আদর্শ জীবনযাপন (পর্ব- ০২) : নৈপুণ্য বা দক্ষতাই সাফল্যের নেপথ্য রহস্য
আমাদের এই ছোট্ট দেহের ভেতেরে কী কী রয়েছে, কোন কোন গুণ বা বৈশিষ্ট্য রয়েছে সেগুলো সম্পর্কে অনেক ক্ষেত্রেই আমরা জানি না। অথচ আত্মসচেতনতা বা নিজেকে জানার মধ্য দিয়েই সেইসব বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে অবহিত হবার সুযোগ মেলে। নিজেকে দেখার মধ্য দিয়ে আমরা নিজের সম্পর্কে যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারবো।
নিজেকে দেখার পদ্ধতির মধ্যেই নিহিত রয়েছে আমরা যে আদর্শ চিন্তা করি সেই আদর্শ অনুযায়ী নিজেকে গড়ে তোলার যথার্থ উপাদান। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় কেউ মিউজিক শেখার পর যখন ওই মিউজিক তার আয়ত্ত্বে চলে আসে মানে মোটামুটি মিউজিকের ওপর দক্ষতা অর্জন করে, তখন সে স্বাভাবিকভাবেই শেখার আগের তুলনায় অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। মিউজিক দিয়ে সমাজে সে একটা সাঙ্গিতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অনেক বেশি দৃঢ় মনোবল হয়ে উঠতে পারে। নৈপুণ্য বা দক্ষতাই এখানে শিল্পীর সাফল্যের নেপথ্য রহস্য।
সম্ভবত এভাবেও বলা যায় যে নিজেকে চেনার গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশ হলো- আমাদের নিজেদের সন্তুষ্টি বা অসন্তুষ্টি, নিজেদের জীবন এবং জীবনাচারে পরিবর্তনের অনুভূতি উপলব্ধি করা। এই যে উপলব্ধি, এই যে আত্মশুদ্ধি ও কল্যাণচিন্তা, এগুলোর জন্য প্রাথমিক পদক্ষেপ হলো আমাদের ভুলভ্রান্তিগুলোকে চেনা, আমাদের দুর্বল দিকগুলো সম্পর্কে সচেতন হওয়া, আমাদের অসন্তুষ্টি কিংবা ব্যর্থতাগুলোর ব্যাপারে জানা। আমাদের আচার ব্যবহার, আমাদের অনুভূতি, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি সবই নির্ভর করে আমাদের ব্যক্তিগত বোধ ও বিশ্বাসের ওপর। আর আমাদের সকল ব্যর্থতা ও সাফল্যের নেপথ্য চালিকাশক্তি এগুলোই। নিজেকে চেনার উপায়গুলো অর্জনের ওপরই নির্ভর করে সবকিছু। সামগ্রিকভাবে বলা যায় নিজেকের চেনার পন্থাগুলো অর্জন করার মধ্যেই নিহিত রয়েছে গঠনমূলক ও সুন্দর আচরণ, দায়িত্বশীল আচরণ ও আত্মসম্মানের বীজ।
আল্লাহর প্রেরিত নবীরাসূলগণ, তাঁর পবিত্র গ্রন্থগুলো এবং জ্ঞানীগুণি মনীষীগণ যুগযুগ ধরে মানুষকে নিজেকে চেনার দিকেই আহ্বান জানিয়েছের। এই নিজেকে চেনাই আল্লাহকে চেনার সূচনা এবং পৃথিবীর সকল জ্ঞানের উর্ধ্বে বলে মনে করতেন তাঁরা। হযরত আলি (আ) বলেছেন: যে নিজেকে জানলো সে তার খোদাকে জানতে পারবে। আলি (আ) নিজের নফস’কে বা নিজেকে চেনাকে সবচেয়ে উত্তম ও উপকারী শিক্ষা বলে মনে করতেন। এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন:

এই নফস মানে আমিত্ব, আমার ব্যক্তিত্ব, আমার আত্মা এমন এক মানুষ যে সকল মেধা, জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল কর্মকাণ্ড ও শিক্ষাকে আত্মীকৃত করে অর্থাৎ অর্জন করে। সুতরাং এই নফসকেই যদি চেনা না যায় তাহলে না জ্ঞান বিজ্ঞানের পরিচয় ও শিক্ষাগুলো আমরা উপলব্ধি করতে পারবো, না পারবো সেইসব জ্ঞানের ভালো মন্দ দিক, ক্ষতি বা উপকারের দিকগুলো মূল্যায়ন করতে। তিনি বলেছেন: “আল্লাহর রহমত তাদের ওপর বর্ষিত হোক যারা জানে কোত্থেকে এসেছে, কোথায় সে বসবাস করছে এবং কোনদিকে যাচ্ছে”।
আত্মসচেতনতা বা নিজেকে চেনার বিষয়টি কুরআনে নিজের সত্যতা বা বাস্তবতাকে পরিচর্যার মাধ্যমে ফিরে পাওয়া অর্থ বোঝায়। নিজের ভেতরে যে বিশাল মেধা,প্রতিভা ও সামর্থ্য লুকায়িত রয়েছে সেগুলোকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জাগিয়ে তোলাকেও বোঝানো হয়েছে। পৃথিবী ও পরকালীন জীবনের জীবন বাস্তবতা সম্পর্কে জাগৃতি ও সচেতনতার ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে বহু আয়াত রয়েছে। কুরআনে আকল বা বুদ্ধিমত্তাকে চেনা বা জানার সাথে যোগসূত্র রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আর বোধ এবং যুক্তিকে বুদ্ধির উপকরণ বলা হয়েছে। কুরআন মানুষকে আহ্বান জানিয়েছে নিজেকে নিয়ে এবং এই বিশ্ব চরাচর নিয়ে চিন্তা ভাবনা করার মধ্য দিয়ে সৌভাগ্য ও সাফল্যের পথ খুজে নিতে।

কুরআন একইভাবে গভীর চিন্তাভাবনাকে ইবাদাত বলে উল্লেখ করেছে। চিন্তা করার জন্য চিন্তাশীলদের আহ্বান জানিয়েছে। বুদ্ধিমত্তা ও যুক্তির সাহায্যে চিন্তাভাবনা ব্যতীত কোনো নীতি বা আক্বিদা বিশ্বাসকে সঠিক বলে মনে করে না। এ থেকে অনুমিত হয় যে মানুষের চিন্তা চেতনাগত ভ্রান্তি ও অবক্ষয়ের পেছনে রয়েছে নিজেকে না চেনা এবং এই বিশ্ব প্রকৃতি সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান না থাকা। এই দুয়ের জ্ঞানহীনতাই মূলত সকল প্রকার ভুল ভ্রান্তি ও গোমরাহির মূল উৎস। ভুল স্বীকার করে সেগুলো থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার ফলে সমালোচনা গ্রহণ করার মন ও মানসিকতা বৃদ্ধি পায়। সেইসাথে নিজেরও ব্যক্তিসত্ত্বা ও ব্যক্তিত্ব আরও বেশি মূল্যবান ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
সমালোচনা গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে ব্যক্তিত্ব ও আত্মমর্যাদা বৃদ্ধি পায়। সুতরাং মানুষ যদি চায় সুস্থ জীবনযাপনের পথে পা বাড়িয়ে সৌভাগ্য, কল্যাণ ও সাফল্যের পথে অগ্রসর হতে তাহলে তাদের উচিত আত্মসচেতন হওয়া অর্থাৎ নিজেকে চেনা। কুরআনের দৃষ্টিতে আমাদের আত্মসচেতনতা সরাসরি আমাদের বোধ, আমাদের জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বুদ্ধি, বিবেক এবং মেধার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। নিজের সম্পর্কে আমরা যদ বেশি জানবো আমাদের চিন্তার গভীরতাও তত বেড়ে যাবে। আর এটাই জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা ও সাফল্য। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সুরা মায়েদার ১০৫ নম্বর আয়াতে বলেছেন: ‘হে ঈমানদারগণ! নিজেদের কথা চিন্তা করো! যদি তোমরা সত্য সঠিক পথ বা হেদায়েতের পথে থেকে থাকো! যারা গোমরাহিতে নিমজ্জিত রয়েছে তারা তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না।‘ (চলবে)
পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/১৪