জুন ১৩, ২০১৭ ১৩:৪৮ Asia/Dhaka

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা আর- রুমের ৪৩ থেকে ৪৬ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ৪৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

فَأَقِمْ وَجْهَكَ لِلدِّينِ الْقَيِّمِ مِنْ قَبْلِ أَنْ يَأْتِيَ يَوْمٌ لَا مَرَدَّ لَهُ مِنَ اللَّهِ يَوْمَئِذٍ يَصَّدَّعُونَ (43)

“যে দিবস আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রত্যাহার করা হবে না, সেই দিবসের পূর্বে আপনি (সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে) নিজেকে দৃঢ় ও সরল ধর্মে  প্রতিষ্ঠিত করুন। সেদিন মানুষ দলে দলে বিভক্ত হয়ে পড়বে।” (৩০:৪৩)

শান্তির ধর্ম ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি মানুষের বিচারবুদ্ধি ও সহজাত প্রবৃত্তির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। এই আয়াতে ইসলামকে এমন একটি ধর্ম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যেটি দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং যাতে মানুষের সব ব্যক্তিগত ও সামাজিক স্বার্থ সংরক্ষিত হয়েছে। তবে ইসলামি সমাজ কেবল তখনই এই ধর্মের বরকত ও ইতিবাচক প্রভাব থেকে উপকৃত হবে যখন মানুষ নিজের গোটা অস্তিত্ব দিয়ে এ ধর্মে প্রবেশ করে এবং জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে এর দিক-নির্দেশনা  বাস্তবায়ন করে। মনের খেয়াল-খুশি মতো ধর্মের একাংশকে গ্রহণ এবং অন্য অংশকে প্রত্যাখ্যান করে না। মানুষ যদি জানত, এই পৃথিবীর জীবন অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী এবং ধারণার চেয়ে অনেক দ্রুতগতিতে সে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাবে তাহলে সে এই সংক্ষিপ্ত জীবনের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করত যাতে কিয়ামতের দিন তাকে অনুশোচনায় দগ্ধ হতে না হয়।

কিয়ামতের দিনের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, সেদিন মানুষ দলে দলে বিভক্ত হয়ে পড়বে। কাফের ও বিভ্রান্ত জনগোষ্ঠী থেকে মুমিনরা দূরত্ব বজায় রাখবেন এবং প্রত্যেক দল আলাদা আলাদা লক্ষ্যপানে ধাবিত হবে।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. ধর্মীয় শিক্ষাকে সুদৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে তা নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করতে হবে। ধর্মীয় বিধান নিজের খেয়াল-খুশিমতো পালন করা যাবে না।

২. ধর্মীয় শিক্ষাকে সার্বিকভাবে বাস্তবায়ন করলেই কেবল একটি সমাজ সব ধরনের অধঃপতনের হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে।

সূরা রুমের ৪৪ ও ৪৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  مَنْ كَفَرَ فَعَلَيْهِ كُفْرُهُ وَمَنْ عَمِلَ صَالِحًا فَلِأَنْفُسِهِمْ يَمْهَدُونَ (44) لِيَجْزِيَ الَّذِينَ آَمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ مِنْ فَضْلِهِ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْكَافِرِينَ (45) 

“যে কুফরি করে, তার কুফরের জন্য সে নিজেই দায়ী এবং যারা সৎকর্ম করে, তারা নিজেদের জন্য (চিরকালীন সৌভাগ্যের পেয়ালা) প্রস্তুত করছে।” (৩০:৪৪)  

“যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে যাতে, আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে নিজ অনুগ্রহে প্রতিদান দেন; (এবং কাফেরদেরকে এই অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত করেন, কারণ) তিনি কাফেরদের ভালোবাসেন না।” (৩০:৪৫)

আগের আয়াতে বলা হয়েছে, কিয়ামতের দিন মানুষ দলে দলে বিভক্ত হয়ে পড়বে এবং মুমিন ব্যক্তিরা কাফেরদের থেকে আলাদা হয়ে যাবে। এই আয়াতে বলা হচ্ছে, সেদিনের সেই শাস্তি ও পুরস্কার নির্ধারিত হবে দুনিয়াতে মানুষের আমলের ভিত্তিতে। দুনিয়াতে করা মন্দ কাজ কিয়ামতের দিন মানুষকে জাহান্নামে যেতে বাধ্য করবে। পক্ষান্তরে ঈমান ও নেক আমল করলে সেদিন প্রশান্ত চিত্তে জান্নাতে প্রবেশ করা সম্ভব হবে।

অবশ্য কাফেররা শাস্তি পাবে তাদের কৃতকর্মের সমপরিমাণ। অন্যদিকে মুমিন ব্যক্তিরা তাদের নেক আমলের প্রতিদান পাওয়ার পাশাপাশি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহে আরো অনেক পুরস্কার অর্জন করবে। আল্লাহর অবাধ্য হওয়ার কারণে কাফেররা মহান আল্লাহর এই অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত হবে।

এই দুই আয়াতের দু’টি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:

১. মানুষের ঈমান ও কুফরি আল্লাহর কোনো লাভ বা ক্ষতি করতে পারে না; বরং এর ফলে মানুষই লাভবান বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

২. কাফেরদের সঙ্গে আল্লাহর আচরণ হবে ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে। অর্থাৎ তারা যতটুকু মন্দ কাজ করেছে ততটুকু শাস্তি তারা পাবে। আর ঈমানদারদের সঙ্গে তিনি করুণাপূর্ণ ও দয়ার্দ্র আচরণ করবেন।

এই সূরার ৪৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَمِنْ آَيَاتِهِ أَنْ يُرْسِلَ الرِّيَاحَ مُبَشِّرَاتٍ وَلِيُذِيقَكُمْ مِنْ رَحْمَتِهِ وَلِتَجْرِيَ الْفُلْكُ بِأَمْرِهِ وَلِتَبْتَغُوا مِنْ فَضْلِهِ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ (46)  

“তাঁর (ক্ষমতা ও প্রজ্ঞার) নিদর্শনসমূহের মধ্যে একটি এই যে, তিনি (বৃষ্টির) সুসংবাদবাহী বায়ু প্রেরণ করেন, যাতে তিনি তাঁর অনুগ্রহ তোমাদের আস্বাদন করাতে পারেন এবং যাতে তাঁর নির্দেশে জাহাজসমূহ বিচরণ করে এবং যাতে তোমরা তাঁর অনুগ্রহ (ও রিজিক) অনুসন্ধান কর এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হও।" (৩০:৪৬)

সূরা রুমের প্রথম দিকে আল্লাহর একত্ববাদ সংক্রান্ত যেসব আয়াত বর্ণিত হয়েছে, এই আয়াতে সে সম্পর্কিত আলোচনায় ফিরে গিয়ে এই ভারসাম্যপূর্ণ বিশ্বজগত সৃষ্টির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলছেন: যদি আসমান ও জমিনের পাশাপাশি বৃষ্টি ও বাতাসের মতো প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া সাধারণ ঘটনাগুলো সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করো তাহলে মহান আল্লাহর ক্ষমতা ও প্রজ্ঞার নিদর্শন দেখতে পাবে এবং তাঁর একত্ববাদ সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করতে পারবে। তোমরা বুঝতে পারবে বাতাস ও বৃষ্টির মতো দু’টি সাধারণ নিয়ামত দিয়ে তিনি প্রাণী, উদ্ভিদ ও মানুষের জীবন রক্ষা করছেন। সেইসঙ্গে তাদের বেঁচে থাকার সব উপকরণ এই ভূপৃষ্ঠে দান করেছেন।

মানুষের অন্ন সংস্থানের দু’টি প্রধান উৎস হচ্ছে কৃষিকাজ ও পশুপালন। বৃষ্টি ও বাতাস ছাড়া এই দু’টি কাজ করা সম্ভব নয়। এ ছাড়া, পণ্য আনা নেয়ার প্রধান বাহন জাহাজ সমূদ্রের মাধ্যমে বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে যাতায়াত ও পণ্য আনা-নেয়া করে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বেশিরভাগ মানুষ আল্লাহর পক্ষ থেকে দেয়া এই মহা নেয়ামত সম্পর্কে উদাসীন। তারা মনে করে, পানি, বাতাস ও বৃষ্টির মতো বিষয়গুলো প্রাকৃতিকভাবে এমনি এমনিই হয়। এর পেছনে কোনো সুবিজ্ঞ সত্ত্বার হাত নেই।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. বাতাস বিশাল মেঘমালাকে সমূদ্রের আকাশ থেকে শুস্ক ভূমির আকাশে নিয়ে যায় এবং সেই মেঘ থেকে নেমে আসা বৃষ্টি তৃষ্ণার্ত জমিনের পিপাসা মেটায়।

২. সমূদ্রে জাহাজের গমনাগমনের বিষয়টি প্রকৃতপক্ষে মহান আল্লাহ পরিচালনা করেন; জাহাজের ক্যাপ্টেন নন। কারণ, মহান আল্লাহই পানির উপরে জাহাজকে ভাসমান রাখার প্রাকৃতিক বিধান তৈরি করে দিয়েছেন। এই বিধানের কারণে হাজার হাজার টন ওজনের বিশাল জাহাজ পানির উপর ভেসে থাকতে এবং এক স্থান থেকে আরেক স্থানে চলাচল করতে পারে।

৩. হালাল রুজি অর্জন করার জন্য চেষ্টা ও পরিশ্রম করা পবিত্র কুরআনের নির্দেশ। অবশ্য মানুষ যা কিছু অর্জন করে সেজন্য মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানানো উচিত। সে যেন একথা না ভাবে যে, সে আল্লাহর সাহায্য ছাড়াই নিজের জ্ঞান ও প্রচেষ্টায় এ সম্পদ অর্জন করেছে।#