কারবালার মহাবিপ্লব ও এর শাশ্বত শিক্ষা (পর্ব-৭)
'কারবালার মহাবিপ্লব ও এর শাশ্বত শিক্ষা' শীর্ষক বিশেষ আলোচনার সপ্তম পর্বে সবাইকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।
কারবালার ঘটনা-প্রবাহ ও ইতিহাস নিয়ে মিথ্যা প্রচারণা এবং ভুল বা ইচ্ছাকৃত বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা আজও অব্যাহত রয়েছে। বনি-উমাইয়াদের সৃষ্ট মিথ্যা প্রচারণা বা ভুয়া ইতিহাসে বিভ্রান্ত বা মিথ্যাচারীদের অনেকেই বলতে চায় ইয়াজিদ ইমাম হুসাইনকে হত্যা করতে বলেননি বরং বন্দি করতে বলেছিলেন। কিন্তু ইয়াজিদের সেনাপতি বা গভর্নর আগ বাড়িয়ে ইমাম ও তার সঙ্গীদেরকে শহীদ করে। এ প্রচারণা দিনের আলোকে রাত বলে চালিয়ে দেয়ার মতই মিথ্যাচার। কারণ ইয়াজিদ যদি ইমামকে হত্যা করতে না চাইত তাহলে ইমামের ঘাতকদের পুরস্কার না দিয়ে তাদেরকে কঠোর শাস্তি দিত এবং আনন্দ-উল্লাস প্রকাশ করত না।
৬০ হিজরীর ১৫ই রজব মোয়াবিয়ার মৃত্যু হলে ইয়াযিদ মদীনার গভর্নরকে চিঠি লিখে বাবার মৃত্যুর খবর জানায় এবং জনগণের কাছ থেকে তার অনুকূলে বাইয়াত নেয়ার আদেশ করে। ইয়াযিদ জানতো যে,মদীনাই সবকিছুর কেন্দ্র এবং সবাই মদীনার দিকে তাকিয়ে আছে। তাই সে ঐ চিঠির ভিতরে একটা চিরকুটে ইমাম হুসাইনের (আ.) কাছ থেকে বাইয়াত নেয়ার কড়া আদেশ দিয়ে বলে যে,ইমাম হুসাইন (আ.) যদি বাইয়াত করতে অস্বীকৃতি জানায় তাহলে তার মাথা কেটে তার কাছে পাঠিয়ে দিতে হবে। এভাবে ইমাম হুসাইন (আ.) সরাসরি মহাসমস্যার সম্মুখীন হন। ওই বাইয়াতের অর্থ হতো ইয়াযিদের সব পাপাচারের স্বীকৃতি দেবার পাশাপাশি রাজতন্ত্রকে মেনে নেয়া তথা ইসলাম ও কুরআনের মুখেই কলঙ্ক লেপন।

উল্লেখ্য মোয়াবিয়াও ফাসেক ছিল। কিন্তু সে ভালোভাবেই বুঝতো যে,যদি তাদের রাজত্ব টিকিয়ে রাখতে হয় তাহলে বাহ্যিকভাবে ইসলামী বেশভূষা বজায় রাখতে হবে।
কিন্তু ইয়াযিদের এ জ্ঞানটুকুও ছিল না। বরং প্রকাশ্যে ইসলাম ও মুসলমানদের অপমান করে কিংবা শরীয়তের বিধান লঙ্ঘন করে সে তৃপ্তি পেত। মদ্যপান,কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে আবোল-তাবোল বকা,বানর নিয়ে খেলা করা এ ধরনের অগণিত হারাম কাজকে সে হালাল মনে করতো। এ কারণেই ইমাম হুসাইন বলেছিলেন:
‘ ইয়াযিদের মতো লোক যদি উম্মতের রক্ষক হয় তাহলে এখানেই ইসলামের বিলুপ্তি ঘটবে’। আসলে ইয়াযিদের অস্তিত্বই ছিল ইসলামের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রচার। তাই ইমাম হুসাইন বলতেন: আমি কোন ক্রমেই ওদের হাতে হাত দেব না-আর ওরাও আমার থেকে বাইয়াত চাওয়া বন্ধ করবে না।
এবারে আমরা ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক মুহাম্মাদ মুনীর হুসাইন খানের কণ্ঠে শুনব ইমাম হুসাইন সম্পর্কিত একটি হাদিস: আবু সায়িদ আল খুদরি থেকে বর্ণিত,মহানবী (সা) বলেছেন,নিশ্চয়ই হাসান ও হুসাইন বেহেশতি যুবকদের নেতা।

ইমাম হুসাইনের (আ.) মত ব্যক্তি বাইয়াত না করে স্বাধীনভাবে জনগণের মধ্যে ঘুরে বেড়াবে এর চেয়ে বিপজ্জনক ইয়াজিদের দলবলের জন্যে আর কি হতে পারে? তাই ইমাম হুসাইনকে (আ.) ক্ষমা করা ইয়াযিদের জন্যে ছিল অসম্ভব। কারণ বাইয়াত না করে তিনি বুঝাতে চান যে,‘ আমি তোমাদেরকে মানি না, তোমাদের আইন-কানুন মেনে চলারও কোনো দরকার মনে করি না। শুধু তাই নয়, এজন্যে আমি চুপ করে বসে থাকবো না,বরং তোমাদেরকে সমূলে উৎখাত করেই ছাড়বো।’ আর উমাইয়াদেরকে সমূলে উৎখাত করার মতো ক্ষমতা একমাত্র ইমাম হুসাইনেরই (আ.) ছিল। এ সত্য বুঝতে পেরে ইয়াযিদ মদিনায় ইমাম হুসাইনের (আ.) কাছে বাইয়াত চেয়ে জোর তাগাদা পাঠায়। ইমামকে ইয়াজিদি শাসক গোষ্ঠীর পক্ষ হতে বলা হল: যদি বাইয়াত না করেন তাহলে মৃত্যু অনিবার্য’। ইমাম জবাবে বললেন,‘ মৃত্যু বরণ করতে রাজী আছি কিন্তু বাইয়াত করতে পারবো না।’

এ ঘটনার পর থেকে ইমাম হুসাইন মাত্র তিনদিন মদীনায় কাটান। রাতে তিনি রাসূলের (সা.) কবরে এসে দোয়া কালাম পড়তেন এবং আল্লাহর কাছে বলতেন:‘ হে মাবুদ,আমার সামনে এমন রাস্তা খুলে দিন যে রাস্তা আপনার পছন্দনীয়।’ তৃতীয় তথা শেষের দিন রাতে ইমাম যথারীতি নবীজির (সা.) মাজারে এসে অনেক দোয়া-কালাম পড়ে অঝোরে কাঁদতে থাকেন এবং ক্লান্ত অবস্থায় এক সময় ওখানেই ঘুমিয়ে পড়লেন। ঘুমের ভিতরে স্বপ্নে নানা রাসূলুল্লাহর (সা.) কাছে প্রথমে তিনি জোর জবরদস্তি এবং অত্যাচার করার জন্যে উম্মতের বিরুদ্ধে নালিশ করলেন এবং এহেন দুর্দশা থেকে মুক্তির জন্যে মৃত্যু কামনা করলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) জবাবে বললেন :
‘ হে হুসাইন! আল্লাহর কাছে তোমার জন্য একটি মর্যাদা রয়েছে যা শাহাদাত ছাড়া তুমি অর্জন করতে পারবে না।’
এবার ইমাম হুসাইন (আ.) তার করণীয় স্পষ্টভাবে বুঝতে পরলেন। পরের দিন ভোরেই পরিবার-পরিজন নিয়ে মক্কাভিমুখে বেরিয়ে পড়লেন। তিনি কোনো আঁকা-বাকা বা অচেনা পথ বেছে নিলেন না বরং মদীনা থেকে মক্কায় যাবার সুপরিচিত পথ ধরেই এগিয়ে চললেন। ইমাম হুসাইন (আ.) ছিলেন বীরের বীর,তাঁর সাহস ছিল খোদায়ী বিশ্বাসে ভরপুর। তাই তিনি কোনো গোপন পথ না ধরে চেনা পথেই অগ্রসর হলেন এবং বললেন,‘ আমি পলাতকের বেশ পরতে মোটেই আগ্রহী নই। এই চেনা পথেই যাব-আল্লাহ যা চায় তা-ই হবে।’
ইমাম হুসাইনের (আ.) কাছ থেকে বাইয়াত আদায় করার আদেশ জারী করে ইয়াযিদ বিশেষ চিঠিতে লিখেছিল : ‘ইমাম হুসাইনকে (আ.) কঠোরভাবে ধরে বাইয়াত আদায় করে ছাড়বে।’
অপরদিকে ইমাম হুসাইন (আ.)ও কঠোরভাবে এ প্রস্তাব নাকচ করে দেন। তার এ সিদ্ধান্ত ছিল পাহাড়ের মতো অটল। তাই কারবালার ময়দানে চরম দুর্দশায় ফেলে ইবনে সাদ ভেবেছিল এখন হয়তো ইমাম হুসাইন (আ.) আপোষ-রফা মেনে নেবেন। কিন্তু শেষ মুহুর্ত পর্যন্তও ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁর সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন। তিনি এক ভাষ্যে বলেন,‘ না। আল্লাহর কসম করে বলছি যে,কিছুতেই আমি তোমাদের হাতে হাত মিলাবো না। এমনকি আজ-এ দূরবস্থার মধ্যে পড়েও, নিজ সঙ্গী সাথীদের মৃত্যু নির্ঘাত জেনেও,পরিবার-পরিজনদের বন্দীদশা অনিবার্য জেনেও আমি আমার মহান লক্ষ্যকে তোমাদের কাছে বিকিয়ে দেব না।’

ইয়াজিদের মত বর্বর ও নিষ্ঠুর শাসকের আনুগত্য অস্বীকারের পরিণতি কি হতে পারে তা ভেবে যখন অনেক খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব আতঙ্কিত ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়েছিলেন অথবা আপোষ বা নীরবতার পথ ধরেছিলেন তখন ইমাম হুসাইন (আ) প্রকাশ্যেই এই চরম জালিম ও তাগুতি শাসকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে জনগণকে জাগাতে সচেষ্ট হন। এ সময় ইমামের প্রতি সহানুভূতিশীল অনেক সাহাবি ও এমনকি তাঁর এক সৎ ভাইও বিপ্লবী তৎপরতা বন্ধের পরামর্শ দিয়েছিলেন তাঁকে। তাদের কেউ কেউ বলেন, ইমাম এ সময় রাসূলুল্লাহর (সা.) মাজারের পাশে থাকলে নিরাপদ থাকতেন। জবাবে ইমাম বলেছিলেন,‘ আমি যদি কোনো পশুর গর্ত গিয়েও আশ্রয় নেই তবুও ওরা আমাকে ছাড়বে না। ওরা আমার কাছ থেকে যেটা চায় কখনও তা আমি মেনে নিতে পারিনা, আর আমি যেটা চাই সেটা ওদের পক্ষেও মেনে নেয়া অসম্ভব।
কারবালার মহাবিপ্লবের নানা দিক ও শিক্ষা সম্পর্কে আমরা আরও কথা বলব এ পর্বের আগামী আসরে। #
পার্সটুডে/মু.আ.হুসাইন/মো.আবুসাঈদ/ ১৭
খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন