিস্তিনি নাগরিকরা তাদের নতুন বছর ২০২৬ শুরু করেছেন দখলদার ইহুদিবাদী ইসরায়েলের আক্রমণ এবং বোমা হামলার মাধ্যমে। প্রায় তিন মাস ধরে চলা যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর থেকে দখলদার ইসরায়েল কখনও চুক্তির শর্তাবলী মেনে চলেনি এবং বহুবার তা লঙ্ঘন করেছে।
তাসনিম নিউজ এজেন্সির বরাত দিয়ে পার্সটুডে জানিয়েছে, ফিলিস্তিনি সংবাদ সূত্র বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, গাজা উপত্যকার দক্ষিণে রাফা শহরে দখলদার ইসরায়েলি সেনাবাহিনী যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন এবং হেলিকপ্টার হামলা অব্যাহত রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খান ইউনিসেও ইসরাইল বিমান হামলা চালিয়েছে।
এদিকে, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে ইসরাইল যে গণহত্যা চালিয়ে আসছে তাতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭১,২৭১ জন শহীদ এবং ১,৭১,২৩৩ জন আহত হয়েছে।
ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১১ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি সেনাদের আক্রমণে ৪১৬ জন নাগরিক শহীদ এবং ১,১৫৩ জন আহত হয়েছেন। এই সময়ে ধ্বংসস্তূপ থেকে ৬৮৩ জন শহীদের মৃতদেহও উদ্ধার করা হয়েছে।
২০২৬ সালে গাজার জটিল সংকটের পূর্বাভাস
আন্তর্জাতিক ও ফিলিস্তিনি সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রাপ্ত পরিসংখ্যান এবং তথ্য থেকে জানা যায়, গাজা সংকট মোকাবেলায় যদি জরুরি ও গুরুতর উদ্যোগ না নেওয়া হয় তাহলে গাজার বাসিন্দাদের জন্য মানবিক পরিস্থিতি মারাতম্তক অবনতি হবে। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। গাজার মানুষ যে সব বড় সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন তা হলো:
আহত ও অসুস্থ: ইসরায়েল গাজায় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রবেশ এবং আহত ও অসুস্থদের চিকিৎসা সেবা গ্রহণের জন্য উপত্যকার বাইরে যাতায়াত করার ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে চলেছে। যদি এই পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকে তাহলে ২০২৬ সাল গাজায় এক অভূতপূর্ব স্বাস্থ্য সংকটে পড়বে। যেখানে ১৭০,০০০ এরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। যাদের মধ্যে কমপক্ষে ২০,০০০ এর দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসন পরিষেবার প্রয়োজন হবে।
এছাড়াও, ৪,৮০০ জনকে অঙ্গচ্ছেদ করা হয়েছে, ১,২০০ জন পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়েছে এবং ১,২০০ জন দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে। চিকিৎসা সেবা পেতে ২২,০০০ রোগীকে গাজা ছেড়ে যেতে হবে, যার মধ্যে ৫,২০০ শিশু এবং ১২,৫০০ ক্যান্সার রোগীও রয়েছে যারা মৃত্যুর মুখোমুখি।
গাজা শরণার্থীদের মধ্যে একটি নতুন মারাত্মক রোগের আশঙ্কা
গাজা উপত্যকায় বর্তমান মানবিক বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে শীতের আগমন এবং সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্বাস্থ্য অবকাঠামো ধ্বংসের সাথে সাথে উপত্যকার চিকিৎসা সূত্রগুলি একটি নতুন মহামারীর প্রাদুর্ভাবের বিষয়ে সতর্ক করেছে। চিকিৎসা ত্রাণ বিভাগের পরিচালক বাসাম জাকৌত বলেছেন, স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত অবস্থার তীব্র অবনতি হয়েছে। শরণার্থী শিবিরগুলিতে পোকামাকড় এবং ইঁদুরের বংশবিস্তারকে কেন্দ্র করে নতুন একটি মহামারীর প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে গুরুতর উদ্বেগ রয়েছে। জাকৌত জোর দিয়ে বলেন, চিকিৎসা কর্তৃপক্ষ লেপ্টোস্পাইরোসিসের সম্ভাব্য প্রাদুর্ভাবের উদ্বেগজনক লক্ষণ দেখছে। এটি একটি সংক্রামক রোগ যা ইঁদুরের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সংক্রামিত হয়। তিনি আরও বলেন, বৃষ্টির পানি, ইঁদুরের মলে দূষিত বন্যার পানি ত্বকে লাগলে সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে যখন এটি খোলা ক্ষতের সংস্পর্শে আসে। এদের মধ্যে শিশুরা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বিশেষ করে যেসব শিশু শরণার্থী শিবিরে দূষিত পানিতে খালি পায়ে খেলা করে।
গাজায় ত্রাণ সংস্থাগুলির ওপর ইসরায়েলের শত্রুতাপূর্ণ পদক্ষেপের পরিণতি সম্পর্কে সতর্কীকরণ
গাজা উপত্যকায় কয়েক ডজন মানবিক সংস্থার পরিচালনা লাইসেন্স বাতিল করার ইসরায়েলি হুমকির পর আন্তর্জাতিক এবং ফিলিস্তিনি সংস্থাগুলি উপত্যকায় মানবিক পরিস্থিতির সম্পূর্ণ পতনের বিষয়ে সতর্ক করেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টার্ক ইসরায়েলি সিদ্ধান্তকে নিষ্ঠুর বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এই ধরনের পদক্ষেপ গাজার ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ঘটাবে। এটি রোধে প্রভাবশালী দেশগুলোর উচিত গাজায় মানবিক সহায়তার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের জন্য ইসরায়েলের ওপর চাপ দেওয়া। ইউরোপীয় ইউনিয়নও সতর্ক করে বলেছে, গাজায় মানবিক সংস্থাগুলির কার্যক্রম স্থগিত করার ফলে এই অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা সরবরাহ ব্যাহত হবে। ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্সও সতর্ক করে বলেছে, ইসরায়েলের এই পদক্ষেপ গাজা উপত্যকার হাজার হাজার ফিলিস্তিনি রোগীকে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত করবে।
ইসরায়েল মানবিক চাহিদাকে ব্ল্যাকমেইলের হাতিয়ারে পরিণত করেছে
ফিলিস্তিনি ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন বা হামাসও এক বিবৃতিতে গাজা এবং পশ্চিম তীরে কয়েক ডজন আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থার পরিচালনা লাইসেন্স বাতিল করার বিষয়ে ইসরায়েলি গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। হামাস আরও বলেছে,' এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং সাহায্য ব্যবস্থার প্রতি স্পষ্ট অবজ্ঞা। দখলদাররা গাজায় ত্রাণ কার্যক্রমকে রাজনীতিকরণ করার চেষ্টা করছে এবং এটিকে ফিলিস্তিনি জনগণকে ব্ল্যাকমেইল করার হাতিয়ারে পরিণত করার চেষ্টা করছে। ফিলিস্তিনি জাতি ইহুদিবাদী অপরাধের ফলে সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হচ্ছে, বিশেষ করে গাজা উপত্যকায়। আন্দোলনটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে জাতিসংঘ এবং সমস্ত আন্তর্জাতিক ও মানবাধিকার সংস্থাকে ইহুদিবাদী ইসরায়েলের এই অপরাধমূলক নীতির নিন্দা জানাতে এবং তাদের মন্ত্রিসভার ওপর চাপ সৃষ্টি করার জন্য দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
হামাসের বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত মানবিক সাহায্যকে অনাহারের অস্ত্র এবং ফিলিস্তিনি জনগণের দুর্ভোগ অব্যাহত রাখার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া উচিত নয়।#
পার্সটুডে/জিএআর/২