ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৬ ১৪:৪১ Asia/Dhaka

১৯৭৯ সালের ১২ বাহমান বা ১লা ফেব্রুয়ারি ইরানের ইসলামী বিপ্লবের নেতা মরহুম ইমাম খোমেনি (রহ.) ১৫ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে তেহরানে ফিরে আসেন। তাঁর দেশে ফেরার ১০ দিনের মাথায় অর্থাৎ ১১ ফেব্রুয়ারি ইসলামী বিপ্লবের চূড়ান্ত বিজয় ঘটে। প্রতি বছর এই ১২ বাহমান থেকে ২২শে বাহমান এই ১০ দিন 'আলোকোজ্জ্বল ১০ প্রভাত' শীর্ষক অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়।

আলোকোজ্জ্বল ১০ প্রভাত উপলক্ষে এ আসরে আমরা ইরানে ইসলামী বিপ্লবের প্রেক্ষাপট, ইমাম খোমেনীর ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্ব এবং বিপ্লবের পর ইরানের আর্থসামাজিক অবস্থা নিয়ে সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করেছি। আর সবশেষে ছিল ইসলামী বিপ্লব সম্পর্কে ইরানি শিশুর কণ্ঠে একটি ফার্সি গান।

কাস্পিয়ান সাগরের তীরে আলবোর্জ পাহাড়ের পাদদেশে এশিয়া মহাদেশের একটি সুন্দর দেশের নাম ইরান। নানা রকম প্রাকৃতিক অবস্থান ও আবহাওয়ার কারণে দেশটি যে কাউকেই আকৃষ্ট করে। এখানে যেমন আছে মরুভূমি, তেমনি সবুজ গাছ-গাছালির সমারোহ, আছে বরফাচ্ছাদিত এলাকা, পারস্য উপসাগরের বিস্তৃত উপকূল এবং ঐতিহাসিক বিভিন্ন স্থান। এই দেশের একজন শাসকের নাম ছিল রেজা শাহ পাহলভী। রেজা শাহ'র পিতা ছিল রেজা খান। তারা দুজনই ব্রিটিশদের কথামত দেশ চালাত। দেশের সম্পদকে তারা নিজেদের খেয়াল-খুশী মতো ভোগ করতো এবং বিদেশীদের দিয়ে দিত। রেজা শাহ এমন কয়েকটি দেশকে, নিজ দেশের সম্পদ দিতো যারা ছিল, ইরান ও ইসলামের শত্রু। তাছাড়া শাহর আমলে রাস্তার মোড়ে মোড়ে ছিল মদের দোকান। দেশের শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী ও যুবসমাজ অন্যান্য দেশের খারাপ, অশ্লীল চাল-চলন আর সংস্কৃতি অনুসরণ করত।

তবে এ অবস্থায়ও ইরানে একদল যোগ্য আলেম ছিলেন যারা মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকতেন এবং রেজা শাহর অন্যায় কাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতেন। যেসব আলেম শাহ সরকারের জুলুম নির্যাতন আর অন্যায় কাজের প্রতিবাদ করতেন ইমাম খোমেনী (রহ.) ছিলেন তাদের মধ্যে সবচেয়ে যোগ্যতম ব্যক্তি।

শাহ সরকার কিভাবে দেশের মানুষকে অত্যাচার করছে ও বিদেশীদের কথামত দেশ চালাচ্ছে তিনি তার 'কাশফ উল আসরার' বা 'রহস্যের উদঘাটন' বইয়ে তা ফাঁস করে দেন। ইমামের এই বই প্রকাশের পর জনগন রেজা শাহর প্রতি ক্ষেপে যায় এবং ইমাম খোমেনীর নেতৃত্বে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে।

১৯৬৩ সালে ইমাম খোমেনী (রহ.) যখন কোমের ফায়জিয়া মাদ্রাসায় দেশের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে বক্তৃতা করেন, তখন শাহের সৈন্যরা তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় ইরানের জনগণ খুব ক্ষোভ প্রকাশ করে। জনতার মিছিলে রেজা শাহর সিংহাসন কেঁপে ওঠে। জনগণের বিক্ষোভকে দমন করার জন্য রেজা শাহর সৈন্যরা গুলি চালিয়ে শুধু তেহরানেই ১৫ হাজার মানুষকে হত্যা করে।

কিন্তু এরপরও রেজা শাহর ভয় দুর হয় নি। সে ইমাম খোমেনীকে দেশ থেকে বের করে তুরস্কে নির্বাসনে পাঠায়। তুরস্ক ছাড়াও তিনি ইরাক ও ফ্রান্সে নির্বাসনে ছিলেন। নির্বাসনে থাকা অবস্থায় ইমাম তার ছাত্রদের মাধ্যমে দেশের মানুষের কাছে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিয়ে বাণী পাঠাতেন। একসময় দেশের আলেম সমাজ ও জনগণ প্রবল প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলে। জনতার আন্দোলন যখন ভয়াবহ রূপ নেয় তখন ১৯৭৯ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি ইমাম খোমেনী ফ্রান্স থেকে দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। ইমামের আসার কথা জানতে পেরে সরকার তাঁকে বিমানবন্দরেই হত্যার ষড়যন্ত্র করে। শুধু তাই নয়, ইমাম যাতে দেশে ফিরতে না পারে সেজন্য সরকার বিমানবন্দর বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয়। কিন্তু বিমান বন্দরের কর্মচারীরা সরকারের নির্দেশ অমান্য করে তাকে ইরানে আসার সুযোগ করে দেয়।

বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, ইমামকে বরণ করার জন্য সেদিন প্রায় ৬০ লাখ নারী পুরুষ বিমানবন্দর এলাকায় উপস্থিত হয়েছিল! সমবেত জনতার যে মানববন্ধন তৈরী হয়েছিল, সেটি ছিল প্রায় ৩৩ কিলোমিটার লম্বা! বিশ্বের ইতিহাসে অন্য কোন নেতা ইতিপুর্বে এতবড় সম্বর্ধনা পাননি!

ইমাম যখন ইরানে ফিরে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তখন তেহরানের একটি দেয়ালে কাঁপা কাঁপা হাতে রক্ত দিয়ে একটি দেয়া লেখা ছিল- "স্বাগতম হে খোমেনী।" ইমামকে স্বাগত জানাতে মিছিল করতে গিয়ে পুলিশের গুলি খেয়ে শহীদ হবার পূর্বে একটি বালক ওই কথাটি লিখে গিয়েছিল। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, ইরানের শিশু-কিশোররাও ইমামকে নিজেদের জীবনের চেয়েও বেশী ভাল বাসতো। মুলত ইমামের দেশপ্রেম, জনগনের প্রতি ভালবাসা ও পরগেজগারীর কারণেই অসংখ্য মানুষ তাঁর জন্য জীবন দেয় এবং অনেকেই পঙ্গুত্ব বরণ করে। ইমাম দেশে ফেরার ১০দিন পর অর্থাৎ ১১ই ফেব্রুয়ারি ইরানে ইসলামী বিপ্লব সংঘটিত হয়।

ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবার পর মানুষের দুঃখ-দুর্দশা কমতে থাকে। স্কুল-কলেজ, পত্রপত্রিকা,রেডিও-টিভি,সিনেমা সবকিছুই ইসলামের আলোকে নতুন করে সাজানো হয়। সমাজে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হয়। অর্থনৈতিক দিক থেকে দেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়। কিন্তু যিনি নিজের জীবনকে বিপন্ন করে দেশের জন্য এতো কিছু করলেন, তাঁর অবস্থা যেমনটি ছিল তেমনই থেকে যায়। হ্যাঁ বন্ধুরা, আমরা বিপ্লবের নেতা ইমাম খোমেনীর কথাই বলছি। বিপ্লবের পর দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা হবার পরও তিনি অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করতেন। বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, তিনি তেহরানে দু'কক্ষ বিশিষ্ট একটি একতলা বাড়িতে বসবাস করতেন। আজও দেশী বিদেশী বিভিন্ন পর্যটক ইমামের ওই বাড়িটি স্বচক্ষে দেখার জন্য জামরানে ভিড় জমায়।

ইমাম তেহরানে যে বাড়িতে বাস করতেন সেটি দুটকক্ষ বিশিষ্ট একতলা বাড়ি। বাড়ির বড় রুমটির মাঝখানে পর্দা দিয়ে একপাশে ইমাম ও তাঁর স্ত্রী ঘুমাতেন। আর অপর পাশে কয়েকটি সাদা কভারের সোফা, কুরআন-হাদিস রাখার কিছু তাক, একটি আয়না, একটি টেলিভিশন ও একটি রেডিও রাখা হতো। বাসার ছোট রুমটিতে তিনি মেহমানদের সাথে কথা বলতেন। একটি দেশের সর্বোচ্চ নেতা হয়েও ইমাম খোমেনীর সাধারণ জীবনযাপন ইসলামের প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।#