ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২০ ১৩:৩৭ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা আস-সাফফাতের ৭৯ থেকে ৯২ নম্বর আয়াতের তাফসির উপস্থাপন করা হবে। এই সূরার ৭৯ থেকে ৮২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

سَلَامٌ عَلَى نُوحٍ فِي الْعَالَمِينَ (79) إِنَّا كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ (80) إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُؤْمِنِينَ (81) ثُمَّ أَغْرَقْنَا الْآَخَرِينَ (82)

“বিশ্ববাসীর মধ্যে নূহের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক।” (৩৭:৭৯)

“আমি এভাবেই সৎকর্ম পরায়ণদেরকে পুরস্কৃত করে থাকি।” (৩৭:৮০)

“প্রকৃতপক্ষেই সে ছিল আমার ঈমানদার বান্দাদের অন্যতম।” (৩৭:৮১)

“অতঃপর আমি অপরাপর সবাইকে নিমজ্জত করেছিলাম।” (৩৭:৮২)

এর আগের আয়াতগুলোতে বলা হয়েছে, হযরত নূহ (আ.) ও তাঁর ঈমানদার সঙ্গীরা ঐশী আজাব অর্থাৎ ভয়াবহ তুফান থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন। এরপর এই চার আয়াতে বলা হচ্ছে: যেসব কাফের হযরত নূহের রিসালাতকে অস্বীকার এবং এই নবীর দাওয়াতের বাণীকে উপহাস করেছিল তাদের সবাই আজাবের শিকার হয়ে পানিতে ডুবে মারা যায়। আয়াতগুলোর শুরুতেই আল্লাহ তায়ালা নূহ (আ.)’র প্রতি সালাম দিচ্ছেন। কারণ, তিনি তাঁর জাতির লোকদেরকে কুফরির অন্ধকার থেকে মুক্তি দেয়ার জন্য সুদীর্ঘ ৯৫০ বছর প্রচেষ্টা চালিয়েছেন, সংগ্রাম করেছেন, নির্যাতন সহ্য করেছেন এবং ধৈর্য ধরেছেন।

একজন মানুষের প্রতি আল্লাহ তায়ালা নিজে সালাম দিচ্ছেন এবং সেই সালামের কথা কুরআনে কারিমের মাধ্যমে কিয়ামত পর্যন্ত সকল মানুষকে জানিয়ে দেয়া হচ্ছে। এর চেয়ে বড় সৌভাগ্যের বিষয় আর কি হতে পারে?

আয়াতের পরের অংশে বলা হচ্ছে: আল্লাহ তায়ালার এই সালাম ও পুরস্কার শুধুমাত্র নূহের জন্য সীমাবদ্ধ নয় বরং সৃষ্টির শুরু থেকে কিয়ামত পর্যন্ত সকল ঈমানদার ও সৎকর্মশীল মানুষ আল্লাহর সালাম ও পুরস্কারে ভূষিত হবে।  

এই চার আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:

১. অতীতে যেসব নবী-রাসূল ও আউলিয়া পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন তারা সবাই আমাদের সালাম শুনতে পান। যদি তারা শুনতে ও উপলব্ধি করতে না পারতেন তাহলে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে তাদেরকে সালাম দেয়া নিরর্থক হয়ে যেত।

২. ঈমান ও সৎকর্ম পরস্পরের পরিপূরক এবং একটি ছাড়া অন্যটি অর্থহীন।

৩. পৃথিবীতে আল্লাহর আজাব নেমে আসলে ঈমানদার সৎকর্মশীল বান্দারা কাফেরদের মধ্যে জীবনযাপন করলেও আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে রক্ষা করেন।

সূরা সাফফাতের ৮৩ থেকে ৮৭ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَإِنَّ مِنْ شِيعَتِهِ لَإِبْرَاهِيمَ (83) إِذْ جَاءَ رَبَّهُ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ (84) إِذْ قَالَ لِأَبِيهِ وَقَوْمِهِ مَاذَا تَعْبُدُونَ (85) أَئِفْكًا آَلِهَةً دُونَ اللَّهِ تُرِيدُونَ (86) فَمَا ظَنُّكُمْ بِرَبِّ الْعَالَمِينَ (87)   

“নিঃসন্দেহে ইব্রাহিম ছিল নূহের অনুসারীদের অন্যতম।” (৩৭:৮৩)

“যখন সে তার পালনকর্তার নিকট পবিত্র হৃদয়ে উপস্থিত হয়েছিল,” (৩৭:৮৪)

“যখন সে তার পিতা ও সম্প্রদায়কে বলেছিল: তোমরা কিসের উপাসনা করছ?” (৩৭:৮৫)

“তোমরা কি মিথ্যামিথ্যি আল্লাহ ব্যতীত অন্য উপাস্য কামনা করছ?” (৩৭:৮৬)

“তাহলে বিশ্বজগতের পালনকর্তা সম্পর্কে তোমাদের ধারণা কি?”(৩৭:৮৭)

সময়ের দিক দিয়ে হযরত নূহ (আ.)’র বহু পরে হযরত ইব্রাহিম (আ.) পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন। কিন্তু যেহেতু দু’জনের রিসালাতের বিষয়বস্তু ছিল এক অর্থাৎ তৌহিদ বা আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদ প্রচার করা তাই পবিত্র কুরআনে হযরত ইব্রাহিমকে হযরত নূহের অনুসারী বলা হয়েছে। এমনভাবে দু’জনের কথা উপস্থাপন করা হয়েছে যেন, তাদের মধ্যে সময়ের কোনো পার্থক্য ছিল না।  এখানে হযরত ইব্রাহিমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বৈশিষ্ট্যটি তুলে ধরা হয়েছে তা হলো- ‘কালবি সালিম’ বা ‘পবিত্র হৃদয়’।  ‘সালিম’ শব্দের অর্থ সব ধরনের দুষণ ও শিরক থেকে মুক্ত ও পবিত্র। একইসঙ্গে আল্লাহ তায়ালার সামনে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ বোঝাতেও আরবি ভাষায় ‘সালিম’ শব্দ ব্যবহৃত হয়।

হযরত ইব্রাহিম (আ.)’র হৃদয় বা অন্তর শিরক ও কুফর থেকে মুক্ত ও পবিত্র ছিল বলে তিনি তার সম্প্রদায়ের লোকদের শিরক ও মূর্তিপূজা মেনে নিতে পারছিলেন না। এ কারণে তিনি তাদেরকে এক আল্লাহর একত্ববাদের দিকে আহ্বান জানান। তিনি প্রশ্ন করেন, তোমরা কীভাবে প্রাণহীন মূর্তির সামনে মাথানত করছ? কেন তোমরা আসল সৃষ্টিকর্তাকে বাদ দিয়ে মিথ্যা উপাস্যদের কাছে ধর্ণা দিচ্ছ? বিশ্বজগতের প্রতিপালককে উপেক্ষা করে তোমরা কীভাবে তারই দয়া ও রহমত কামনা করছ?

এই পাঁচ আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:

১. সব নবী রাসূলের দেখানো পথ এক এবং তাদের মধ্যে কোনো মতপার্থক্য বা পরস্পরবিরোধিতা নেই। স্থান ও কালভেদে ইসলামের মৌলিক শিক্ষায় কোনো পরিবর্তন আসেনি।

২. শিরক ও কুফর থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকা এবং আল্লাহ তায়ালার আদেশ-নিষেধের সামনে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ হচ্ছে নবী-রাসূল ও তাদের অনুসারীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

এই সূরার ৮৮ থেকে ৯২ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

فَنَظَرَ نَظْرَةً فِي النُّجُومِ (88) فَقَالَ إِنِّي سَقِيمٌ (89) فَتَوَلَّوْا عَنْهُ مُدْبِرِينَ (90) فَرَاغَ إِلَى آَلِهَتِهِمْ فَقَالَ أَلَا تَأْكُلُونَ (91) مَا لَكُمْ لَا تَنْطِقُونَ (92)

“অতঃপর সে একবার তারকাদের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করল।”(৩৭:৮৮)

“এবং বলল: আমি পীড়িত।” (৩৭:৮৯)

“অতঃপর তারা তার প্রতি পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে চলে গেল।” (৩৭:৯০)

“অতঃপর সে গোপনে তাদের মূর্তিগুলোর কাছে গেল এবং (উপহাস করে) বলল: তোমরা খাচ্ছ না কেন?”(৩৭:৯১)

“তোমাদের কি হল যে, কথা বলছ না?” (৩৭:৯২)

আগের আয়াতগুলোতে কাফেরদের উদ্দেশে হযরত ইব্রাহিম (আ.)’র কিছু প্রশ্ন উত্থাপনের পর এই আয়াতগুলোতে কাফেরদেরকে সঠিক পথের দিশা দেয়ার জন্য আল্লাহর এই নবীর আরেকটি পদ্ধতির কথা জানানো হয়েছে।  সেকালে বাবেল শহরের মানুষ উৎসব পালনের জন্য শহরের বাইরে চলে যেত। তারা উৎসবের আগের রাতে হযরত ইব্রাহিমকে তাদের সঙ্গে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানায়। কিন্তু আল্লাহর নবী উৎসবের সুযোগটিকে কাজে লাগাতে চান বলে কৌশলের আশ্রয় নেন। তিনি বাবেলের মানুষদের ভ্রান্ত বিশ্বাসের সূত্র ধরে আকাশের তারকারাজির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর বলেন: গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থা ভালো নয়। আমার কাছে মনে হচ্ছে আমি শহর থেকে বাইরে গেলে অসুস্থ হয়ে যাব। তাই আমার জন্য শহরে থেকে যাওয়াই শ্রেয় হবে।

নিঃসন্দেহে ভাগ্যের ওপর গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাবের প্রতি হযরত ইব্রাহিমের বিন্দুমাত্র বিশ্বাস ছিল না। কিন্তু তিনি কাফেরদের কাছে নিজের উত্তরকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য এই কৌশল অবলম্বন করেন। এরপর সবাই উৎসবে চলে গেলে আল্লাহর নবী মূর্তিগুলোর কাছে যান। তিনি তাদেরকে প্রশ্ন করেন, তোমাদের সামনে যেসব প্রসাদ সাজিয়ে রাখা হয়েছে তোমরা সেগুলো খাচ্ছো না কেন? মুশরিকরা তো মনে করে তোমরা তাদের ভাগ্য নিয়ন্তা; তাহলে কেন তোমাদের কোনোকিছু করার ক্ষমতা নেই?

এই পাঁচ আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:

১. দ্বীন প্রচারের ক্ষেত্রে প্রত্যেক জাতির কাছে ওই জাতির জন্য বোধগম্য পদ্ধতিতে দাওয়াত দিতে হবে। এজন্য আলোচ্য জাতির রীতিনীতি ও ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখতে হবে।

২. সমাজের কুসংস্কার ও ভ্রান্ত বিশ্বাসের বিরুদ্ধে বিচক্ষণতার সঙ্গে লড়তে হবে এবং উপযুক্ত সুযোগের অপেক্ষায় থাকতে হবে।