অক্টোবর ২৪, ২০১৯ ১৬:১৫ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে  সূরা আস-সাফফাতের ২২ থেকে ৩০ নম্বর আয়াতের তাফসির উপস্থাপন করা হবে। এই সূরার ২২ ও ২৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

احْشُرُوا الَّذِينَ ظَلَمُوا وَأَزْوَاجَهُمْ وَمَا كَانُوا يَعْبُدُونَ (22) مِنْ دُونِ اللَّهِ فَاهْدُوهُمْ إِلَى صِرَاطِ الْجَحِيمِ (23)

“(মহান আল্লাহ ফেরেশতদের এই নির্দেশে দেবেন যে,) একত্রিত কর গোনাহগারদেরকে, তাদের দোসরদেরকে এবং তারা যাদের এবাদত করত।” (৩৭:২২)

“আল্লাহ ব্যতীত। অতঃপর তাদের সবাইকে পরিচালিত কর জাহান্নামের পথে।” (৩৭:২৩)

গত আসরে আমরা বলেছি, জাহান্নামের অধিবাসীরা কিয়ামতের দিন দোজখের আগুন দেখার পর অনুতপ্ত হবে এবং নিজেদেরকে এই বলে ভর্ৎসনা করবে যে, হায়! যদি আমরা আজকের দিনটিকে অস্বীকার না করতাম! এরপর আজকের এই দুই আয়াতে বলা হচ্ছে: আল্লাহ তায়ালা সেদিন জাহান্নামের প্রহরায় নিযুক্ত ফেরেশতাদের নির্দেশ দেবেন: কাফির, জালিম এবং তারা আল্লাহ ছাড়া অন্য যেসব উপাস্যের পূজা করত তাদের সবাইকে অন্যদের কাছ থেকে আলাদা স্থানে জড়ো করো এবং এরপর জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাও।

জুলুম স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন ধরনের হয়। প্রচলিত অর্থে অন্যের প্রতি অন্যায়-অবিচারকে জুলুম বলা হয়। পবিত্র কুরআনে এই অর্থটি বহাল থাকার পাশাপাশি নিজের প্রতি অন্যায় করাকেও জুলুম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহর সঙ্গে যারা অন্য কোনো উপাস্যকে শরীক করে তারা নিজেদের প্রতি অনেক বড় জুলুম করে; যা আল্লাহ তওবা ছাড়া ক্ষমা করেন না।

মুশরিকরা যাদের উপাসনা করে তাদের দু’টি শ্রেণি রয়েছে এবং এই দুই শ্রেণিকেই জাহান্নামে পাঠানো হবে। একশ্রেণির জালিম ও কাফির শাসক নিজেদেরকে আল্লাহর স্থানে বসিয়ে প্রজাদেরকে তাদের উপাসনা করতে বাধ্য করে। মানুষরূপী এই শাসকরা নিজেরা মাবুদ সেজেছে বলে তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। আর মাটি, পাথর ও কাঠের তৈরি মূর্তিগুলোকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে যারা তাদের পূজা করত তাদেরকে ভর্ৎসনা করার জন্য।

আয়াতের পরবর্তী অংশে বলা হচ্ছে: তাদেরকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাও। অর্থাৎ দুনিয়ায় যারা সিরাতুল মুস্তাকিমে পরিচালিত হয়নি তাদেরকে কিয়ামতের দিন জাহান্নামের পথ দেখিয়ে দেয়া হবে এবং সেই পথে তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হবে জোর করে। অথচ দুনিয়ায় সিরাতুল মুস্তাকিমে চললে আজ তারা খুশিমনে জান্নাতে যাওয়ার স্বাধীনতা পেত।

এই দুই আয়াতের দু’টি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:

১- কিয়ামতের দিন সমচিন্তা ও সমভাবসম্পন্ন মানুষদেরকে একসঙ্গে পুনরুত্থিত করা হবে। দুনিয়ায় ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রক্ষাকারী মানুষেরা কিয়ামতে একই পথের পথিক হবে। এমনকি তাদের মাবুদ যদি মাটি ও পাথরের তৈরিও হয় তাহলেও তাদেরকে একসঙ্গে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।

২- কিয়ামতের দিন জাহান্নামের ফয়সালা হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদেরকে কোনো ব্যক্তি বা বস্তু জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারবে না।

সূরা সাফফাতের ২৪ থেকে ২৬ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَقِفُوهُمْ إِنَّهُمْ مَسْئُولُونَ (24) مَا لَكُمْ لَا تَنَاصَرُونَ (25) بَلْ هُمُ الْيَوْمَ مُسْتَسْلِمُونَ (26)

“এবং তাদেরকে থামাও, তারা জিজ্ঞাসিত হবে;” (৩৭:২৪)

“(তাদেরকে বলা হবে) তোমাদের কি হল যে, তোমরা একে অপরের সাহায্য করছ না?" (৩৭:২৫)

“(তারা কেউ কাউকে সাহায্য করতে পারবে না) বরং তারা আজকের দিনে (মহান আল্লাহর কাছে) আত্নসমর্পণকারী।” (৩৭:২৬)

এই তিন আয়াতে বলা হচ্ছে: আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদেরকে কাফির ও জালিমদের থামাতে বলবেন। কারণ, জাহান্নামে নিক্ষেপের আগে তাদেরকে কিছু প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। যদিও আল্লাহ তায়ালার কাছে এসব প্রশ্নের  উত্তর স্পষ্ট তারপরও তাদেরকে ভর্ৎসনা করার পাশাপাশি কেন তাদেরকে জাহান্নামে পাঠানো হচ্ছে তার কারণ জানানোর লক্ষ্যে এসব প্রশ্ন করা হবে।

তাদের কাছে জানতে চাওয়া হবে, তোমাদের সঙ্গে তো এখন বহু সঙ্গী রয়েছে যারা দুনিয়ায় পরস্পরকে খারাপ কাজে সহযোগিতা করতে। তাহলে আজ কেন জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচতে তাদের সাহায্য নিচ্ছ না? এ প্রশ্নের জবাবে তারা বলবে, আজ কোনো শক্তিধর, ক্ষমতাধর বা বন্ধুই আমাদেরকে বাঁচাতে পারবে না। তারা সবাই আজ মহা পরাক্রমশালী আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করেছে। আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া তাদের পক্ষে কোনো কিছুই করা সম্ভব নয়।

এই তিন আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে;

১- কিয়ামতের দিন আমাদেরকে আল্লাহ তায়ালার জিজ্ঞাসাবাদের সম্মুখীন হতে হবে। জীবন ও যৌবনকে কোন পথে ব্যয় করেছি, কাকে বিশ্বাস করেছি এবং কার উপাসনা করেছি ইত্যাদি প্রশ্ন।

২- দুনিয়ার ক্ষমতাধর, প্রতাপশালী ও অহংকারী সব মানুষ কিয়ামতের দিন আল্লাহর ইচ্ছার সামনে নিরূপায় হয়ে যাবে।

৩- কিয়ামতের দিন অপরাধীরা একে অপরকে সাহায্য করতে পারবে না।

এই সূরার ২৭ থেকে ৩০ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে বলা হয়েছে:

وَأَقْبَلَ بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ يَتَسَاءَلُونَ (27) قَالُوا إِنَّكُمْ كُنْتُمْ تَأْتُونَنَا عَنِ الْيَمِينِ (28) قَالُوا بَلْ لَمْ تَكُونُوا مُؤْمِنِينَ (29) وَمَا كَانَ لَنَا عَلَيْكُمْ مِنْ سُلْطَانٍ بَلْ كُنْتُمْ قَوْمًا طَاغِينَ (30)

“তারা একে অপরের দিকে মুখ করে পরস্পরকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে।” (৩৭:২৭)

“তারা বলবে, নিঃসন্দেহে তোমরা (দৃশ্যত) আমাদের উপকার করার অজুহাতে আমাদের কাছে আসতে।” (৩৭:২৮)

“(উত্তরে) তারা বলবে, বরং তোমরা নিজেরা তো বিশ্বাসীই ছিলে না।” (৩৭:২৯)

“এবং তোমাদের উপর আমাদের কোন কতৃত্ব ছিল না, বরং তোমরাই ছিলে সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়।” (৩৭:৩০)

এই চার আয়াতে কিয়ামতের দিনের একটি দৃশ্য সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সেদিন জাহান্নামের অধিবাসীরা তাদের এই করুণ পরিণতির জন্য পরস্পরকে দায়ী করবে। প্রথমে খারাপ কাজের অনুসারীরা তাদের নেতাদের বলবে: তোমরাই আমাদের উপকার করার অজুহাতে আমাদেরকে এই কাজে লিপ্ত করেছ। তোমরা না থাকলে আমরা এই পাপকাজে লিপ্ত হতাম না এবং এখন জাহান্নামেও যেতে হতো না। কিন্তু সেদিন নেতারা এই অভিযোগ অস্বীকার করবে। তারা বলবে, তোমরা নিজেরাই তো ঈমানদার ছিলে না। তোমাদের ঈমান থাকলে তোমরা আমাদের অনুসরণ করার পরিবর্তে আল্লাহ ও তার রাসূলকে অনুসরণ করতে। কাজেই তোমরা আজ এই পরিণতির জন্য নিজেদেরকে অভিযুক্ত করো। আমরা তোমাদেরকে কোনো কাজে বাধ্য করিনি। তোমাদের অন্তরে সীমা লঙ্ঘনের বৈশিষ্ট্য ছিল বলে আমাদের অনুসরণ করেছিলে।

এই চার আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:

১- কিয়ামতের দিন কাফের ও মুশরিকরা তাদের নেতাদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে নিজেদেরকে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করবে। কিন্তু সেদিন এই প্রচেষ্টা কাজে আসবে না।

২- পার্থিব জীবনে কাফির ও মুশরিক নেতারা বাহ্যত মানুষের উপকার করার অজুহাতে তাদেরকে ধোঁকা দেয় ও ভিন্নপথে পরিচালিত করে।

৩- বাহ্যিক পরিবেশ মানুষকে গোনাহ করতে বাধ্য করতে পারে না; বরং তাকে প্ররোচিত করতে পারে মাত্র। অন্তর কলুষিত হয়ে গেলে তখনই মানুষ পাপের পথে ধাবিত হয়। খারাপ বা ভালো কাজের প্রস্তুতি শুরু হয় অন্তর থেকে। সেই অন্তরের নিয়ন্ত্রণ মানুষের নিজের হাতে রয়েছে।#