জানুয়ারি ৩১, ২০১৮ ১৭:৫৬ Asia/Dhaka
  • মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতি-৫২

'আব্দুল্লাহ বিন ওমর বায়জাবি' হিজরি সপ্তম শতাব্দির একজন নামকরা মুফাসসির এবং মুতাকাল্লেম। তিনি ছিলেন শাফেয়ি মাযহাবের অনুসারী একজন বড়ো ফকিহ।

বায়জাবি জন্মগ্রহণ করেছেন ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশ ফার্সের বায়জা শহরে। সুশিক্ষিত এবং শিক্ষানুরাগী একটি পরিবারে তিনি লালিত পালিত হন। বায়জাবি'র বিখ্যাত তাফসির গ্রন্থটির নাম হচ্ছে "আনওয়ারুত তাঞ্জিল ওয়া আসরারুত তা'ভিল"। তাঁর এই তাফসির গ্রন্থটি 'তাফসিরে বায়জাবি' নামেও ব্যাপক প্রসিদ্ধ। আবার অনেকে তাফসিরে বায়জাবিকে "মুখতাসারে কাশশাফ" অর্থাৎ কাশশাফের সারসংক্ষেপ নামেও অভিহিত করেছেন। এর কারণ হলো তাফসিরে বায়জাবি লেখার ক্ষেত্রে যামাখশারির তাফসিরে কাশশাফের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। আবার এই তাফসির গ্রন্থের ফিকাহ এবং কালাম অধ্যায়ে ফাখরে রাযির তাফসিরে কাবিরের প্রভাব রয়েছে বলেও অনেকে মনে করেন।

তাফসিরে বায়জাবি অতীতের মতো বর্তমানেও ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা লাভ করেছে। একইভাবে তাফসিরটি প্রাচীন মুফাসসিরদের কাছে যেমন তেমনি নতুন মুফাসসিরদের কাছেও বেশ গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রভাবশালী হিসেবে গণ্য। এই তাফসিরের ভেতরে বায়জাবি যে পদ্ধতির আশ্রয় নিয়েছেন তা না হাদিস থেকে গৃহীত, না কেবল বুদ্ধিবৃত্তি কিংবা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ভিত্তিক-যা কিনা কোরআনের গোপন রহস্য ও সত্যতা অনুসন্ধানেই ব্যস্ত থাকে, বরং এই সবক'টি পদ্ধতিই পুরো তাফসির জুড়ে লক্ষ্য করা যাবে। বায়জাবি কোরআনের আয়াতের তাফসিরের ক্ষেত্রে সাহিত্যিক, ঐতিহাসিক, ফিকহি এবং কালামি দিকগুলোকে স্মরণে রেখেছেন। তাফসিরে বায়জাবির ওপরে শিয়া আলেমগণ অন্তত বিশটি ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণধর্মী বই লিখেছেন। এগুলোর মাঝে শেখ বাহায়ি এবং কাজি নুরুল্লা শুশতারির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।

আরেকজন বিখ্যাত মুফাসসির হলেন "জালালুদ্দিন সুয়ুতি"। তাঁর বিখ্যাত তাফসির গ্রন্থটির নাম হলো "তরজুমানুল কোরআন"। সুয়ূতি তাঁর এই তাফসির গ্রন্থটিকে বিপুলায়তন ভেবে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সংক্ষিপ্ত করে ফেলবেন এবং তাই করলেন। সংক্ষিপ্ত আকারের তাফসিরটির নাম দিয়েছেন "আদদুররুল মানসুর ফিত তাফসির বিল মাসুর"। সুয়ূতির "আদদুররুল মানসুর" এর তথ্যসূত্র হলো সহিহ বোখারি, সহিহ মুসলিম, সুনানে নাসায়ি, তিরমিযি, আবু দাউদ, মুসনাদে আহমাদ বিন হাম্বল, তাবারির তাফসিরসমূহ এবং আরো অনেক সূত্র। উদ্ধৃত সূত্রগুলো থেকেই বোঝা যায়, জালালুদ্দিন সুয়ূতি হাদিস চেনার ক্ষেত্রে বেশ দক্ষ ছিলেন।

হিজরি একাদশ শতকের বিখ্যাত মুফাসসিরদের মধ্যে "মোল্লা মোহসিন ফয়েয কাশানি'ও অন্যতম। তিনি একজন শিয়া আলেম ছিলেন। বিশিষ্ট আরেফ, দার্শনিক, মুহাদ্দিস এবং নামকরা মুফাসসির ফয়েয কাশানি হিজরি ১০০৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন।

ফয়েয কাশানি জীবনের শুরুতে কোমে কাটিয়েছেন। কোমের বর্তমান ফয়েযিয়া নামের বিখ্যাত মাদ্রাসাটি তাঁরই নামে নামকরণ করা হয়েছে। কোম থেকে তিনি গেছেন শিরাযে। সেখানে তিনি এলমে হাদিস শিক্ষা লাভ করেন সাইয়্যেদ মাজেদ বাহরানীর কাছে। আর দর্শন এবং আধ্যাত্মিকতা শেখেন বিশিষ্ট দার্শনিক ও আরেফ 'সাদরুল মুতাআল্লেহিনে'র কাছে। মহান এই মনীষীর জীবনটা ছিল বেশ বরকতপূর্ণ। স্বরচিত বইয়ের সংখ্যার দিক থেকে তাঁর নামটি বিখ্যাত। "তাফসিরে সাফি" ফয়েয কাশানির লেখা। এতে অবশ্য তাফসিরে বায়জাবির প্রভাব রয়েছে। তারপরও নিজস্বতাও রয়েছে অনেক। যেমন তিনি যে আয়াতের তাফসির করেছেন সেই আয়াত সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আয়াতকে তার নিচেই সন্নিবেশিত করেছেন। অবশেষে ফয়েয কাশানি ১০৯১ সালে কাশানেই মৃত্যুবরণ করেন।

বর্তমান যুগেও অনেক বড়ো বড়ো মুফাসসির রয়েছেন যাঁদের অনেকেই হলেন ইরানী। অবশ্য ইরানী মুসলমানগণ সেই প্রাচীনকাল থেকেই আলকোরআনের তাফসিরের ক্ষেত্রে যে রকম ইমানী চেতনা ও ঐকান্তিক আগ্রহ উদ্দীপনা দেখিয়েছেন, বর্তমান যুগেও তা ব্যতিক্রমহীন। এরকমই একজন মুফাসসির হলেন আল্লামা "সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ হোসাইন তাবাতাবায়ি"। আল্লামা হিজরি ১৩২১ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি শিয়া মাযহাবের অনুসারী একজন বড়ো মুফাসসির এবং দার্শনিক। তাফসিরের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে যে গতানুগতিক ধারা বিরাজমান ছিল আল্লামা তাবাতাবায়ি সেই ধারা উত্তীর্ণ নতুন ধরনের পরিবর্তন ও স্টাইল প্রবর্তনকারীদের একজন। আল্লামা তাবাতাবায়ির শ্রেষ্ঠ তাফসির গ্রন্থটি হলো "তাফসিরুল মিযান"।

স্টাইলের দিক থেকে তুলনা করলে আগেকার তাফসির গুলোর সাথে আলমিযানের গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যটা হলো এই যে আগের তাফসিরগুলোতে কোনো একটি আয়াতের দুই তিনটি অর্থ বলা হতো এবং সম্ভাব্য বিভিন্ন বর্ণনা তুলে ধরা হতো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বোঝা যেত না লেখক কোনটাকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। কিন্তু আলমিযানে কোরআন থেকে কোরআনের তাফসির পদ্ধতি অবলম্বন করে ঐ অনেকগুলো অর্থের একটিকে কোরআনের আয়াতের সহযোগিতায় প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে এবং মূল বক্তব্যকে সুস্পষ্ট করে তোলা হয়েছে। এই সূত্রটি ব্যবহার করার কারণে আল্লামা তাবাতাবায়ির তাফসিরটি কৌশলগত দিক থেকে যেমন শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, সেই শক্তিমত্তা তাঁর তাফসিরটিকেও দিয়েছে অনবদ্য সাফল্য। তাই বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাওয়া থেকে তাঁর তাফসিরটি বেঁচে গিয়ে সর্বজনগ্রাহ্য ও কালজয়ী হয়ে উঠেছে।আল্লামা তাঁর তাফসিরে তৌহিদ, তওবা কিংবা জিহাদের মতো দ্বীনী এবং কোরআনী পরিভাষাগুলোকে কোরআনের আয়াতের মাধ্যমেই ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছেন।

আল্লামা তাবাতাবায়ি মনে করেন যে কোনো বর্ণনার সঠিক বা যথার্থতা বিচারের মূল মানদণ্ড হলো কোরআনের আয়াত। কেননা আহলে বাইত (আলাইহিমুস সালাম) এর দিকে ইঙ্গিত করে বা আহলে বাইত সম্পর্কিত বর্ণনাগুলোকে যখন কোরআনের বিভিন্ন আয়াতের সাথে তুলনা করা হয়,তখন যেটুকু বা যা কিছুই বর্ণিত হয়েছে সেটুকুই বর্ণনায় উঠে আসে, আর যদি যথোপযুক্ত কোনো আয়াতের সাথে তুলনা দেওয়া না যায় তাহলে তা পরিহার করা হয়। এজন্যেই তাফসিরে আলমিযান আধুনিক যুগের শিয়া তাফসিরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ ও সমগ্রতার দিকে থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত। অন্তত ইমামিয়া শিয়াদের কাছে সাম্প্রতিক শতাব্দিতে সবচেয়ে মৌলিক এবং উত্তম তাফসিরগুলোর অন্যতম বলে গৃহীত হয়েছে আলমিযান। আল্লামা তাবাতাবায়ি একটানা বিশ বছর ধরে লাগাতার শ্রম ও মেধা দিয়ে এই তাফসিরটি রচনা করেছেন। তাফসিরে আলমিযান বর্তমানে বিশ খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে। পুরো বিশ খণ্ডই আরবি ভাষা থেকে ফার্সি ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। মহান এই মুফাসসিরে কোরআন অবশেষে হিজরি ১৪০২ সালে নশ্বর এই পৃথিবীকে বিদায় জানিয়ে চলে গেছেন তাঁর স্রষ্টার কাছে। #

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবু সাঈদ/ ৩১