ইরান-ইরাক যুদ্ধের ইতিহাস ( ১১ পর্ব): যুদ্ধের শুরুতে ইরানে রাজনৈতিক মতবিরোধ
আজকের আসরে আমরা যুদ্ধের শুরুতে ইরানে রাজনৈতিক মতবিরোধ এবং এর জের ধরে তেহরানের কাছ থেকে অতিরিক্ত ছাড় আদায়ের ব্যাপারে ইরাকের সাদ্দাম সরকারের মনে যে ভুল আশা তৈরি হয়েছিল সে সম্পর্কে আলোচনা করব।
গত কয়েকটি আসরে আমরা ইরাকি বাহিনীর আগ্রাসনের মোকাবিলায় ইরানের যুদ্ধ প্রস্তুতি এবং ইরানি জওয়ানদের প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পর্কে ইরাকের তৎকালীন সাদ্দাম সরকারের ভুল হিসাব-নিকাশ সম্পর্কে আলোচনা করেছি। আমরা বলেছি, সাদ্দাম ভেবেছিলেন, তার বাহিনী মাত্র তিন দিনের মধ্যে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় তেল-সমৃদ্ধ খুজিস্তান প্রদেশ দখল করে নিতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় তার ভিন্ন চিত্র। ওই প্রদেশের একটি শহর অর্থাৎ খোররামশাহর দখল করতেই আগ্রাসী বাহিনীর ৩৪ দিন লেগে যায়। এ অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে সাদ্দামের আর বুঝতে বাকি থাকে না যে, ইরানি যোদ্ধাদের প্রতিরোধের মুখে এ আগ্রাসনে খুব একটা সুবিধা করে উঠতে পারবে না ইরাকি বাহিনী। তাই তিনি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব উত্থাপন করেন। কিন্তু হাজার হাজার বর্গকিলোমিটার ভূমি ইরাকের দখলে থাকা অবস্থায় যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব মেনে নেয়া তেহরানের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই ওই প্রস্তাবে কোনো ভ্রুক্ষেপই করেনি তেহরান।
এ অবস্থায় ইরাক সরকার তার দখলে থাকা ইরানি ভূমিতে সামরিক অবস্থান শক্তিশালী করে। এ সম্পর্কে তৎকালীন মার্কিন নৌবাহিনীর অন্যতম কমান্ডার উইলিয়াম এফ হাইকম্যান লিখেছেন: “ইরাকি সেনারা তাদের দখলীকৃত ভূমিতে অবস্থান করছিল এবং তেহরানে রাজনৈতিক মতবিরোধ চলতে থাকায় ইরানের পক্ষেও হাতছাড়া হয়ে যাওয়া ভূমি পুনরুদ্ধারের তৎপরতা চালানো সম্ভব হচ্ছিল না।” এ অবস্থায় ইরাক-ইরান যুদ্ধে চরম অচলাবস্থা দেখা দেয়। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, ইরানে কি ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিয়েছিল যার কারণে তেহরানের পক্ষে শত্রুর হাতে দখল হয়ে যাওয়া ভূমি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা পর্যন্ত চালানো সম্ভব হচ্ছিল না?
এ প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য আমাদেরকে খানিকটা পেছনে ফিরে যেতে হবে। ইসলামি বিপ্লবের আগে ইরানের ওপর চেপে বসা আমেরিকার পদলেহী স্বৈরাচারী শাহ সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছিল অনেকগুলো বিপরীতমুখী রাজনৈতিক শক্তি; যদিও প্রধান বিপ্লবী শক্তি ছিল ইসলামি বিপ্লবের রূপকার ইমাম খোমেনী (রহ.) নেতৃত্বাধীন ইসলামপ্রিয় জনতা। কিন্তু সব দল ও পক্ষ শাহকে ক্ষমতা থেকে উৎখাতের তৎপরতায় জড়িত ছিল বলে তাদের মধ্যকার মতবিরোধ বিপ্লবের আগে খুব বেশি প্রকাশিত হয়নি। বিপ্লব বিজয়ের পরও যতক্ষণ পর্যন্ত সবগুলো রাজনৈতিক ধারা নবগঠিত ইসলামি শাসনব্যবস্থার প্রতি সমর্থন দিয়ে যাচ্ছিল ততদিন পর্যন্ত এই রাজনৈতিক মতভেদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেনি। প্রথম প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচনে সবগুলো রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করে। কিন্তু ইসলামের শত্রুরা বিশেষ করে তৎকালীন সোভিয়েতপন্থি বাম রাজনৈতিক ধারা ধীরে ধীরে ইসলামি সরকারের বিরুদ্ধাচরণ করতে শুরু করে।
এ সময় ইসলামি বিপ্লবে জড়িত বহু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও ধারা নিজেদের অস্তিত্বকে বিপদাপন্ন হতে দেখে নবগঠিত ইসলামি সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। আর এই ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় তেহরানের মার্কিন দূতাবাস। বিষয়টি উপলব্ধি করে ইমাম খোমেনী (রহ.)’র অনুসারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ১৯৮০ সালের শেষদিকে গুপ্তচরবৃত্তির আখড়া হিসেবে খ্যাত মার্কিন দূতাবাস দখল করে নেন এবং তারা সেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ দলিল-প্রমাণ উদ্ধার করেন। এসব দলিল থেকে মার্কিন দূতাবাসের গুপ্তচরবৃত্তির তৎপরতার পাশাপাশি বিপ্লবীদের মধ্যে ঘাপটি মেরে বসে থাকা ষড়যন্ত্রকারীদের স্বরূপ উন্মোচিত হয়ে যায়। এ কারণে বিপ্লবী ছাত্ররা মার্কিন দূতাবাসের নাম দেন গুপ্তচরবৃত্তির আখড়া।

মার্কিন দূতাবাস দখলের মাধ্যমে ইসলামি সরকার বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের স্বরূপ উন্মোচিত হয়ে যাওয়ার পর নিজেদের বাঁচানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে তারা ইসলামি বিপ্লবের পতন ঘটানোর জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন। কারণ ইসলামি সরকার ক্ষমতায় থাকলে তাদের বিচার হবে এবং তাতে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। মহা বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, ইসলামি বিপ্লবের কঠিন দিনগুলোতে ইমাম খোমেনী (রহ.)’র ঘনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী রাজনীতিবিদ বনি সাদ্র ইরানের সেই স্পর্শকাতর দিনগুলোতে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেন। ইমাম তাকে এতটাই বিশ্বাস করেছিলেন যে, তিনি বনি সাদ্রকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রার্থী করেন এবং জনগণ তাকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করে। বনি সাদ্র প্রকাশ্যে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছিলেন আর গোপনে বিপ্লব বিরোধীদের সঙ্গে আঁতাত করে ইসলামি সরকারব্যবস্থার পতন ঘটানোর চেষ্টা করছিলেন।
ইসলামি বিপ্লবের চূড়ান্ত দিনগুলোতে ইমাম খোমেনী (রহ.) যখন ফ্রান্সে প্রবাসী জীবন কাটাচ্ছিলেন তখন কৌশলে ইমামের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিতে পরিণত হলেও ইসলামি বিপ্লবের রূপকারের সঙ্গে রাজনৈতিক চিন্তাচেতনায় আকাশ-পাতাল তফাৎ ছিল বনি সাদ্রের। কিন্তু বিপ্লবের পরপরই ইমামের অনুমোদন নিয়ে জননির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর বনি সাদ্র ভাবতে শুরু করেন এবার তিনি তার গোপন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারবেন। শাসনব্যবস্থার কাঠামো থেকে বিপ্লবী ব্যক্তিদের অপসারণের কাজে হাত দেয়ার সাহসও দেখান তিনি। কিন্তু ইরাকি বাহিনীর আগ্রাসনের মাধ্যমে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে বিপ্লবী শক্তিকে সুসংহত করার জন্য ইমাম খোমেনী (রহ.)’র অনুসারী বলে একটি রাজনৈতিক ধারা নিজেদেরকে সুসংহত ও শক্তিশালী করে। এর ফলে বনি সাদ্রের পক্ষে তার অশুভ রাজনৈতিক লক্ষ্য চরিতার্থ করা কঠিন হয়ে যায়। কিন্তু তারপরও তার প্রচেষ্টা থেমে থাকেনি। পদাধিকারবলে সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে তিনি ইমামের অনুসারী রাজনৈতিক ধারাকে ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দূরে সরিয়ে দেয়ার কাজ অব্যাহত রাখেন।
এদিকে বিপ্লবের পর নয়া ইসলামি সরকার রাজনৈতিক ও সামরিক খাতে মৌলিক সংস্কারের কাজে হাত দেয়। এর ফলে রাজনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে অভ্যস্ত ইসলামি শক্তির পক্ষে সংস্কারের কাজ চলার একই সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব হয়। কিন্তু সামরিক বাহিনী এই মৌলিক পরিবর্তন সহজে মেনে নিতে চায়নি বলে সেখানে কিছুটা ভারসাম্যহীন পরিস্থিতি দেখা দেয়। ইসলামি সরকার গঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইমাম খোমেনী (রহ.) বিপ্লবী চেতনা রক্ষা করার লক্ষ্যে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি গঠন করার নির্দেশ দেন। এ সময় সামরিক বাহিনীতে শুদ্ধি অভিযানে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা এই গুজব ছড়িয়ে দেয় যে, আইআরজিসি গঠনের কারণে সেনাবাহিনী বিলুপ্ত করে দেয়া হবে। এই গুজব ছড়িয়ে দিয়ে সামরিক অঙ্গনে চরম অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা হয়।
এরকম পরিস্থিতিতে ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ করে গোম্বাদ, কুর্দিস্তান, খুজিস্তান ও বালুচিস্তানে বিপ্লব বিরোধী সশস্ত্র ব্যক্তিরা চরম সংকট সৃষ্টির চেষ্টা করে এবং সাধারণ মানুষ ও ইসলামি বিপ্লবের প্রতি অনুগত বাহিনীর ওপর ব্যাপক হত্যাকাণ্ড শুরু করে। এ সময় কোনো কোনো সীমান্ত এলাকায় বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতাও শুরু হয়ে যায়। সার্বিকভাবে নব্য প্রতিষ্ঠিত ইসলামি শাসনব্যবস্থা দেশের ভেতরেই ব্যাপক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। ইরানের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ইরাকে সাদ্দাম সরকারের মনে এই আশা সৃষ্টি করে যে, সে দুর্বল ইরানকে সহজেই ধরাশায়ী করতে অথবা ইরাকি বাহিনী অন্তত যে কয়েক হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করেছে তা নিজের করায়ত্বে রেখে দিতে পারবে।#
পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ / ০১