জানুয়ারি ২৭, ২০২৪ ১৪:২৪ Asia/Dhaka

প্রতিটি সমাজের মানুষেরই একটা বড় অংশ চাকরিজীবী। তারা নিয়মিত তাদের কর্মক্ষেত্রে যান, দিনের একটা বড় অংশ সেখানে ব্যয় করেন। কর্মক্ষেত্রে সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করে ব্যক্তির নৈতিকতা ও শিষ্টাচারের উপর।

আপনি যদি সরকারি দপ্তরের কর্মচারী হোন তাহলে আপনাকে আপনার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে সম্মান প্রদর্শন করতে হবে এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। পরস্পরকে সালাম করা, উঠে দাঁড়ানো এবং অন্যের কথার মাঝে ঢুকে না যাওয়া অর্থাৎ অন্যের কথার মাঝে কথা না বলার মতো বিষয়গুলো শিষ্টাচার হিসেবে গণ্য করা হয়। শুধু নিজের অফিস বা বিভাগ নয়, বিভাগ বহির্ভূত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও সম্মান দেখাতে হয়। অন্যকে সম্মান দিলে নিজেও সম্মান পায় এ কথাটি মনে রাখা দরকার। সমাজে ছোট-বড়, গরীব-ধনী, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, বিভিন্ন ধর্ম ও বর্ণের লোকের বসবাস। পরস্পরের দেখা সাক্ষাতে কুশল বিনিময় ও যুক্তিপূর্ণ আচরণ, সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সম্মান ও ভালবাসার মাধ্যমে সামাজিক সম্প্রীতি বৃদ্ধি পায় এবং নিজ নিজ অবস্থান সুদৃঢ় হয়। মনে রাখবেন, সবসময় নিজে অন্যের কাছ থেকে সালাম পাওয়ার প্রত্যাশা শিষ্টাচার পরিপন্থী, বরং যিনি আগে সালাম দেবেন তিনিই বেশি বিনয়ী হিসেবে গণ্য হবেন।

আগ বাড়িয়ে নিজে সালাম করাই ইসলাম সম্মত। এতে সালামদাতার প্রতি অন্যদের শ্রদ্ধাবোধ বেড়ে যায়। ছোটদের স্নেহ করা, বড়দের সম্মান করা, গরীব-দুঃখীর প্রতি মমত্ববোধ, প্রতিবেশীর প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ থাকা অপরিহার্য। এর ব্যত্যয় ঘটলে সামাজিক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। মনে যেখানেই চাকরি করুন না কেন, আপনি কোনো একটা লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন। সেই লক্ষ্যে অটল থেকে সততার সঙ্গে চাকরি করতে হবে। জনসেবার সুযোগ থাকলে সর্বোত্তম উপায়ে সেই কাজটি করার চেষ্টা করুন। মানুষের সঙ্গে এমনভাবে কথা বলুন যাতে অহংবোধের প্রকাশ না পায়। তবে অপ্রয়োজনীয় কথা বর্জন করা জরুরি। প্রতিটি কথার সুদূরপ্রসারী ফল কী হতে পারে তা হিসেব করে এবং গুছিয়ে কথা বলতে হবে। উচ্চারণ পরিষ্কার, বাচনভঙ্গি সুন্দর ও আকর্ষণীয় হতে হবে। কটু কথাও সুন্দরভাবে বলতে জানলে মানুষ ক্ষেপে যায় না, নিজের ভুলটা সহজে মেনে নেয়। অন্যের কথায় ভুল ধরা বা অধস্তন কর্মচারীদের কথায় কথায় ত্রুটি আবিষ্কার করা শিষ্টাচার বিরোধী। অধস্তন কর্মচারীদের সাথে সহানুভূতির সঙ্গে কথা বললে তাদের কাজের মান ও পরিমাণ দুইই বৃদ্ধি পায়।

পরনিন্দা অবশ্যই সর্বত্র পরিত্যাজ্য। অফিসও এর ব্যতিক্রম নয়। পরনিন্দা মানুষকে ছোট করে এবং শত্রুতা বাড়ায়। নিন্দা করে সমস্যার সমাধান হয় না বরং জটিলতা বৃদ্ধি পায়। এটি একটি শিষ্টাচার বিরোধী কাজ। কারো সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের ক্ষেত্রে সরাসরি পরিচয় জিজ্ঞাসা করা শিষ্টাচার পরিপন্থী। এক্ষেত্রে প্রথমে নিজের পরিচয় দিয়ে

অভ্যাগতের পরিচয় জানতে চাইতে হয়। নিজের সম্পর্কে বাড়িয়ে বলা পরিহার করতে হবে। ভ্রমণকালে অন্যের বিরক্তি উদ্রেককারী আচরণ থেকে বিরত থাকা শিষ্টাচারের অংশ। ভ্রমণকালে কাউকে আসন থেকে তুলে দিয়ে নিজে আসন গ্রহণ শিষ্টাচার পরিপন্থী। অবশ্য অধস্তন কর্মচারী বা কর্মকর্তা যদি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সম্মানে আসন ছেড়ে দেন তাহলে সে আসনে বসতে দোষ নেই। অন্যদের সঙ্গে হাঁটার সময় হাত যাতে অত্যধিক না দোলে সেদিকে খেয়াল রাখা শিষ্টাচারের অংশ। অফিশিয়াল কাজে টেলিফোন করা এবং রিসিভ করার ক্ষেত্রেও শিষ্টাচার রয়েছে। এ উভয় ক্ষেত্রেই প্রথমে সালাম দিয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে কথা বলতে হয় । ভুল নম্বরে ফোন গেলে বা ভুল নম্বর থেকে ফোন আসলে 'দুঃখিত' বলে টেলিফোন রাখতে হয়। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার পক্ষ থেকে ফোন এলে ঐ পক্ষ যতক্ষণ লাইন বিচ্ছিন্ন না করে ততক্ষণ ফোন না রাখাই শিষ্টাচারের অংশ।

যেকোনো অফিস বা প্রশাসন পরিচালনার জন্য আইন-কানুন, বিধি-বিধান থাকা সত্ত্বেও নৈতিকতা ও শিষ্টাচারের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। শিষ্টাচার ও নৈতিকতার গুণে অফিসের সুনাম বজায় থাকে; দায়িত্ব পালন যথাযথ হয়, আদেশ ও নিষেধের প্রতি যত্নবান হওয়া যায়, ঊর্ধ্বতনদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং অধস্তনদের প্রতি ক্ষমাশীল ও সহমর্মিতাবোধ জাগ্রত হয়। সাধারণত সব অফিসেরই পোশাক সংক্রান্ত বিধিমালা থাকে সেটা মেনে চলা শিষ্টাচারের অংশ। যেমন, খেয়াল খুশি মত রং চং এর পোশাক পরা যাবে না, শার্টের বুকের উপরের দিকের বেতাম এমনভাবে খোলা রাখা যবে না যাতে গেঞ্জি বা বুকের অংশ বিশেষ দেখা যায়, অফিসে অপরিচ্ছন্ন বা দুমড়ানো-মুচড়ানো পোশাক পরা উচিৎ নয়। অফিসে বা সভায় সময়মত উপস্থিত হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। সভায় বা প্রশিক্ষণ কক্ষে মোবাইল সাইলেন্ট বা বন্ধ রাখা জরুরি। আপনার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অফিস ত্যাগ না করা পর্যন্ত অফিসে থাকুন এবং জরুরি প্রয়োজনে আবশ্যক হলে তার অনুমতি নিয়ে অফিস ত্যাগ করুন। আপনার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ডেকে পাঠালে যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি তার নিকট হাজির হোন, কোনো কারণে বিলম্ব হলে তাকে অবহিত করুন।

মনে রাখবেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বক্তব্যের সরাসরি বিরোধিতা না করেও বিনয়ের সঙ্গে বলা যায়। যেমন, বলতে পারেন “আমিও আপনার সঙ্গে একমত কিন্তু তবে আমার মনে হয় বিষয়টি এমন হলে ভালো হয়। এরপর আপনার মতামত দিন। কথা বলার সময় শিষ্টাচার বজায় রাখলে সব জায়গায় শৃঙ্খলা বজায় থাকে। ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে অপ্রয়োজনে সাক্ষাৎ করা হতে বিরত থাকুন। তবে সৌজন্য সাক্ষাৎকার এক ধরণের শিষ্টাচার বা ভদ্রতা। সৌজন্য সাক্ষাৎকারে বেশি সময় ব্যয় করা হতে বিরত থাকতে হবে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কোন বিষয়ে কৈফিয়ত তলব করলে উত্তেজিত, বিক্ষুব্ধ ও অসহিঞ্চু না হয়ে আপনার বক্তব্য তুলে ধরুন। কোনো সভায় সভাপতির অনুমতি ছাড়া কথা বলার চেষ্টা করার অভ্যাস পরিহার করতে হবে। সভার সময় আশেপাশের লোকদের সঙ্গে উচ্চস্বরে কথা বলা পরিহার করুন। সভায় অপ্রাসঙ্গিক কথাবার্তা ও সাইড টক করা থেকে বিরত থাকুন।  কম কথা বলা এবং ধৈর্য সহকারে অন্যের কথা শোনা বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী মানুষের কাজ। বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী লোকেরা বেশি শুনে এবং কম বলে।#

পার্সটুডে/সোহেল আহম্মেদ

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ