কারবালার মহাবিপ্লব ও এর শাশ্বত শিক্ষা (পর্ব-৫)
'কারবালার মহাবিপ্লব ও এর শাশ্বত শিক্ষা' শীর্ষক বিশেষ আলোচনার পঞ্চম পর্বে সবাইকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে: আল্লাহর রাসূল হযরত ইবরাহীম (আ.) সব কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পর আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁকে মানব জাতির জন্য ইমাম বা নেতা মনোনীত করেন এবং তাঁর প্রশ্নের জবাবে জানান যে, তাঁর বংশের নেককারদেরও তথা তাঁর বংশের নবী-রাসূলগণকে ইমাম বা নেতা বানানো হলো (সূরাহ্ আল্-বাক্বারাহ্ : ১২৪)। এ ছাড়াও আমাদের নামাযের বিশেষ দরূদে আলে ইবরাহীম ইব্রাহিমের বংশধরদের সাথে আলে মুহাম্মাদের (সা) তথা মুহাম্মাদের বংশধরদের তুলনা থেকে মুসলমানদের ওপর মহানবীর পবিত্র বংশধরদের দ্বীনী নেতৃত্ব এবং সেই সাথে রাজনৈতিক নেতৃত্বের অধিকারও অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়। এটাও লক্ষ্যনীয় যে বেহেশতি যুবকদের সর্দার অন্য কোনো সাহাবিকে বলেননি মহানবী। মহানবীর আহলে বাইতের প্রত্যেক সদস্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে মহানবী বলেছেন, তাঁদের সন্তুষ্টিতে রয়েছে আমি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং তাদের অসন্তুষ্টিতে রয়েছে আমি ও আমার অসন্তুষ্টি। আর যারা শত্রুতা করে তাঁদের সঙ্গে তারা আসলে আমার সঙ্গেই শত্রুতা করে।

কেউ কেউ হযরত ইমাম হুসাইন ও হযরত ইমাম হাসানকে দুই ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখেন। তারা ইমাম হুসাইনকে অসম সাহসী বীর পুরুষ ও ইমাম হাসানকে খুবই নরম মনের মানুষ বলে মনে করেন। অথচ সুন্নি মুসলমানদেরও নামাযের দরূদ ও জুমার খুতবাহর ভিত্তিতে উভয়ের মর্যাদা অভিন্ন। হযরত ইমাম হাসান তাঁর জীবনে অনেকগুলো যুদ্ধে সশরীরে অংশ নিয়েছিলেন। অন্যদিকে মু‘আবিয়ার বিশ বছরের রাজত্বকালের দশ বছর পর হযরত ইমাম হাসানকে বিষপ্রয়োগে শহীদ করা হলে আহ্লে বাইতের এবং তাঁদের ভক্ত-অনুরক্ত-অনুসারীদের নেতৃত্বে আসেন হযরত ইমাম হুসাইন (আ)।
কিন্তু ইমাম হুসাইন মু‘আবিয়ার শাসনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য প্রচারে অবতীর্ণ হন নি, যা তিনি ইয়াযীদের বিরুদ্ধে করেছিলেন। এর কারণ,তাঁদের দুই ভাইয়ের মধ্যকার চরিত্র বৈশিষ্ট্যের পার্থক্য নয়, বরং পরিস্থিতির পার্থক্য। ভাইবোনেরা, আলোচনার এ পর্যায়ে আমরা ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক মুহাম্মাদ মুনীর হুসাইন খানের কণ্ঠে শুনব ইমাম হুসাইন সম্পর্কিত একটি হাদিস:
মহানবী (সা) ইমাম হুসাইনকে কোলে রেখে বলেছিলেন, জিবরাইল আমাকে জানিয়েছেন যে আমার উম্মত এই হুসাইনকে হত্যা করবে। ইবনে আব্বাস বলেন, আমরাও সন্দেহ করতাম না (মহানবীর) আহলুল বাইত নিশ্চিত ছিলেন যে হুসাইন ইবনে আলী কারবালায় শহীদ হবেন।

ইসলামের সব মাযহাব ও ফির্কাহ্ হযরত আলীর খেলাফতের বৈধতার ব্যাপারে একমত। বিপুল সংখ্যক গণ্যমান্য সাহাবি ও সাধারণ জনগণের অনুরোধে তিনি খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও মু‘আবিয়া তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। হযরত আলীর শাহাদাতের পর শহীদ বৈধ খলীফার অনুসারী জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইমাম হাসানকে খলীফাহ্ হিসেবে বরণ করে নেন। কিন্তু মু‘আবিয়া যে কোনো মূল্যের বিনিময়ে ক্ষমতা দখল করতে দৃঢ়-সংকল্প ছিলেন। ঐ সময় ইমাম হাসানের অধীনে চল্লিশ হাজার সেনা ছিলো। এ অবস্থায় তিনি যুদ্ধ করলে সে যুদ্ধে হার-জিত যার যা-ই হতো না কেন,বিপুল সংখ্যক হতাহতের কারণে মুসলমানদের সামরিক শক্তি নিঃশেষ হয়ে যেতো এবং এই সুযোগে রোম সাম্রাজ্য হামলা চালিয়ে খুব সহজেই গোটা ইসলামী ভূখণ্ডকে দখল করে নিতো। এ কারণে, ইসলাম ও মুসলমানদের বৃহত্তর কল্যাণ তথা অস্তিত্ব রক্ষার লক্ষ্যে ইমাম হাসান মু‘আবিয়ার সঙ্গে সন্ধি করেন। অবশ্য মু‘আবিয়া লিখিতভাবে এ মর্মে অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়েছিলেন যে, তাঁর পরে হযরত ইমাম হুসাইনই খলীফা হবেন। কিন্তু মুয়াবিয়া সে অঙ্গীকার রক্ষা করে নি এবং নিজের চরিত্রহীন পুত্র ইয়াযীদকে পরবর্তী খলীফাহ তথা যুবরাজ মনোনীত করেন।
এতো কিছু সত্ত্বেও হযরত ইমাম হুসাইন মু‘আবিয়াহর বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিরোধিতা ও প্রচারে অবতীর্ণ হন নি। কারণ,সর্বসম্মত বৈধ খলীফা হযরত আলীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ থেকে শুরু করে ইয়াযীদকে যুবরাজ মনোনীত করার মধ্য দিয়ে রাজতন্ত্রের গোড়াপত্তনসহ মু‘আবিয়ার বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিচার-বিশ্লেষণ করা ও তা বোঝা তৎকালীন পরিবেশে সাধারণ মুসলিম জনগণের পক্ষে সম্ভব ছিলো না এবং তাদেরকে তা বুঝানোও সম্ভব ছিলো না। কারণ,সাধারণ মানুষ জানতো যে,তিনি ছিলেন হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর সাহাবি ও ওহি-লেখকদের অন্যতম এবং বাহ্যিক দ্বীনী আমলের ক্ষেত্রে তাঁর মধ্যে কোনো শৈথিল্য ছিলো না। এছাড়া অনেক সাহাবিও মুয়াবিয়ার সাথে ছিলেন। তাই ইমাম হুসাইন মুয়াবিয়ার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক বিরোধিতায় ও প্রচারে অবতীর্ণ হলে জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হতো এবং মু‘আবিয়ার পক্ষে তাঁর বিরাট প্রশাসন ও প্রচারযন্ত্র কাজে লাগিয়ে ইমাম হুসাইনকে ক্ষমতালোভী হিসেবে জনগণকে বিশ্বাস করানো সম্ভব হতো। আর তাই ইমাম হুসাইন (আ) সরাসরি মুয়াবিয়ার বিরোধিতায় নামেননি।

কিন্তু ইয়াযীদ ক্ষমতায় বসার পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। কারণ, ইয়াযীদের অনৈসলামী চরিত্রবৈশিষ্ট্য ছিলো এমনই সুস্পষ্ট যে, জনগণ কখনোই তাকে দ্বীনদার মনে করতো না, ফলে হযরত ইমাম হুসাইনের পক্ষ থেকে তার বিরোধিতায় বিভ্রান্তির কোনো কারণ ছিলো না। শুধু তা-ই নয়,এ ক্ষেত্রে ইমাম হুসাইনের নীরবতাও হতো ইসলামের জন্য বিপর্যয়কর। কারণ,নবী-রাসূলদের সমতুল্য মর্যাদা নিয়েও তিনি যদি কেবল প্রাণ বাঁচানোর লক্ষ্যে নীরব থাকতেন তাহলে এটা সব মুসলমানের জন্য সুবিধাবাদ ও কাপুরুষতার দৃষ্টান্ত হতো। তাই তিনি স্বল্পসংখ্যক অনুসারী নিয়েও প্রকাশ্যে সত্যের পতাকা উত্তোলন করেন।
উল্লেখ্য, ইমাম হুসাইন ইয়াযীদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ ঘোষণা করেননি। তিনি কেবল ইয়াযীদের মতো চরিত্রহীন ব্যক্তিকে খলীফা হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করেন এবং জনগণের কাছে সত্যকে তুলে ধরেন। তিনি তাঁর বিভিন্ন ভাষণে সুস্পষ্টভাবে বলেন যে, তাঁর আন্দোলনের লক্ষ্য ক্ষমতা দখল নয়, বরং তাঁর নানার আদর্শ পুনরুজ্জীবিত করা এবং ‘ভালো কাজের আদেশ দান ও মন্দ কাজে নিষেধ করাই ছিল তাঁর আন্দোলনের লক্ষ্য ।
লক্ষণীয় যে, ইমাম হুসাইন (আ) ইয়াযীদের অনুকূলে বাই‘আত্ হননি। তাই ইয়াযীদের বিরুদ্ধে তাঁর উত্থানকে সশস্ত্র বিদ্রোহ বলা যায় না। তিনি যা করেছেন তা হচ্ছে জনগণের মধ্যে সচেতনতা ও জাগরণের চেষ্টা। অন্য কথায়,তিনি নিজ মত প্রচারের মাধ্যমে জনমত গঠনের চেষ্টা চালিয়েছিলেন। আজকের দিনে বিশ্বের অধিকাংশ অমুসলিম দেশেও মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও সরকারের বিরোধিতা, এমনকি জনমত গঠনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের প্রচেষ্টাকে বৈধ গণ্য করা হয়। কিন্তু ইয়াযীদের স্বৈরাচারী রাজতান্ত্রিক শাসনে সে অধিকারটুকুও স্বীকার করা হচ্ছিলো না।#
পার্সটুডে/মু.আ.হুসাইন/মো.আবুসাঈদ/ ১৫
খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন